kalerkantho

26th march banner

চুরি হওয়া এক গাড়ি উদ্ধারের শ্বাসরুদ্ধকর গল্প

আশরাফুল হক রাজীব   

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কর্মকর্তাদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গাড়িটি সচিবালয়ে জমা করার আগে চালক ওমর ফারুকের এক কাপ চা খাওয়ার ইচ্ছা জাগে। তিনি রাত ৯টা ২০ মিনিটে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি গাড়িটি পার্ক করে রেস্টুরেন্টে ঢোকেন। ভেতরটা বেশ ফাঁকা। হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে বসার সঙ্গে সঙ্গে চা চলে আসে। তবে ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিতে গিয়েই তাঁর চোখ ছানাবড়া। একি! গাড়ি তো চলে যাচ্ছে! ‘আমার গাড়ি চলে যাচ্ছে, চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে...’ চিত্কার করতে করতে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আসেন তিনি। দেখেন গাড়িটি ওসমানী উদ্যানের সামনে দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। পাশেই একটি প্রাইভেট কার ছিল। সেটি থামিয়ে নিজের গাড়ির পিছু নেন তিনি। কিন্তু শিক্ষা ভবনের সামনে এসে গাড়িটি হারিয়ে ফেলেন। দ্রুত ফিরে আসেন জিরো পয়েন্টে। কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জেন্টকে জানান সব কথা। সার্জেন্ট বলেন, ‘আমার ওয়াকিটকিতে চার্জ নেই। মেসেজ পাস করা যাবে না। তবে আপনাকে আমি অন্যভাবে হেল্প করতে পারি। আমার বন্ধুও ট্রাফিক সার্জেন্ট। তিনি সামনেই ডিউটি করছেন। তাঁকে মোবাইল ফোনে বলে দিলে তিনি ম্যাসেজ দিয়ে দেবেন। ’ বলেই তিনি বন্ধুকে ঘটনা জানালেন। সঙ্গে সঙ্গে ওই বন্ধু ম্যাসেজ পাস করে দেন। সাদা রঙের ঢাকা মেট্রো-চ-৫১-৪১২১ নম্বরের মাইক্রেবাস চুরি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওমর ফারুক জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়েই ওয়াকিটকিতে পুলিশের কথা চালাচালি শুনছিলেন। তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের গাড়িচালক। পুলিশ কন্ট্রোলরুম থেকে জানানো হয় চুরি যাওয়া গাড়ি উদ্ধারে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে।

এ পর্যায়ে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জানানো হয়, এখন গাড়িটি রমনা থানার সামনে দিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ কন্ট্রোলরুম থেকে তখন জানতে চাওয়া হয়, ‘আপনি কিভাবে বুঝলেন?’ তখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানায়, ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) দিয়ে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সব গাড়িই ভিটিএস নিয়ন্ত্রিত।

এরপর পুলিশ কন্ট্রোলরুম থেকে বলা হয়, ‘আপনি ফোনে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। গাড়ি উদ্ধার হবেই। ’ রমনা থানার সামনের চেকপোস্টকে সতর্ক করা হয়। কিন্তু গাড়ি ততক্ষণে থানা পেরিয়ে সিদ্ধেশ্বরীর দিকে চলে গেছে। তখন ওয়্যারলেস গেটের পুলিশ চেকপোস্টকে সতর্ক করা হয়। কিন্তু গাড়িটি সেখানেও থামানো যায়নি। ৯ মার্চ বুধবার জামায়াতে ইসলামীর ডাকা হরতাল শেষে রাতের রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা ছিল। গাড়িটি দ্রুতবেগে মালিবাগ রেলগেট ঘুরে আবার মৌচাক ফিরে আসে। মৌচাক মোড়ে পুলিশ গাড়িটি থামানোর চেষ্টা করে। কিন্তু চালক তাতে সাড়া না দিয়ে গাড়িটি নিয়ে রাজারবাগ এসবি অফিসের সামনে দিয়ে শান্তিনগরের দিকে ছুটতে থাকে। শান্তিনগরে পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও চালক গতি কমায়নি। পুলিশ সদস্য জীবন বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এরপর আটকানোর চেষ্টা হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সামনে। সেখানেও সম্ভব হয়নি। গাড়িটি চলে যায় এজিবি কলোনির সামনে দিয়ে টয়েনবি সার্কুলার রোড ধরে। একপর্যায়ে নটর ডেম কলেজের সামনে পৌঁছালে গাড়িটির পিছু নেন দুই পুলিশ সার্জেন্ট। এ সময় চুরি যাওয়া গাড়ির চালক আচমকা ব্রেক করে। তার গাড়ির সঙ্গে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা লাগে পুলিশ সার্জেন্টের মোটরসাইকেলের। অন্য ট্রাফিক সার্জেন্টের মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি ঢুকে যায় পুরান ঢাকায়। পুলিশ সার্জেন্টদের বেহাল দশা দেখে এবার সাধারণ মানুষ পিছু নেয়। তারা গাড়িটির ওপর ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। অনেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া করে। পুলিশ ও সাধারণ জনতার ধাওয়া খেয়ে গাড়ি ঢুকিয়ে দেওয়া হয় নারিন্দার চিপা গলিতে। সেখানে আর সামনে এগোনোর রাস্তা না পেয়ে চোর নেমে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু জনতা তাকে ধরে মারধর শুরু করে। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ওয়ারী থানা হয়ে নিয়ে আসে শাহবাগ থানায়। সেখানে ওমর ফারুক মামলা দায়ের করেন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবদুল ওয়াদুদ বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সব গাড়িই ভিটিএস করা। এ কারণেই রক্ষা পেয়েছে গাড়িটি।


মন্তব্য