kalerkantho


মেয়েকে রক্ষা করতে গিয়ে বাবা খুন

ফতুল্লার এই ঘটনায় গ্রেপ্তার ৮, রিমান্ডে ৬ জন

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় এক স্কুল ছাত্রীকে অপহরণের চেষ্টার সময় বাধা দেওয়ায় ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে তার বাবাকে। গতকাল বুধবার ভোরে ফতুল্লার রঘুনাথপুর এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ সাতজনকে এবং পরে আরো একজনকে আটক করে।

স্কুল ছাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচয়ের পর স্থানীয় এক তরুণের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার জের ধরে এই ঘটনা ঘটেছে।

অন্যদিকে পুলিশ বলছে, মেয়েটি সনাতন ধর্মাবলম্বী আর ছেলেটি মুসলমান। ধর্মীয় বাধার কারণে প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও অভিভাবকরা মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি না হওয়ায় অপহরণের চেষ্টা করা হয়। ওই সময় বাধা দিতে গেলে হত্যা করা হয় তার বাবাকে।

নিহত ব্যক্তির নাম মনীন্দ্র অধিকারী (৪৫)। তিনি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণদিশার গ্রামের উপেন্দ্র নাথ অধিকারীর ছেলে।

মনীন্দ্র সপরিবারে রঘুনাথপুর এলাকায় এনামুল হক এনামের বাড়িতে থাকতেন। তিনি ওই বাড়ির দেখাশোনার কাজ করতেন। পাশাপাশি কখনো রিকশা, কখনো রিকশাভ্যান চালাতেন।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, মনীন্দ্রের তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে কয়েক বছর আগেই। মেজ মেয়ে স্থানীয় হাজি পান্দে আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী। অন্য মেয়ে স্থানীয় শুভেচ্ছা কিন্ডারগার্টেনের চতুর্থ শ্রেণি এবং ছেলে একই স্কুলের শিশু শ্রেণির ছাত্র।

মনীন্দ্রের পরিবার ও মামলার এজাহারের বরাত দিয়ে ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মো. কামাল উদ্দিন জানান, গত বছর রঘুনাথপুর এলাকায় কালীপূজার অনুষ্ঠানে ‘ডিজে পার্টির’ আয়োজন করে স্থানীয় লোকজন। ওই অনুষ্ঠানে ‘সাউন্ড সিস্টেম’ নিয়ে আসে ঢাকার শ্যামপুর এলাকার ‘তুহিন সাউন্ড সিস্টেম’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তুহিন শ্যামপুর এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে। ওই অনুষ্ঠানে তুহিনের সঙ্গে পরিচয় হয় মনীন্দ্রের মেজ মেয়ের। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তুহিনের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে বেড়াতে যায় মেয়েটি। এর মধ্যে ঝর্ণার পরিবার মেয়ের বিয়ে ঠিক করে ফেলে। এসব জানতে পেরে গতকাল ভোরে রঘুনাথপুর এলাকায় দুটি মাইক্রোবাসে করে দলবল নিয়ে আসে তুহিন। তখন ঘরে প্রবেশ করে হৈ চৈ ও পরে মেয়েটিকে টেনে-হিঁচড়ে সহযোগীরা বের করার সময় বাধা দেন মনীন্দ্র অধিকারী। তখন তুহিনের সহযোগীরা তাঁকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার সময় এলাকার লোকজন ধাওয়া করে সাতজনকে আটক করলেও পালিয়ে যায় তুহিন।

ওই ঘটনায় আটককৃতরা হলেন নজরুল ইসলাম (৩৫), মনিরুল ইসলাম মনির (৩৪), জাহিদ (২০), এলবার্ট সুশান্ত (১৯), জুয়েল (২৫), বাবু (২১) ও হৃদয় (২৬)।

আহতদের মধ্যে হৃদয়কে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরে ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া পরে পুলিশ তানভীর নামের আরো একজনকে আটক করেছে।

মনীন্দ্রর স্ত্রী এই আটজন ছাড়াও তুহিন ও তাঁর সহযোগী সবুজকে আসামি করে ফতুল্লা থানায় হত্যা মামলা করেছেন বলে ওসি জানান।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে তানভীর ও হৃদয় ছাড়া বাকি ছয়জনকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে গতকাল বিকেলে বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। শুনানির পর হাকিম সাইফুজ্জামান শরীফ তাঁদের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে ফতুল্লা মডেল থানায় মেয়েটি সাংবাদিকদের বলে, ‘তুহিন আমাকে প্রস্তাব দিলেও সেটা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। কিন্তু প্রায়ই তুহিন আমাকে উত্ত্যক্ত করত। আর সে কারণে চাপে পড়ে আমি গত বছর তার সঙ্গে সোনারগাঁয়ে বাংলার তাজমহলে ঘুরতে গিয়েছিলাম। পরে ঢাকার শ্যামপুর ও সর্বশেষ ৮ ফেব্রুয়ারি পাগলা মেরি এন্ডারসনে তুহিনের সঙ্গে দেখা করি। এরপর থেকে মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখি। ’

মেয়েটি আরো জানায়, যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর তুহিন তার বন্ধু তানভীরকে তাদের বাসায় পাঠায়। তিনি মেয়েটির বাসায় গিয়ে অনেক উচ্চবাচ্চ্য করে। এ সময় স্থানীয় লোকজন বিষয়টি জানতে পেরে তাঁকে মারধর করে। খবর পাওয়ার পর তানভীরের পরিবারের লোকজন পুলিশ নিয়ে মেয়েটিকে তুলে আনতে গিয়েছিল। গতকাল ভোরে তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন তুহিন ও তাঁর বন্ধুরা। তখন বাধা দিতে গেলে তার বাবাকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়।

গতকাল সন্ধ্যায় ফতুল্লার চিতাশাল শ্মশানে মনীন্দ্রের শেষকৃত্য হয়েছে।

এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতারা। পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে যান। দলটিতে ছিলেন সংগঠনের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মিলন কুমার দত্ত, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জি। তাঁরা দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।


মন্তব্য