kalerkantho

আবাদ

ঘর সাজবে সবজিতে

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ঘর সাজবে সবজিতে

রংপুরের বুড়িরহাট আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মাঠে শোভাবর্ধনকারী কুমড়া জাতীয় ফসলের ক্ষেত পরিদর্শন করেন কৃষিবিজ্ঞানীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঘর সাজাতে শৌখিন মানুষ সাধ্য অনুযায়ী দেশি-বিদেশি কত জিনিসই না ব্যবহার করেন। এবার তাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে আসছে জীবন্ত সবজি। বাসা-বাড়ির ড্রইংরুম, বেডরুম, ডাইনিং টেবিল, অফিস টেবিলে শোভা ছড়াবে কুমড়া ও লাউ জাতীয় সবজি। সৌন্দর্য বাড়ানো এসব সবজির স্থায়িত্ব হবে ছয় মাস থেকে এক বছর।

দেশে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যোগে নান্দনিক ও শোভাবর্ধনকারী কুমড়া জাতীয় ফসলের চাষ করে সাফল্য এসেছে। কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, বিভিন্ন আকারের ফল ও এর ত্বকের বিভিন্ন রং আর গঠনের বৈচিত্র্য কাজে লাগিয়ে সংকরায়নের মাধ্যমে আরো নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে দৃষ্টিনন্দন এসব ফসলের চাষাবাদ করে অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানিও সম্ভব।

শোভাবর্ধনকারী কুমড়া জাতীয় ফসল কিউকারবিটেসি পরিবারের সদস্য। এসবের মধ্যে রয়েছে লাউ, কুমড়া, স্কোয়াশ ও বাঙ্গি। অন্যান্য দিক বাদ দিলেও নান্দনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব সবজির গুরুত্ব অনেক। আকর্ষণীয় রং, বিভিন্ন ধরনের গড়ন ও দীর্ঘ স্থায়িত্বকাল এগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন দেশে উষ্ণ, নাতিশীতোষ্ণ ও শীতপ্রধান অঞ্চলে শোভাবর্ধনকারী এমন নানা প্রজাতির সবজি জন্মে।

বারি সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল ২০১২ সালে জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস থেকে প্রায় ১১ রকমের শোভাবর্ধনকারী নান্দনিক কুমড়া জাতীয় ফসল সংগ্রহ করেন। তিনি এসব ফসলের বীজ গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য বারির ফুল বিভাগকে দেন। পরবর্তী সময়ে উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কবিতা-আনজু-মান আরা এবং তাঁর সহকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেন। পাশাপাশি চীন থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরো কিছু নতুন জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করেন ড. কবিতা-আনজু-মান আরা। দীর্ঘ চার বছর গবেষণার পর এবারই প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে নান্দনিক ও শোভাবর্ধনকারী এই কুমড়া জাতীয় ফসলের চাষ করা হয়।

সরেজমিনে রংপুরের বুড়িরহাটে আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, এই ফসল চাষ করা প্লট দেখে সহজে কেউ নতুন ফসল বলে অনুমান করতে পারবে না। গাছগুলো দেখলে মনে হবে এটি মিষ্টি কুমড়ার ক্ষেত। তবে গাছের ডালে ফলেছে বিভিন্ন আকৃতির ছোট ছোট ফল। একেকটা ফলের একেক রকম রং ও আকৃতিই মনে করিয়ে দেবে এটি শোভাবর্ধনকারী কোনো ফসল। লাল, সাদা, ধূসর, বাদামি, নীল, সবুজসহ নানা রঙের ফল ধরেছে গাছে গাছে। কোনো কোনো ফল আবার বিভিন্ন রঙের মিশেলে চেক রং ধারণ করেছে। গাছ থেকে ছিঁড়ে কারো হাতে দিলে কেউই বিশ্বাস করতে চাইবে না যে এটি টাটকা কোনো ফল বা সবজি জাতীয় ফসল।

গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক সহকারী মতিয়ার রহমান ও শামসুল হক জানান, বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় প্রতিদিন স্থানীয় লোকজন শোভাবর্ধনকারী নতুন এই ফসল দেখতে মাঠে ভিড় করছে। এখন এগুলোকে রীতিমতো পাহারা দিয়ে রাখতে হচ্ছে।

আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আবু আলম মণ্ডল বলেন, ‘জীবন্ত ফল বা সবজি বাড়িতে শোপিস হিসেবে রাখার বিষয়টি ভাবাই যায় না। বারির উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বুড়িরহাট কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে শোভাবর্ধনকারী কুমড়া জাতীয় ফসলের চাষ সফল হওয়াটা আমাদের জন্য বড় সুখবর। ’

জানা যায়, এরই মধ্যে বারির কম্পিউটার ও জিআইএস ইউনিটের পরিচালক আবিদ হোসেন চৌধুরী, প্রাকৃতিক গবেষণা ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. ছায়ফুল্লাহ, বারির পরিচালক (গবেষণা) ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দীন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার মণ্ডলসহ জার্মানি থেকে আগত বিজ্ঞানীরা বুড়িরহাটে ফসলের মাঠ পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অভিমত, এখন এসব ফসলের ওপর ব্যাপক গবেষণা করে এর প্রায়োগিক দিক নির্ণয় করা উচিত। শক্ত ত্বকের কারণে ফলগুলো দীর্ঘ সময় ধরে অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষণের বিশেষ উপযোগী। এ কারণে এগুলো বিদেশে রপ্তানিরও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আর জাতগুলো অধিক বিটা ক্যারোটিনসমৃদ্ধ হলে এগুলোর রংবৈচিত্র্য আরো বাড়বে বলে আশা করা যায়।

বুড়িরহাট আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে শোভাবর্ধনকারী ফসল দেখতে সম্প্রতি এসেছিলেন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কবিতা আনজু-মান-আরা। এ সময় তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, কুমড়া জাতীয় এই নান্দনিক ফসলগুলো বাংলাদেশের শীতকালীন আবহাওয়ায় জন্মানো ও বীজ উৎপাদনের উপযোগী। চারা লাগানোর তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এগুলোর ফল আহরণ করা যায়। জাতভেদে এক একটি গাছে পাঁচ থেকে ১০টি ফল ধরে। ফলগুলো গোলাকৃতি, ডিম্বাকৃতি, লম্বাটে, কখনো বা চাকতি আকৃতির হয়ে থাকে। ফলের আবরণ মসৃণ, ফোস্কাকৃতি অথবা খাঁজকাটা। বেশির ভাগ ফলের ত্বক শক্ত থাকায় জাতভেদে এগুলো ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত স্থায়িত্বকালের উপযোগী। সংকরায়নের মাধ্যমে এসব সবজির আরো নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনেরও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

বারির মহাপরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম মণ্ডল কালের কণ্ঠকে জানান, পাতা, কাণ্ড ও ফলের আকার, রং, গঠন, ফলের সংখ্যা, স্থায়িত্বকাল, বীজের সংখ্যা, গঠন সর্বোপরি বীজের মান মূল্যায়নের মাধ্যমে তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন জাত হিসেবে এগুলো অবমুক্ত করার কথা ভাবছেন। এভাবে এগুলো বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করে অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করা সম্ভব।


মন্তব্য