kalerkantho

26th march banner

বরিশালে চলন্ত বাসে এসএসসি পরীক্ষার্থী ২ বোনকে গণধর্ষণ

গ্রেপ্তার ৫, আদালতে দায় স্বীকার

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল   

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বরিশালে চলন্ত বাসে এসএসসি পরীক্ষার্থী ২ বোনকে গণধর্ষণ

বরিশালে সেবা পরিবহনের একটি চলন্ত বাসে চালকসহ ছয়জন মিলে সদ্য এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া দুই বোনকে গণধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ধর্ষণের সময় মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে ধর্ষকরা। গত ২২ জানুয়ারি রাতে এ ঘটনা ঘটলেও এত দিন জেলা শ্রমিক ইউনিয়ন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল। সম্প্রতি ধর্ষকরা মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে, টাকা না দিলে সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেয়। এ পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার রাতে বরিশাল নগরীর এয়ারপোর্ট থানায় মামলা করে ভুক্তভোগীদের পরিবার। গতকাল ভোরের দিকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

ভুক্তভোগীরা জানায়, তাদের বাড়ি বানারীপাড়ার চাখাড় এলাকায়। দুই বোনের সঙ্গে তাঁদের একজনের স্বামী ও এক বন্ধু ওই বাসে সহযাত্রী হিসেবে ছিলেন। কিন্তু ধর্ষকরা সেই স্বামী ও বন্ধুকে বাসের ভেতর সিটের সঙ্গে হাত-পা বেঁধে মুখে কাপড় গুঁজে রাখে। ওই স্বামী ও বন্ধু দুজনই একই পরিবহনের গাড়ি চালক। ওই স্বামী বাদী হয়েই মামলাটি দায়ের করেছেন।

পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃতরা হলো—রনি মৃধা (২৩), তারেক হোসেন (২৫), দেবাশীষ চন্দ্র দাস (২৩), সুজন কুমার মিত্র (২৬) ও নাসির চাররাসি (২৩)। অভিযুক্ত মিজানুর রহমান (২৫) নামে আরেকজন পলাতক রয়েছে। এরা সবাই সেবা পরিবহনের সুপারভাইজার ও চালক এবং নথুল্লাবাদ বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য। তাদের সবার বাড়িই এয়ারপোর্ট থানাধীন গড়িয়ারপাড় এলাকায়।

মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ২২ জানুয়ারি সকালে স্ত্রী, শ্যালিকা ও এক বন্ধুকে নিয়ে কুয়াকাটা বেড়াতে যান মামলার বাদী। ওই দিন রাতেই বিআরটিসির একটি বাসে করে তাঁরা বরিশালের নথুল্লাবাদ পৌঁছান। রাত তখন আনুমানিক সোয়া ২টা। বাসস্ট্যান্ডে বাদীর ছয় সহকর্মী আড্ডা দিচ্ছিল। তাদের বলার পর রাতেই বানারীপাড়া পৌঁছে দেওয়ার জন্য ওই ছয় সহকর্মী সেবা পরিবহনের শ্রেয়া (বরিশাল জ-১১-০০১০৫) বাস নিয়ে আসে। স্ত্রী, শ্যালিকা ও বন্ধুকে নিয়ে বাসে ওঠেন বাদী। গড়িয়ারপাড় নেমে যাবে, এমন কথা বলে চালক রনির সঙ্গে সহকর্মী পাঁচজনও একই বাসে ওঠে।

বাদী এজাহারে উল্লেখ করেন, গড়িয়ারপাড় অতিক্রম করে বাস বানারীপাড়ার সড়কের উল্টো দিকে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক ধরে চলতে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধর্ষকরা বাদী ও তাঁর বন্ধুকে বাসের সিটের সঙ্গে বেঁধে ফেলে। পরে বাদীর স্ত্রী ও শ্যালিকাকে জোর করে চলন্ত বাসে ধর্ষণ করা হয়। একই সঙ্গে ধর্ষণের সেই চিত্র মোবাইল ফোনে ধারণ করে ধর্ষকরা। এভাবে ভোর রাত পর্যন্ত পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়। পরে বাসটি দোয়ারিকা-শিকারপুর থেকে আবার নথুল্লাবাদ বাসস্টান্ডে নিয়ে আসে। সেখানেই তাদের নামিয়ে রেখে বাস নিয়ে দ্রুত ধর্ষকরা পালিয়ে যায় বলে উল্লেখ করেন মামলার বাদী।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি) আবু সালেহ মো. রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হবেন, এমনটি ভেবে বিষয়টি এত দিন চেপে রেখেছিল ভুক্তভোগীরা। কিন্তু ধর্ষকরা ভিডিও চিত্র ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ায় ভুক্তভোগীরা পুলিশের সহযোগিতা নিয়েছে। ধর্ষকদের কাছ থেকে ধর্ষণের বেশ কিছু স্থিরচিত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

উপকমিশনার বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্ত পাঁচজনই আজ (গতকাল বুধবার) বিকেলে ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। সেখানে তারা গণধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে বলে জেনেছি। কিন্তু জবানবন্দি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে থাকায় বিস্তারিত বলতে পারছি না। ’

এদিকে গতকাল সকালে থানার ওসি রেজাউল ইসলামের কক্ষে বসে নির্যাতনের বর্ণনা দেন ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রী ও তার ভগ্নিপতি, যিনি মামলার বাদী। পরে ওই ছাত্রী কাঁদতে কাঁদতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার তো সবই গেল! বেঁচে থেকে আর কী লাভ? আমার ওপর নির্যাতনের কাহিনী তো সবাই জানে, আমার তো আর সংসার হবে না। ’

মামলার বাদী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনার পরই শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেনকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। তিনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আজ-কাল করে করে আর বিচার করেননি। আমরা বলেছিলাম, ভিডিওটি উদ্ধার করে দেন। তিনি তাও করেননি। উল্টো এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথাকাটাকাটি হওয়ায় আমাদের সদস্যপদ স্থগিত করেন। ’

বাদী বলেন, ‘সম্প্রতি ধর্ষকরা ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। একই সঙ্গে তারা এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। বিষয়টি মঙ্গলবার এয়ারপোর্ট থানা পুলিশকে অবহিত করলে, তারা মামলার পরমর্শ দেয়। সে অনুযায়ী মামলা দায়ের করেছি। ’

বরিশাল জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই দিন আগে সোমবার আমাকে বিষয়টি মৌখিকভাবে জানিয়েছিল। বিষয়টি মীমাংসাযোগ্য নয়, তাই থানা পুলিশকে জানানোর জন্য পরামর্শ দিয়েছি। ’


মন্তব্য