kalerkantho


প্রকৃতি

জিন্দা পার্কের নিসর্গ সম্ভোগ

বিপ্রদাশ বড়ুয়া   

১৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জিন্দা পার্কের নিসর্গ সম্ভোগ

শেওড়াগাছ সম্পর্কে একটি মজার কথা আছে। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের কোথাও কোথাও এ গাছের বিয়ে হয়।

যারা ‘বউ-খেগো’ অর্থাৎ যাদের বউ বাঁচে না তাদের আবার বিয়ের দিনে এই গাছের সঙ্গে মালাবদল বা বিয়ে হয়। কেন? অর্থাৎ বউ-খেগোর আবার বউ মরলে ওই শেওড়াগাছের পেত্নীটাই মরুক। ওই পেত্নীর লম্বা ধবধবে আঁচল, দাঁত দুটো মুখ থেকে বেরিয়ে থাকে হামেশা। মরুক সে। আরো একটি কথা আছে, ছাগল চোরেরা চুরি করার সময় যাতে ছাগলটা ম্যাঁ ম্যাঁ না করে তার জন্য জিবের নিচে শেওড়াপাতা গুঁজে দেওয়া হয়। ডুমুরের মতো খসখসে পাতার জন্য ছাগল তখন বোবা। চোরেরও ঝামেলা খতম।

এই গাছের ডাল সোজা বড় হয় না, প্রায়ই গাঁট, খুব বাড়ে না। পনেরো-বিশ ফুট হয়।

গাছে প্রচুর পাতা হয়। এ জন্যই এর প্রাচীন নাম শাখোটক। পাতা ছিঁড়লে বা গাছ কাটলে দুধ বা ক্ষীর বের হয়। গাছের বৈজ্ঞানিক নাম স্ট্রেবলাস অ্যাসপার, পরিবার মোরাসে। বিলে-ঝিলে এর জাঁকালো ডাল মাছের জাগ দেওয়ার খুব উপযোগী। এলোমেলো অজস্র ডালে মাছেরা নিরাপদ আশ্রয় মনে করে। ডাল কাটতে কাটতে গাছটি ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে থাকে। সেই সৌন্দর্যও মার্কামারা উর্বশী।

আমার তোলা ছবিতে ধরা গাছটি স্বভাবতরু নয়। রূপসজ্জাকারের ক্ষৌরকর্মের বাহাদুরিতে পাতার চুল ছেঁটে চেহারা পাল্টানোর মতো শেওড়া তরুণীর ভোল পাল্টে দেওয়া হয়েছে। মানুষ সভ্যতার এই স্তরে এসে এই কাজ হাতে নিয়েছে। চীন দেশে এর রেওয়াজ অধিক। বনসাই থেকে পথের ধারের মহীরুহ বটবৃক্ষকে বিশাল ভালুক, পান্ডা, হাতি, শুয়োর ইত্যাদি বানিয়ে। একটি বিশাল গ্রামই নাকি সেখানে বটগাছে ছেয়ে রেখেছে। তার জন্য শীতে সেখানে বসন্ত, গ্রীষ্মে সেখানে হেমন্ত বিরাজমান শুধু গাছের পাতার প্রস্বেদন প্রক্রিয়ার কারণে। বট বা বকুলগাছকে ছেঁটেছুটে করে রেখেছে সমুদ্রের ডলফিন—ভাবুন!

ছাঁটা ডালের পাতায় হাত দিয়ে বুঝতে দেরি হলো না সে আমার ভিটের এক কোণের অবহেলিত শেওড়া। যার তলায় শুঁয়োপোকা ও সাপ থাকে নিশ্চিন্তে, যার ফুল ও ফলের প্রতি কারো কোনো জ্ঞানগম্যি নেই, উৎসাহও না। বুঝলাম কোনো শৌখিন বৃক্ষচর্যাকারী তিলকে তাল করেছেন, ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ডিগ্রিধারী নন, জিন্দা পার্কের ব্রতচারী গ্রাম্যকর্মীরা। আমাদের মহাবিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনের তুখোড় ছাত্রনেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য আমাকে জিন্দা পার্ক দেখার সঙ্গী করে নিয়েছেন অনুগ্রহ করে। এই আমার প্রথম জিন্দা পার্ক সম্ভোগ ও সন্দর্শন। সঙ্গে আছেন পরিবেশ আন্দোলনের নেতা ও প্রেমী নাসের খান। ওই নাছোড়বান্দা আকর্ষণে পেয়ে গেলাম সংসদ সদস্য মইনুদ্দীন খান বাদল ও নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট হোসনে আরা বেগম বাবলীর। আমি তো মুগ্ধ হবই। তিরিশাধিক বছরের সাধনায় গড়া বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি এমন পার্ক আমি দেখার অবসর এত দিন করে করে নিইনি! এই অবহেলার কি কোনো ক্ষমা আছে? নাকি থাকা উচিত! আমার খুব জানতে ইচ্ছে করল জিন্দা পার্ক কি সরকার নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়, নাকি কিছু সুবিধাভোগী এখানে ছুঁচ হয়ে ঢুকতে চায়? সরকার তো ব্যক্তি বা বেসরকারি উদ্যোগের বিরোধী নয়! তাহলে কি কিছু সুবিধাভোগী ও আর্থিক সমর্থ মানুষ জিন্দা পার্ক দখল করে নগ্ন ফায়দা লুটতে আগ্রহী? জিন্দা পার্ক দেখাশুনো করছে স্থানীয় সংস্থা। যদি ধরে নিই যে এতে তাদের লাভ হচ্ছে তাতে অসুবিধে কোথায়! পার্কটির ব্যবস্থাপনা ও সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ তো হবই। আমি তো মানুষ, সাধারণ জ্ঞানগম্যি আমার তো থাকার কথা এবং অধিকারও আছে। তালগাছ, জারুল, হিজল, অবহেলিত পাকুড় বা বাঁশঝাড়, সঙ্গে পায়রার চাষ, ঝিলের ধারে টংঘর—এ রকম তো ভূ-বাংলার কোথাও আমি দেখিনি। আছে কি? অভিজ্ঞরা কী বলেন? ক্ষমতাসীনদের কি এমন অনাবিল চোখ আছে? নাকি থাকতে নেই?

গ্রামীণ মানুষের যুগ যুগ সঞ্চিত অভিজ্ঞতাকে কি মূর্খতা বলা যায়, নাকি উচিত? ওখানে গ্রামের জলাশয়ের শিং মাছ, লাউ, কই মাছ খেয়েছি বলে মাথা আমার ঘুরে যায়নি। আবার গেছেও। অমন স্বাদ আর কোথায় পাব এই ভেজালের দেশজোড়া সাম্রাজ্যে! ঝিলের ধারে পঙ্কজ ভট্টাচার্য ও নাসের খানের সঙ্গে দু দণ্ড বসে ছবি তোলার, সংসদ সদস্যদ্বয়ের মধুর সঙ্গ তো দুর্লভ ধন আমার জন্য। ঢাকা থেকে তয়োতা গাড়িতে করে যাওয়াও তো ভাগ্যের ব্যাপার। আহা, সুন্দর পূর্বাচল শহর যদি গড়ে ওঠে তো ভাগ্যের ব্যাপার। পূর্বাচলের ভূদৃশ্য নয়ন ও হৃদয়লোভা।

জিন্দা পার্কের ভেতরে আছে অসাধারণ সুন্দর মসজিদ, পাঠাগার, বিশ্রামাগার, ঝিল এবং বৃক্ষশোভা রচনা। ওরা আমাকে প্রাকৃতিক যে সৌন্দর্য দিয়েছে যা ঢাকার নাগরিক উদ্যান বা পার্কে রক্ষা করা হয় না, যা রমনা বা সোহরাওয়ার্দী বা বোটানিক্যাল গার্ডেনে রক্ষা করা হয়নি অসম্ভব সুযোগ ও সুস্থতা থাকা সত্ত্বেও। জিন্দা পার্কের নির্জনতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থাও আমাকে সুস্থতা ও স্থিরতা দিয়েছে। কর্মীদের সারল্য ও সহযোগিতা আমাকে অবসর দিয়েছে প্রকৃতিকে ভালোবাসিবার। দর্শনার্থীরা এখানে নিরুপদ্রব।

আহা শেওড়াগাছের কারুকাজ, বুনো বাঁশঝাড় ও পরিচর্যা করা অলিন্দের বাঁশঝোপ, তাল ও হিজলের প্রাকৃতিক সৌষ্ঠব। অর্থাৎ তাদের গায়ে পরগাছার আক্রমণকেও মেনে নেওয়া বা স্বাধীনতা আশঙ্কা জাগালেও সহজিয়া ভাবের জন্য মেনে নিতে আমি দেরি করিনি। প্রকৃতির এই মায়ার খেলাও পার্কে দেখতে পাব আমি ভাবিনি। যদিও এই চর্চা করা শেওড়াগাছে পেত্নী থাকা কোনো মতেই সম্ভব নয়। কিন্তু আমার যে ইচ্ছে করে কখনো কখনো পেত্নী দেখতে বা গল্প শুনতে? তবে তেমন গাছ এই পার্কে আছে। আমার পাঠিকা ও পাঠকদের আমি আশ্বাস দিচ্ছি তেমন কিছু আভাস পেলে আপনাদের ভাগ দিতে একটুও দ্বিধা করব না, আমার গল্পে বা উপন্যাসে বা এ রকম অনুস্মৃতিমূলক লেখায়। মার্চের জয় বাংলা


মন্তব্য