kalerkantho

শনিবার । ২১ জানুয়ারি ২০১৭ । ৮ মাঘ ১৪২৩। ২২ রবিউস সানি ১৪৩৮।


আদালতে দায় স্বীকার করে মায়ের জবানবন্দি

আদালত প্রতিবেদক   

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আদালতে দায় স্বীকার করে মায়ের জবানবন্দি

হতাশার কারণে দুই সন্তানকে নিজেই হত্যা করেছেন বলে র‌্যাব ও পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে একাধিকবার বলেছেন মা মাহফুজা মালেক জেসমিন। এবার আদালতেও জবানবন্দি দিয়ে সন্তান হত্যার দায় স্বীকার করে এই মা বলেছেন, ‘বিবেকের তাড়নায় আমি সত্য বলছি। ’

দ্বিতীয় দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল রবিবার মাহফুজা ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। হাকিম মো. গোলাম নবী তাঁর খাস কামরায় জবানবন্দি গ্রহণ করেন।

দুই সন্তানকে হত্যার কারণ হিসেবে মাহফুজা জবানবন্দিতে বলেছেন, ‘ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ায় ভালো ছিল না। ’

মা-বাবার সঙ্গে বনশ্রীর ‘বি’ ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর বাসায় থাকত নুসরাত আমান (১৪) ও আলভী আমান (৬)। নুসরাত ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের (বেইলি রোড শাখা) সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত, আলভী হলি ক্রিসেন্ট স্কুলে নার্সারিতে পড়ত। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর দুই শিশুর মা জেসমিন দাবি করেন, একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টের খাবারের বিষক্রিয়ায় নুসরাত ও আলভীর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসকরা জানান, দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

ঘটনার পর ২ মার্চ জামালপুরের গ্রামের বাড়ি থেকে দুই শিশুর বাবা আমান উল্লাহ, মা মাহফুজা ও খালা আফরোজা মালেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকায় নিয়ে আসে র‌্যাব-৩। পরদিন সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাব দাবি করে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদে মা দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। এরপর এ ঘটনায় আমান উল্লাহ বাদী হয়ে স্ত্রীকে আসামি করে রামপুরা থানায় মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, মাহফুজা সন্তানদের পরীক্ষার ফল ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় থাকতেন। তাঁর ধারণা ছিল, তাঁর সন্তানরা বড় হয়ে কিছুই করতে পারবে না। এ হতাশা থেকেই তিনি দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মাহফুজা হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘গৃহশিক্ষিকা মেয়েকে পড়িয়ে চলে যান। ছেলেকে নিয়ে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। বিকেল সোয়া ৫টার দিকে পড়া শেষে মেয়ে আমার রুমে এসে পাশে বসে। আমি মেয়েকে বলি, তুমি পড়া পেরেছ? মেয়ে বলে, পারিনি। তখন আমার রাগ উঠে যায়। মেয়ের গলায় থাকা ওড়না পেঁচিয়ে ধরি। ধস্তাধস্তির সময় মেয়ে খাটের নিচে পড়ে যায়। এর পরও অন্তত দশ মিনিট ওড়না পেঁচিয়ে ধরে রাখি। যখন বুঝতে পারি মেয়ে মারা গেছে তখন একই ওড়না ঘুমিয়ে থাকা ছেলের গলায় পেঁচিয়ে ধরি। কিছুক্ষণ পর ছেলেকেও মেরে ফেলি। এরপর কান্নাকাটি করি। তারপর শাশুড়িকে ডেকে বলি, আপনার নাতি-নাতনি দুপুরে খাবার (চায়নিজ) খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। এত ডাকছি উঠছে না। আসলে দুই সন্তানকে আমি একাই হত্যা করেছি। ’ তিনি আরো বলেন, একইভাবে স্বামী আমান উল্লাহকেও ফোন করে মিথ্যা কথা বলেন তিনি।

গতকাল সকালে মাহফুজাকে আদালতে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক লোকমান হেকিম। তিনি আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে বলেন, আসামি রিমান্ডে থাকাবস্থায় স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিতে চান। অতএব আসামির জবানবন্দি গ্রহণ করা হোক। এরপর দুপুরে দুই ঘণ্টা ধরে মহানগর হাকিম গোলাম নবী তাঁর খাস কামরায় মাহফুজার জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। এরপর তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।

গতকাল আদালতে স্বীকারোক্তি দেওয়ার আগে দুই দফায় থানা পুলিশ ও পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) হেফাজতে ছেলেমেয়েকে হত্যার দায় স্বীকার করেন মাহফুজা। আটকের পর র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও সন্তান হত্যার দায় স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকে একজন মা তাঁর দুই সন্তানকে হত্যা করতে পারেন—তা কারো বিশ্বাসই হচ্ছিল না।

জবানবন্দিতে মাহফুজা বলেছেন, তাঁর বোন ও বান্ধবীর সন্তানরা পরীক্ষায় সব সময় ভালো ফল করত। তাদের চেয়ে তাঁর দুই ছেলেমেয়ের ফল খারাপ ছিল। এটা তাঁকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে মেয়ের জন্য অঙ্ক ও ইংরেজির আলাদা গৃহশিক্ষক রাখেন। এর পরও মনে হয়, মেয়ের লেখাপড়ায় উন্নতি হচ্ছে না। গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে মনে হলো ছেলেমেয়েকে দিয়ে আর কিছু হবে না। ওরা ‘আপদ’ হয়ে গেছে। ওদের সরিয়ে দিতে হবে।

জবানবন্দিতে মাহফুজা আরো বলেন, এর আগেও দুই-তিনবার সন্তানদের হত্যার চেষ্টা করেন তিনি। কথার ছলে, দুষ্টুুমি করতে করতে ওদের গলায় গামছা দিয়ে ফাঁস দেন। গামছাটি শক্ত করে টান দিতেই তাঁর হাত শক্ত হয়ে আসত। হাত কেঁপে উঠত। এ জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেও পারেননি তিনি। তবে এখন তিনি ‘ভারমুক্ত’। ওদের নিয়ে এখন তাঁর চিন্তা করতে হচ্ছে না।

গত ৪ মার্চ প্রথম দফায় জেসমিনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে রামপুরা থানার পুলিশ। পরে মামলাটির তদন্তভার ডিবি পুলিশকে দেওয়া হয়। গত ৯ মার্চ জেসমিনকে দ্বিতীয় দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।

জানতে চাইলে রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মাহফুজাই যে দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন সে বিষয়ে আমাদের সন্দেহ ছিল তদন্তের শুরুতে। সন্তানরা লেখাপড়া করে না—এ ধরনের তুচ্ছ কারণে একজন মা তাঁর সন্তানদের হত্যা করতে পারেন, সেটা অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। কিন্তু সব কিছু মিলে এ রকম কোনো তথ্য আমাদের কাছে আসেনি যে মা হত্যাকারী নন। মানসিক যন্ত্রণার কারণে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন বলে মনে হয়েছে। তবে সিদ্ধান্ত পূর্বপরিকল্পিত মনে হয়নি। ঘটনার আকস্মিকতায় এ ধরনের জটিল মানসিকতা তৈরি হতে পারে। একাধিক মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলে এবং মাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এমনটাই মনে হয়েছে। ’

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক ডিবি কর্মকর্তা বলেন, তদন্তে মাহফুজা ও তাঁর স্বামীর বাল্যকাল, বৈবাহিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে গোপন কোনো তথ্য তাঁরা খুঁজে পাননি। বাবার দায় মা নিয়েছেন কি না, এ ধরনের বিষয়ও তদন্ত করে দেখা হয়েছে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও খতিয়ে দেখে ঘটনাটি বিরল হলেও একেবারে অসম্ভব নয় বলে তাঁদের মনে হয়েছে। তবে মাহফুজা সন্তান হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিলেও তদন্ত চলবে।


মন্তব্য