kalerkantho


প্রবাসী শ্রমিকরা অসুস্থ হলেও খরচের ভয়ে চিকিৎসা করান না

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



প্রবাসী শ্রমিকরা অসুস্থ হলেও খরচের ভয়ে চিকিৎসা করান না

রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় এইডস-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন আইক্যাপ অনুষ্ঠানে গতকাল নাচে-গানে মেতে ওঠে অংশগ্রহণকারীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘বিদেশে অবস্থানকালে নিজের কর্মস্থলে একবার লোহার খাম্বা সরাতে গিয়ে আঘাত পেয়ে পায়ের অংশবিশেষ কেটে যায়। এতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। এ সময় আফ্রিকার এক সহকর্মী আমাকে রক্ত সরবরাহ করেন। এরপর বারকয়েক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম তারা চিকিৎসার কোনো খরচ দিত না। আর নিজের পকেটের টাকা দিয়ে চিকিৎসা করাতে গেলে অনেক খরচ হয়ে যায়। তাই আর ডাক্তারের কাছে যেতাম না। একপর্যায়ে এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়লাম যে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হই। আর এখানে এ দেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানতে পারি শরীরে এইচআইভি বাসা বেঁধেছে। সঙ্গে আরো জটিল কিছু রোগও জমেছে। এখন আর কী করব; মৃত্যুর প্রহর গুনছি। ’ গতকাল রবিবার রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার রাজদর্শন হলের সামনে বসে এভাবেই প্রবাসে থাকাকালে তাঁর সর্বনাশের কথা জানান একজন।

পাশে থাকা আরেকজন বলেন, ‘প্রবাসে থাকাকালেই আমি জেনে গিয়েছিলাম, আমার শরীরে এইচআইভি ধরা পড়েছে। কিন্তু অন্যদের কাছে তা গোপন রেখেছিলাম। আমি যে প্রতিষ্ঠানে ছিলাম তারা আমার অল্প কিছু চিকিৎসা খরচ দিত। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম ছিল। অসুস্থ হলে প্রয়োজনীয় সেবা-যত্নের কাউকে পেতাম না। আমি সহসা নিজের সমস্যা খুলে বলতে পারতাম না। আবার তাদের কাগজপত্র ঠিকমতো পড়তে পারতাম না। একপর্যায়ে দেশে চলে আসি। ’

এ দুজন জানান, শুধু এইচআইভি আক্রান্তরাই নয়, অন্য রোগে আক্রান্তরাও বিদেশে কাজ করার সময় অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিয়ে বড় সমস্যায় পড়েন। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে তাঁরা দেশে ফিরে আসেন। আবার কেউ কেউ লাশ হয়েও ফেরেন।

এমনভাবে ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ পাড়ি দেওয়া শ্রমিকদের ৬১ শতাংশই প্রবাসে অবস্থানকালে চিকিৎসা খরচ জোগাতে হয় নিজের পকেট থেকে। ২২ শতাংশ শ্রমিককে আংশিক চিকিৎসা খরচ দেয় নিয়োগকর্তারা। আর মাত্র ১৬ শতাংশের ক্ষেত্রে চিকিৎসার ব্যয় পুরোটাই বহন করে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। ফলে খরচের ভয়ে অনেক প্রবাসী শ্রমিকরা বিদেশে অসুস্থ বোধ করলেও সহসা চিকিৎসা নেন না। এর পরিণতিতে একপর্যায়ে রোগ আরো জটিল অবস্থায় পৌঁছে গেলে কর্মক্ষমতা হারিয়ে তাঁদের দেশে ফিরে আসতে হয়।

ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এইডসবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন আইক্যাপ-১২-এর গতকাল ছিল দ্বিতীয় দিন। এদিন কয়েকটি অধিবেশনের মধ্যে একটিতে অভিবাসীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তানের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। এতে বাংলাদেশ অংশে বলা হয়, অবস্থানপত্র অনুযায়ী ২০১৪ সালে চার লাখ ২৫ হাজার ৬৮৪ জন শ্রমিক বিদেশে চাকরির জন্য নিবন্ধিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে বাংলাদেশের জনশক্তি নিয়োজিত রয়েছে। যাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে সৌদি আবর ও আবর আমিরাতে। আর এসব প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে ৬০ শতাংশই কর্মস্থলে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। যাদের ৩৪ শতাংশকেই শারীরিক পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়। ৭ শতাংশ নারী শ্রমিক জোরপূবর্ক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরে।

গতকাল এ ছাড়া যক্ষ্মার বিস্তৃতি নিয়েও আরেক অধিবেশনে আলোচনা হয়। যেখানে বলা হয় এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে যক্ষ্মা রোগীর অবস্থা খুবই শোচনীয় পর্যায়ে থাকে।

আজ রবিবার ঢাকা ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ সম্মেলন শেষ হবে। শনিবার রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং পার্টনারস ইন পপুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (পিপিডি) বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এ আয়োজন করে।

আইক্যাপের মহাসচিব জো থমাস গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিটি অধিবেশন থেকে ভালো ভালো কিছু সুপারিশ উঠে আসছে, যা এইচআইভি-এইডস নির্মূলে খুব সহায়ক হয়ে উঠবে।

আয়োজকরা জানান, ২৬ বছর ধরে এই ফোরামটি এইডস বিষয়ে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, যাতে করে এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ বিষয়ে জ্ঞান ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি পায়, প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় রাজনৈতিক পর্যায়ে করণীয়, অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা শক্তিশালী হয়। ১৯৯০ সালে প্রথম অস্ট্রেলিয়ায় এ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি দুই বছর পর পর এ অঞ্চলের যেকোনো একটি রাষ্ট্রে এ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। ইতিমধ্যে এটি মালয়েশিয়া, জাপান, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ভারতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৩ সালে ১১তম আইক্যাপ থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয় ।

এদিকে এইডসবিষয়ক দক্ষিণ এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের ১২তম সম্মেলন আইক্যাপ সফলভাবে আয়োজন করায় বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ইউএনএইডসের সিনিয়র উপদেষ্টা এবং মূল্যায়ন কমিটির প্রধান ড. সলিল পানাকাদান।

এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এইডস প্রাদুর্ভাবের জন্য অত্যন্ত কম ঝুঁকিতে থাকলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের অবাধ যাতায়াত দেশের অভ্যন্তরে নতুনভাবে এইডস বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার এদিকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে কাজ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এইডস নির্মূলের চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে বাংলাদেশকে সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য ইউএনএইডসের প্রতি আহ্বান জানান মন্ত্রী।


মন্তব্য