kalerkantho

সোমবার । ১৬ জানুয়ারি ২০১৭ । ৩ মাঘ ১৪২৩। ১৭ রবিউস সানি ১৪৩৮।

ঘোড়ার গাড়ি

দুর্গম পথের বাহন

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দুর্গম পথের বাহন

রংপুরের তিস্তার চরে ক্ষেত থেকে আলু নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘ভাইরে, আগের দিন আর নাই, রিকশাওয়ালায় তুলিয়া নিল মোর গাড়িয়ালি কামাই। ’ কথাগুলো রংপুর অঞ্চলের জনপ্রিয় একটি ভাওয়াইয়া গানের। একসময় গ্রাম-গ্রামান্তরে পরিবহন বলতে ছিল গরুর গাড়ি। ক্রমান্বয়ে রিকশা সেই স্থান দখল করে নেওয়ায় বিলুপ্তপ্রায় গরুর গাড়ির চালকের (গাড়িয়াল) ক্ষোভ-দুঃখ নিয়েই এই গান বাঁধা। তার পরও রাস্তাঘাট নেই এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে কয়েক বছর আগেও বিশেষ করে পণ্য পরিবহনে গরুর গাড়ির কদর ছিল। কিন্তু সেই সামান্যতম জায়গাটুকুও এখন ঘোড়ার গাড়ির দখলে।

ঘোড়ায় টানা গাড়ি একসময় ছিল রাজা-বাদশাহদের বাহন। সেই গাড়িতে চড়ার সুযোগ সাধারণের ছিল না। তবে সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার গাড়িতেও পরিবর্তন এসেছে। রাজরাজড়া নেই। ঘোড়ার গাড়ির সেই জৌলুসও হারিয়ে গেছে। এখন দেশের অনুন্নত এলাকাগুলোতে পণ্য পরিবহনে ব্যবহার করা হয় ঘোড়ায় টানা গাড়ি। ব্যতিক্রম নয় রংপুরের চরাঞ্চলও। এখানে ঘোড়ায় টানা গাড়ি পণ্য পরিবহনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

বছর তিনেক ধরে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ, আদিতমারী, হাতীবান্ধা, কুড়িগ্রামের উলিপুর ও চিলমারীর তিস্তার চরাঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিপণ্যসহ মালামাল পরিবহনে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয়েছে। রিকশা-ভ্যানসদৃশ গাড়ির সামনে ঘোড়া জুড়ে দিয়ে বাহনটি টেনে নেওয়া হয়। তিস্তার চরসহ প্রত্যন্ত গ্রামে রাস্তাঘাট সেভাবে তৈরি হয়নি। ফলে এখানে যান্ত্রিক বাহন চলাচলের সুযোগও নেই। অগত্যা ঘোড়ার গাড়িই এখানে একমাত্র ভরসা। উৎপাদিত ফসল জমি থেকে গোলা পর্যন্ত টেনে নিতে যুতসই একটি বাহন বটে এটি।

সম্প্রতি সরেজমিনে গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের জয়রামওঝা, ইচলী চর, শংকরদহসহ বিভিন্ন চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, ক্ষেত থেকে আলু তোলার কাজ চলছে। নদীতে পানি কম বলে নৌকায় আলু পরিবহনে অনেক ঝক্কি। ফসল পরিবহনে তাই দেদার ব্যবহার করা হচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি। আলু নিয়ে তিস্তা নদী পার হয়ে আসছে ঘোড়ার গাড়ি কিংবা চর পেরিয়ে কেউ বা আলু নিয়ে যাচ্ছে তিস্তার ওপারে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলায়।

চরের আলুচাষি লুলু মিয়া বলেন, ক্ষেত থেকে উত্তোলন করা আলু কিনতে প্রতিদিন সকালে ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে চরে হাজির হয় মহাজনরা। কালীগঞ্জের আলু ব্যবসায়ী আলমগীর বলেন, ‘এখন গরুর গাড়ি পাওয়া যায় না। চরে রিকশা-ভ্যানও চলে না। তাই ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে এসেছি। ’

আব্দুল আউয়াল ও কোরবান আলী বলেন, অভাবী এলাকা হিসেবে পরিচিত গঙ্গাচড়ায় তিস্তার চরে ব্যাপক আলু চাষ হওয়ায় বছর তিনেক ধরে এখানে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন হয়েছে। মহিপুর এলাকার চাষি তারেক মিয়া ঘোড়ার গাড়িতে আলু নিয়ে যাচ্ছিলেন নদীর ওপারে। তিনি জানান, নদীতে পানি না থাকায় নৌকায় ফসল পরিবহনে খুবই ঝামেলা। তাই ঘোড়ার গাড়িই ভরসা। ঘোড়ার গাড়িতে পাঁচ-ছয় বস্তা (১০ থেকে ১২ মণ) আলু পরিবহন করা যায়। ইচলী চরের বকুল মিয়া ও আফছার আলী বলেন, ‘কী দ্যাকেন বাহে, ঘোড়ার গাড়ি নোয়ায়, ইগলা (এসব) হামার আলু পরিবহন। ’

ঘোড়ার গাড়ির চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাড়ি তৈরির খরচ ও ঘোড়ার দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকায় অনেকেই এটিকে পেশা হিসেবে নিচ্ছে। গাড়ি টানার উপযোগী একটি ঘোড়া ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। আবার চরাঞ্চলে অনেকে ঘোড়া লালনপালনও করছে। শংকরদহ চরের ঘোড়ার গাড়ির চালক আমিনুর রহমান জানান, মালামাল বহন করে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। তা থেকে ঘোড়ার খাবারের জোগান দিয়েও সংসার খরচটা চলে যায়। গরুর চেয়ে ঘোড়ার দাম কম এবং তেমন ঝুঁকি নেই বলেও জানান তিনি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় রংপুর অঞ্চল থেকে বিলুপ্ত হতে চলা ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ির স্থান দখল করে নিয়েছে ঘোড়ার গাড়ি।


মন্তব্য