kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০১৭ । ৬ মাঘ ১৪২৩। ২০ রবিউস সানি ১৪৩৮।


দরপত্রের আগেই বড় জটিলতা

শরীফুল আলম সুমন   

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দরপত্রের আগেই বড় জটিলতা

গত বছর বিনা মূল্যের ৩৩ কোটি পাঠ্য বই মুদ্রণে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক কষ্টে সেই বৈতরণী পার হয় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। আর এবার দরপত্র-প্রক্রিয়া শুরুর আগেই ৩৪ কোটি বই মুদ্রণে বড় রকমের জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এত দিন মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বিবেচনায় যেকোনো পরিমাণ কাজই তারা করতে পারত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনের বরাত দিয়ে এনসিটিবি বলছে, এবার থেকে কোনো প্রতিষ্ঠানকেই দুই লটের বেশি কাজ দেওয়া হবে না। অন্যদিকে মুদ্রণকারীরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনের সঠিক ব্যাখ্যায় যাওয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া এনসিটিবিকে একবারে ৭৭৫টি লটের কাজ করতে হয়। একটি প্রতিষ্ঠানকে দুই লট কাজ দিলে মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানই খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর যাদের বেশি কাজ করার সক্ষমতা রয়েছে তাদেরও সামান্য কাজ করে বসে থাকতে হবে। এতে দেশের কাজ আবার বাইরেও চলে যেতে পারে। ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে দেশীয় শিল্প। দুই পক্ষের এমন অবস্থানে মুদ্রণকাজ শুরুর আগেই সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। ফলে যথাসময়ে বই পেতে এবার রয়েছে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা।

গত বছরের ২৪ আগস্ট পণ্য ও সেবা ক্রয়সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনের বরাত দিয়ে এনসিটিবিকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ‘একই প্রতিষ্ঠানের একই সঙ্গে দুটি কাজ বা লটের বেশি কাজ না দেওয়া এবং একই সঙ্গে দুটি কাজ পেলে যথাসময়ে শুরু করতে পারলে এবং শেষ করবে নিশ্চিত হলে পরে আরো কাজ পাবে এরূপ বিধান সন্নিবেশ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ’ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (সমন্বয় ও সংসদ) মো. আখতারউজ জামান স্বাক্ষরিত পত্রে আরো বলা হয়, এমতাবস্থায় সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও সেবা ক্রয় সম্পাদনে প্রধানমন্ত্রীর উপর্যুক্ত অনুশাসন যথাযথভাবে প্রতিপালন নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশা ক্রমে অনুরোধ করা হলো।

এর কিছুদিন পরই গত ২৬ নভেম্বর এনসিটিবির  তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র পাল শিক্ষাসচিব বরাবর এ বিষয়ে আরেকটি পত্র দেন। সেখানে বলা হয়, ‘পিপিআর অনুযায়ী কার্যাদেশের মেয়াদ ৯৮ দিন। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী লট তৈরি করা হলে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ প্রতিবছরই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বই মুদ্রণের সংখ্যাও বাড়ছে। সে ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠানকে কয়টি লট দেওয়া হবে, একটি শেষ হওয়ার পর আরেকটি দেওয়া হবে, এমন হলে লট বিভাজন বা নির্দিষ্টকরণ প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। একটি লটের কাজ শেষ হওয়ার পর আরেকটি লটের কাজ দেওয়া হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থাৎ এক জানুয়ারি কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে না। এমতাবস্থায় এনসিটিবিকে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও সেবা ক্রয়সংক্রান্ত অনুশাসনের আওতামুক্ত রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো। ’

কিন্তু নারায়ণ চন্দ্র পাল গত বছরের শেষ দিকে অবসরে যাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান অধ্যাপক ড. মিয়া ইনামুল হক সিদ্দিকী (রতন সিদ্দিকী)। তিনি কোনোভাবেই এক প্রতিষ্ঠানকে দুই লটের বেশি কাজ দেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ীই দরপত্র আহ্বানের যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ করা হয়েছে।

এসব বিষয়ে শিক্ষাসচিব মো. সোহরাব হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বইয়ের টেন্ডারের ব্যাপারটি নিয়ে আপাতত এনসিটিবিই কাজ করছে। তবে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। যদি কাজ করতে গিয়ে কোনো সমস্যায় পড়ি তাহলে আমরা তা সমাধানে পুনরায় অনুশাসনের ব্যাখ্যা বুঝতে চাইতে পারি। কিন্তু এনসিটিবি এখনো আমাদের তাদের সমস্যার কথা জানায়নি। তাই দেখা যাক কী হয়। ’

নাম প্রকাশ না করে একজন মুদ্রণকারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনের সঠিক ব্যাখ্যায় যাওয়া হচ্ছে না। সেখানে বলা হয়েছে—যারা কাজ যথাসময়ে শুরু করবে এবং শেষ করবে নিশ্চিত হলে পরে তাদের আরো কাজ দেওয়া যেতে পারে। ফলে যাদের সক্ষমতা রয়েছে তাদের বেশি কাজ দিতে বাধা নেই। সাধারণত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে একবারে আট-দশটির বেশি টেন্ডার আহ্বান করা হয় না। তাদের ক্ষেত্রে এই অনুশাসন কার্যকর হতে পারে। কিন্তু এনসিটিবি একবারে ৭৭৫টি লটের টেন্ডার আহ্বান করে। আবার নির্দিষ্ট সময়েই সেই কাজ শেষ করতে হয়। তাই এ ক্ষেত্রে অনুশাসনের শেষ লাইন অনুযায়ীই অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা অনুযায়ী একাধিক লট দেওয়া যেতে পারে। বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে আলাপও হতে পারে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চেয়ে এনসিটিবিই দুই লটে কাজ দিতে বেশি আগ্রহী। তাই তারা প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনের কোনো ব্যাখ্যায়ই যেতে চাচ্ছেন না। ’     

জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান রতন সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনের বাইরে যেতে পারব না। তবে প্রতিটি লটে আগের চেয়ে বইয়ের পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো হচ্ছে। এতে আগের মতো একটি কম্পানি বেশি কাজ পাবে আর কেউ কম কাজ পাবে তা হবে না। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই আমরা বই পৌঁছে দিতে পারব। ’

৭৭৫টি লট দেওয়ার জন্য এত কম্পানি পাওয়া যাবে কি না সে প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠানের ভালো মানের বই ছাপানোর সক্ষমতা আছে কিন্তু এনসিটিবির কাজ করে না তাদেরও আমরা দরপত্রে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। ’

আরেকজন মুদ্রণকারী জানান, এখন দুই লটের বেশি কাজ দেবে না আবার প্রতিটি লটে বইয়ের পরিমাণ বাড়াবে। এতে একদিকে ছোট প্রেস মালিকরা আর দরপত্রে অংশ নিতে পারবেন না। আর যারা বড় প্রেস কয়েক কোটি বইয়ের কাজ করারও সক্ষমতা রয়েছে তারাও ২০-৩০ লাখের বেশি বইয়ের কাজ করতে পারবে না। এতে ছোট-বড় উভয় প্রেসই দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে দেশীয় মুদ্রণশিল্পেও অস্থিরতা তৈরি হবে। বাংলাদেশে ওয়েব মেশিন আছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ৩২টি, যাদের সবাই আবার এনসিটিবির কাজ করে না। ফলে আন্তর্জাতিক দরপত্রে অন্যান্য দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে অংশ নিয়েও কাজ বাগিয়ে নেবে। আর তারা যদি উচ্চ দামে দরপত্রে অংশ নেয়, তখন বিকল্প না পেয়ে তাদেরই কাজ দিতে হবে।

এ ব্যাপারে এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের হাতে দরপত্র বাতিল করার সুযোগ রয়েছে। যদি দেখি দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি দাম দিয়েছে তাহলে তা বাতিল করে দেব। ’

এনসিটিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘চলতি শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাথমিক স্তরের প্রায় ১১ কোটি কপি বই ছাপানো হয়েছে ৯৮টি লটে। অনেক প্রতিষ্ঠান একটি লটের কাজ পেয়েও সময় মতো বই দিতে পারেনি। এবার তারা অবশ্যই দুটি লটের কাজ পাবে। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান তিন কোটি বা চার কোটি কপি বই ছাপার কাজ পেয়ে নির্ধারিত সময়ে বই দিয়েছে তারা এক কোটি বইয়ের কাজও পাবে না। এতে বছরের শেষ নাগাদ সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ বই ছাপানো সম্ভব হতে পারে। ’

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে লট কমিয়ে বইয়ের পরিমাণ বাড়ালেও অন্যান্য ক্ষেত্রে লট কমানো হয়নি। ফলে দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাবে না এনসিটিবি। ওই দরপত্র বাতিল করতে হবে বা কিছু কাজের জন্য আবারও ডাকতে হবে। আর যদি বেশি দাম দেওয়ায়ও দরপত্র বাতিল করা হয় তাহলে পুরো কাজেই চরম জটিলতা সৃষ্টি হবে। যথাসময়ে বই মুদ্রণেও অনিশ্চয়তার তৈরি হবে।


মন্তব্য