kalerkantho


টাইগার ক্যারাভান

বাঘের দেশে ‘বাঘ মামা’

বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্ত্তী, বাগেরহাট   

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাঘের দেশে ‘বাঘ মামা’

গতকাল বাগেরহাট খানজাহান আলী কলেজ মাঠে টাইগার ক্যারাভান। ছবি : কালের কণ্ঠ

সনিয়া আর অনা বাগেরহাট খানজাহান আলী ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী। সুন্দরবনবেষ্টিত ওরা বাগেরহাট জেলার বাসিন্দা।

অথচ ‘বাড়ির পাশের’ সুন্দরবনই দেখা হয়ে ওঠেনি। আর সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখার তো প্রশ্নই ওঠে না। তবে এবার সেই সুযোগ মিলেছে, হোক না তা কৃত্রিম। টাইগার ক্যারাভানে কৃত্রিম সুন্দরবন ও এর বাসিন্দা রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখে ওরা মুগ্ধ।

শুধু ওই দুই সহপাঠী নয়, বাঘ ও সুন্দরবন দেখতে টাইগার ক্যারাভানে গতকাল শনিবার ভিড় জমিয়েছিল বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। বাদ যায়নি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী-পুরুষও। ক্যারাভানে সুন্দরবন আর বাঘ দেখে ওরা বেজায় খুশি। সবাই একবাক্যে বলল, ‘বাঘ আমাদের জাতীয় পশু। সুন্দরবন আছে বলে বাঘ আছে।

আর বাঘ আছে বলেই বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন টিকে আছে। সুন্দরবনে হুমকির মুখে থাকা বাঘকে ভালোবেসে সবাইকে ওদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ’

‘বাঘ আমাদের গর্ব, বাঘ সুরক্ষা করবো’ স্লোগান সামনে রেখে ইউএসএইডের অর্থায়নে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এবং ওয়াইল্ড টিমের তত্ত্বাবধানে টাইগার ক্যারাভানটি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে দেশব্যাপী ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটি এখন বাগেরহাটে। গতকাল সকালে বাগেরহাট-খুলনা মহাসড়কের পাশে খানজাহান আলী ডিগ্রি কলেজ মাঠে টাইগার ক্যারাভান প্রদর্শন করা হয়। ক্যারাভানের গাড়িটিকে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আদল দেওয়া হয়েছে। ক্যারাভানের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে সুন্দরবন। আসলে কৃত্রিমভাবে ওই ক্যারাভানে সুন্দরবনের আবহ সৃষ্টি করা হয়েছে। সুন্দরীসহ বিভিন্ন গাছপালায় ভরপুর ওই বনে স্থান পেয়েছে বাঘ, হরিণ, কুমির ও বানর। দর্শনার্থীদের দেখাতে ক্যারাভানে সব কিছুই কৃত্রিমভাবে তৈরি শেষে স্থাপন করা হয়েছে। আর পথনাটক প্রদর্শনের মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ সুরক্ষার কথা জানাচ্ছেন ওই টিমের সদস্যরা।

খানজাহান আলী কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুননেছা অনা ও সনিয়া খাতুন জানায়, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের বড় একটি অংশ বাগেরহাট জেলার মধ্যে পড়েছে। সুন্দরবন এবং বাঘ মামাখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অনেক গল্প ওরা শুনেছে এবং বইয়ে পড়েছে। কিন্তু বাস্তবে এখনো সুন্দরবন দেখা হয়নি। টাইগার ক্যারাভানে গিয়ে কৃত্রিম সুন্দরবন আর কৃত্রিম বাঘ দেখে ওরা বিস্মিত। বন ও বাঘের ওই দৃশ্য ওদের মুগ্ধ করেছে। সুন্দরবন বাঁচাতে বাঘ রক্ষায় বাঘের প্রতি মানুষের ভালোবাসা তৈরি করতে হবে। ওদের মন্তব্য, আর বাঘ রক্ষা পেলেই সুন্দরবন রক্ষা পাবে।

টাইগার ক্যারাভান দেখতে আসা বাগেরহাট সরকারি পিসি কলেজের শিক্ষার্থী ফারহানা খান ও রবিউল ইসলাম জানায়, চোরা শিকারিচক্র আর পাচারকারীদের কারণে সুন্দরবনে বাঘ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছে। বাঘ না থাকলে সুন্দরবন একদিন উজাড় হয়ে যাবে। বাগেরহাট তথা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করতে হলেও সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে। আর সুন্দরবন বাঁচাতে হলে বাঘ রক্ষার বিকল্প নেই।

টাইগার ক্যারভান টিমের লিডার মামুন হোসেন জানান, বাগেরহাটের স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঁচ দিন ধরে টাইগার ক্যারাভানটি ঘুরবে। সুন্দরবনসংলগ্ন শরণখোলা ও মংলায়ও যাবে ওই ক্যারাভান। গত ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে টাইগার ক্যারাভানটি। এরপর নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর ঘুরে এটি বাগেরহাটে পৌঁছেছে। ১০২ দিন পর্যন্ত টাইগার ক্যারাভানটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বাঘ ও সুন্দরবন রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়াবে।

টিমের নাটক দলের প্রধান মৌসুমি আক্তার বাঁধন জানান, টাইগার ক্যারাভান আর নাটক প্রদর্শনের মাধ্যমে তাঁরা সুন্দরবনে বাঘ সুরক্ষার কথা জানাচ্ছেন। এ পর্যন্ত তাঁরা দেশের যেসব এলাকায় টাইগার ক্যারাভান আর নাটক প্রদর্শন করেছেন সেখানকার সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়েছে।

গতকাল সকালে খানজাহান আলী কলেজ মাঠে বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মীর শওকাত আলী বাদশা ফিতা কেটে বাগেরহাটে টাইগার ক্যারাভান প্রদর্শনের উদ্বোধন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাটের পুলিশ সুপার নিজামুল হক মোল্যা ও সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম। পরে সেখানে একটি নাটক প্রদর্শন করা হয়।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম জানান, ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে সর্বশেষ জরিপ অনুসারে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ১০৬। বাঘ বাঁচাতে বন বিভাগ নানামুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার নিজামুল হক মোল্যা জানান, চোরা শিকারি ও পাচারকারীদের ধরতে বন বিভাগের পাশাপাশি পুলিশও কাজ করছে। সুন্দরবনে বাঘ রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন।


মন্তব্য