kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আনসারুল্লাহ বাংলা টিম গোছাচ্ছে সাত পাকিস্তানি!

সরোয়ার আলম   

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আনসারুল্লাহ বাংলা টিম গোছাচ্ছে সাত পাকিস্তানি!

নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি)। আর নিষিদ্ধ ঘোষিত এই সংগঠনটি গোছানোর কাজে ব্যস্ত আছেন সাত পাকিস্তানি।

এরই মধ্যে ওই পাকিস্তানিদের পরিচয়ও উদ্ঘাটন করেছে দুটি গোয়েন্দা সংস্থা। গোয়েন্দা ও পুলিশ সূত্রের দাবি, পাকিস্তানের ওই সাত নাগরিক সেখানকার লস্কর-ই-তৈয়বার সক্রিয় সদস্য। এ ছাড়া এবিটি-প্রধান মুফতি জসিম উদ্দিন রাহমানি কারাগারে আটক থাকায় সংগঠনের নতুন আমির করা হয়েছে ভারতের নাগরিক তানিম আল আদনানিকে। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে অবস্থান করছেন বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে তিনি বাংলাদেশে আসেন।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, যেসব পাকিস্তানি এবিটিকে সংগঠিত করার চেষ্টায় নিয়োজিত তাদের পরিচয়সহ প্রোফাইল তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরকে অবহিত করেছে দুটি গোয়েন্দা সংস্থা। সাত পাকিস্তানির মধ্যে তিনজন বেলুচিস্তানের এবং অন্যরা পাঞ্জাবের বাসিন্দা। তাদের মধ্যে অর্থ দিয়ে এবিটিকে সহায়তা করছেন সৈয়দ আদমান, শমসের জুলগান গনি, রুহুল বোরুজগার। আল-কায়েদার শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে।

কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে এবিটি গোছানোর কাজে নিয়োজিত ‘বিদেশি’দের সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিছু বিদেশি এবিটিকে লাইম লাইটে আনার চেষ্টা করছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। ’ মন্ত্রী অবশ্য দাবি করেন, জঙ্গি তৎপরতা অনেকটা কমে এসেছে। আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের তৎপরতা কিছুটা থাকলেও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার সামর্থ্য নেই। তার পরও পুলিশ-র‌্যাব সজাগ রয়েছে।

একই রকম তথ্য দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হকও। তিনিও দাবি করেন, দেশে নাশকতা চালানো শক্তি নেই জঙ্গি সংগঠনগুলোর। এর পরও জঙ্গি তৎপরতা রোধ করতে পুলিশ-র‌্যাবকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। যেসব পলাতক জঙ্গি সক্রিয় আছে তাদের ধরার চেষ্টা চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা পুলিশ বলেন, ‘এবিটি নিয়েই আমরা বেশি আতঙ্কিত। তারা প্রকাশ্যে মানুষ মেরে থাকে। সংগঠনটিকে যেসব পাকিস্তানি সহায়তা করে আসছেন তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা বাংলাদেশে না আসলেও ভারতে আসা-যাওয়া করেন। তা ছাড়া বর্তমান আমির তানিম মাঝেমধ্যে বাংলাদেশে আসেন বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। ’ তিনি আরো বলেন, আল-কায়েদার পাশাপাশি আইএসের জিহাদি কার্যক্রমে অনুপ্রাণিত হয়ে এশিয়াজুুড়ে জঙ্গি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করে আসছে সংগঠনটি।  

পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এবিটির নতুন আমিরকে সহায়তা করেন বাংলাদেশের আরেক দুর্ধর্ষ জঙ্গি নেতা মুফতি নাজিম উদ্দিন। তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহী অঞ্চলে। এর আগে নাজিম জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজিবি) সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবিটি সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। একটি চক্র বিদেশি অর্থ দিয়ে সংগঠনটিকে সাজানোর চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে এবিটির একাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ’ তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান, ভারতে এবিটির একাধিক শাখা রয়েছে। যেসব পাকিস্তানির নাম এসেছে তারা একসময় আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ওসামা বিন লাদেন মারা যাওয়ার পর তারা লস্কর-ই-তৈয়বায় যোগ দেন। পাশাপাশি আনসারুল্লাহকে সহায়তা করেন। একপ্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, তাদের ধরতে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হবে।

একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, তাঁদের কাছে তথ্য এসেছে, জেএমবি, হুজিসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা এবিটিতে যোগ দিচ্ছে। রাজশাহী, বরিশাল, ঢাকা, চটগ্রামসহ অন্তত ৩২টি স্থানে এবিটির তৎপরতা রয়েছে। সম্প্রতি এবিটির সাংগঠনিক তৎপরতা ও সদস্যদের সক্রিয়তা নিয়ে দুটি সংস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরকে অবহিত করেছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, মাসখানেক আগে তানিম আল আদনানি বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি রাজশাহী অঞ্চলে আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের অনুসারীদের নিয়ে বৈঠক করে পুনরায় ভারত ফিরে যান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেএমবি সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেএমবির সাগঠনিক কর্মকাণ্ড আগের মতো নেই। এ কারণে আমি আনসারউল্লাহ বাংলা টিমে চলে এসেছি। হোসাইন আহমেদ, মুফতি কামাল উদ্দিন, রুহুল আমিন, মাহবুবুর রহমান, আব্দুল কুদ্দুস, সিরাজুল ইসলাম, আবুল কাশেম, মাহবুবুর রহমান, ফজলে এলাহী, আবু বক্কর, আব্দুর রাজ্জাক, আবু তাহের প্রমুখ জেএমবি ছেড়ে এবিটিতে যোগ দিয়েছেন। ’ তিনি আরো বলেন, কিছু পাকিস্তানি এবিটির শক্তি-সামর্থ্য বাড়াতে কলকাঠি নাড়ছেন। তানিম আল আদনানিকে আমির বানানো হয়েছে। আর তাঁকে সার্বক্ষণিক সহায়তা করছেন মুফতি নাজিম উদ্দিন। নাজিম উদ্দিন একসময় সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইয়ের অন্যতম সহযোগী ছিলেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা নানাভাবে সংগঠনকে মজবুত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।  

জানা যায়, মাসদুয়েক আগে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন এবিটির সক্রিয় সদস্য আসিফ ও তানজীল। তারাও সংগঠন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। তারা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছেন।

জানা যায়, নিষিদ্ধ করার পরও জেএমবি, হুজি, জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), শাহাদাত-ই-আল হিকমা, হিযবুত তাহরীর ও এবিটি নানা কৌশলে সক্রিয় আছে। বিশেষ করে এবিটিকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। গোয়েন্দাদের হিসাব অনুযায়ী, এবিটির অন্তত তিন হাজার সদস্য রয়েছে। তাদের হামলার টার্গেটে আছেন দেশের প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও ব্লগাররা।


মন্তব্য