kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নির্দেশনা নেই, মূলস্রোতে মিশে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা

আরিফুজ্জামান তুহিন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে ফিরে   

১২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নির্দেশনা নেই, মূলস্রোতে মিশে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা

মিয়ানমার সরকারের তাড়া খেয়ে আশির দশক থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকতে শুরু করে। সরকারি হিসাবে নিবন্ধিত প্রায় ৩২ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এখন অবস্থান করছে।

অনিবন্ধিত বা হিসাবের বাইরে বেআইনিভাবে এ দেশে অন্তত পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা আছে। অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় তারা এখন বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এভাবে এ দেশের সমাজে রোহিঙ্গাদের আত্তীকরণ ঘটায় তারা এটিকে এখানে বসবাসের সবুজ সংকেত হিসেবে দেখছে। ফলে জেনেবুঝেই প্রতিদিন রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ঢুকছে বাংলাদেশে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বসবাস করা মোট রোহিঙ্গার ১৩ শতাংশই এ দেশে এসে বিয়ে করে ঘর-সংসার নিয়ে জেঁকে বসেছে। তারা এ দেশের নাগরিক সেজে সহজেই পাসপোর্ট করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ও নয়াপাড়ার দুটি শরণার্থী ক্যাম্পে প্রায় ৩২ হাজার নিবন্ধিত মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বসবাস করছে। তাদের শরণার্থীর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তবে এ দেশে অবৈধভাবে বসবাস করা রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ।

বাংলাদেশে ঢোকার পর স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সহায়তায় রোহিঙ্গারা বানিয়ে নিচ্ছে ন্যাশনাল আইডি কার্ড (এনআইডি)। আর এভাবেই তারা বাংলাদেশের নাগরিকও বনে যাচ্ছে। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার এ স্রোত থামানো যাচ্ছে না। জাতিগতভাবে নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে একই সময় ঢুকে পড়ছে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) ভাবাদর্শে বিশ্বাসীরাও। এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি সংগঠন বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে মোর্চা গঠন করে কর্মকাণ্ড চালানোতে এ অঞ্চলে নিরাপত্তাঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সরেজমিন ঘুরে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।

পাহাড়তলীতে কী হয় : চট্টগ্রামের হাটহাজারী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের তিনটি এলাকা রোহিঙ্গা অধ্যুষিত। গত চার বছরে পাহাড়তলীর সন্দ্বীপপাড়া, আদর্শগ্রাম ও গুচ্ছগ্রামে পাহাড় কেটে এলাকার প্রভাবশালীরা রোহিঙ্গাদের কাছে তা উচ্চ দামে হয় বিক্রি করছে, না হয় ভাড়া দিচ্ছে। অথচ এসব পাহাড় সংরক্ষিত ও সরকারি।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আলী আজম ও বশির নামে দুই ব্যক্তি চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর পাহাড় কেটে রোহিঙ্গাদের কাছে তা বিক্রি করছেন। এখানে ২ শতক জমির মূল্য ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। আলী আজম হাটহাজারী সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আর বশির একই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার। এর মধ্যে আলী আজম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পাহাড় কাটার অপরাধে আটক হয়েছিলেন। আলী আজম ও বশিরের সঙ্গে ইসলামী জঙ্গি মোর্চা হিলফুল ফুজুলের সম্পর্ক রয়েছে।

জানা গেছে, সাবেক চেয়ারম্যানের ছোট ভাই আফছার পাহাড় কেটে একটি মুরগির ফার্ম তৈরি করেছেন। এখানে রোহিঙ্গাদের কম টাকায় শ্রমিক হিসেবে খাটানো হয়। রাতে এসব ফার্ম এলাকায় আরএসওর গোপন বৈঠক হওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, সেখানে কী হয় সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই।

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে আফছার বলেন, ‘এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য না। আপনার সঙ্গে এ বিষয়ে আমি কোনো কথা বলব না। ’

শামলাপুরের রোহিঙ্গারা মিশে গেছে বাংলাদেশিদের সঙ্গে : টেকনাফের শামলাপুরে সমুদ্রপারে রোহিঙ্গাদের একটি বস্তি ছিল। এসব রোহিঙ্গা অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করে আসছিল। আট মাস আগে সরকার এ অবৈধ ক্যাম্পটি উচ্ছেদ করে। উচ্ছেদ হওয়া রোহিঙ্গাদের কেউই মিয়ানমারে ফিরে যায়নি। তারা সবাই বাংলাদেশের মূলস্রোতে মিশে গেছে।

জানা গেছে, শামলাপুর বস্তি থেকে উচ্ছেদ হওয়া রোহিঙ্গারা বাঁধের পাশে শামলাপুর বাজার-সংলগ্ন এলাকায় বসবাস করছে। উচ্ছেদ হওয়া রোহিঙ্গাদের অনেকে এর মধ্যেই বাংলাদেশে বিয়েশাদি করেছে।

রোহিঙ্গা যুবক হেলাল উদ্দিন (২০) কালের কণ্ঠকে জানান, গত সাত মাসে তাঁর দুই বোনের বিয়ে হয়েছে স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে। একই রকম তথ্য দিলেন রোহিঙ্গা যুবক (২৫) সালামত।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শামলাপুর রোহিঙ্গা বস্তি দেখে আন্দাজ করা যেত রোহিঙ্গাদের অবস্থান। বস্তি উচ্ছেদ হওয়ায় তারা এখন বাংলাদেশিদের স্রোতে মিশে গেছে। রোহিঙ্গাদের দ্রুত একটি জরিপের আওতায় এনে চিহ্নিত করা উচিত। আর তা না করা গেলে বেআইনিভাবে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের কোনোকালেই মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না।

পুলিশ ও প্রভাবশালীদের রোহিঙ্গা ব্যবসা : বাংলাদেশের নাগরিক না হওয়ায় রোহিঙ্গাদের অপরাধ বা কোনো বিরোধ পুলিশ প্রশাসনের কাছে যায় না। ফলে এগুলোর কোনো বিচারও হয় না। এমনকি রোহিঙ্গা নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও তারা বিচার পায় না। এ ক্ষেত্রে সামাজিক বিচারই ভরসা তাদের। আর এই সালিস-বিচার করতে গিয়ে হাজার হাজার টাকা কামিয়ে নিচ্ছে পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাটহাজারী সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলী আজম ও একই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার বশির পুলিশের সঙ্গে মিলে একটি বিচার-সালিস সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এর ফলে কোনো রোহিঙ্গা নারী বা পুরুষ হাটহাজারী থানায় গিয়ে অভিযোগ করলে পুলিশ এসডিআর (সার্ভিস রেকর্ড ডায়েরি) নামে একটি ফাইল করে। মামলা, সাধারণ ডায়েরি বা অভিযোগের খাতা থাকার নিয়ম থাকলেও চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানায় এসডিআর নামে বিশেষ খাতা খোলা হয়েছে রোহিঙ্গাদের জন্য। প্রতিদিন অন্তত গড়ে ১০টি অভিযোগ এসডিআর খাতায় তোলা হয় আর মাসে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০০-তে। এ থানায় জিডির চেয়ে এসডিআর বেশি হয়। এসডিআর হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের এসব বিরোধ বা অভিযোগের মীমাংসা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালীরা সালিসের মাধ্যমে করে থাকে। একেকটি সালিসে ২০ হাজার থেকে লাখ টাকারও বেশি নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এসব টাকা পুলিশ, আলী আজম ও বশিরের লোকদের মধ্যে ভাগ হয়।

তবে হাটহাজারী থানার পুলিশ জানিয়েছে, জিডির চেয়ে এসডিআরের সংখ্যা বেশি হলেও মাসে এসডিআরের সংখ্যা ৬০-এর বেশি হবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাটহাজারী থানার উপপরিদর্শক হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসডিআর বেশি হয়। আর এসডিআরের বিষয়টি আসলে স্থানীয়ভাবে সালিসের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়। ’

নাগরিকত্ব বাগিয়ে নিচ্ছে রোহিঙ্গারা : চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ও কক্সবাজারের টেকনাফ ঘুরে দেখা গেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনেকেই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়ে গেছে। আর এ কাজে তাদের সহায়তা করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

সরকারের প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য সব থেকে বেশি প্রয়োজন হয় ভূমিসংক্রান্ত তথ্য ও প্রমাণ। কারণ যেকোনো মানুষ চেষ্টা করলে যে কাউকে আত্মীয় বানিয়ে আনতে পারে। তবে ভূমিসংক্রান্ত রেকর্ড যেহেতু জাল করা সম্ভব নয়, সে কারণে স্থানীয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে রোহিঙ্গারা ভূমিহীন নামে সনদপত্র সংগ্রহ করে। আর এ সনদপত্রের মাধ্যমে তারা জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়ে নাগরিক হয়ে যাচ্ছে। ’ অনুসন্ধানে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের ভূমিহীন সনদ সব থেকে বেশি দিয়েছেন কক্সবাজারের উখিয়ার রত্নবলা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নুরুল কবির।

জানা গেছে, টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন, হোয়াইকং, টেকনাফ সদর ও সাবরং থেকে রোহিঙ্গাদের নাগরিক হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সব থেকে বেশি রোহিঙ্গা নাগরিকত্ব পেয়েছে টেকনাফ সদর থেকে। আর সদর টেকনাফের জালিয়াপাড়া থেকে অধিকসংখ্যক রোহিঙ্গা নাগরিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে। নূর মুহাম্মদ, এনআইডি নম্বর ২২১৮৯৮৬০৫০০৩; ছৈয়দ আলম, এনআইডি নম্বর ২২১৮৯৮৬০৫০১০; আব্দুল কুদ্দুস, এনআইডি নম্বর ২২১৮৯৮৬৪৪৮৬৬; আবুল কাশেম, এনআইডি নম্বর ২২১৮৯৮৬৪৪৯৮৪-এর মতো শুধু হ্নীলা ইউনিয়নের দক্ষিণ হ্নীলার নয়াপাড়া ঘুরে অন্তত ৭০ জন রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে।

এ প্রসঙ্গে রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মোজাম্মেল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্য ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় রোহিঙ্গারা এনআইডি পেয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময় আমরা নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসনকে সুনির্দিষ্ট তালিকা করে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাইনি। ’

অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের শুমারি করতে গিয়ে বিপাকে বিবিএস : বাংলাদেশে কী পরিমাণ অবৈধভাবে বসবাসকারী রোহিঙ্গা রয়েছে তার সঠিক তথ্য জানতে গত বছরের মে মাসে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বাংলাদেশে অবস্থানরত অনিবন্ধিত মিয়ানমার নাগরিক শুমারি ২০১৬’ শিরোনামের একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় পরিকল্পনা কমিশন। রোহিঙ্গাদের শুমারি করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় বিবিএসকে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, পটুয়াখালী—ছয়টি জেলায় আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত চলবে এই শুমারি। এই শুমারির মাধ্যমে বাংলাদেশে অবস্থানরত অনিবন্ধিত মিয়ানমারের নাগরিকদের একটি সমন্বিত ডাটাবেইস প্রণয়ন করা হবে। শুমারির কাজ শেষ হলে জানা যাবে বাংলাদেশে মিয়ানমারের অনিবন্ধিত নাগরিকের সংখ্যা কত।

জানা গেছে, শুমারির অংশ হিসেবে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়েই মূলত জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিবিএস কর্মকর্তাদের। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের চট্টগ্রামের মানুষ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। ফলে বিবিএসের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জরিপ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।

আরএসওর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের অথবা দেশের বাইরের কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে কোনো ধরনের কার্যক্রম করতে দেওয়া হবে না। এ ব্যাপারে আমরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি। ’ নিয়মিত অভিযান চলছে বলেও তিনি জানান।


মন্তব্য