kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি সফলতার পথে যাত্রা

রেজাউল করিম   

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি সফলতার পথে যাত্রা

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতি প্রয়োগে শুরুর দিকেই সফলতা অর্জনের পথে রয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। অসচ্ছল জনগণকে বিনা মূল্যে আইনি সেবা দিতে আইন মন্ত্রণালয় পরিচালিত ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’র মাধ্যমে দেশের ১৯ জেলায় গত জুলাইয়ে শুরু হয়েছে এই পদ্ধতি প্রয়োগ।

জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব জেলায় ২২৯টি বিরোধ নিষ্পত্তি করেছে সংস্থাটি, যাতে দ্রুত ন্যায়বিচার পেয়েছে উভয় পক্ষের এক হাজার ৮৪১ জন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এডিআর প্রয়োগের আইন থাকলেও এই প্রথম বাস্তবায়নের সুফল পাচ্ছে বিচারপ্রার্থীরা।

মামলা না করেও যাতে অসচ্ছল জনগোষ্ঠী দ্রুত ন্যায়বিচার পায় সে জন্য এডিআর পদ্ধতি প্রয়োগ বাধ্যতামূলক করতে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি প্রবিধিমালা জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। এতে কোনো অসচ্ছল বা গরিব ব্যক্তি মামলা করতে গেলেই এডিআর পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার বিধান রাখা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেছেন, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে সরকার আন্তরিক। এ জন্য আদালতে এডিআর প্রয়োগের জন্য নানাভাবে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গরিব জনগণকে বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা দিতে। অর্থাৎ গরিবের মামলার ভার সরকার নিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এডিআর প্রয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার মাধ্যমে।

নরসিংদীর পলাশ থানার ডাংগা গ্রামের তানিয়া আক্তার স্বামীর বিরুদ্ধে দেনমোহরের মামলা করার জন্য আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার জেলা কার্যালয়ে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে কতৃপক্ষ উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নেয়। নরসিংদী জেলা আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার কর্মকর্তা (সিনিয়র সহকারী জজ) ইয়াসমিন আক্তারের মধ্যস্থতায় তানিয়া ও তাঁর স্বামীর পরিবারের উপস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে তানিয়ার দেনমোহর ও অন্য দাবি বাবদ এক লাখ ৬০ হাজার টাকায় রফা হয়।

নরসিংদী জেলা আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার কর্মকর্তা ইয়াসমিন আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, অসচ্ছলদের মামলা পরিচালনা ও খরচের দায়িত্ব নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অসচ্ছলদের মামলা দায়েরের আগে উভয় পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার জন্য উদ্যোগ নিতে আইনও রয়েছে। এরই ধরাবাহিকতায় যেকোনো অভিযোগ কার্যালয়ে এলে প্রথমেই মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়ে থাকে জেলা আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা। তিনি বলেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ফলে একদিকে মামলা না করেই বাদী তার পাওনা দ্রুততার সঙ্গে আদায় করতে পারছে। অন্যদিকে এর জন্য কোনো খরচ হচ্ছে না, সময়ও নষ্ট হচ্ছে না।

উপকারভোগী তানিয়া আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি অসচ্ছল মানুষ হিসেবে নরসিংদী জেলা আইনগত সহায়তা সংস্থার কার্যালয়ে যাই আমার স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করতে। সেখানে কর্মকর্তা বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার জন্য আমাকে বুঝিয়ে বলেন। আমি যাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছিলাম তাদেরকে এবং আমার পরিবারকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা হয়। এতে আমি অনেক খুশি। কারণ মামলা করলে আমার দাবি আদায় করতে দুই-তিন বছর সময় লাগত। কিন্তু সেটি মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে সমাধান হয়েছে। ’

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ১৯ জেলায় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার এডিআর প্রয়োগের মাধ্যমে ২২৯টি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। এসবের মধ্যে ১৪৫টি মামলা দায়েরের আগের, আর ৮৪টি চলমান মামলা ছিল। এসব বিরোধ নিষ্পত্তি করে মোট ৬৮ লাখ এক হাজার ৪০০ টাকার দাবি আদায় হয়েছে। এসব বিরোধের সঙ্গে উভয় পক্ষে জড়িত ছিল এক হাজার ৮৪১ জন ব্যক্তি, যাদের মধ্যে মামলার আগেই এক হাজার ১৭০ জন এবং চলমান মামলায় ৬৭১ জন উপকৃত হয়েছে। এদের বেশরি ভাগই অসচ্ছল।

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার সহকারী পরিচালক (সিনিয়র সহকারী জজ) মাসুদা ইয়াসমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, অসচ্ছলদের মামলার ব্যয়ভার নিয়েছে সরকার। আবার মামলা না করেও যাতে ন্যায়বিচার পাওয়া যায় সে জন্য এডিআর প্রয়োগ বাধ্যতামূলক করে আইন করা হয়েছে। তিনি বলেন, অসচ্ছল ছাড়াও যেকোনো ব্যক্তি এডিআরের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারে। এ ছাড়া যেকোনো আদালত এডিআর প্রয়োগের জন্য কোনো চলমান মামলা জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার কাছে পাঠাতে পারেন।

প্রতিটি জেলা আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার কার্যালয়ে স্থায়ীভাবে একজন করে লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও দেশের ১৯ জেলায় রয়েছে। ফলে অন্য জেলাগুলোতে এ সংস্থার মাধ্যমে এডিআর প্রয়োগ সম্ভব হচ্ছে না।

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (আইন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব) বিকাশ কুমার সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, গরির অসচ্ছলদের জন্য দ্রুত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এই উদ্যোগ। তবে যেকোনো চলমান মামলা বা বিরোধ এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার জন্য আইনগত সহায়তা সংস্থার কাছে আসতে পারে।

নরসিংদীর শিবপুর থানার ভরতেরকান্দি গ্রামের রশিদা আক্তার যৌতুক নিরোধ আইনে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন আদালতে। বিচারাধীন মামলাটি এডিআর প্রয়োগের মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য জেলা আইনগত সহায়তা সংস্থার কার্যালয়ে পাঠান সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক। উভয় পক্ষকে ডেকে এই মামলাটি নিষ্পত্তি করেন জেলা আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের কর্মকর্তা। এক সপ্তাহের মধ্যেই ফল আসে। আপস হয়ে যায় রশিদা ও তার স্বামীর মধ্যে। রশিদা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে জানতে পারলে আগেই আমরা আইনগত সহায়তার কার্যালয়ে এই পদ্ধতি নিষ্পত্তির অবেদন করতাম। ’


মন্তব্য