প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা অতিষ্ঠ-334657 | শেষের পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা অতিষ্ঠ এলাকাবাসী

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা অতিষ্ঠ এলাকাবাসী

রাজধানীতে যেসব স্থানে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হয়, তার মধ্যে অন্যতম কল্যাণপুর পোড়া বস্তি। বস্তিটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অপরাধীদের আখড়া হিসেবে পরিচিত। মাদক কারবারি ছাড়াও অনেক সন্ত্রাসী এ বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের জন্য আশপাশ এলাকার চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট থানা সূত্র ও সরেজমিন ঘুরে বস্তিতে অপরাধের নানা চিত্র পাওয়া গেছে। 

মিরপুর থানা ও দায়িত্বশীল একটি সংস্থার সূত্রে জানা যায়, এ বস্তিতে মাদক বেচাকেনা ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্ত্র লুট, মানবপাচার, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার মতো আলামত পাওয়া যাচ্ছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে এ বস্তি থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকসহ নাশকতার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। বস্তিতে মাদক বিক্রেতাদের মধ্যে সুমন, স্বপন ও রিপন অন্যতম। তাদের হয়ে ঝুলন ও ফাতেমা আপা নামের দুই নারী মাদক বিক্রি করে। সুমন পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত। সেখানে মদ, গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক বিক্রি হয়। ইসলাম ও বাবুল নামের দুজনের নেতৃত্বেও বস্তি ও আশপাশের এলাকায় মাদক বিক্রি হয়।

স্থানীয় সংসদ সদস্য আসলামুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই বস্তির অপরাধীদের জন্য আশপাশের বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। চুরি, ছিনতাইসহ মাঝেমধ্যে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। বস্তির নামে কিছু লোক সরকারি জমি দখল করে ভাড়া দিচ্ছে। তাদের সঙ্গে কিছু মাদক ব্যবসায়ীও রয়েছে। প্রশাসন মাদক ব্যবসার অপরাধে কয়েকজনকে ইতিমধ্যেই আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। এখানে অনেক দখলদার নিজেদের সরকারদলীয় নেতা হিসেবে পরিচয় দেয়, তবে বাস্তবে তাদের দাবির কোনো ভিত্তি নেই। মাদক কারবারি আর দখলবাজরা আওয়ামী লীগের কেউ না।’

মিরপুর মডেল থানা সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ জানুয়ারি পোড়া বস্তির মনিরের ছাপরাঘর থেকে মাদকসহ দুজনকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়। একই দিনে বস্তি থেকে আরো কয়েকজনকে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ২০১৫ সালে এ বস্তি থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও জড়িতদের গ্রেপ্তারের পর মামলা হয়েছে ৯টি। একই বছর বিশেষ ক্ষমতা আইন, অস্ত্র আইন, নারী নির্যাতন ও চুরি-ছিনতাই, দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ বেশ কিছু অপরাধে মামলা হয়েছে। এ ছাড়া এই বস্তি থেকে মাদক উদ্ধার ও জড়িতদের গ্রেপ্তারের পর মিরপুর থানায় ২০১৪ সালে পাঁচটি, ২০১২ সালে ছয়টি, ২০১১ সালে ১৩টি, ২০১০ সালে চারটি মামলা হয়েছে। প্রতিটি মামলায় একাধিক আসামিকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হলেও পরে তারা জামিনে বের হয়ে আবারও মাদকের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। গত ছয় বছরে বস্তির বিভিন্ন ঘটনায় একই থানায় অস্ত্র আইনে আরো ৩০টি মামলা হয়েছে।

মিরপুর মডেল থানার ওসি মাহবুব হাসান বলেন, ‘মিরপুর থানার মধ্যে কল্যাণপুর বস্তি অন্যতম অপরাধপ্রবণ এলাকা। চুরি, ছিনতাই, মাদকের বিষয়ে আমরা প্রায়ই অপরাধীদের গ্রেপ্তার করি। জড়িতদের বেশির ভাগই বস্তির বাসিন্দা। বস্তির অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের পুলিশের একটি টিম নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে।’

জানা যায়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রায় ১৫ একর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে কল্যাণপুর পোড়া বস্তি। ১৯৬২-৬৩ সালের অধিগ্রহণ করা সরকারি এই জমিতে বস্তি ছাড়াও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বস্তিতে রয়েছে প্রায় এক হাজার ঘর। সেখানে বসবাস করছে সাত থেকে আট হাজার লোক। বস্তির সঙ্গে গড়ে উঠেছে কয়েক শ দোকান, গোডাউন, গ্যারেজ, নির্মাণসামগ্রীর দোকন। সেখানে সরকারি পুকুর ও কয়েকটি বড় আকারের পোল্ট্রি ফার্মও রয়েছে।

এ বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৯৬২-৬৩ সালের অধিগ্রহণ করা আমাদের ১৫ একর জমি বেদখলে রয়েছে। এ জমি নিয়ে একটি পরিকল্পনা রয়েছে। স্বল্প খরচে কিভাবে বাড়ি তৈরি করা যায়, এ বিষয়ে একটি রিসার্চ সেন্টারসহ সেখানে কয়েকটি স্থাপনা করা হবে।’

বর্তমান বাজারমূল্যে এই ১৫ একর জমির দাম কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, বস্তিতে প্রায় এক হাজার ঘর তুলে ভাড়া দিচ্ছে অর্ধশত প্রভাবশালী ব্যক্তি। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বসিয়ে সেখান থেকেও মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করছে তারা। ছোট ছোট ঘর তৈরি করে প্রতিটি ঘর স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছ থেকে মাসিক দুই থেকে তিন হাজার টাকায় ভাড়া নিয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। ১ থেকে ১০ নম্বর সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে পুরো বস্তিকে। চার নম্বর বস্তিতে মো. লাদেনের ৯০টি, শাহ আলমের ১০০টি, কামাল শিকদারের ২০টি, আবুল কাশেমের ৫০টি ও রাসেলের ২৫টি ঘর এবং কালামের তিনটি গোডাউন ও একটি ভাঙারির দোকান আছে। ৮ নম্বর বস্তিতে মোহাম্মদ আলীর ৫০টি ঘর ও ১০টি দোকান, একটি গোডাউন ও একটি গ্যারেজ আছে। একই বস্তিতে মামুনের রয়েছে ২২টি ঘর, দুটি দোকান ও একটি গ্যারেজ, খোকনের রয়েছে তিনটি ঘর ও একটি ফার্নিচারের দোকান, মেহেদীর রয়েছে কেবল ও বিদ্যুতের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া সেখানে জুয়েল ড্রাইভারের ২২টি, মনির ড্রাইভারের ১২টি এবং আমেনা বেগমের রয়েছে ৪০টি ঘর। ১১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা ইসলামের রয়েছে ৪০টি ঘর, রিপন-স্বপন দুই ভাইয়ের রয়েছে ৫০টি ঘর, দোকানদার বাবুলের রয়েছে দোকান ও গোডাউনসহ ১০টি ঘর, জহিরের রয়েছে রিকশার গ্যারেজ ও ২০টি ঘর, রীনার মার আছে ২০টি ঘর ও পাঁচটি দোকান। এ ছাড়া হান্নানের ২০টি, ছোটনের ১০টি, এমদাদের ২৫টি, বাচ্চুর ৫৬টি ও আলমগীর হোসেনের ১০টি ঘর রয়েছে। আলমগীরের পাঁচটি দোকানও রয়েছে।

এ ছাড়া বস্তিতে নাগর আলী, হানিফ আলী, মিজান, পিরুজ মিয়া, বাচ্চু মিয়া, বেলাল হোসেন, জুয়েল, মনির হোসেন, কাজী এমদাদ, আজহার, মো. নান্টু, আমেনা, জাহাঙ্গীর, শাহ আলম, নান্নু, রহিম, মোফাজ্জল, মজিবুর, কালাম ও মাইনউদ্দিনের বেশ কিছু ঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।

মন্তব্য