যুক্তরাজ্যে কার্গো নিষেধাজ্ঞায়-334281 | শেষের পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৫ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৭ জিলহজ ১৪৩৭


যুক্তরাজ্যে কার্গো নিষেধাজ্ঞায় হুমকিতে রপ্তানি বাণিজ্য

আশরাফুল হক রাজীব   

১০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



যুক্তরাজ্যে কার্গো নিষেধাজ্ঞায় হুমকিতে রপ্তানি বাণিজ্য

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করার জন্য ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশকে সময় দিয়েছিল যুক্তরাজ্য। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ২৩ দিন আগেই নিরাপত্তার অজুহাত তুলে ঢাকা থেকে লন্ডনের সরাসরি ফ্লাইটে কার্গো বহন নিষিদ্ধ করেছে ব্রিটিশ পরিবহন দপ্তর।

যুক্তরাজ্যের এই নিষেধাজ্ঞা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) সব দেশই অনুসরণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ ইইউভুক্ত দেশগুলো বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড অনুসরণ করে। তা ছাড়া সম্প্রতি জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালিও বাংলাদেশের বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ায় কার্গো বহনের ওপর নিষেধাজ্ঞার তিন মাসের মধ্যে যুক্তরাজ্যে কার্গো পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞার ফলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বাংলাদেশ থেকে কৃষিপণ্য ও পোশাক রপ্তানিকারকরা। কারণ এ নিষেধাজ্ঞার ফলে শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস নয়, বাংলাদেশ থেকে চলাচলকারী কোনো এয়ারলাইনসই কার্গো নিয়ে সরাসরি যুক্তরাজ্যে যেতে পারবে না। ঢাকা থেকে কার্গো নিলেও যুক্তরাজ্যে ঢোকার আগের স্টেশনে এসব কার্গো নামিয়ে স্ক্যানিং করাতে হবে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট মাফরুহা সুলতানা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৫৪.৬০ শতাংশ হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে। এ রপ্তানির বেশির ভাগই সমুদ্রপথে হলেও আকাশপথেও কম হয় না। কৃষিজ পণ্য, বিশেষ করে ফল, শাকসবজি, মাছ, শুকনা খাবার আকাশপথেই রপ্তানি হয়। ২০১৪-১৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ১৭.০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত অর্থবছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৫৮৬ মিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে আর চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি হয়েছে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য। এসব পণ্য আকাশপথে পরিবহন করা হয়। কৃষিপণ্য ছাড়াও জরুরিভিত্তিতে অনেক পণ্য আকাশপথে পাঠানো হয়। অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মালামাল পৌঁছানোর জন্যও বেশি ভাড়া দিয়ে আকাশপথেই পণ্য পরিবহন করা হয়।

বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল অ্যালাইট প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হব। অন্য দেশে কার্গো নামিয়ে সেগুলো স্ক্যান করার ফলে যে খরচ পড়বে, তা কোনোভাবেই পোষাবে না। এই নিষেধাজ্ঞা আমাদের রাস্তায় বসিয়ে দেবে। অথচ এই নিষেধাজ্ঞা এক দিনে আরোপ করা হয়নি। অনেক দিন ধরেই যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়ানোর কথা বলে আসছে। সরকার করছি করছি করেও তা করেনি। একবার নিষিদ্ধ হয়ে গেলে তা প্রত্যাহার করানো কঠিন কাজ। এখন প্রত্যাহারের আবেদন করলে ওরা নানা শর্ত দেবে।’

অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর বলেন, ‘গত বছর আমরা এক হাজার কোটি টাকার পণ্য আকাশপথে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছি। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশই ইউরোপীয় ইউনিয়নে। অবশিষ্ট ৬৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে।’

সংগঠনটির ইউরোপ বিষয়ক উপদেষ্টা মনজুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে যে পণ্য রপ্তানি হয় তার ৯০ শতাংশই যুক্তরাজ্যে। কয়েক শ ব্যবসায়ীর শত শত কোটি টাকা বাকি পড়ে আছে যুক্তরাজ্যে। এখন এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ওই টাকা ওঠানোও সম্ভব হবে না। তা ছাড়া ভারতের ব্যবসায়ীরা মুখিয়ে আছে ইউরোপের বাজার দখল করার জন্য। সম্প্রতি পাকিস্তানও আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। দেশের এই সেক্টরে পাঁচ থেকে ছয় লাখ লোক কাজ করে। তাদের মধ্যে ব্যবসায়ী ছাড়াও কৃষক রয়েছে। কৃষিপণ্য ইউরোপে প্রবেশ করতে না পারলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই শিল্পের সঙ্গে প্যাকিং জড়িত; তারাও বেকার হয়ে পড়বে। রপ্তানি পণ্যের জন্য কৃষিপণ্যের বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়; বিশেষ ধরনের সার, কিটনাশক ব্যবহার হয়; সংশ্লিষ্ট সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গত মঙ্গলবার এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গতকাল বুধবার এ সংবাদ জেনেছেন। এ খবর শোনার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হিসাব কষতে বসেছেন, কেন নির্ধারিত সময়ের আগেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৩১ মার্চ সময় শেষ হওয়ার পূর্বমুহৃর্তে বাংলাদেশ আরো দুই মাস সময় চাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। ওই দুই মাসের মধ্যে যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, তা নেওয়া হবে। কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা ছিল যুক্তরাজ্য সরকার দুই মাস সময় দেবে। কারণ তারা শাহজালালের যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা নিয়েও উদ্বিগ্ন ছিল। সরকার ইতিমধ্যে সেখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়িয়েছে। এই নিরাপত্তা নিয়ে এখন তারাও সন্তোষ প্রকাশ করেছে। কার্গো কমপ্লেক্সের বিষয়েও সময় পাওয়া যাবে বলেই তাদের বিশ্বাস ছিল।

এদিকে শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন অথরিটির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এই বোঝাপড়ার অভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছিল। বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অনেক সিদ্ধান্ত এ দুটি সংস্থা, বিশেষ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস পরোয়া করে না। বিমান অনেকটাই স্বাধীনভাবে চলার চেষ্টা করে।

সিভিল এভিয়েশনের এক কর্মকর্তা জানান, শাহজালাল বিমানবন্দরে কার্গো রাখার পেলেট নেই। দেড় বছর আগে সমস্যাটি চিহ্নিত হলেও নিষ্পত্তি হয়নি। বিমান বলছে পেলেট কেনার দায়িত্ব সিভিল এভিয়েশন অথরিটির। আর সিভিল এভিয়েশন অথরিটির কথা হলো কার্গো চালায় বিমান, তাই এগুলো বিমানকে কিনতে হবে। এ নিয়ে দুই সংস্থার একাধিক বৈঠক হয়েছে। কোনো সমাধান হয়নি। সম্প্রতি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-সচিব উপস্থিত ছিলেন। এর পরও সমাধান হয়নি।

শুধু পেলেটই নয়, স্ক্যানার কেনা ও পরিচালনাসহ কার্গো কমপ্লেক্সের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিমান ও সিভিল এভিয়েশন অথরিটির মধ্যে বিরোধ রয়েছে। সিভিল এভিয়েশন চায় অন্যান্য দেশের মতো গ্রাউন্ড ও কার্গো পরিচালনার ভার তাদের হাতেই ন্যস্ত থাকুক। আর বিমান কোনোভাবেই এ দায়িত্ব থেকে সরতে চায় না। কারণ বিমান একটি লোকসানী সংস্থা। বিমানের নগদ অর্থ আয় করার দুটো পথ হচ্ছে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কার্গো হ্যান্ডলিং। এর মধ্যে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করে বিমান বছরে ৩০০ কোটি টাকার বেশি আয় করে। এর চেয়ে বেশি মুনাফা হয় কার্গো হ্যান্ডেলিংয়ে। তাই নগদ অর্থের এসব উৎস বন্ধ করতে চায় না বিমান। ওদিকে আবার নগদ অর্থ বিনিয়োগ করে নানা ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করে বিমানের হাতে তুলে দিতে চায় না সিভিল এভিয়েশন অথরিটি। আর বিমানও সরাসরি কার্গো কমপ্লেক্সে অবকাঠামো নির্মাণ করতে আগ্রহী নয়। স্ক্যানারসহ অন্যান্য বিষয়েও দুই সংস্থার মধ্যে দূরত্ব রয়েছে। এই সুযোগে কার্গো কমপ্লেক্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

দুই রাষ্ট্রীয় সংস্থার রেষারেষিতে শেষ পর্যন্ত যা হয়েছে তা হচ্ছে, যুক্তরাজ্য কার্গো বন্ধ করে দিয়েছে। আর যুক্তরাজ্যের পথ অনুসরণ করতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। অথচ যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপে সরাসরি কার্গো রপ্তানির এয়ার কার্গো সিকিউরিটি-৩ (এসিসি) সনদ রয়েছে বাংলাদেশের। গত জানুয়ারিতে নবায়ন করার সময় বাংলাদেশকে কার্গোর পরিস্থিতি উন্নত করার জন্য তিন মাসের সময় দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সঠিকভাবে কার্গো কমপ্লেক্স পরিচালনা না হওয়াকে কারণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে যুক্তরাজ্য। তারা শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকে উদ্বেগজনক বলেছিল। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকাস্থ ভারপ্রাপ্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার মার্ক ক্লেটন যুক্তরাজ্যের এভিয়েশন সিকিউরিটি টিম নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (ইউরোপ) রুহুল আলম সিদ্দকীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় তারা শাহজালালের নিরাপত্তা ঘাটতির জন্য চারটি কারণ চিহ্নিত করেছিলেন। এগুলো হচ্ছে লন্ডনগামী কার্গোগুলো বিমানবন্দরে অরক্ষিত পড়ে থাকে। কার্গো কমপ্লেক্সে এগুলো খোলা আকাশের নিচে থাকে। এই কার্গো কমপ্লেক্সের এক্স-রে ও বিস্ফোরক চিহ্নিত যন্ত্র যথাযথাভাবে কাজ করে না। কার্গো কমপ্লেক্সের সুপারভিশন বা তদারকিতেও গলদ রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের এই এভিয়েশন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ দলটি শাহজালালের কার্গো কমপ্লেক্স পরিদর্শনের সময় দেখতে পায়, একজন সুপারভাইজার যথাযথভাবে কাজ করছেন না। অথচ মাত্র তিন দিন আগে ওই সুপারভাইজার প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজে যোগ দিয়েছেন। এ ঘটনার পর যুক্তরাজ্যের এভিয়েশন নিরাপত্তা দল ওই সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে। এর পরদিন ওই সুপারভাইজার যথাযথভাবে কাজ করছে কি না তা দেখতে আবারও শাহজালালে যায় নিরাপত্তা দল। গিয়ে তারা দেখতে পায়, সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজার যথাযথভাবে কাজ করছেন। এ ঘটনা উল্লেখ করে যুক্তরাজ্যের ওই নিরাপত্তা দল সরকারকে জানিয়েছে, কর্মচারীদের প্রণোদনার ঘাটতি রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন অথরিটির সঙ্গে বৈঠক করে কার্গোর নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়ে সংশোধনমূলক কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিল। এই কর্মপরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হয়নি। ২৯ ফেব্রুয়ারির বৈঠকে যুক্তরাজ্য দুটি সুপারিশ করে। তারা ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) সদস্য হিসেবে সংস্থাটি থেকে বাংলাদেশকে এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা বৃদ্ধির বিষয়ে সহায়তা চাওয়ার পরামর্শ দেয়। এ ছাড়া তারা পলিসি, ম্যানেজমেন্ট ও অপারেশনের জন্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করারও পরামর্শ দিয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন গত মঙ্গলবার রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আর আপত্তি নেই। আশা করি কার্গো নিয়েও জটিলতা থাকবে না। সরকার এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছে।

মন্তব্য