হাওর-কন্যারা এখন ‘ডাক্তার বেটি’-333488 | শেষের পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


প্রসূতিসেবা

হাওর-কন্যারা এখন ‘ডাক্তার বেটি’

তৌফিক মারুফ, আজমিরীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) থেকে ফিরে   

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



হাওর-কন্যারা এখন ‘ডাক্তার বেটি’

হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে প্রসূতির সেবায় এক ‘হাওর-কন্যা’ সোমা রানী। ছবি : কালের কণ্ঠ

কেউ বলে ‘ডাক্তারনী’, কেউ বা ‘ডাক্তার বেটি’, আবার কেউ বা ডাকে ‘মা-মণি’। সূর্য ওঠা ভোর কিংবা ভরদুপুর অথবা গভীর রাত—প্রয়োজনের মুহূর্তে গিয়ে দাঁড়ান প্রসূতি মায়েদের পাশে। কখনো মেঠো পথ পেরিয়ে আবার কখনো ঢেউ খেলানো অথৈ জল পাড়ি দিয়ে সেবার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে চলেছেন হাওরবাসী একদল সাহসী নারী।

হাওরের কাদা-জলে বেড়ে ওঠা এসব ‘হাওর-কন্যা’ হবিগঞ্জের দুর্গম আজমিরীগঞ্জে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন প্রসূতি আর নবজাতকের জীবন বাঁচাতে। সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী নন তাঁরা। তবে তাঁদের আছে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা আর আনুষঙ্গিক আধুনিক যন্ত্রপাতি। সেবা দেওয়ার বিনিময়ে তাঁরা নিয়ে থাকেন ৫-১০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। তবে কেউ কেউ সন্তান প্রসবের পর শাড়ি-কাপড় কিংবা নগদ টাকা বকশিশ দিয়ে থাকে। আর উপার্জিত সেই অর্থ তাঁরা জোগান দেন নিজের সংসারে। ব্যয় করেন সন্তানের লেখাপড়ায়। এভাবে বিপদের বন্ধু হয়ে এই সেবা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা পাল্টে ফেলেছেন নিজেদের জীবনমানও। হয়ে উঠেছেন স্বাবলম্বী। পরিবার ও সমাজে বেড়েছে মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা।

এমনই এক হাওর-কন্যা আজমিরীগঞ্জের সোমা রানী সরকার। আগে ছিলেন গৃহিণী। এখন পাঁচ বছরের মাথায় নিজ ঘর ছাড়িয়ে তিনিই হয়ে উঠেছেন গোটা এলাকার বিপদাপন্ন মানুষের আপনজন। প্রসূতি নারীদের বিপদের বড় বন্ধু। সবাই তাঁকে চেনে-জানে।

সোমা রানী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসএসসি পাসের পরই বিয়ে হয়ে যায় আমার। বাবার বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ি একই হাওর অঞ্চলে। বিচ্ছিন্ন এই জনপদে নারীদের তেমন কোনো আয়ের পথ নেই। কী করব না করব ভাবছিলাম। ২০১১ সালে এক সূত্রে খবর পেলাম হবিগঞ্জ সদরে ছয় মাসের একটা ট্রেনিং দেওয়া হবে ডেলিভারি বিষয়ে। যোগাযোগ করে অংশ নেই ওই ট্রেনিংয়ে। ইউএসএআইডি ও সেফ দ্য চিলড্রেনের মা-মণি প্রকল্পের সহায়তায় স্থানীয় এফআইভিডিবি ও গাইনি চিকিৎসকদের সংগঠন ওজিএসবি এর আয়োজন করে। প্রশিক্ষণ শেষে পেয়ে যাই প্রাইভেট কমিউনিটি স্কিল বার্থ অ্যাটেনডেন্ট বা পিসিএসবিএ সনদ ও পরিচিতি। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসবের জন্য উপকরণও দেওয়া হয়।’

আজমিরীগঞ্জের এই এলাকায় মা-মণির হাসপাতাল বলে পরিচিতি পাওয়া সোমা রানীর চেম্বারে একাধারে চলে প্রসূতি নারীদের নিয়মিত এএনসি-পিএনসি চেকআপসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্বাভাবিক প্রসব। যেখানে দেখা যায় আধুনিক ডেলিভারি টেবিল, রোগীর বেড, প্রেসার মাপার মেশিন, রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার টেস্টটিউব ও পেপার কিটস, ওজন মাপার যন্ত্র, ডায়াবেটিস মাপার উপকরণ, নবজাতকের শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়ক হ্যাম্বু ব্যাগ, পেঙ্গুইন সাকার, কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ক্যাঙ্গারু ব্যাগসহ আরো বেশ কিছু যন্ত্রপাতি ও উপকরণ। রয়েছে জরুরি কিছু ওষুধও।

সোমা জানান, তিনি এ পর্যন্ত ১০০ প্রসূতির নরমাল ডেলিভারি করেছেন। এর মধ্যে কেবল একজনকে জটিলতার কারণে অন্যত্র রেফার করতে হয়েছে। বাকি সব মা ও শিশু সুস্থ আছে। এসব সেবার বিনিময়ে তিনি মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় করেন। এই আয়ের একটা অংশ দিয়ে সংসারের খরচে স্বামীকে সহায়তা করেন। বাকি কিছুটা সঞ্চয় করেন।

ওই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা প্রসূতি শিবু রানী বলেন, ‘আমার প্রথম সন্তান এই মা-মণি হাসপাতালেই সোমা ডাক্তারনীর হাতে জন্ম নিয়েছে। এবার দ্বিতীয় সন্তান গর্ভে নিয়ে আমি এখানেই আসি। কারণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আর দুটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র আমাদের বাড়ি থেকে দূরে। সেখানে যেতে অনেক কষ্ট হয়, সময়ও লাগে খুব বেশি। এলাকার বেশির ভাগ প্রসূতি মায়েরাই এখন এখানে আসে।’

বানিয়াচংয়ের আরেক পিসিএসবিএ মাসহুদা খাতুন নিজেকে এলাকাবাসীর খুবই আপনজন হিসেবে গর্ব করে বলেন, ‘আমি এলাকার সব প্রসূতির খোঁজখবর রাখি। তাদের সব বাড়িতে আমার মোবাইল নম্বর আছে। যখনই দরকার হয় আমাকে তারা ডাকে। মাসে সব মিলিয়ে পাঁচ হাজার থেকে শুরু করে ১০-১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। এই অর্থ দিয়ে আমি স্বাবলম্বী হয়েছি। টিনের বসতঘর এখন বিল্ডিং করেছি। পরিবারে ও সমাজে বেড়েছে মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা।’

হবিগঞ্জের এফআইভিডিবির সমন্বয়কারী (মা-মণি এইচএসএস) নাজমা বেগম বলেন, ‘জেলার আট উপজেলার মধ্যে চারটিতে মা-মণি প্রকল্পের সহায়তায় মোট ৬৯ জন কমপক্ষে এসএসসি পাস নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে পিসিএসবিএ হিসেবে তৈরি করা হয়। এর মধ্যে ৫৪ জন এখন নিজ নিজ কর্ম এলাকায় কাজ করেন। বাকিরা অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন। প্রথম প্রশিক্ষণ পাওয়া ১৪ জনকে তাঁদের নিজ বাড়ির ভেতরে অবকাঠামো তৈরি করে নরমাল ডেলিভারির জন্য উপকরণ দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা প্রসূতিদের জন্য আন্তর্জাতিক গাইডলাইন বা পার্টোগ্রাফ মেনে নিরাপদ প্রসব ও নবজাতকের নিরাপদ জন্ম নিশ্চিত করেন। অন্যদিকে এসব নারী নিজে আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছেন।’

নাজমা বেগমের দেওয়া তথ্য অনুসারে, মা-মণির পিসিএসবিএ কার্যক্রম শুরুর আগে ওই চার উপজেলার মধ্যে আজমিরীগঞ্জে দক্ষ প্রসবকর্মীর হাতে প্রসবের হার ছিল মাত্র ১০ শতাংশ। এখন এই হার উঠে এসেছে ৭২.৮ শতাংশে। নবীগঞ্জে আগে ছিল ২১.৯ শতাংশ, এখন যা ৪০.৬ শতাংশ, চুনারুঘাটে আগে ছিল ১৪.২ শতাংশ, এখন ২৬.৮ শতাংশ। বানিয়াচংয়ে আগে ছিল ১০.২ শতাংশ, যা এখন বেড়ে হয়েছে ৩২ শতাংশ।

মা-মণি হেলথ সিস্টেমস স্ট্রেংদেনিং প্রোগ্রামের চিফ অব পার্টি ও সেভ দ্য চিলড্রেনের পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. ইশতিয়াক মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, পিসিএসবিএরা কেবল হবিগঞ্জে নয় কিংবা শুধু সংস্থার আওতায়ই নন, সারা দেশে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে দুর্গম অঞ্চলে এমন অনেক পিসিএসবিএ কাজ করছেন নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য। আর এসব পিসিএসবিএ সরকারের সিএসবিএ কারিকুলাম অনুসারে সরকারের কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এমনকি তাঁদের সনদও দেওয়া হয়েছে সরকারের নার্সিং কাউন্সিল থেকে। তাই সরকারি সিএসবিএ আর প্রাইভেট সিএসবিএর মধ্যে যোগ্যতা-দক্ষতার দিক থেকে পার্থক্য করার সুযোগ নেই। সবাই সরকারের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।

মন্তব্য