kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


টার্গেটে মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টরা

এস এম আজাদ   

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



টার্গেটে মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টরা

ছিনতাইকারী চক্রের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছেন বিকাশসহ মোবাইল ফোন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের এজেন্টরা (পরিবেশক)। টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে বা জমা দিতে গিয়ে তাঁরা ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছেন।

গত এক বছরে রাজধানীসহ সারা দেশে এমন অর্ধশত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। সশস্ত্র ছিনতাইকারীদের এমন টার্গেট হওয়ায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, বেশির ভাগ ঘটনায় ছিনতাইকৃত টাকা উদ্ধার এবং আসামি শনাক্ত করতে পারছে না পুলিশ। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঘটনাগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। বেশি অঙ্কের টাকা বহনের ক্ষেত্রে পুলিশের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে সচেতনতার অভাবে অনেক ব্যবসায়ী এ সুবিধা নিচ্ছেন না।

সর্বশেষ গত শনিবার তালতলা এলাকায় মাইক্রোবাস থামিয়ে বিকাশের এজেন্ট সাইদুর রহমানের পায়ে গুলি করে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে গেছে ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। শেরে বাংলানগর থানার ওসি গোপাল গণেশ বিশ্বাস গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা জড়িতদের ধরার চেষ্টা করছি। সন্দেহভাজন একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ’

রাজধানীতে এ ধরনের ছিনতাইয়ের বড় ঘটনা ঘটে ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর। মিরপুরের রূপনগর থানার প্রশিকা ভবন মোড়ে বিকাশ এজেন্ট ও এক মোবাইল কম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি জাহিদকে গুলি করে ৯০ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনায় কারা জড়িত ছিল তা আজও অজানাই রয়ে গেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘ডিএমপির পক্ষ থেকে একাধিকবার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন করতে গেলে যেন পুলিশের সহযোগিতা নেওয়া হয়। কিন্তু অনেকেই এ সহযোগিতা নেন না। ’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনারই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। ছিনতাইকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতেও সময় লাগে।

আবার অনেক সময় ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার হলেও টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। ’

জানতে চাইলে ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘কত টাকা বহন করলে আমাদের এসকর্ট সুবিধা পাওয়া যাবে তা নির্দিষ্ট করা নেই। একটু বেশি অঙ্কের টাকা বহন করার ক্ষেত্রে সবাই এ সুবিধা চাইতে পারেন। ’

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মিরপুর ১৪ নম্বর এলাকায় এআইডি নামের একটি বিকাশ পরিবেশক প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মীকে গুলি করে ১৩ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। গুলিবিদ্ধরা হলেন আল আমিন ও মোশারফ হোসেন। দিনে-দুপুরে এ ছিনতাইয়ের ঘটনারও রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি  পুলিশ। কাফরুল থানার ওসি শিকদার শামিম হোসেন বলেন, তাঁরা এখনো তদন্ত করছেন।

এর আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি মিরপুরের শাহ আলীর এফ ব্লক ৯ নম্বর রোডে বিকাশ এজেন্টের পাঁচ লাখ টাকা ছিনতাই করা হয়। এ ঘটনার রহস্য অজানা বলে জানিয়েছেন শাহ আলী থানার ওসি আনোয়ার হোসেন।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি টঙ্গী স্কুইব রোডে বেক্সিমকো ওষুধ কারখানার পেছনে অস্ত্রের মুখে সোহেল রানা নামের এক বিকাশ এজেন্টের ৩২ লাখ টাকা ছিনতাই হয়। টঙ্গী থানার ওসি ফিরোজ তালুকদার বলেন, ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ছিনতাইকারীদের ফেলে যাওয়া একটি মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে বেশ কিছু তথ্য পেয়েছে পুলিশ। টঙ্গীতে বিকাশের টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় নেতৃত্ব দেয় সাটুরিয়ার রিপন ও দেলোয়ারের গ্রুপ। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এদিকে গত ২ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের শ্রীপুরের মুলাইদ এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বাংলালিংকের এক কর্মীকে গুলি করে এক লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। গত ৪ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর বাড় বাজারের ফলপট্টি এলাকায় শাহনেয়াজ নামের এক বিকাশ এজেন্টের সোয়া লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। গত ২৬ জানুয়ারি রাজধানীর হাজারীবাগে খলিল সরদার মার্কেটের সামনে সোহাগ হোসেন অনিক নামের এক বিকাশ এজেন্টকে গুলি করে দুই লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।

গত বছরের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের গিলন্ড বাজারে বিকাশ এজেন্ট মঈন বিশ্বাস ও রিকশাচালক মজনু মিয়াকে গুলি করে তিন লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। গত বছরের ৫ জুলাই রাজধানীর পূর্ব বাড্ডায় ফয়সাল নামের এক বিকাশ এজেন্টকর্মীর পায়ে গুলি করে তিন লাখ টাকা ছিনতাই করে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। গত বছরের ২৩ জুন তেজগাঁওয়ে শিল্পাঞ্চল এলাকায় সাইফুল ইসলাম কাজল নামের এক বিকাশ এজেন্টকে গুলি করে তিন লাখ টাকা ছিনতাই করে দুর্বৃত্তরা। গত বছরের ২০ জুন নোয়াখালীর ধর্মপুর ইউনিয়নের হাজীরহাট বাজারের পার্শ্ববর্তী নোবিপ্রবি-সোনাপুর সড়কে বিকাশের দুই এজেন্টকে গুলি করে ১৪ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। গত বছরের ১৩ মার্চ সাভারের গেণ্ডায় বিকাশকর্মী রাজিবের চোখে-মুখে মরিচের গুঁড়া ছুড়ে ব্যাগভর্তি পাঁচ লাখ ৩৬ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চারজনকে গ্রেপ্তার করলেও পুলিশ টাকা উদ্ধার করতে পারেনি। ২৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নেতার মাজারের সামনে দুই বিকাশকর্মীকে গুলি করে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। গত বছরেরই ৪ এপ্রিল রাজধানীর কদমতলী ও নিউ মার্কেটে গুলি করে ফালান মিয়া ও সানু নামের দুই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় সন্ত্রাসীরা। ১৩ এপ্রিল সবুজবাগ ও তুরাগে দুটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় দুই বিকাশকর্মীর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।

বিকাশের মুখপাত্র জাহেদুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একসময় দুষ্কৃতকারীরা ব্যাংকের গ্রাহকদের টার্গেট করে ছিনতাই করত। এখন তারা মোবাইল ব্যাংকিং সংশ্লিষ্ট পরিবেশকদের টার্গেট  করেছে। সম্প্রতি যেসব ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বিকাশ তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা আমাদের এজেন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটরদের টাকা পরিবহনের সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছি। টাকা পরিবহনের সময় প্রয়োজনে তাঁদের পুলিশি সহায়তা নিতে বলেছি। ’ তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ নগদ এক লাখ টাকার বেশি পরিবহনের ক্ষেত্রে কেউ চাইলে এসকর্ট সহায়তা দিয়ে থাকে। এ ছাড়া আমাদের ডিস্ট্রিবিউটররা ব্যাংকে টাকা উত্তোলন বা জমাদানের সময় টাকা পরিবহনের ক্ষেত্রে সশস্ত্র আনসারের সহায়তা নিচ্ছেন। ডিস্ট্রিবিউটর ও এজেন্টদের এ ধরনের ঘটনা রোধে নিরাপত্তাসংক্রান্ত নিরাপত্তা নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে। তবে আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা পাচ্ছি। ’


মন্তব্য