মীর কাসেম আলীর আপিলের রায় আগামীকাল-333050 | শেষের পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০১৬। ১৬ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৮ জিলহজ ১৪৩৭


মীর কাসেম আলীর আপিলের রায় আগামীকাল

ছড়িয়ে পড়ছে কথার উত্তাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মীর কাসেম আলীর আপিলের রায় আগামীকাল

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর আপিলের রায় আগামীকাল মঙ্গলবার। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এ রায় ঘোষণা করবেন। একাত্তরের আলবদর নেতা মীর কাসেম আলীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে নাকি অন্য কোনো সাজা হবে তা নির্ধারিত হবে এ রায়ের মধ্য দিয়ে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ কাল যে রায় দেবেন সেটিই চূড়ান্ত রায়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৭২ বছরের  কারাদণ্ড দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে একই বছরের ৩০ নভেম্বর আপিল করেন মীর কাসেম আলী। আপিলের শুনানি শুরু হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষ হলে আদালত রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন।

এদিকে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর আপিলের রায়ের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে কথার উত্তাপ। আপিল বিভাগে এ মামলার শুনানিকালে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রধান বিচারপতির করা মন্তব্যের জের ধরে এ উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এরই মধ্যে দুজন মন্ত্রী প্রধান বিচারপতিকে এ মামলার বিচার থেকে সরে দাঁড়াতে বলেছেন। মন্ত্রীদের এ বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং আপিল বিভাগে মীর কাসেম আলীর প্রধান আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগে শুনানিকালে অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনারা প্রসিকিউশন টিম এ মামলা একেবারে দায়সারাভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা দুঃখজনক।  ট্রাইব্যুনালের অন্য কোনো মামলায় এত দুর্বল তথ্য ছিল না।’ প্রধান বিচারপতি আরো বলেন, ‘সময় এসেছে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থাকে একই কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর।’ তিনি বলেন, এটা এমন একটি মামলা, যেখানে পর্যাপ্ত পারিপার্শ্বিক এভিডেন্সের অভাব রয়েছে।

প্রধান বিচারপতির এ বক্তব্যের জের ধরে গত শনিবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল লিগ্যাল স্টাডিজ (বিলিয়া) মিলনায়তনে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের সমালোচনা করেন। তাঁরা প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে মীর কাসেম আলীর মামলায় পুনরায় আপিল বিভাগে শুনানির দাবি জানান। এ প্রেক্ষাপটে গতকাল রবিবার অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি আলাদা সংবাদ সম্মেলনে বক্ত্য দেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এ বক্তব্য বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে : মীর কাসেম আলীর মামলা নিয়ে দুই মন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি কোনো ব্যক্তি নন, একটি প্রতিষ্ঠান। প্রধান বিচারপতিকে বিতর্কিত করা মানে বিচারব্যবস্থাকে বিতর্কিত করা। তাই প্রধান বিচারপতি ও বিচারালয় নিয়ে বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। মীর কাসেম আলীর মামলার রায় কী হয়, তা দেখতে সবাই ৮ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।’ মীর কাসেমের আপিল শুনানি পুনরায় শুরু করতে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের দাবির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এ ধরনের উক্তি অসাংবিধানিক। এ বক্তব্য ন্যায়বিচার ব্যাহত করবে ও যুদ্ধাপরাধের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।’

খন্দকার মাহবুবের দাবি, দুই মন্ত্রী সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন : দুই মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘মীর কাসেম আলীর রায় ঘোষণার আগেই এ রায় নিয়ে এবং প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে সরকারের দুই মন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন তাতে দুজন মন্ত্রী সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। তাই এ বিষয়ে সরকার তাঁদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেয় সেটাই দেখার বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘বিচারাধীন মামলার ব্যাপারে সরকারের উচ্চপদস্থ দুজন মন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা বিচার বিভাগের জন্য হুমকি। আশা করি বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষায় সর্বোচ্চ আদালত দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রহণ করবেন। আর যদি এই দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তাহলে দেশবাসী মনে করবে, ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল সুপ্রিম কোর্টও বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের রক্তচক্ষু দেখে ভীত সন্ত্রস্ত।’ তিনি বলেন, সরকার বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণের জন্য পাঁয়তারা করছে। মীর কাসেম আলীর মামলা নিয়ে দুই মন্ত্রীর বক্তব্য তা আরো স্পষ্ট করে দিয়েছে।

খন্দকার মাহবুব বলেন, সংবিধান অনুযায়ী বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং প্রধান বিচারপতি বারবার এটা বলে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় তাঁর সম্পর্কে এরকম ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণভাবে অবজ্ঞা ও অবমাননা করার শামিল।

সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের পরিচালনায় সমিতি ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সমিতির সহসম্পাদক মাজেদুর রহমান পাটোয়ারী, সদস্য অ্যাডভোকেট মির্জা আল মাহমুদ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে ১০টি প্রমাণিত হয়। এসবের মধ্যে দুটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে আলাদাভাবে মৃত্যুদণ্ড এবং আরো আটটি নির্যাতনের ঘটনায় বিভিন্ন মেয়াদে মোট ৭২ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া চারটি নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ওই সব অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ২০১২ সালের ১৭ জুন মীর কাসেম আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন থেকেই তিনি কারাগারে।

মন্তব্য