kalerkantho

খেলা

একটা টিকিট চাই

ক্রীড়া প্রতিবেদক   

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



একটা টিকিট চাই

‘সোনার হরিণ’ একটি টিকিটের জন্য মিরপুর স্টেডিয়ামের গেটে দীর্ঘ লাইন। ছবি : মীর ফরিদ

এ যুগে চট করে বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য নামি কমিউনিটি সেন্টার পাওয়া যায় না। তাই ‘ডেট’ ঠিক করতে হয় অন্তত এক বছর আগে।

শোনা যায় মাঝের সময়টায় ভেন্যু এবং ডেট ঠিক থাকলেও পাত্র-পাত্রী নাকি কখনো-সখনো বদলে যায়! এশিয়া কাপের এবারের আসরের ফাইনালেও কি তেমনটা হয়নি? বাংলাদেশ দলের পক্ষ থেকে প্রথম ম্যাচের পর ফাইনালে ওঠার আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল ঠিকই, যদিও ভেতরে ভেতরে ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি উপলক্ষে কত আগে ধর্মশালায় যাওয়া যায়, সে প্রস্তুতি চলছিল জোরেশোরেই। যা-ই হোক, ফাইনালের পাত্র-পাত্রী অদল-বদল হোক না হোক, ম্যাচটা নিয়ে তুমুল হট্টগোল শুরু হয়েছে গতকাল থেকেই। অনুমিতভাবে সেটি টিকিট নিয়েই।

দেশের ক্রিকেট মোহনা অনেক দিন ধরেই মিরপুর ১০ নম্বর সেকশন। সেখানেই যে ‘হোম অব ক্রিকেট’ এবং টিকিটপ্রাপ্তির বুথ। বাংলাদেশের খেলা হলেই জনতার সর্পিল সারি নিয়মিতই পথচলতি মানুষের নজর কাড়ে। আসন মাত্র ২৪ হাজার, অথচ টিকিটপ্রার্থী অন্যূন কয়েক লাখ। সুযোগ থাকলে সেটি অনায়াসে কোটিও ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা। তাই টুকটাক লাঠিচার্জ কিংবা ধাওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছে।

অগত্যা পোড় খাওয়া অনেক টিকিটপ্রত্যাশীই এখন টিভিতে খেলা দেখাকেই নিয়তি ধরে নিয়েছেন বলে রক্ষা। নইলে গতকাল মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনে রক্তারক্তি অবধারিত ছিল। উত্তাল রাজনৈতিক দিন বিগত হওয়ায় অনেক দিন পুলিশের জলকামান, আর্মার্ড কার রাজপথে দেখা যায়নি। তবে এশিয়া কাপ ফাইনাল উপলক্ষে সেসবের সরব উপস্থিতি কাল দেখা গেছে মিরপুরে। ব্যাটন, কাঁদানে গ্যাসও ব্যবহৃত হয়েছে। টিকিটপ্রার্থীরা তো আর রাজনৈতিক কর্মী নন, তাই সামান্য নিপীড়নেই ছত্রখান জনতা।

অবশ্য ঘটনা ওখানেই শেষ ভাবার কোনো কারণ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের দিন থেকেই টিকিটের জন্য হাহাকার। লতায়-পাতায় পরিচিত যিনিই ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট, তার কাছে টিকিটের জন্য ধরনা দেওয়ার প্রতিযোগিতাই চলেছে। পাল্টা হিসেবে ক্রিকেটসংশ্লিষ্টরা ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন, ‘টিকিট চাহিয়া কেহ লজ্জা দিবেন না। আমি এমনিতেই যারপরনাই লজ্জিত!’

মাথা গুনলে আজকের ফাইনাল চাক্ষুষ করতে এক ঢাকাতেই রয়েছেন কোটিরও বেশি জনতা। ২৪ হাজার টিকিট তো অতি সামান্য। তবু প্রশ্ন ওঠে এ টিকিটগুলোই-বা কোথায় যায়? এ প্রশ্নের উত্তর এমনিতেই দিতে চান না বোর্ড কর্মকর্তারা। এবার তো আরো নীরব তাঁরা। আগে তবু ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় নিজেদের দুঃখের কথা বলতেন, ফাইনালের আগে সে আলাপের জন্যও পাওয়া যাচ্ছে না তাঁদের! তাতে ধরে নেওয়া যায় এত দিন যে হারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় আর সংস্থাকে টিকিট দিতে হতো বিসিবিকে, এবার তা আকাশ ছুঁয়েছে। যাঁদের কারণে আজ ফাইনালে বাংলাদেশ, সেই দলটির ক্রিকেটাররাও প্রত্যাশিত সংখ্যার টিকিট না পেয়ে বিষণ্ন হাসছেন। ক্ষমতাবলেই বিসিবির পরিচালকদের পকেটে সবচেয়ে বেশি টিকিট যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেই তাঁদের একজন কাল বিমর্ষ, ‘কি বলব ভাই, সব নিয়ে নিয়েছে!’ কে নিয়ে নিয়েছে, সেটি অবশ্য নাম গোপন রাখার শর্তেও বলতে রাজি হননি তিনি।

এ অব্যস্থাপনার জন্য অবশ্য বিসিবির কর্মকর্তারা নিজেদেরই দায়ী করেন অনেকাংশে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রনালয় কিংবা সংস্থার আনুকূল্য পেতে একটা সময় দেদার সৌজন্য টিকিট বিলি করা হয়েছে বিসিবির পক্ষ থেকে। কালের বিবর্তনে এখন আর বিসিবির নিজের উদ্যোগে টিকিট পাঠাতে হয় না, সুবিধাপ্রাপ্ত ভিআইপিরা দূত মারফত পাঠিয়ে দেন ডিমান্ড নোট। সেসব অনুরোধ উপেক্ষা করার সাহস নেই বিসিবির। কেন নেই, সে প্রশ্নের উত্তরও অজানা!

তাই অনেক দিন ধরেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হলেই ঘরের মাঠের গ্যালারি ‘ভিআইপি’দের দখলে। সাধারণের জন্য খুব সামান্যই বরাদ্দ থাকে। এশিয়া কাপ ফাইনাল আরো সংকুচিত করে দিয়েছে সাধারণ মানুষের মাঠে প্রবেশাধিকার। ভিআইপিদের মতি-গতি কিংবা বিসিবির কর্তাব্যক্তিদের হাবে-ভাবে এ পরিস্থিতি বদলানোর কোনো ইঙ্গিত নেই। উত্তরোত্তর এটা বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে।

মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের উত্তপ্ত রাজপথ পেরিয়ে ২ নম্বরে অবস্থিত শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে ঢুকলেই অবশ্য অন্য চিত্র। এক লহমায় মনে হবে এশিয়া কাপ পরবর্তী হাজার বছর বাংলাদেশেই হোক না কেন! বাজি ধরে বলা যায়, এশিয়া কাপ অন্য কোনো দেশে এতটা সমাদৃত হবে না। দুপুরে বাংলাদেশ দল ইনডোরে আর ভারত বিসিবি একাডেমি মাঠে প্র্যাকটিসে ব্যস্ত। শত ক্যামেরা, হাজার সাংবাদিক আর অযুত কর্মীবাহিনীর ভিড় দেখে মনে হবে ৬ মার্চ বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঘটনাস্থল নিশ্চিতভাবেই হতে চলেছে শেরেবাংলা স্টেডিয়াম। অসম্ভবও নয়। বাংলাদেশ-ভারতের জনসংখ্যার যোগফলে তো আজকের ইভেন্টের দর্শক প্রায় দেড়শ’ কোটি। টিআরপি হিসেব করলে এমনিতেই দিনের সেরা আকর্ষণ। আর আবেগের রিখটার স্কেল বলছে দিনটা উত্তাল ৬ মার্চের মর্যাদা পেয়েও যেতে পারে।

গতকাল বিকেল পর্যন্ত যা যা দেখা গেছে তা আদতে আজকের ‘দ্য ফাইনাল’ থ্রিলারের টাইটেল মাত্র। আর মাশরাফিদের উৎসব যদি সিনেমার ‘দ্য এন্ড’ হয়, তাহলে?

কল্পনার ডানা মেলেও আপাতত সেই সিকোয়েন্সটা ধরা যাচ্ছে না!


মন্তব্য