kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কৃষককে ধোঁকা দিয়ে নিষিদ্ধ পপি চাষ!

স্বপন চৌধুরী ও ছাইদুল হক সাথী রংপুর   

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কৃষককে ধোঁকা দিয়ে নিষিদ্ধ পপি চাষ!

রংপুর ও দিনাজপুরের মধ্যবর্তী প্রত্যন্ত এলাকায় অন্য ফসলের সঙ্গে চাষ করা হচ্ছে পপি। ছবি : কালের কণ্ঠ

রংপুরের বদরগঞ্জ সীমান্তের প্রত্যন্ত এলাকা কুতুবপুর ইউনিয়নের সোনারপাড়া গ্রাম। সেখানে এক কৃষকের ৪০ শতক জমিতে আলু, ভুট্টা, শাক-সবজিসহ নানা ধরনের ফসলের পাশাপাশি চাষ করা হয়েছে নিষিদ্ধ পপি।

যা থেকে কয়েক কোটি টাকার সর্বনাশা মাদক হেরোইন উৎপাদন সম্ভব। অথচ ওই জমির কৃষক দাবি করছেন, এগুলো যে নিষিদ্ধ পপি তা তিনি জানেন না, জমির মালিক অন্য ফসলের কথা বলে তাঁকে দিয়ে এর চাষ করিয়েছেন। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে পপি চাষের এ চিত্র পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রংপুরের বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ, পার্বতীপুর ও ঘোড়াঘাটের প্রত্যন্ত এলাকাগুলো মাদক চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। এ ছাড়া এসব এলাকার অনেক স্থানেই নিষিদ্ধ পপির চাষ হচ্ছে নির্বিঘ্নে। প্রায় দেড় বছর আগে নবাবগঞ্জ উপজেলার কুশদহ ও জয়পুর এলাকায় নিষিদ্ধ পপিক্ষেতের সন্ধান পেয়েছিল প্রশাসন। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ক্ষেতেই তা নষ্ট করা হয়। এর পরও মাদক চোরাচালানিরা নেপথ্যে থেকে এসব প্রত্যন্ত এলাকায় সহজ-সরল কৃষককে ধোঁকা দিয়ে ভিন্ন ফসলের কথা বলে পপি চাষ করাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার সকালে সোনারপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, ভুট্টাক্ষেতের পাশেই নিষিদ্ধ এ পপি চাষ করা হয়েছে। গাছে ফুল থেকে ফল হয়েছে। আর কিছুদিন পরই তা কেটে নেওয়া হবে। সে অপেক্ষায় দিন গুনছেন চাষি মোকছেদুল ইসলাম (৩০)। তিনি জানান, ওই এলাকার শফিউল ইসলাম ওরফে খোকা মেম্বারের জমি বর্গা নিয়ে আলু ও ভুট্টার পাশাপাশি অন্তত ৪০ শতক জমিতে অজানা এ ফসলের চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জমির মালিকই আমাকে বীজ এনে দিয়েছেন। খোকা মেম্বার বলেছেন, ফসল কী হয় হোক, চাষ কর, তোর ভালো লাভ হইবে। ’

তবে জমির মালিক খোকা মেম্বার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমিও সঠিক জানি না ওগুলো পপি কি না। এক ব্যক্তি পোস্তদানা হিসেবে ওই বীজ দিয়েছে। জমি পতিত থাকায় অন্য ফসলের পাশাপাশি পোস্তদানা চাষ করতে বর্গাচাষিকে পরামর্শ দিয়েছি। ’

গাছগুলোর দৈর্ঘ্য তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট। পাতা খাঁজকাটা। ফুলের রং সাদা। দেখতে সুন্দর। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন মৌসুমি ফুলের চাষ করা হয়েছে। তবে ওই এলাকার কৃষক আবুল কালাম আজাদ (৬০) বলেন, ‘বাহে হামরা জাইনবার চাইছি ইগলা (এসব) কিসের গাছ? জমির মালিক কইছে সোয়াবিনের গাছ। ফির (আবার) কায়ও কইছে বিদেশি মুলার গাছ। এর ফল থেকে উন্নত জাতের মুলার বীজ হইবে। ’

একই এলাকার কৃষক আব্দুল মোত্তালেব (৭৬) বলেন, ‘এটা নাকি পোস্তদানা। খাইতে সুস্বাদু হইবে। হামাক সেই কথায় কইছে জমির মালিক। ’ ওই এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরাও সঠিকভাবে বলতে পারেননি আসলে এটা কোন জাতের ফুল বা ফসল। তবে এটা যে ‘পপিগাছ’ তা নিশ্চিত করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা।

নিষিদ্ধ এ পপিগাছের নমুনা সংগ্রহের পর বৃহস্পতিবার বিকেলে যাওয়া হয় রংপুর সার্কিট হাউস সড়কে অবস্থিত জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে। সেখানকার পরিদর্শক আবদুল মান্নান গাছ, ফুল ও ফল দেখে শতভাগ নিশ্চিত করেন যে এটা ‘পপিগাছ’। তিনি জানান, ফল দেখে মনে হচ্ছে আর এক সপ্তাহের মধ্যেই তা পরিপক্ব হবে এবং কেটে নেওয়ার উপযোগী হবে। ফলের গায়ে ব্লেড দিয়ে চিকন করে কেটে দেওয়ার পর গাঢ় আঠালো পদার্থ বের হবে। ওই আঠালো পদার্থে বাতাস (অক্সিজেন) লাগার সঙ্গে সঙ্গে জমাট বাঁধে। জমাট বাঁধা আঠা সংগ্রহ করে তৈরি করা হয় মরণ নেশা হেরোইন। ৪০ শতক জমির পপি থেকে কয়েক কোটি টাকার হেরোইন উৎপাদন করা সম্ভব। রংপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক তৌহিদুল ইকবাল প্রাথমিকভাবে এটিকে পপিফুল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে এ ব্যাপারে উদ্ভিদ তত্ত্ব বিভাগ ভালো বলতে পারবে বলে জানান তিনি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেন জোর দিয়ে বলেন, এটি নিষিদ্ধ পপিগাছের ফুল ও ফল, যা থেকে তৈরি হয় মরণ নেশা হেরোইন।

রংপুরের বুড়িরহাটে আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আবু আলম মণ্ডল নমুনা দেখে বলেন, “এটি প্রাথমিকভাবে ‘পপি’ বলেই মনে হচ্ছে, যার চাষ একেবারেই নিষিদ্ধ। তবে এ অঞ্চলে পপি চাষ হলে তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। ”

এ প্রসঙ্গে বদরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী আবেদা গুলশান বলেন, ‘আমি এ এলাকায় নতুন এসেছি। এখানে পপি চাষ হচ্ছে—এমন খবর আমার জানা নেই। যদি পপি চাষ হয়ে থাকে, তাহলে তা উদ্বেগের। এ বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছি, সন্ধান পেলে অবশ্যই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। ’

বদরগঞ্জ থানার ওসি মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‘রংপুর-দিনাজপুর সীমান্তের প্রত্যন্ত এলাকায় গোপনে নিষিদ্ধ পপির চাষ হতো বলে আমাদের কাছে খবর ছিল। বছর দুয়েক ধরে তেমন কোনো তথ্য নেই। তবে এ ধরনের তথ্যপ্রমাণ পেলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’


মন্তব্য