kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চাইলেই কেনা যায় পুলিশ ও র‌্যাবের পোশাক, সরঞ্জাম

সরোয়ার আলম   

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



চাইলেই কেনা যায় পুলিশ ও র‌্যাবের পোশাক, সরঞ্জাম

শহীদ ওরফে কামরুল মাঝি সাত বছর ধরে পুলিশ সেজে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। সারাক্ষণ তাঁর হাতে থাকত পিস্তল ও ওয়াকিটকি।

দেখলে তাঁকে আসল পুলিশই মনে হতো। এমনই আরেকজন ইউসুফ কাজী। তিনিও প্রতারণা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়েছেন।

এই দুজনের মতো ঢাকাসহ সারা দেশে কয়েক শ ভুয়া পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্য রয়েছে। তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। অবশ্য কামরুল ও ইউসুফ শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর পলওয়েল মার্কেট ও রজনীগন্ধা সুপারমার্কেটে অবাধে বিক্রি হয় র‌্যাব-পুলিশের পোশাক; পাওয়া যায় হাতকড়াসহ সব ধরনের সরঞ্জাম। পোশাক ও সরঞ্জাম বিক্রির ব্যাপারে নিয়মনীতি মানা হচ্ছে না। এই সুযোগ ভালোভাবে কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা। তারা পুলিশ বা র‌্যাবের পোশাক পরে ছিনতাই, ডাকাতি, খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে। আর ভাবমূর্তির সংকটে পড়ছেন পুলিশ ও র‌্যাবের আসল সদস্যরা।

ওই মার্কেটে পুলিশ-র‌্যাবের কটি, হাতকড়া, লাইটিং ডিটেক্টর, ব্যাজ, বাঁশি, ক্যাপ, বেল্ট, জুতা, পিস্তল কাভারসহ সব সরঞ্জামই বাইরের লোকের কাছে বিক্রি করা হয়। অথচ পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনা দেওয়া আছে, পরিচয়পত্র ছাড়া কারো কাছে কোনো সরঞ্জাম বিক্রি করা যাবে না।

পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণির প্রতারক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে সাধারণ লোকজনের সঙ্গে প্রতারণা করছে। কিছু প্রতারককে এরই মধ্যে ধরা হয়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘পুলিশের পোশাক ও সরঞ্জাম বাইরে বিক্রি হচ্ছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। এ কাজে সহায়তা করছে দুর্নীতিবাজ কিছু পুলিশ সদস্য। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। পুলিশের পোশাক ও সরঞ্জাম বিক্রির জন্য নীতিমালা রয়েছে; কেউ অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চাকরিচ্যুত বা অবসরে যাওয়া কিছু পুলিশ সদস্য তাঁদের ব্যবহূত পোশাক জমা না দিয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের পোশাক ও সরঞ্জাম ব্যবহারে কড়াকড়ি না থাকায় অপরাধীরা অপরাধ ঘটানোর সুযোগ পাচ্ছে। একসময় তালিকাভুক্ত দোকান ছাড়া অন্য কোথাও পুলিশি সরঞ্জাম বেচাকেনা করা যেত না। যে কেউ ইচ্ছা করলেই দোকান থেকে পুলিশি সরঞ্জাম কিনতে পারত না। পুলিশ সদস্যদেরও যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে পোশাক ও সরঞ্জাম কিনতে হতো। এখন যেকোনো ব্যবসায়ী পুলিশি সরঞ্জাম কেনাবেচা করতে পারেন, যে কেউ কিনতে পারেন; অনুমতির প্রয়োজন হয় না।

সূত্র আরো জানায়, খোলাবাজারে র‌্যাব-পুলিশের মনোগ্রামসহ ছাপানো আইডি কার্ডও বিক্রি হচ্ছে। তাতে যে কেউ নিজের নাম লিখে, ছবি বসিয়ে হয়ে যাচ্ছে পুলিশ বা র‌্যাবের বড় কর্তা। সেনাবাহিনী বা আনসার বাহিনীর আইডি কার্ডও কিনতে পাওয়া যায়।

পুরানা পল্টনের পলওয়েল মার্কেট ও কচুক্ষেতের রজনীগন্ধা সুপারমার্কেটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক ও সরঞ্জাম বিক্রি হয়। পুলিশ সদস্যরা ওই সব মার্কেট থেকে পোশাক ও সরঞ্জাম কিনে থাকেন। পুলিশের প্রবিধানে (পিআরবি) পুলিশি সরঞ্জাম খোলাবাজারে বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা নেই; তবে পোশাক বিক্রি বেআইনি।

২০১২ সালে এক কার্যনির্বাহী আদেশে পুলিশের পোশাক ব্যবহার সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। এর পরও বিভিন্ন সিকিউরিটি কম্পানি, পাড়া-মহল্লার দারোয়ান ও নাইটগার্ডরা অহরহ র‌্যাব-পুলিশের মতো পোশাক ব্যবহার করছে। তারা পুলিশের মতো হাতকড়া, র্যাংক ব্যাজও ব্যবহার করছে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।

কয়েক দিন আগে পলওয়েল মার্কেটের বেশ কিছু দোকানে গিয়ে পুলিশের বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনতে চাইলে ব্যবসায়ীরা অনায়াসে বিক্রি করতে রাজি হন। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তাঁরা সতর্ক হন; বলেন, পুলিশের পরিচয়পত্র না দেখে বিক্রি করা যাবে না। ওই সময় ডিসেন্ট স্টোর, গাজীপুর পুলিশ স্টোর, বরিশাল মিলিটারি স্টোরসহ কয়েকটি দোকানে অবাধে এসব সরঞ্জাম বিক্রি করতে দেখা গেছে।

ওই মার্কেটের একটি স্টোরের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করে জানান, নির্দেশনা থাকার পরও পোশাক ও সরঞ্জাম বিক্রি করেন তাঁরা। সব দোকানেই বিক্রি হয়। তিনি জানান, রজনীগন্ধা সুপারমার্কেটেও এসবের বেচাকেনা চলে।

পলওয়েল মার্কেটের ভেন্ডার (অনুমতিপ্রাপ্ত পুলিশি সরঞ্জাম বিক্রেতা) রুহুল আমিন, আবু হেনা ও রাসেল জানান, বুটজুতা এক হাজার ৩০০ থেকে দুই হাজার টাকা, নেমপ্লেট ৮০ থেকে ১০০ টাকা, র্যাংক ব্যাজ ৩০ থেকে ৭০ টাকা, ক্যাপ ৯০ থেকে ৩৫০ টাকা, পিস্তল কাভার ৩০০ থেকে দেড় হাজার টাকা, বেল্ট ৪৫০ থেকে এক হাজার টাকা, চীনা হাতকড়া ৭৫০ টাকা, থাই হাতকড়া এক হাজার ২০০ টাকা, কোরিয়ান হাতকড়া এক হাজার ৫০০ টাকা ও তাইওয়ানি হাতকড়া দুই হাজার টাকা, দেশি বাঁশি ৫০ টাকা এবং বিদেশি বাঁশি ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। তাঁরা বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর ও পলওয়েল মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির নির্দেশনা অনুযায়ী পোশাক ও সরঞ্জাম পরিচয়পত্র দেখে বিক্রি করা হয়। তবে জুতার কালি, ব্রাশ প্রভৃতি ছোটখাটো জিনিস বিক্রির বিষয়ে তেমন নির্দেশনা নেই।

পুলিশ সদরের এক কর্মকর্তা বলেন, পলওয়েল মার্কেটে কিছু দোকান নির্দিষ্ট করা আছে। ওই সব দোকান থেকে পুলিশ সদস্যরা পোশাক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনতে পারেন। তবে খোলাবাজারে সহজলভ্য হওয়ায় এসবের অপব্যবহার হচ্ছে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর মতো সাপ্লাই কোরের মাধ্যমে পুলিশের সরঞ্জাম বেচাকেনার ব্যবস্থা করলে প্রতারকরা সুযোগ পেত না। যারা প্রতারকদের কাছে সরঞ্জাম বিক্রি করছে তাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

কয়েক দিন আগে ঢাকায় গ্রেপ্তার আব্দুল মালেক, মালেক চৌধুরী, জাহাঙ্গীর আলম, ইয়াসিন, বাদল ও আব্বাস আলী পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে পুলিশের পোশাক ব্যবহার করে প্রতারণার কথা স্বীকার করেন। তাঁরা জানান, পলওয়েল মার্কেট ও রজনীগন্ধা সুপারমার্কেট থেকে সহজেই সরঞ্জাম কেনা যায়। তবে এক হাজার টাকার জিনিসের জন্য অন্তত চার হাজার টাকা দিতে হয়। দোকানিরা পরিচয়পত্র দেখে না।

চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার আনিছ ও আব্দুল হক পুলিশকে জানান, চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনস এলাকার কয়েকটি দোকানে পুলিশ ও র‌্যাবের সরঞ্জাম কিনতে পাওয়া যায়। বর্তমানে জামিনে মুক্ত মুন্সীগঞ্জের রিন্টু মিয়া, টঙ্গীর সোহেল রানা ও জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, পলওয়েল মার্কেট থেকে সরঞ্জাম কেনা যায়, তবে দাম অনেক বেশি রাখে।

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ রকম প্রতারকচক্র সারা দেশেই আছে। র‌্যাবের নাম ব্যবহার করে তারা অনেক প্রতারণার ঘটনা ঘটিয়েছে। অনেককে ধরা হয়েছে, অন্যদের ধরার চেষ্টা চলছে। র‌্যাবের পোশাক-সরঞ্জাম খোলাবাজারে পাওয়া যাওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের প্রতি সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

 


মন্তব্য