kalerkantho

ভ্রমণ

নদী পরিব্রাজক দল

আপেল মাহমুদ   

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নদী পরিব্রাজক দল

ঘাটে ভিড়েছে নদী পরিব্রাজক দলের নৌকাবহর। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর একদল তরুণ-যুবা। দেখা মেলে একের পর এক নদীর বুকে। নৌকাকে বাহন করে ছুটে যায় এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে। ঘুরে বেড়ায় এক নদী থেকে আরেক নদীতে। ওরা নদী পরিব্রাজক। ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশের প্রায় এক শ নদ-নদী ভ্রমণ শেষ করেছে। শুরুটা শখের বশে। তবে সময় পরিক্রমায় তা আর কেবলই শখে সীমাবদ্ধ নেই। নিজেদের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে মানুষকে নদী রক্ষায় সচেতন করে তোলার কাজটিও করে চলেছে দলবদ্ধভাবে।

শুরুটা হয়েছিল ২০১১ সালে। ১১ জন তরুণ-যুবক একত্র হয়ে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় জাদুকাটা নদী ভ্রমণের মাধ্যমে কর্মকাণ্ড শুরু করে। এরপর থেকে সময়-সুযোগ পেলেই পরিব্রাজক দলটি শখের বশে নদী সঙ্গমে বেরিয়ে পড়ে। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় উপলব্ধি করে, শখের এই নদী ভ্রমণের মধ্য দিয়ে আরো কিছু কাজ করার দায়িত্বটাও পালন করা উচিত। কারণ নাগরিক হিসেবে তাদের কিছু দায়দায়িত্ব রয়েছে। নদী ভ্রমণের এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে নদী রক্ষায় জনসচেতনতা সৃষ্টি, নদী ভরাট ও দূষণ বন্ধে মানুষের বিবেক জাগ্রত করার কাজটি এ ক্ষেত্রে হতে পারে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ।

এমন নাগরিক দায়িত্ববোধ থেকেই পরিব্রাজক দলটি ব্যাপক পরিসরে নদী ভ্রমণ শুরু করে। ২০১৪ সালের ১৪ মার্চ তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে সাংগঠনিক রূপ দেয়। সংগঠনের নাম রাখে ‘নদী পরিব্রাজক দল’। বর্তমানে এই দলে রয়েছে ১১৫ জন। এদের অধিকাংশই তরুণ ও শিক্ষার্থী। আছে নারী সদস্যও। স্বেচ্ছাসেবী এই সংগঠনটি নিজের চাঁদার টাকায় কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। অবশ্য মাঝেমধ্যে অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তিও অর্থ সহায়তা নিয়ে সংগঠনটির পাশে এসে দাঁড়ান।

দলনেতা ও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মনির হোসেন বলেন, ‘নদীর মায়ায় নদীর টানে আমরা নদীতে ঘুরে বেড়াই। নদী বিষয়ে নিজে জানা এবং অন্যকে জানানোর কাজ করি। কারণ নদী পরিব্রাজক দল মনে করে, নদীকে জানলেই কেবল নদী বাঁচবে। একই সঙ্গে নদীর সন্তান জেলে এবং বেদেদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে তাদের সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষা দেওয়ার জন্যও কাজ করছি আমরা। ’

গত বছরের ৪ ডিসেম্বর সকালে নদী পরিব্রাজক দল নৌপথে টঙ্গী রেলসেতু থেকে গাজীপুরের কড্ডা সেতু পর্যন্ত প্রায় ২২ কিলোমিটার তুরাগ ভ্রমণের আয়োজন করে। এই সময় তারা নৌভ্রমণের পাশাপাশি তুরাগ নদ ধ্বংসের অনেক নমুনা সাংবাদিক ও ভ্রমণার্থীদের সরেজমিনে দেখায়। শত শত কারখানা থেকে তরুল বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে পানির রং কালচে হয়ে গেছে। দুর্গন্ধে নাকে রুমাল চাপতে হয়। নদ-নদীর বুকে জলজ প্রাণী ভেসে উঠছে। আর নদীতীর দখল হচ্ছে নির্বিচারে। অথচ তা দেখার কেউ নেই। উচ্চ আদালতের নির্দেশে তুরাগে যেসব সীমানা পিলার দেওয়া হয়েছিল তার সিংহভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে।

তুরাগ নদ ভ্রমণের সময় নদী পরিব্রাজক দল জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে লিফলেট বিলি করে। সেখানে তাদের কিছু আবেদন-নিবেদনও রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, নদীর তলদেশ খোদাই করে বালু উত্তোলন না করা। কারণ এর প্রভাবে মৎস্য সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আরো রয়েছে—নদীর বুকে ময়লা-আবর্জনা না ফেলা, দূরপাল্লার নৌযানে ডাস্টবিন স্থাপন করে সেখানে ময়লা ফেলার ব্যবস্থা করা, নদীর তীরভূমিতে বসবাসরত জেলে ও বেদে পরিবারের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত ও সচেতন করে তুলতে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা।

সাধারণ মানুষের মধ্যে নদীপ্রেম জাগ্রত করতে পরিব্রাজক দল নদী ভ্রমণ ছাড়াও বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যায়ক্রমে পাঠচক্র আয়োজন করা। ওই পাঠচক্রে নদ-নদী বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নদীবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য রচনা প্রতিযোগিতা, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা ও নদীর সঙ্গে সেলফি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা।

নদী ভ্রমণ আয়োজকরা জানায়, ঢাকার সবচেয়ে কাছের দুটি নদী হলো তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা। অথচ এ দুটি নদ-নদীই ঢাকার মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। দলটি বিভিন্ন সময় দেশের প্রায় ৪০টি নদ-নদী ঘুরে দেখেছে। এর মধ্যে ঢাকার পাশের বালু, বান্দরবানের শংখ, সুসং দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী, দিনাজপুরের ঢেপা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু তুরাগ-বুড়িগঙ্গার মতো এত বিপর্যয় আর কোনো নদীতে দেখা যায়নি।

তুরাগ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি ও নদী পরিব্রাজক দলের সদস্য মনোয়ার হোসেন রনি বলেন, ‘তুরাগকে দখলমুক্ত ও স্বচ্ছ পানির নদ হিসেবে দেখার স্বপ্ন ছিল। সে জন্যই কাজ করছি। কিন্তু দখলদার ও দূষণকারী কারখানার মালিকরা এতটাই প্রভাবশালী যে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে ভয় পায়। তবে আমরা নদী ভ্রমণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলার চেষ্টা করছি। ’

দলের সাধারণ সম্পাদক তাহাজুল ইসলাম ফয়সল বলেন, ‘শুধু তুরাগ-বুড়িগঙ্গাই নয়, দেশের যেকোনো নদ-নদী বাঁচাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে নদীর তীরবর্তী মানুষগুলো। নদ-নদীর তীরে বসবাসরত মানুষ সচেতন হলে এভাবে নদ-নদী ধ্বংস হতো না। কেউ অবাধে তীরভূমি দখল করে মিল-কারখানা নির্মাণ করতে পারত না। এখানে কারখানা নির্মাণ মানেই এর পানি ব্যবহারের অনুপযুক্ত করে ফেলা। দুঃখজনক হলেও সত্য, তীরভূমিতে বসবাসরতরা নদী রক্ষা দূরের কথা, বরং দখলদারদের সহযোগিতা করে থাকেন। ’

নদী পরিব্রাজক দলের একাধিক সদস্য বলেন, ‘নদীর জলপ্রবাহের সঙ্গে আমাদের জীবন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নদীর স্রোত থেমে গেলে আমাদের জীবনও থেমে যাবে। সভ্যতার মূল শিকড় হলো নদী। নদীতীরেই যুগ যুগ ধরে মানব সভ্যতা বিকশিত হয়েছে। নানা প্রতিবন্ধকতায় সেটা থমকে গেছে। একে চলমান করার জন্যই আমরা কাজ করছি। এ দেশের তরুণ-যুবসমাজ আমাদের এই নদী বাঁচাও আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে। আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করলে অনেকেই সাড়া দিয়েছে। ’


মন্তব্য