জোড়াতালির নিরাপত্তা শাহজালালে-331978 | শেষের পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


জোড়াতালির নিরাপত্তা শাহজালালে

আশরাফুল হক রাজীব   

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জোড়াতালির নিরাপত্তা শাহজালালে

বিভিন্ন সংস্থা থেকে ধারদেনা করে আনা জনবল দিয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা সচল রেখেছে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশ (সিএএবি)। প্রভাবশালী দেশগুলো এই বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করায় জনবল ধারদেনার পরিমাণ আরো বাড়িয়েছে সংস্থাটি। সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, নিজেদের বিশেষায়িত নিরাপত্তা বাহিনী ‘এভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্স’ (এভসেক) যত দিন আলোর মুখ না দেখবে তত দিন এভাবেই চলতে হবে। কিন্তু কবে নাগাদ এভসেক গঠন করা হবে এবং জোড়াতালির নিরাপত্তাব্যবস্থার অবসান হবে তা কেউ বলতে পারছে না। সিএএবির পক্ষ থেকে পাঁচ বছর আগে এভসেক গঠনের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হলেও এখনো তা আলোর মুখ দেখেনি। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দফায় দফায় সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছেন। তার পরও এভসেক অনুমোদনের ফাইল নড়াচড়ায় কোনো গতি নেই। 

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন জানিয়েছেন, অনেক দিন আগেই এভসেক গঠনের প্রস্তাব পাঠিয়েছে সিএএবি। প্রস্তাবটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অনুমোদন করেছে। এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় রয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিশ্বমানের করার জন্য সিএএবি পাঁচ বছর আগে পাঁচ হাজার জনবল নিয়ে ‘এভসেক’ গঠনের প্রস্তাব বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এ মন্ত্রণালয়ই প্রস্তাবটি দুই বছরেরও বেশি সময় আটকে রাখে। তারপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠালে সেখানে আটকে থাকে আরো দুই বছর। শেষ পর্যন্ত জনপ্রশাসন ছাড় করলেও আজও ফাইলটি আনুমোদন দেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়। নিজস্ব জনবল বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন না হওয়ায় বিভিন্ন সংস্থা থেকে নিরাপত্তাকর্মীদের ধার করে শাহজালালের নিরাপত্তা দিচ্ছে সিএএবি।

সিএএবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালি উদ্বেগ প্রকাশের পর বিমানবাহিনী, আনসার ও পুলিশ থেকে ২৫০ জনকে অস্থায়ী ভিত্তিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার কাজে সহযোগিতার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে সিএএবির মোট জনবল সাত হাজার ২৯৭ জন। তাদের মধ্যে দৈনিকভিত্তিক কর্মচারীই এক হাজার ৩৪০ জন। জনবলের অভাবে সিএএবি এই বিপুলসংখ্যক দৈনিকভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে। সংস্থাটিতে আনসার রয়েছে এক হাজার ৮৩ জন। তাদের দিয়ে রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রন, সংরক্ষিত এলাকার বিভিন্ন প্রবেশপথ, অপারেশন বিল্ডিং, কার্গো ভবনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। শাহজালালের বহিরাঙ্গনের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে জোরদার করা হয়েছে আর্মড পুলিশ ব্যটালিয়নের এক হাজার ১০০ সদস্য দিয়ে। প্রশিক্ষিত জনবলের সংকটের কারণে ফ্লাইট সেফটি ও রেগুলেশন বিভাগে ৫৬ জন কনসালট্যান্টকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

জানা গেছে, সিএএবির অর্গানোগ্রাম পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। অর্গানোগ্রামে মোট পদ পাঁচ হাজার ১১ জন। এর মধ্যে এভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্স এক হাজার ৭৩৫ জনের। সংস্থায় বর্তমানে কর্মরত তিন হাজার ৮০০ জন। তাঁদের মধ্যে ৯৫০ জন নিরাপত্তার কাজ করছেন। 

১৯৯৮ সাল পর্যন্ত শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও গুটিকয়েক বিদেশি এয়ারলাইনস বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনা করত। বর্তমানে ২৭টি বিদেশি এয়ারলাইনস ও ২০টি দেশি এয়ার অপারেটরকে নিয়ন্ত্রণ করছে সিএএবি। আগামী কয়েক বছরে এসব এয়ারলাইনসের সংখ্যা আরো বাড়বে। কিন্তু সিএএবির জনবল ১৯৮৪ সাল থেকে একইভাবে আছে। সে সময় বাংলাদেশে একটি মাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছিল। আর অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোতে দিনে দু-একটি ফ্লাইট পরিচালিত হতো। সে সময় সিভিল এভিয়েশনের অনুমোদিত জনবল ছিল তিন হাজার ৬৯৭ জন। পরে প্রশাসনসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ সৃষ্টি করা হয়।

ইতিমধ্যে দেশের আরো দুটি বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত হয়েছে। সাতটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরেও বিমান ওঠানামা করছে। কিন্তু বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ চলাচল ও যাত্রীর সংখ্যা বাড়লেও ১৯৮৪ সালের জনবল দিয়েই সিভিল এভিয়েশন চলছে। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে সংস্থাটি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। নানা কারণে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বহুবার বিঘ্নিত হয়েছে। আনসার বাহিনী ও এপিবিএন বিমানবন্দরের বাইরের নিরাপত্তা দেখভাল করলেও এ দুটি সংস্থা সিভিল এভিয়েশনের সিকিউরিটি বা এভিয়েশন হুমকি মোকাবিলায় উপযুক্ত নয়। তাদের ওপর সিএএবির কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই। কোনো অপরাধ করলেও তাদের শাস্তির আওতায় আনতে পারে না সিএএবি।

এ প্রসঙ্গে সিএএবির চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম সানাউল হক বলেন, ‘এভসেক একটি নতুন বিষয় হওয়ায় এ নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। এ জন্য বারবার তথ্য চাওয়া হচ্ছে। আমরাও অনেকবার প্রস্তাবিত কাঠামো বদল করেছি। আশা করি, শিগগিরই বাকি কাজ শেষ হবে। তবে এভসেক গঠন না হলেও আমরা নিরাপত্তার কাজে কোনো গাফিলতি করছি না। এডহক ভিত্তিতে বিভিন্ন সংস্থা থেকে জনবল এনে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তার পরও এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা সন্তোষজনক নয়। এটা আরো বাড়াতে হবে। তবে তার অর্থ এই নয় যে নিরাপত্তা উদ্বেগের পর্যায়ে রয়েছে। নিরাপত্তা বাড়াতে জনবল বাড়ানো হচ্ছে, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। যাঁরা আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, তাঁরা এখন সন্তুষ্ট।’

মন্তব্য