বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা যাবে-331976 | শেষের পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১২ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৪ জিলহজ ১৪৩৭


বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা যাবে বেসরকারি খাতে!

আরিফুজ্জামান তুহিন   

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা যাবে বেসরকারি খাতে!

বিদ্যুতের সঞ্চালনব্যবস্থা সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে চায় সরকার। এ জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রাথমিকভাবে তিনটি স্থানকে চিহ্নিত করেছে পাওয়ার গ্রিড কম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। পরীক্ষামূলক এই তিন প্রকল্পের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে এর ফল হিসেবে দেশের অন্যান্য স্থানে সঞ্চালন লাইন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। এর আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমোদন বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দিলেও সঞ্চালনব্যবস্থার বেসরকারীকরণের উদ্যোগ এটাই প্রথম। সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। 

জানা গেছে, দেশের কোন কোন স্থানে বেসরকারিভাবে সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা যায়—বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে পিজিসিবির কাছে তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে পিজিসিবি বিদ্যুৎ বিভাগকে দেশের তিনটি স্থানে বেসরকারি খাতে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন ছেড়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। জায়গাগুলো হলো—চট্টগ্রামের মিরসরাই এলাকায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের লাইন, পটুয়াখালী থেকে বরিশালের ভাণ্ডারিয়া এবং মাদারীপুর থেকে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত সঞ্চালন লাইন। এখানে গ্রিড ও সাব-স্টেশন নির্মাণের মাধ্যমে নতুন সঞ্চালনব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে বলে পিজিসিবি মনে করছে।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ব্যাপক আকারে বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়। এর ফলে গত সাত বছরে বিদ্যুতের সংকট অনেকটাই মিটে গেছে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সংগতি রেখে বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হয়নি। এর ফলে সরকারের হাতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ থাকা সত্ত্বেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। সঞ্চালনব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে মাঝেমধ্যে গ্রীষ্মে বিদ্যুেকন্দ্র বন্ধ রাখা হয়।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। তবে বর্তমানে যে সঞ্চালনব্যবস্থা রয়েছে তা দিয়ে আট হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করাও কঠিন। সাধারণত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার দ্বিগুণ বিতরণ ক্ষমতা এবং প্রায় তিন গুণ সঞ্চালন ক্ষমতা থাকা উচিত। সে হিসাবে দেশের সঞ্চালনব্যবস্থা বেশ নাজুক।

২০২১ সালের মধ্যে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা হলেও সরকার ২০১৮ সালের মধ্যেই সেই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে চায়। এ জন্য সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে সঞ্চালনব্যবস্থার বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় মনে করছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালনে যে পরিমাণ অগ্রগতি প্রয়োজন পিজিসিবি তা এককভাবে করতে পারবে না। ভবিষ্যতে বিদ্যুতের চাহিদার সঙ্গে উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে, সে ক্ষেত্রে সরকারের একক এই কম্পানির অবস্থা আরো নাজুক হবে। এ কারণে মন্ত্রণালয় সঞ্চালনব্যবস্থায় অংশীদারি বাড়াতে চায়।

আবার সঞ্চালনব্যবস্থা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে বিদ্যমান বিদ্যুৎ আইন পরিবর্তন করতে হবে। ইতিমধ্যে সরকার ‘বিদ্যুৎ আইন ২০১৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে। এত দিন ধরে ১৯১০ সালের ইলেকট্রিসিটি অ্যাক্ট অনুযায়ী দেশের বিদ্যুৎ খাত পরিচালিত হয়ে আসছে। খসড়া আইনে বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় বেসরকারি খাত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলেও গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ ও সরবরাহ করার সুযোগ পায় না। সঞ্চালন ও বিতরণ খাত এককভাবে পরিচালনা করছে দেশের রাষ্ট্র মালিকানাধীন কম্পানি ও বোর্ড। বেসরকারি বিদ্যুেকন্দ্রগুলোতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে নিয়ে তা সঞ্চালন ও বিতরণ করছে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলো।

গত বছর পিজিসিবি ভেঙে ‘ইনডিপেনডেন্ট ট্রান্সমিশন কম্পানি’ নামে একটি পৃথক বিদ্যুৎ সঞ্চালন কম্পানি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিন্তু এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন পিজিসিবির কর্মচারী-কর্মকর্তারা। পরে পিজিসিবি মন্ত্রণালয়কে জানায়, আলাদা সঞ্চালন কম্পানি গঠন করা ঠিক হবে না। এরপর সরকার ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। বর্তমানে পিজিসিবি সারা দেশে সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ, পরিচালন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুম আল বেরুনী বলেন, ‘এখনো বিষয়টি (সঞ্চালনব্যবস্থা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া) একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। মন্ত্রণালয় আমাদের কাছে প্রতিবেদন চাওয়ায় আমরা তা জমা দিয়েছি। এখন একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠন করা হবে। ওই কমিটি সরকারকে এ বিষয়ে সুপারিশ জানাবে। কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।’

সঞ্চালনব্যবস্থা বেসরকারীকরণের যুক্তি হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন,  বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় সব থেকে পিছিয়ে আছে পিজিসিবি। সংস্থাটির এবার ২০টি প্রকল্পে কোনো অগ্রগতি নেই। এক হাজার কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে তারা ফিরিয়ে দিতে চেয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিস্থিতির উন্নতির জন্যই বেসরকারীকরণের দিকে যেতে চায় সরকার।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ছে। সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থারও আধুনিকায়ন করা হবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা চিন্তা করছি। ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতে এর কিছু অংশ দেওয়া হবে। বিভিন্ন দেশে বিদ্যুতের সঞ্চালনব্যবস্থায় বেসরকারি কম্পানি কাজ করছে। আমরাও আলাপ-আলোচনা করছি কিভাবে দ্রুতগতিতে সঞ্চালন ও বিতরণ প্রক্রিয়া বাড়ানো যায়।’

তবে নাম না প্রকাশ করার শর্তে পিজিসিবির এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ শুধু সঞ্চালনেরই বিষয় নয়। একই সঙ্গে এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তাও জড়িত। সঞ্চালনব্যবস্থা বেসরকারীকরণ হলে জাতীয় নিরাপত্তা ব্যাহত হতে পারে।’

মন্তব্য