kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পাখি

নীলগলা বসন্ত বৌরি

দেবদাস মজুমদার, আঞ্চলিক প্রতিনিধি   

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নীলগলা বসন্ত বৌরি

হরিণঘাটায় রাস্তার পাশে গাছের ডালে বসে পাকা আমড়া খাচ্ছে নীলগলা বসন্ত বৌরি। ছবি : রাজিউল ইসলাম রাজিব

প্রকৃতি এখন ফাগুনময়। চারদিকে বসন্ত ঋতুর সাজ।

পাতা ঝরার দৃশ্য। তারই মাঝে গাছের ডালে ডালে নতুন প্রাণের আবহ। পথেপ্রান্তরে পত্র-পল্লবহীন আমড়াগাছের ডালে দু-চারটি পরিপক্ব ফল চোখে পড়ে। মানুষ তো বটেই, পাকা রসালো আমড়ায় আকৃষ্ট হয় পাখিও।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে উপকূলজুড়ে হাজারো পাখির বিচরণ। তবে নজরকাড়া সৌন্দর্যের এই প্রজাতির পাখি খুব একটা দেখা যায় না। সম্প্রতি হরিণঘাটা বনের পথে চলতে গিয়ে চোখে পড়ে, পাতাবিহীন আমড়াগাছের মগডালে কয়েকটি পাকা আমড়া ঝুলে আছে। আর বর্ণিল একটি পাখি একাকী আপন মনে একটা পাকা আমড়ায় ঠোকর দিয়ে ফলের অম্ল-মধুর স্বাদ নিচ্ছে।

পাখিটির নাম বসন্ত বৌরি। এটিকে নীলগলা বসন্ত বৌরি, ধনিয়া, বড় বসন্ত বৌরি বা বসন্ত বাউরি নামেও ডাকা হয়। এরা বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা। বসন্ত বৌরির ইংরেজি নামBlue Throated Barbet. বৈজ্ঞানিক নাম Megalaima asiatica। এটি Capitonidae গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।

পরিবেশবিদরা মনে করেন, ফলাহারি বসন্ত বৌরি কয়েক দশক ধরে আগের তুলনায় কমে গেছে। তবে পাখিটি বিলুপ্তির আশঙ্কার পর্যায়ে।

আলোকচিত্রী ও পাখি গবেষক কিরণ খান জানান, বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও চীনের দক্ষিণাঞ্চলে দেখা মেলে বসন্ত বৌরির। বসন্তকালে বাংলাদেশের গ্রাম-গ্রামান্তরে এটির দেখা মেলে।

বাংলাদেশে লাউয়াছড়া ও সাতছড়ি মিশ্র চিরসবুজ বনে নীলগলা বসন্ত বৌরি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে তিন প্রজাতির বসন্ত বৌরি রয়েছে। এর মধ্যে নীলগলা বসন্ত বৌরি বেশি সৌন্দর্যময়। পাখিটির মাথার ওপরের রং লাল। গলার নিচে উজ্জ্বল নীল, চোখের দুই পাশ নীলচে। মাথার চাদির ওপরে কালচে টান রয়েছে। বুক হলদেটে। ঠোঁটের রঙে হলুদ-কালোর মিশ্রণ। চোখ লালচে। ওপরের সব পালক টিয়ার মতো সবুজ। লেজের তলার অংশ ফিকে নীল। ডানার তলা সাদাটে।

স্ত্রী-পুরুষ বসন্ত বৌরি দেখতে একই রকম। এদের গায়ের রং সবুজ বলে পাতার আড়ালে মিশে থাকে। তাই সবুজ পাতার ফাঁকে সহজে এদের আলাদা করে দেখা যায় না। গাছের মগডাল পছন্দ করে। কখনোই দলবদ্ধভাবে থাকে না। সব প্রজাতির বসন্ত বৌরির বাসার ধরন একই রকম। এরা তিন থেকে পাঁচ দিন সময় ব্যয় করে কেবল বাসার জায়গা পছন্দ করতেই। কাঠঠোকরার মতো গাছের গায়ে ছোট গোল গর্ত করে এরা বাসা বাঁধে। কখনো কখনো কাঠঠোকরা পাখির পরিত্যক্ত বাসাও ব্যবহার করে। পাখিটির প্রজননকাল মার্চ থেকে জুলাই। দুই থেকে তিনটি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি পালাক্রমে ডিমে তা দেয় ও বাচ্চা লালনপালন করে। ডিম ফোটে ২০-২২ দিনে।

ঘন জঙ্গলে ফল-পাকুড়ের গাছের আধিক্য যেখানে সেখানে এদের বেশি দেখা যায়। ফলাহারি পাখিটির প্রিয় খাবার বটফল। তবে ছোট পোকামাকড়ও এরা খেয়ে থাকে। বিশেষ করে পাকা বটের ফল, কদম, দেবদারু, আম, কলা, ডেউয়া, তেলাকুচা ও কিছু পোকামাকড় খেতে পছন্দ করে।

পাখিটি গাছের ডালে বসে ‘পুক্র্ক...পুক্র্ক...পুক্র্ক’ করে তিনবার থেমে থেমে ডাকে। আর একবার শুরু করলে থেমে থেমে ডাকতেই থাকে। শব্দও বেশ তীক্ষ। অনেক দূর থেকে শোনা যায়। তবে শীত মৌসুমে এরা তেমন ডাকে না। শীত শেষে বসন্ত ঋতু এলেই এরা গলা ছেড়ে ডাকতে শুরু করে।


মন্তব্য