‘ডাইনিং রুমটাই গ্যাসে ভরা ছিল’-331583 | শেষের পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৫ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৭ জিলহজ ১৪৩৭


উত্তরায় আগুনে ছারখার পরিবার

‘ডাইনিং রুমটাই গ্যাসে ভরা ছিল’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘ডাইনিং রুমটাই গ্যাসে ভরা ছিল’

‘চুলা অল্প জ্বালিয়ে চায়ের পানি দিছি। ওর আব্বু (মৃত শাহনেওয়াজ) বলল, ঘরে গ্যাসের গন্ধ আসছে, ফ্যানটা ছেড়ে দিই। ফ্যান ছেড়ে সে জানালা খুলে দেওয়ার জন্য যাচ্ছিল। জায়ান ওর বাবার কোলে। ফ্যানটা ছেড়ে দেবার পরে দাউ দাউ করে আগুন। সেকেন্ডের মধ্যে, এত আগুন। আসলে ডাইনিং রুমটাই গ্যাসে ভরা ছিল। সারলিনের রুম ছিল রান্নাঘরের পাশেই। একটা জানালা সম্ভবত বন্ধ ছিল।’ স্বজনদের কাছে এভাবেই সেদিনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন গৃহবধূ সুমাইয়া বেগম (৪০)। আগুনে তাঁর শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে গেছে। ছয় দিন ধরে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এখন চিকিৎসাধীন আছেন মোহাম্মদপুরের সিটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। গত শুক্রবার রাজধানীর উত্তরায় বাসার রান্নাঘরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সুমাইয়ার স্বামী ও দুই ছেলে নিহত হয়েছে।

তিন দিন প্রায় অচেতন থাকার পর কথা বলতে শুরু করেছেন সুমাইয়া। স্বজনদের কাছে ঘটনার কারণ ও ধরন পুরোটাই বর্ণনা করেছেন তিনি। গতকাল বুধবার আইসিইউতে সুমাইয়ার সঙ্গে তাঁর স্বজনদের কথা বলতে দেওয়া হয়নি। তবে এর আগে তাঁর ২৮ মিনিটের কথা মোবাইল ফোনে রেকর্ড করেন স্বজনরা। সেখানে সুমাইয়া বারবার বলেছেন, চুলার আগুনে বা তাঁদের অসাবধানতায় দুর্ঘটনাটি ঘটেনি। গ্যাসের লাইনে ছিদ্র থাকার কারণে ঘরের ভেতরে গ্যাসেই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ঘরে গ্যাসের লাইনের সমস্যার কথা মালিককে জানানো হলেও এর কোনো প্রতিকার হয়নি।

স্বজনরা বলছেন, ‘ওরা কী বেঁচে নেই’ বলে বারবার প্রশ্ন করছেন সুমাইয়া। না জানানো হলেও তিনি বুঝতে পেরেছেন তাঁর দুই ছেলে ও স্বামী মারা গেছেন। অন্যদিকে সুমাইয়ার মেজ ছেলে জারিফ বিন নেওয়াজ এখন আগের চেয়ে অনেকটা ভালো আছে। সেও সিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গত মঙ্গলবার মাকে একবার দেখার পর থেকে বাবা ও ভাইদের দেখতে চাইছে জারিফ।

গত শুক্রবার ভোরে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর রোডের ৮ নম্বর সাততলা ভবনের সপ্তম তলার ফ্ল্যাটে রান্নাঘরের গ্যাসলাইনের আগুনে প্রকৌশলী শাহনেওয়াজের পরিবারের পাঁচজন দগ্ধ হয়। গৃহকর্তা শাহনেওয়াজ ছিলেন আমেরিকান দূতাবাসের মেইনটেন্যান্স শাখার ইঞ্জিনিয়ার। শুক্রবারই মারা যায় তাঁর দুই ছেলে সারলিন বিন নেওয়াজে (১৫) এবং জায়ান বিন নেওয়াজ (১৪ মাস)। শনিবার মারা যান শাহনেওয়াজ। চিকিৎসকরা সুমাইয়ার সুস্থ হয়ে ওঠার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তবুও স্বজনরা উন্নত চিকিৎসার আশায় মঙ্গলবার তাঁকে সিটি হাসপাতালে নিয়ে যান।

সুমাইয়ার খালাতো ভাই খিরকিন নেওয়াজ গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, সুমাইয়া কথা বলেছেন। মঙ্গলবার খিরকিনের বড় ভাই নওশাদ জামান মোবাইল ফোনে সুমাইয়ার বক্তব্য রেকর্ড করেছেন। এরপর খিরকিন সেই বক্তব্য ফেসবুকে আপলোড করেন। পরে তা সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। খিরকিন নেওয়াজ বলেন, ‘ঘটনার পর আগুনের কারণ নিয়ে নানা কথা বলা হলেও এখন স্পস্ট যে, ঘরে গ্যাস বা অন্য কোনো দাহ্য পদার্থ থাকার কারণেই আগুন লেগেছে। চুলার সমস্যা বা লিকেজের সামান্য গ্যাস হলে তা জানালা ও ভেন্টিলেটারের ফাঁকা দিয়ে চলে যেত। দুর্ঘটনা ঘটলে চুলা জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গেই ঘটত। চুলা জ্বালানো হলো, সুইচ অন করে ফ্যান চালানোর পর আগুন ধরত না। এ ঘটনায় তদন্ত হলে দেখা যেত বাড়ির মালিকের কতটা অবহেলা ছিল।’

সুমাইয়া তাঁর বর্ণনায় বলেন, ‘বাসায় গ্যাসের পাওয়ার কম ছিল। তিন দিন বাইরে থেকে খাবার কিনে খাই। সমস্যা জানানোর পর মিস্ত্রি এসে পাওয়ারফুল রাইজার লাগিয়ে দিয়ে যায়। এর পরও বাসায় গ্যাসের গন্ধ পেতাম। গ্যাসের পাইপে লিক ছিল। ঘটনার আগের দিন রাতেও বাসায় গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেছে। ওর বাবা (শাহনেওয়াজ) মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা করে দেখে। বলে, ছাদে গ্যাসচালিত গিজারের ট্যাংক আছে, গন্ধ সেখান থেকে আসতে পারে। আমরা তো রান্নার সময় ছাড়া চুলা সব সময় বন্ধ রাখি। ঘটনার দিন সকালে নামাজ পড়ে চা বানানোর জন্য চুলায় পানি দেই। ওর বাবা সকাল পৌনে ৭টায় বাসা থেকে বের হওয়ার কথা ছিল। জারিফের বাবা বলছে গ্যাসের গন্ধ; ফ্যান ছেড়ে দেই। ফ্যান ছাড়ার পর চুলার কাছে যাই। এর পরই সেকেন্ডের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ল।’

অগ্নিকাণ্ডের পর প্রতিবেশীদের সহযোগিতা চেয়েও পায়নি সুমাইয়া ও তাঁর পরিবার। এই দুঃসহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে সুমাইয়া বলেন, ‘ওর বাবার কোলে পিচ্চিটা। সাততলা থেকে দৌড়ে নামছি আর চিৎকার করছি। প্রথমে চারতলা ও পরে তিনতলার ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়লাম। ওরা দরজা খুলল। আমাগো দেইখ্যা দরজাগুলো সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিল। সব স্পষ্ট মনে আছে। বিল্ডিংয়ের নিচে নামলাম। দেখলাম কত মানুষ। কেউ এগিয়ে আসল না। সবাই তাকাইয়্যা রইল। পুরা কাপড় তো পুইড়্যা গেল। একটা চটের বস্তা দিয়া শরীরটা জড়াই। আল্লাহ মাফ করুন। মানুষ কত অমানবিক। বিল্ডিংয়ের মহিলারা একটা চাদরও আগাইয়্যা দিল না। বললাম আমি মহিলা; অন্তত একটা চাদর দেন। কিচ্ছু দিল না। নইলে ওদের একটা চাদর বা তোষকই পুড়ত। আমার বাচ্চারা তো বাঁচত।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সুমাইয়াদের বাসায় দুটি শোবার ঘর। রান্নাঘরের সঙ্গে একটি ছোট বসার ঘর, যেখানে একটি ছোট খাট। ওই রুমের ফ্যান চালানোর কথাই বলেছেন সুমাইয়া। মূলত রান্নাঘরের চেয়ে বেশি পুড়েছে এই ঘরটি। সুমাইয়া ও মৃত্যুর আগে শাহনেওয়াজের বর্ণনা অনুযায়ী, গোলার মতো আগুন তাঁদের ধাক্কা মেরে বসার ঘরের দিকে নিয়ে আসে। তখনই বিস্ফোরণ ঘটে। পুরো ঘর অন্ধকার হয়ে যায়। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ছিদ্র দিয়ে বের হওয়া গ্যাস বসার ঘরে জমাট বেঁধে ছিল। রান্নাঘরের জানালা খোলার কারণে সেখানে চুলা জ্বালালেও তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ ঘটেনি।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডে একটি পরিবার বিপন্ন হওয়ার ঘটনায় বাড়ির মালিক দেলোয়ার হোসেনের অবহেলার অভিযোগ উঠলেও তাঁর বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শাহনেওয়াজের স্বজনরা একটি অপমৃত্যু মামলা করেছেন। ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশও। জানতে চাইলে উত্তরা-পশ্চিম থানার ওসি আলী হোসেন বলেন, ‘কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। কেন দুর্ঘটনা হয়েছে তা উদ্ঘাটনে আমরা আলামত পরীক্ষা করে দেখেছি। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মতামত চেয়ে চিঠিও পাঠানো হয়েছে।’

গতকাল সিটি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাতে-পায়ে সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো জারিফকে। চেয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। সাদা চাদরে তাকে ঢেকে রাখা হয়েছে। সে বারবার বলছে, ‘আমার বাবাকে এনে দাও। বড় ভাইকেও ডাক। তাদের সঙ্গে কথা বলব। বাবুটাকে (ছোট ভাই) আমার কোলে দাও। আমি ওর সঙ্গে খেলব। বাসার ড্রয়ার থেকে খেলনা এনে দাও।’ ডা. শহীদুল্লাহ বারীর তত্ত্বাবধানে জারিফের চিকিৎসা চলছে। আশঙ্কামুক্ত হলেও পুরোপুরি সেরে উঠতে জারিফের অন্তত দুই সপ্তাহ লাগবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

চাচাতো বোন মিথিলা জামান হাসপাতালে জারিফের দেখাশোনা করছেন। তিনি বলেন, ‘ও (জারিফ) অনেক প্রশ্ন করছে। সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছি না। কিভাবে দেব? তার বাবা-ভাই বেঁচে নেই, কিভাবে তাকে বলি যখন তার নিজের অবস্থাও শোচনীয়। এখন জারিফকে ভালো রাখাই আমাদের বড় কাজ।’ মিথিলা জানান, মঙ্গলবার জারিফের সঙ্গে তার মায়ের দেখা হয়েছে। তবে গতকাল স্বজনদের আইসিইউতে ঢুকে সুমাইয়ার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

মন্তব্য