kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রিলায়েন্সের প্রস্তাবে অবশেষে সায়

আরিফুজ্জামান তুহিন   

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রিলায়েন্সের প্রস্তাবে অবশেষে সায়

গ্যাসের সংকটে দেশের শিল্প-কারখানা ধুঁকছে; বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে টিম টিম করে। এই মুহূর্তে ২১টি কেন্দ্রে এক হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদিত হচ্ছে গ্যাস সংকটের কারণে।

নতুন গ্যাসকূপ আবিষ্কৃত না হলে আগামী ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে দেশে গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে যাবে। এ অবস্থায় ভারতের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স রাজধানীর উপকণ্ঠে মেঘনা ঘাটে গ্যাসচালিত ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তাতে সায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ। গতকাল বুধবার বিকেলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি বৈঠক সূত্র এ খবর নিশ্চিত করেছে। দরপত্র ছাড়াই বিদ্যুৎ জ্বালানি সরবরাহ বিশেষ আইনে এই কাজ দেওয়া হচ্ছে বলে সূত্র জানায়।

জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভাগে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, বিদ্যুৎসচিব মনোয়ার ইসলাম, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান শামসুল হাসান মিয়া, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ইশতিয়াক আহমেদ ছাড়াও পাওয়ার গ্রিড কম্পানি এবং গ্যাস ট্রান্সমিশন কম্পানির কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় সে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আদানি ও রিলায়েন্স বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে আসে। এর মধ্যে রিলায়েন্স ৭৫০ মেগাওয়াট করে তিনটি মোট দুই হাজার ২৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দেয় সরকারের কাছে। এর মধ্যে ৭৫০ মেগাওয়াটের দুটি কেন্দ্র হবে নারায়ণগঞ্জের মেঘনা ঘাটে আর অন্যটি হবে কক্সবাজারের মহেশখালীতে। আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে তখন একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। তবে রিলায়েন্সের কেন্দ্রের জন্য বিপুল পরিম্যাণ গ্যাস মেঘনা ঘাটে দেওয়া সম্ভব নয় বলে তখন গ্রুপটির সঙ্গে কোনো সমঝোতা স্মারক সই হয়নি।

গত বছর রিলায়েন্সের প্রস্তাবে সাড়া না দিলেও ওই প্রস্তাবে এবার সাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে রিলায়েন্সকে মেঘনা ঘাটে গ্যাসভিত্তিক ৭৫০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেবে পিডিবি। এ জন্য পিডিবি তাদের প্রয়োজনীয় জমি দেবে, দেবে প্রয়োজনীয় গ্যাসও।

জানা গেছে, রিলায়েন্সকে মেঘনা ঘাটে ৭৫০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাস সরবরাহ করবে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি। রিলায়েন্স কক্সবাজারের মহেশখালীতে প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করার জন্য একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করবে। মেঘনা ঘাটের বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাসের বদলি হিসেবে তারা এই এলএনজি দেবে সরকারকে। বৈঠকে বলা হয়, মহেশখালী থেকে বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেম পর্যন্ত একটি পাইপলাইন নির্মাণ করবে বাংলাদেশ গ্যাস ট্রান্সমিশন কম্পানি (জিটিসিএল)। তবে এর ব্যয় রিলায়েন্সকে বহন করতে হবে।

জানা গেছে, রিলায়েন্সের প্রস্তাবের বাস্তবতা খতিয়ে দেখতে তখন একটি কারিগরি কমিটি করা হয়েছিল। এ কমিটি তখন জানায়, ঢাকার উপকণ্ঠে যদি দেড় শ মিলিয়ান ঘনফুট গ্যাস কোনো প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয় তাহলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ এলাকায় অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। এমনকি এ অঞ্চলের বাসাবাড়িতেও গ্যাস পাওয়া যাবে না। যদিও রিলায়েন্স সরকারকে মহেশখালীতে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করবে, কিন্তু বাংলাদেশে এ রকম কোনো একক সরবরাহ লাইন নেই যার মাধ্যমে রিলায়েন্সের মহেশখালীতে দেওয়া গ্যাস সরাসরি মেঘনা ঘাটে চলে আসবে। এ ছাড়া কোনো কারণে এলএনজির জোগানে সমস্যা হলে ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম অঞ্চলে এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে পিডিবির এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্যাসের অভাবে বর্তমানে ১৭শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন করা হচ্ছে। ৩০০ শিল্প-কারখানাকে গ্যাস সংযোগের অনুমতি দিলেও তাদের কারখানায় গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হয়নি। আর যেসব শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ আছে তাদের অবস্থাও কাহিল। এ রকম পরিস্থিতি ৭৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের জন্য গ্যাস সরবরাহ করলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যাহত হবে। ’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ইশতিয়াক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যতখানি গ্যাস রিলায়েন্সের মেঘনা ঘাটে প্রয়োজন হবে, ততখানি গ্যাস (এলএনজি) তারা আমাদের কক্সবাজারের মহেশখালীতে দেবে। আর এই গ্যাস আমরা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার দিকে পাইপলাইনে দিয়ে দেব। ’

এক প্রশ্নের জবাবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, ‘রিলায়েন্সকে গ্যাস দিলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের আশপাশে গ্যাসের কোনো সংকট হবে না। এটি মাথায় রেখেই তাদের গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। ’

তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম। কালের কণ্ঠকে তিনি গত রাতে বলেন, ‘রিলায়েন্সকে এত গ্যাস দিলে ঢাকা ও এ অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যাহত হবে। বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বেশি মুনাফা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য সরকার সব জায়গা থেকে গ্যাস প্রত্যাহার করছে আর সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে গ্যাসের অভাবে বসিয়ে রাখা হচ্ছে অথচ সেখানে রিলায়েন্সকে এত বড় কেন্দ্রের জন্য গ্যাস সরবরাহ করবে সরকার— এটা আসলে জাতীয় দুর্গতি সৃষ্টি করবে। ’


মন্তব্য