শেষ হলো প্রাণের মেলা-330720 | শেষের পাতা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০১৬। ১৬ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৮ জিলহজ ১৪৩৭


বইমেলা

শেষ হলো প্রাণের মেলা

আজিজুল পারভেজ   

১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শেষ হলো প্রাণের মেলা

শেষ দিনে মেলায় বইপ্রেমীর ভিড়। ছবি : কালের কণ্ঠ

অতলস্পর্শী আবেগ-উচ্ছ্বাসে লেখক, পাঠক, প্রকাশক আর বইপ্রিয় মানুষকে দীর্ঘ এক মাস মাতিয়ে রেখে শেষ হলো প্রাণের মেলা, বইমেলা। বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হওয়া দেশের এই সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক আয়োজনে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ, বইকে কেন্দ্র করে লাখো মানুষের উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা আর একুশের চেতনাজাত মিলনমেলার পর্দা নামল গতকাল সোমবার।

নিরাপত্তা শঙ্কা নিয়ে শুরু হওয়া মেলা শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নেই শেষ হলো। ভয়-ভীতি আর শঙ্কাকে উপেক্ষা করে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার প্রত্যয়ে প্রতিদিন বানের স্রোতের মতো বইমেলায় এসেছে বইপ্রিয় মানুষ। আড্ডায় মেতে উঠেছে। সংগ্রহ করেছে পছন্দের বইটি। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশ না থাকলেও ছিল নিরাপত্তা হুমকি। একটি স্টলে অগ্নিসংযোগের অপচেষ্টা ছাড়া আর কোনো বিপত্তি বা অপ্রীতিকর ঘটনা এবার ঘটেনি। তবে ২৪ ফেব্রুয়ারি ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কবলে পড়ে এক দিন বন্ধ থাকার ঘটনা মেলার ইতিহাসে আর ঘটেনি। এদিন ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে মেলার বেশির ভাগ প্রকাশনা সংস্থা। এর বাইরে বৃহৎ পরিসরে মেলা আয়োজন, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিষয়ভিত্তিক সেমিনার, মেলার বাইরে বারোয়ারি পণ্যের হাট বসতে না দেওয়া, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা—এসব ইতিবাচক আয়োজনের জন্য এবারের মেলা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

বইমেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির সরবরাহ করা পরিসংখ্যান অনুসারে, এবারের মেলায় গত বছরের তুলনায় নতুন বই কম এলেও বিক্রি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রের হিসাব মতে, এবার মেলায় প্রকাশিত হয়েছে তিন হাজার ৪৪৪টি নতুন বই। সংখ্যাটি গেলবারের চেয়ে কম। গত বছর বেরিয়েছিল তিন হাজার ৭০০টি নতুন বই। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে বেরিয়েছিল দুই হাজার ৯৫৯টি আর ২০১৩ সালে তিন হাজার ৭০টি। যদিও এবার বর্ষ গণনায় ফেব্রুয়ারি লিপ ইয়ার হওয়ার কারণে মেলা এক দিন বেশি ছিল।

বাংলা একাডেমির সংগৃহীত তথ্য অনুসারে, এবার মেলায় বই বিক্রি হয়েছে প্রায় ৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকার। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ২১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। তার আগের বছর ১৬ কোটি টাকা। এই পরিসংখ্যান বাংলা একাডেমি বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রকাশ করে থাকে। এই কারণে এই সংখ্যাটি ধারণানির্ভর। তবে বাংলা একাডেমির বই বিক্রির তথ্য পাওয়া যায় সুনির্দিষ্টভাবে। কিন্তু একাডেমির বই গত বছরের চেয়ে এবার কম বিক্রি হয়েছে। মেলার ২৮ দিনে একাডেমির বই বিক্রি হয়েছে এক কোটি ৪০ লাখ টাকার। আর শেষ দিনে আরো ১০ লাখ টাকা বিক্রি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। গত বছর ২৮ দিনের মেলায় একাডেমির বই বিক্রি হয়েছিল এক কোটি ৫৮ লাখ ৩৫ হাজার ২৫৮ টাকা। তার আগের বছর বিক্রি হয়েছিল এক কোটি ১৮ লাখ ৯ হাজার ১৭৬ টাকা।

এবার বই বিক্রি বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা জানিয়েছে প্রকাশক ও বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ। গত বছর ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, যে কারণে মেলায় বইয়ের বিক্রি ছিল কম। ঢাকার বাইরের পাঠক-ক্রেতারা গতবার মেলায় আসতে পেরেছিলেন খুবই কম। এবার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকায় মেলার প্রথম দিন থেকেই ছিল উপচে পড়া ভিড়।

শেষ দিনে মেলার দ্বার খুলে দেওয়া হয় দুপুর ১টায়। বিপুল উপস্থিতি ছিল বইপ্রিয় মানুষের। প্রবেশপথে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়।

সন্ধ্যায় একাডেমি প্রাঙ্গণের বইমেলা মঞ্চে ছিল সমাপনী অনুষ্ঠান। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। মেলার প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ড. জালাল আহমেদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব আক্তারী মমতাজ। আরো বক্তব্য দেন ইভেন্ট সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইভেন্ট টাচ ইন্টারন্যাশনালের সিইও মেজর (অব.) মাইনুল হাসান। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

মেলার প্রতিবেদনে সাতটি সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন জালাল আহমেদ। তিনি বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের স্টল বিন্যাসের গুচ্ছগুলো দৃশ্যমান ছিল না। নতুন প্রবেশপথ করা হলেও সেটা দৃষ্টিনন্দন হয়নি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের উত্তর-পূর্ব অংশে ক্রেতা সমাবেশ ঘটানো সম্ভব হয়নি। গুচ্ছের চারপাশে পাকা রাস্তা করা সম্ভব হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তিসেবা পর্যাপ্ত ছিল না, পূর্ব দিকে পাকা ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ছিল না এবং দর্শনার্থীদের পানীয় ও খাবারের সংকটের কথাও অকপটে স্বীকার করেন মেলার সদস্যসচিব। আগামীবার এ বিষয়ে বাস্তবানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা করেন একাডেমির এই পরিচালক।

শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘এবারের গ্রন্থমেলা সব দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সরকার, লেখক-বুদ্ধিজীবী, প্রকাশক, পাঠক এবং দেশের সর্বস্তরের জনগণ যেভাবে গ্রন্থমেলাকে সফল করে তুলেছেন তা ভবিষ্যতে আরো সুন্দর ও নতুন আঙ্গিক আর বিন্যাসে করার প্রেরণা দেবে।’ 

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘আজ পৃথিবীর দীর্ঘতম গ্রন্থমেলার সমাপনী হচ্ছে। এত দীর্ঘ গ্রন্থোৎসবের আয়োজন আমাদের জন্য বিপুল গৌরবের ব্যাপার। এই গ্রন্থমেলা কেবল বিকিকিনির মেলা নয়, চেতনার অভূতপূর্ব মিলনোৎসবও বটে।’ 

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলা পরিসরের দিক থেকে ছিল এযাবৎকালের বৃহত্তম মেলা। এই মেলায় বিপুল মানুষের সমাগম দেখে অনুধাবন করা যাচ্ছে মুদ্রিত বইয়ের আবেদন কখনো শেষ হওয়ার নয়।’

অনুষ্ঠানে প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চায় অবদানের জন্য ফরাসি গবেষক ও অনুবাদক ফ্রাঁস ভট্টাচার্য ও প্রবাসী বাঙালি কথাশিল্পী মন্জু ইসলামকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পুরস্কার-২০১৫ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়। ফ্রাঁস ভট্টাচার্য অনুপস্থিত থাকায় তাঁর পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন রামেন্দু মজুমদার। পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের হাতে পুরস্কারের অর্থমূল্য ৫০ হাজার টাকার চেক, পুষ্পস্তবক, সনদ ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে ২০১৫ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিকসংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য মাওলা ব্রাদার্সকে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার, গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য বেঙ্গল পাবলিকেশন্স লিমিটেড, নিমফিয়া পাবলিকেশন ও পাঠসূত্রকে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার, শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণমান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য ময়ূরপঙ্খিকে রোকনুুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার এবং ২০১৬ সালের নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সময় প্রকাশন, মধ্যমা পাবলিকেশন ও জ্যার্নিম্যান বুকসেক শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০১৬ প্রদান করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্ত সব প্রকাশককে ২৫ হাজার টাকার চেক, সনদ ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ফরিদা পারভীন।

মন্তব্য