গাড়িতে আগুন দিয়ে যত বেশি মানুষ পোড়ানো সম্ভব হয়, নেপথ্যের নেতারা খুশি হয়ে সেই অনুপাতে পারিশ্রমিকও বাড়িয়ে দেন- এই ভয়ংকর তথ্য জানিয়েছেন রাজধানীর শাহবাগে বাসে আগুন দিয়ে ১৮ জনকে দগ্ধ করার ঘটনায় গ্রেপ্তার ছাত্রদলের দুই নেতা-কর্মী। ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ঢাকার ৭০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি সোহেল চাঁন ওরফে মিলন ও কর্মী উজ্জল হোসেন গোয়েন্দাদের বলেছেন, রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে কমপক্ষে ১০ জন ও সর্বোচ্চ ২০ জন করে 'পিকেটিং টিম' গঠন করে নাশকতা চালানো হচ্ছে। সফলতা আর পারিশ্রমিক হিসেবে টিমের প্রতিটি সদস্য প্রতিদিন সর্বনিম্ন দুই হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ চার হাজার টাকা করে পাচ্ছে। বিএনপি জোটের গঠন করা এসব 'পিকেটিং টিমের' পরিকল্পনা ও পরিচালনায় রয়েছে জামায়াত-শিবির। অর্থও জোগান দিচ্ছে তারা। গত দুই দিনে রাজধানীর বংশাল ও শান্তিনগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা ছাত্রদলের এই দুই নেতা-কর্মীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা। ৭০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি মিলন গোয়েন্দা হেফাজতে কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিকে বলেছেন ভয়ংকর কিছু কথা। ডিবির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মিলন জানান, শাহবাগের শিশুপার্কের সামনে 'মিশন' সফল করতে শিবির ও ছাত্রদলের সাতজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। দলের নেতৃত্ব দেন তিনি (মিলন)। যেকোনো একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিতে ওই দিন সকাল থেকেই তাঁরা শাহবাগ এলাকায় অবস্থান করেন। দুপুরে তাঁরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমবেত হন। দিনে পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়ায় নিজেদের মধ্যে আলাপ করে তাঁরা সন্ধ্যার পর বাসে আগুন দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। মাগরিবের আজানের পর অন্ধকার নেমে এলে উদ্যান থেকে ফুটপাতে এসে সড়ক দ্বীপের দুই পাশে বিভক্ত হয়ে তাঁরা অবস্থান নেন। এ সময় 'বিহঙ্গ' কম্পানির বাসটি ঘটনাস্থলে এলে প্রথমে তাঁরা কৌশলে সেটি থামানোর চেষ্টা করে। তা সম্ভব না হলে দ্রুত বাসটির সামনে এসে চালকের সামনের 'গ্লাসে' একটি পেট্রলবোমা ছুড়ে মারেন। দূর থেকে তাঁরা দেখতে পান বাসটি পুড়ছে আর যাত্রীরা ভেতরে আগুনে ছটফট করছে। কিছুদূর চলার পর বাসটি সড়ক দ্বীপের সঙ্গে ধাক্কা লেগে থেমে যায়। এরপর তাঁরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যান। বাসটিতে আগুন লাগানোয় ইতিমধ্যেই এর তিন যাত্রী মারা গেছে। মানুষ পোড়াতে খারাপ লাগে কি না- এ প্রশ্নের জবাবে মিলন ডিবি হেফাজতে এই প্রতিবেদককে বলেন, ''আগুন লাগানোর পরের দিন মিডিয়ায় 'মানুষ মরার' খবর জানতে পেরে কিছুটা খারাপ লেগেছিল। কিন্তু তাতে কী আসে যায়, মিশন সফল করতে পারলেই একদিকে টাকা আর অন্যদিকে দলে 'প্রমোশন' হয়।'' তিনি জানান, হরতাল-অবরোধ সফল করতে তাঁরা যেকোনো ধরনের নাশকতার জন্য প্রস্তুত। দল ক্ষমতায় যাবে কি না সেটা পরের ব্যাপার। এর আগে যতটুকু 'টাকা' কামাইয়া নেওয়া যায়। মিলন বলেন, 'আমরা জ্যেষ্ঠ (সিনিয়র) নেতাদের নির্দেশে অবরোধ কার্যক্রমকে সফল করার জন্য জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে ককটেল ও পেট্রলবোমা নিক্ষেপ এবং গাড়িতে আগুন দেই।' তিনি আরো জানান, এসব নাশকতার পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থের সংস্থান করছে জামায়াত-শিবির। অন্য দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা সেই টাকা পিকেটিংয়ের দায়িত্বে থাকা একজন দলনেতার মাধ্যমে বিতরণ করেন। ওই দুজনকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান পরিচালনাকারী ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (বিস্ফোরক অধিদপ্তর) সানোয়ার হোসেন বলেন, 'গ্রেপ্তারকৃতরা শাহবাগে যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থেকে নাশকতামূলক ঘটনায় জড়িত থাকার দায় স্বীকার করেছে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে হরতাল-অবরোধকে ঘিরে এরা বোমা হামলা ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার কাজ করে। নাশকতামূলক ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। হামলাকারীদের অনেকেই বেতনভুক্ত।' এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'বিষয়টি খুবই অমানবিক। গ্রেপ্তারকৃতরা শুধু টাকা আর বড় ভাইদের নির্দেশে মানুষ পুড়িয়ে মারছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। এসব রাজনৈতিক অপরাধীর নামের তালিকা করে ধরার চেষ্টা চলছে। রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডেই এরা সংগঠিত।' নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীর ৯০টি ওয়ার্ডেই পিকেটিং টিম রয়েছে। বিপুল পরিমাণ টাকা নাশকতার কাজে ব্যয় করা হচ্ছে। এই টাকার প্রধান উৎস জামায়াত-শিবির। গত কয়েক মাসে যত ধরনের নাশকতামূলক ঘটনা ঘটেছে তার জন্য শীর্ষ নেতারাই দায়ী। অতি সম্প্রতি শাহবাগের আগে ও পরে রামপুরা, বনশ্রী, ধানমণ্ডি, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, উত্তরা এবং পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পিকেটারদের দেওয়া আগুনে ১২০ জন দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। এদের মধ্যে ১৩ জন (গতকাল শনিবার পর্যন্ত) মারা গেছে। এখনো ২৯ জন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। ডিবি ও র্যাব সূত্র জানায়, রাজধানীতে জামায়াত-শিবিরের অনেক মেস আছে। সেই সঙ্গে সমমনা ইসলামী দলগুলোর 'উগ্রপন্থী গ্রুপ' সদস্যরা হরতাল-অবরোধে নাশকতায় জড়িত। নাশকতায় ব্যবহার করা বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকসহ ইতিমধ্যে ৮৯ জন পিকেটারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।