kalerkantho

রিয়ালিটি শো বন্ধ করে দেওয়া উচিত

সুবীর নন্দী। একুশে পদকজয়ী কণ্ঠশিল্পী। গেয়েছেন আড়াই হাজারের মতো গান। তাঁর জীবনের গল্প শুনেছেন রুদ্র আরিফ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

২২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



রিয়ালিটি শো বন্ধ করে দেওয়া উচিত

ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিলেন?

আমার জন্ম ৩০ নভেম্বর ১৯৫৩, হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে। পিতৃভিটা একই জেলার বানিয়াচরের নন্দীপাড়ায়। বাবা সুধাংশু ভূষণ নন্দী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ আর্মিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর পোস্টিং ছিল মিয়ানমারে। ১৯৪৭ সালে ক্যাপ্টেন হিসেবে রিটায়ার্ড করে দেশে ফিরে আসেন। মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে যোগ দেন চা বাগানটিতে। বাবার চাল-চলনে আর্মির দাপট ছিল। দুষ্টুমি করলে দেয়ালের দিকে নাক সোজা করে দাঁড় করিয়ে রাখতেন। তিনি ঘুমালেই আমরা সটকে পড়তাম! মা পুতুল রাণী নন্দী আমার প্রথম গুরু। প্রতি সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে প্রার্থনাগীত গাইতাম—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার মাথা নত করে দাও’। সুলেখা দেবরায়, সুজিত কুমার নন্দী, তপন কুমার নন্দী, শিপ্রা দাশগুপ্তা, আমি, সুবিনয় নন্দী, সত্যজিত্ নন্দী, পার্থসারথী নন্দী ও রাখি নন্দী—আমাদের সব ভাই-বোনের জীবন মা-ই গড়ে দিয়েছেন। আমাদের খুব পেটাতেন তিনি! আমরাও দুষ্টু ছিলাম। তখন প্রতিটি বাড়িতেই ছিল ফলের গাছ। মধু মাসে বন্ধুরা মিলে একেক ডালে বসে একেকজন একেকটা কাঁঠাল আস্ত খেয়ে ফেলতাম! লক্ষ্মীপূজার সময় কারো বাড়িতে ফল থাকা ছিল অসম্ভব ব্যাপার! আমরা দল বেঁধে সাফ করে ফেলতাম! বৃষ্টিতে ভিজে খেলাধুলা করতাম। শীতকালে চা বাগানে দুর্গাপূজায় যাত্রাপালা হতো। বড় বড় যাত্রাদল আসত। যাত্রার লোকগুলো ভীষণ সুদর্শন ছিলেন। ছিলেন স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত। চা বাগানে ৭০০-৮০০ শ্রমিক ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল আত্মীয়ের মতো। তাঁরা নাটক করতেন। সেই নাটকের ডিরেক্টর ছিলেন বাবা। আমার বড়দা অভিনয় করতেন।

 

গানে হাতেখড়ি কখন?

বাবার সংগ্রহে তিন শতাধিক গানের রেকর্ড ছিল। বড় ভাই-বোনদের গান শেখাতে হবিগঞ্জ শহর থেকে অনেক কষ্ট করে প্রতি পনেরো দিনে একবার আসতেন ওস্তাদ বাবর আলী খান। উনি ছিলেন আমাদের হাউস টিউটরের মতো। আমি আসলে ওনার কাছে শিখতে শুরু করি ১৯৬৬ সালের প্রথম দিক থেকে, চা বাগানের বাংলো ছেড়ে হবিগঞ্জে নিজেদের বাড়িতে চলে আসার পর। এর আগে চা বাগানের কাছেই, শাহজাহানপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। হবিগঞ্জে ওস্তাদজি সপ্তাহে এক দিন আসতেন। হবিগঞ্জ শহরটা খুব রাজনীতিসচেতন ছিল। আমাদের ১৬ জনের একটি দল ছিল ‘উদয়ন শিল্পীগোষ্ঠী’। বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মিটিংয়ের আগে গান করতাম। এভাবে ১১ দফা, তারপর এক দফার সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততা ছিল। তারপর মুক্তিযুদ্ধের সময় টিকতে না পেরে, দোসরা বৈশাখ (এপ্রিলে) আমরা আগরতলা হয়ে আসামের ডিবরুগড়ে চলে গেলাম। আমার বড়দা তখন ওখানে ব্যাংকে চাকরি করতেন। যুদ্ধ শেষে দেশে ফেরার পথে, আসামের করিমগঞ্জ শহরে কাকুর বাসায় গিয়েছিলাম। ওখানে থাকাকালেই বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার খবরটা শোনামাত্র বাবা মারা গেলেন! ডাক্তার জানালেন, সম্ভবত অতি উচ্ছ্বাসের কারণেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর। দেশে ফিরে হবিগঞ্জের বৃন্দাবন সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ফাইনাল পরীক্ষা দিলাম। তারপর ১৯৭২ সালেই চাকরি নিলাম জনতা ব্যাংকে। সেখান থেকে ২০১০ সালে অবসর নিয়েছি।

 

পেশাদার গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ কখন?

১৯৬৭ সালে সিলেট রেডিওর তালিকাভুক্ত শিল্পী হয়ে গান গাইতে শুরু করলাম। হলফনামা করে বয়স বাড়ানো হলো, যেন বড়দের অনুষ্ঠানে গাইতে পারি। পরে ক্লাস নাইনে পড়ার সময় প্রকৃত বয়সটা আবার অ্যাডজাস্ট করে নিয়েছিলাম। এক ঝলক লেখাপড়া ও খেলাধুলা, বাকি সময়টা গান-বাজনা এভাবেই চলছিল। কলকাতা থেকে প্রচারিত ‘অনুরোধের আসর’ অনুষ্ঠানটি বাসার সবাই একসঙ্গে শুনতাম। এটা একটা রেওয়াজ ছিল। ঢাকা রেডিওতে আবদুল লতিফ, আবদুল আহাদ এবং আরো অনেক গুণী শিল্পী ‘সংগীত শিক্ষার আসর’ অনুষ্ঠানে গান শেখাতেন। রবিবার সাড়ে ৯টায় সেটি প্রচার হতো। ঢাকার গানের সঙ্গে রেডিওর মাধ্যমেই তখন আমার যোগাযোগ ছিল। শুনতে শুনতে খুব দ্রুত গানের বাণীগুলো লিখে ফেলতাম।

 

ঢাকায় এলেন কবে?

১৯৭৪ সালে ঢাকায় এসে, ৩৩/১ পুরানা পল্টনে ‘বড় আপা’র বাসায় উঠলাম। এই বড় আপা ছিলেন কণ্ঠশিল্পী শাম্মী আখতারের স্বামী আকরামুল ইসলামের চাচাতো বোন। আকরামও তখন ওখানে থাকতেন। এরপর উঠলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে, দুলাল ভৌমিকের রুমে। রুম নম্বর ২৫৬। সে সময়ে দুলালদা ছিলেন আমাদের কাছে নায়ক। ভালো গান গাইতেন। ওখানে থাকা অবস্থায় ১৯৭৫ সালের বিভীষিকাময় ঘটনাটি ঘটল। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর সুজেয় শ্যাম কারফিউর মধ্যেই আমাকে হল থেকে বের করে নিয়ে গেলেন তাঁর বাসায়—৫৭৮ পেয়ারাবাগ, মগবাজারে। তিনি আমার আত্মীয়। মাঝখানে বছরখানেক ভাড়াবাড়িতে থাকার কথা বাদ দিলে, ১৯৮১ সালে পারিবারিকভাবে পূরবী নন্দীকে বিয়ে করার আগ পর্যন্ত বাকি সময়টা আমি শ্যামদার বাসায়ই ছিলাম। বিয়ের পর দিলু রোডে ভাড়া বাসায় উঠলাম। আমার মেয়ে ফাল্গুনী নন্দীর জন্ম হলো। চলে গেলাম মালিবাগ। তারপর পুরানা পল্টন হয়ে গ্রিন রোডে। কাকতালীয়ভাবে রেডিওতে আমার প্রথম গান গাওয়ার আর বিয়ে করার তারিখ একটিই—১৪ অক্টোবর। আসলে বিয়ের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল না। গান-বাজনা নিয়ে ব্যস্ত। মা ভাবলেন, ছেলের সংসারী হওয়া উচিত। তাই বিয়ে করিয়ে দিলেন!

 

চলচ্চিত্রে গানের যাত্রা কখন?

আমাদের প্রজন্মের সবারই কিন্তু আত্মপ্রকাশ হয়েছে রেডিওতে গান করে। ১৯৭৪ সালে ‘রাজা-শ্যাম’ নামে একটি জুটি ছিল। রাজা হোসেন খান আর সুজেয় শ্যাম মিলে ‘রাজা-শ্যাম’। তাঁরা প্রচুর কাজ করতেন। রফিকুল আলম, আবিদা সুলতানা, শাম্মী আখতার, তপন চৌধুরী, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী এবং সে সময়ে আরো যাঁরা গান করেন—আমাদের বিশাল একটা গ্রুপ ছিল। একসঙ্গে আড্ডাবাজি করতাম। এক শনিবার অফিস থেকে আসার পর শ্যামদা বললেন, ‘কালকে কী করবি?’ বললাম, ‘ছুটির দিন। বড় আপার বাসায় যাব, দুপুরে খাওয়ার দাওয়াত।’ ‘না, যেতে পারবি না।’ ‘কেন?’ ‘ফিল্মের গান আছে!’ আব্দুস সামাদ ছিলেন প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক। শ্যামদা বললেন, ‘সামাদ ভাই একটা ছবি বানাচ্ছেন। কাল বিকেলে তুই গান গাইবি।’ গান গাইলাম রাজা-শ্যামের সংগীত পরিচালনায়। ফোক ধারার গান ‘শুনিলাম আমি দয়ালরে...’। সিনেমার নাম ‘সূর্য গ্রহণ’। মুক্তি পেল। তারপরই সত্য সাহা, খান আতাউর রহমান—আরো যাঁরা সংগীত পরিচালক ছিলেন, আমাকে ডাকলেন। এরপর সত্যদা আমাকে দিয়ে বাবুল চৌধুরীর ‘মা’ ছবিতে, সোহেল রানার লিপসিংয়ে গান করালেন ‘আমি পথে পথে ঘুরি’। সেই গানটির জন্যই পরের বছর, ১৯৭৭ সালে আমি শ্রেষ্ঠ গায়ক হিসেবে বাচসাস (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি) পুরস্কার পেলাম। নিজের গাওয়া চলচ্চিত্রের দ্বিতীয় গানের জন্য এই পুরস্কার পাওয়া ছিল আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার। কারণ তখনো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তন হয়নি। বাচসাসই ছিল সবচেয়ে মর্যাদাজনক পুরস্কার। বাচসাস এখন একেবারে ম্লান হয়ে গেছে। খুব কষ্ট লাগে!

 

চলচ্চিত্রে কতগুলো গান গেয়েছেন?

সব মিলিয়ে আমি হয়তো দুই-আড়াই হাজার গান গেয়েছি। এর মধ্যে চলচ্চিত্রে গেয়েছি ৩০০-৩৫০টির মতো। ‘মাস্টার সাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই’, ‘আমি পথে পথে ঘুরি’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়’, ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’, ‘পাখি রে তুই খাঁচা ভেঙে’, ‘তুমি এমনই জাল পেতেছ সংসারে’...কত গান! এর মধ্যে ‘আমার এ দুটি চোখ’ কিন্তু রেডিওর গান। এটি রি-রেকর্ডিং করে ‘মহানায়ক’ ছবিতে ব্যবহার করলেন আলমগীর কবির। তখন আমার ২৩-২৪ বছর বয়স। ওনার ছবিতে গান গাওয়া মানে বিশাল ব্যাপার। গানটি মূলত কবি জাহিদুল হকের কবিতা। একটা কাগজে লিখে জাহিদ ভাই কত সংগীত পরিচালককে যে দেখিয়েছিলেন! দেখাতে দেখাতে কাগজটি ছিঁড়ে গিয়েছিল। বাকি সবাই বলছিলেন, ‘এ আবার কেমন গান!’ শেখ সাদী খান বললেন, ‘এটাই গান!’ তিনি সুর করলেন। সাদী ভাই আমাকে এখনো স্নেহ করেন। ওনার সুর আমি বুঝতে পারতাম। ওনার সুরে একই ছবিতে হৈমন্তী শুক্লার সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে ‘তুমি চাও পিয়ানো দিনে’ গেয়েছিলাম। মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, কবি শামসুর রাহমান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, নজরুল ইসলাম বাবু, মুন্সী ওয়াদুদ, মাহফুজুর রহমান মাহফুজ, নাসির আহমেদ—এঁদের লেখা অনেক গান গেয়েছি। সে সময়ের গীতিকাররা দুর্দান্ত ছিলেন। নজরুল ইসলাম বাবু সিগারেটের প্যাকেটে গান লিখতেন। রফিকুজ্জামান মুখটুকু লিখে অন্তরা দিতে সময় নিতেন। বাকিরা পুরো গানটি একসঙ্গেই দিতেন। বাবু ভাই ছিলেন এক ধরনের বোহেমিয়ান। ওনার লেখা প্রচুর গান গেয়েছি। ১৯৭৭ সালে আমরা যখন ইস্কাটন গার্ডেনে ‘কণ্ঠশিল্পী সংস্থা’ প্রতিষ্ঠা করলাম, সেখানে গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, গায়ক...সবাই একসঙ্গে আড্ডা মারতাম। এক দিন এমনই এক আড্ডায় সাদী ভাই কাওয়ালি সুরে হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন। বাবু ভাই সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে সেই সুরে লিখে ফেললেন ‘চাঁদে কলঙ্ক আছে’। চলচ্চিত্রের জন্য বাবু ভাই প্রথম গান লিখেন ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’। আমাদের চলচ্চিত্রের গানের স্বর্ণযুগ ছিল সেটা। ওই সময়ের অভ্যাস থেকেই এখনো বাণীনির্ভর গান গাওয়ার চেষ্টা করি।

 

গান হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া তখন কেমন ছিল?

আবদুল আহাদ, সমর দাশ, মীর কাসেম, ওমর ফারুক, ওস্তাদ কাদের জামিল, এরপর শেখ সাদী খান, আলাউদ্দীন আলী, আলম খান—এমন সংগীত পরিচালকদের সংস্পর্শে আমরা গান করেছি। এঁরা আমাদের গানের একেকটি স্তম্ভ। একেকটি গানের রিহার্সাল আমরা চার দিন ধরে করতাম—হোক সেটা রেডিওর, ফিল্মের কিংবা টেলিভিশনের। শ্যামদা, অজিত রায়, সত্যদা—এঁরা আমাদের যে কত শিখিয়েছেন! প্রত্যেক সংগীত পরিচালকের একেকটি বিশেষত্ব ছিল। যেমন সত্যদা খুব পরিষ্কার উচ্চারণ চাইতেন। ১৯৮৫ সালে ‘তোমারই পরশে জীবন আমার ওগো ধন্য হলো’ গানের রেকর্ডিংয়ের স্মৃতি যদি বলি, তখন আমি খুব পান খেতাম। ফলে আমার উচ্চারণ পরিষ্কার হতো না। সত্যদা রেগে গিয়ে খুব বকাঝকা করলেন, ‘তোমারে না বলছি পান খাওয়া ছাড়তে; ছাড়ো নাই?’ সেদিন সেই রেকর্ডিং স্টুডিও থেকেই পান খাওয়া ছেড়ে দিলাম।

আসলে এই মানুষগুলো ছিলেন আমাদের মাস্টার। এই যে বড় বড় মানুষের সঙ্গে বোঝাপড়া, তাদের অভিজ্ঞতার ভাগ নেওয়া—এটিই আমাদের অর্জন। তাই গান গাইতে আমাদের খুব একটা কষ্ট হয় না। গান কিভাবে গাইতে হয়—সেই কৌশলটা আমার প্রজন্ম জানে। গান শেখা এক জিনিস, আর করা অন্য জিনিস। এই দুটিকে একত্র করেই গান গাইতে হয়। আমার তো তখনই প্রচুর গান। তাই সারা দেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার ডাক পড়ত। এ কারণে আমাকে ‘খ্যাপ মাস্টার’ ডাকা হতো। ১৯৭৪ সাল থেকে শুরু করে ‘খ্যাপে’ বা কনট্রাক্টে আমার গান গাওয়া এখনো চলছে। স্টেজে গান গাইলে একটু এদিক-সেদিক হয়ই। তাই দর্শক-শ্রোতাকে সন্তুষ্ট করা খুব কঠিন কাজ। এর সঙ্গে শুধু রেডিওতে লাইভ গাওয়ার তুলনা টানা যেতে পারে। আমরা সে সময়ে রেডিওতে কিন্তু লাইভ গান গাইতাম।

 

অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার বিশেষ কোনো স্মৃতি?

একটি কলেজের অনুষ্ঠানে গান গাইতে ১৯৮৬ সালে কুমিল্লার দাউদকান্দি গিয়েছিলাম। গান শেষে এক ছাত্র এসে ধরল, ‘আমাদের বাড়িতে আপনাদের খেতে হবে।’ ‘কেন?’ ‘মা আপনার জন্য রান্না করছেন।’ আমি তখন খুব ভোজনরসিক ছিলাম। কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমি তাদের বললাম, ‘জরুরি কাজে ঢাকা ফিরতে হবে।’ তারপর চুপিসারে সেই ছাত্রটির বাড়ি গেলাম, খাওয়ার জন্য। ভরপেট খেলাম। সে কী সুস্বাদু! ফেরার সময় বাড়ির লোকজন আমাকে এক ছড়ি কলা ধরিয়ে দিলেন। আমি হাসিমুখে সেটিতে বাসায় নিয়ে এসেছি। কেননা, এ ছিল নিখাঁদ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

 

চলচ্চিত্র পরিচালকদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল?

অবশ্যই সরাসরি যোগাযোগ থাকত। গানটা যদি নাচের হতো, তাহলে নৃত্য পরিচালকও রেকর্ডিংয়ের সময় হাজির থাকতেন। তখন সিনেমার একেকটা গান তৈরি করা ছিল একটা শিশুর জন্ম দেওয়ার মতো। হেলাফেলা করে গান হতো না।

 

কোন গানটি গাইতে বেশি ভোগান্তি হয়েছে?

তখন গানের রেকর্ডিং সরাসরি হতো। এই প্রক্রিয়া নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছিল। আলাউদ্দীন আলীর সুরে, গাজী ভাইয়ের লেখা ‘কেঁদো না, আর কেঁদো না’ গানটিতে প্রচুর অর্কেস্ট্রা ব্যবহার করা হয়েছিল। সারা দিন একটানা চেষ্টা করে রাত ১০টায় রেকর্ডিং শেষ হয়েছিল। অন্যদিকে ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’ রেকর্ডিং হয়েছিল উনচল্লিশবারের প্রচেষ্টায়।

 

সংগীত পরিচালনায় কবে এলেন?

গায়ক হিসেবে আমার স্টুডিও অ্যালবাম ১৭-১৮টি। ২০০২ সালে অনেকটা শখের বশেই সংগীত পরিচালনা শুরু করি। প্রথমে একটি গানের সুর করেছিলাম অরুণ চৌধুরীর নাটকে, তপন চৌধুরীর কণ্ঠে। আমার সংগীত পরিচালনায় সাতটি অ্যালবাম প্রকাশ পেয়েছে। এখন তিনটি অ্যালবামের কাজ চলছে। মূলত নতুন শিল্পীদের নিয়ে কাজ করি। এ ক্ষেত্রে কনটেম্পরারি মিউজিকের সঙ্গে একটা মিশ্রণ ঘটাই। আসলে বাংলা গানের নির্দিষ্ট একটা গায়কী আছে। বাংলা গান কখনোই চিত্কারের নয়। গণজাগরণের গানসহ অল্প কিছু গানের কথা যদি বাদ দিই, বাংলা গান কিন্তু সব সময়ই অন্তর্মুখী ও বাণীপ্রধান। আজকাল অনেককেই দেখছি সুফিয়ানা স্টাইলে গান করতে। সুফিয়ানা গান বাংলায় হবে না। কারণ আমাদের মাটি ভেজা। সুফিয়ানা গান শুষ্ক অঞ্চলের, মরু অঞ্চলের। সুফিয়ানা গানের তাল থাকে না। এটা যে কোন বুদ্ধিতে এখানে আমদানি করা হচ্ছে! মুম্বাইয়েও অনেক সুফিয়ানা গান হয়েছে; কিন্তু একটাও টেকেনি। এই স্টাইলটা আমাদের সহজাত স্টাইলের বাইরের। ভাত খেয়ে সুফিয়ানা হবে না! পরিবেশ ও প্রকৃতির ওপর গানের ভাষা ও সুর তৈরি হয়। এটা কেউ ভাঙতে গেলে অনাসৃষ্টি হবে।

 

গান গেয়ে অনেক সম্মাননা পেয়েছেন...

বাচসাস পেয়েছি চারবার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি পাঁচবার। নিশ্চয়ই সব পুরস্কারই সম্মানের। তবে আমার কাছে একুশে পদকের মূল্য আকাশের চেয়েও বড়! তার মানে অনন্ত। যেকোনো পুরস্কারই দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়।

 

সমসাময়িক শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ কেমন?

একাত্তরের পরে আমরা যাঁরা গানে এসেছি, আমরা ছিলাম একটা পরিবারের মতো। পেশাগত ঈর্ষা আমাদের মধ্যে ছিল না। আগে আমরা প্রতি রবিবার লীনু বিল্লাহর পল্টনের বাসায় নিজেরা গান-বাজনা করতাম। এখন ঢাকার যানজটের কারণে কোথাও যাওয়া সহজ কথা নয়! তবু রফিকুল আলম, আবিদা সুলতানা, খুরশীদ ভাই (খুরশীদ আলম), কনকচাঁপা—আমাদের মধ্যে সব সময়ই যোগাযোগ থাকে। অন্যদিকে শাম্মী তো চলেই গেল!

 

খ্যাতির বিড়ম্বনায় পড়েছেন কখনো?

আমি এ কথা বিশ্বাস করি না। কেউ যদি এটাকে বিড়ম্বনা মনে করেন, তার মানে তিনি নিজেকেই মূল্যায়ন করতে পারছেন না। একজন শ্রোতা আপনাকে দেখে উচ্ছ্বাস নিয়ে ‘হ্যালো’ বললেন; ওই মানুষটির অনুভূতিকে মূল্যায়ন করতে হবে। তাঁর সঙ্গে হয়তো আপনার আর কোনো দিনই দেখা হবে না। তাই এটাকে বিড়ম্বনা নয়, অর্জন ভাবি আমি। কিছুদিন আগে এক রিকশাওয়ালা রিকশা থামিয়ে আমাকে বললেন, ‘দাদা, নমস্কার’—এটা তো ভালোবাসা। যদি কেউ আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেই মুহূর্তের জন্য হয়তো সেটি বিড়ম্বনার কারণ হবে; কিন্তু এ রকম পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কৌশলও একজন শিল্পীর শিখে রাখা দরকার।

 

তরুণ প্রজন্ম যখন আপনার গান গায়, কেউ কেউ রিমেক করে—কেমন লাগে?

আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, রিমেক করে কোনো কাজ হবে না। আর রিয়ালিটি শোগুলো তো বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও কোনো লাভ হয়নি। হয়তো দু-একজন শিল্পী উঠে এসেছেন; কিন্তু তাঁরা আগেও ভালো গাইতেন। আমরা যে হবিগঞ্জ থেকে সিলেট, সিলেট থেকে ঢাকায় এসেছি—আমাদের কি কেউ নিয়ে এসেছে? নিজেদের গান গেয়ে এসেছি। তাই আপাতত কিছুদিন রিয়ালিটি শো থামিয়ে রাখা উচিত। শিল্পীকে স্ট্রাগল করে আসতে হয়। স্ট্রাগল ছাড়া কিছু হয় না। তা ছাড়া গান-বাজনার কোনো কোনাকুনি রাস্তা নাই। আপনাকে প্রতিদিন রেওয়াজ করতে হবে—অর্ধেক শোনার, অর্ধেক শেখার মাধ্যমে। আমি আগে বলতাম, আমার গান তরুণরা যেভাবেই গাক—ভালো ব্যাপার; কিন্তু এখন আমি চাই না আমার গান কেউ গাক। এত বিকৃতি মেনে নেওয়া যায় না। তবু যাঁরা আমার গান গাইতে চান, অনুরোধ করছি, যেন আমার কাছ থেকে তাঁরা শিখে নেন। শিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ নাই, গীতিকারের সঙ্গে যোগাযোগ নাই, মিউজিক ডিরেক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ নাই, অথচ গান গেয়ে আপনারা বাজারে বা অনলাইনে ছেড়ে দিলেন—বলি, আপনারা কারা? আমি বলি, শিল্পীকে নিজস্ব দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রত্যেক শিল্পীরই উচিত নিজেকে নিজের শ্রদ্ধা করা। কেউ শুনুক বা না শুনুক, নিজের গান গাইতে হবে; নিজের কাজের কিছু ছাপ রেখে যেতে হবে।

 

জীবনকে কিভাবে দেখেন?

৫২-৫৩ বছর ধরে গান গাইছি। আমি জানি, আত্মকেন্দ্রিক হয়ে থাকলে জীবনের অর্জন কিছুই হবে না। আপনাকে সবার কথা ভাবতে হবে। দেশের কাছ থেকে কত সুবিধা আমরা নিই, দেশকে কী দিচ্ছি—সেটা ভাবতে হবে। একা বেঁচে থাকার কোনো মানে নাই। প্রতিটি মুহূর্তে যতটুকু সম্ভব অনুভব করতে হবে—আপনি শুদ্ধ আছেন, নাকি ভুল? স্কুলে পড়ার সময় অঙ্কের শিক্ষক কিরণ চন্দ্র ভট্টাচার্য একবার বলেছিলেন, ‘দেখ ব্যাটা, চা বাগানে যদি ভালো কাজ করতে পারিস, করবি; কিন্তু খারাপ কাজ করবি না। খারাপ কাজ করলে লোকে গালি দেবে।’ সেই শিক্ষা মনে রেখে সারা জীবনে একটা মানুষেরও ধন্যবাদ যদি না পাই, কারো গালি যেন না পেতে হয়, সেভাবেই জীবন কাটাতে চেয়েছি।

(গ্রিন রোড, ঢাকা; ১৬ মার্চ ২০১৯)

মন্তব্য