kalerkantho


২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর আর গান করব না

ফেরদৌস ওয়াহিদ। পপ গায়ক। ‘এমন একটা মা দে না’, ‘আমি এক পাহারাদার’, ‘মামনিয়া’, ‘আগে যদি জানিতাম’ প্রভৃতি তাঁর তুমুল জনপ্রিয় গান। তাঁর জীবনের গল্প শুনেছেন রুদ্র আরিফ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর আর গান করব না

গানে এলেন কী করে?

আমার বড় বোন রবীন্দ্রসংগীত শিখতেন। ওকে গান শেখাতে বাড়িতে শিক্ষক আসতেন। আমার কানে গানগুলো লেগে থাকত। আমি গুনগুন করে গাইতাম। তখন আমি সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলে ক্লাস ফোরে পড়ি। আমাদের বাংলার শিক্ষক ছিলেন নলিনীবাবু। তিনি বাসায় এসে আমাকে প্রাইভেট পড়াতেন। এক দিন বাসায় ঢোকার মুহূর্তে শুনলেন, আমি গুনগুন করছি—‘মায়াবন বিহারিণী...’। তিনি আমাকে চার লাইন গেয়ে শোনাতে বললেন। শোনালাম। বললেন, ‘তুই তো ভালোই গাসরে! দেখি, তোর বাবা-মাকে বলব তোকে গান শেখাতে।’ এটিই ছিল আমার শুরুর প্রেরণা। তারপর ১৯৬৪ সালে, নবাবপুরের সিনেমা হলে আমরা সিনেমা দেখতে গেলাম। সপরিবারে সিনেমা দেখার রেওয়াজ ছিল তখন। সিনেমার নাম ‘আরমান’। তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের ছবি। এটির গানগুলো আমার মনে দাগ কেটে গেল। ভাবলাম, আমিও যদি এ রকম গাইতে পারতাম! তখন তো ভাবতাম নায়ক-নায়িকারা সত্যি সত্যি গাইছে। সে রাতেই জানলাম, গানগুলো সব রেকর্ড করা; নায়ক-নায়িকা শুধু ঠোঁট মিলিয়েছে।

এখন যেটি প্রেস ক্লাব, তার উল্টো দিকে কয়েকটি রেকর্ডের দোকান ছিল। আমি পরদিনই চার আনা দিয়ে ওই ছবির একটি রেকর্ড কিনলাম। তারপর গানগুলো শুনতে থাকলাম। সেই রেকর্ড শুনেই আমার প্রথম গান শেখা। কলেজজীবন পর্যন্ত এভাবেই কেটেছে। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত আমি ছয় মাস দেশে, ছয় মাস কানাডায় থাকতাম। দেশে এসে গানগুলো শুনে আগ্রহ বাড়ল। তখন রবিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। এ দিন আমাদের বাড়িতে বড় শিল্পীদের অনেকেই আসতেন। বারীণ মজুমদার, মিউজিক কলেজের অধ্যাপক সোহরাব হোসেন, আব্দুল আলীম। আব্দুল আলীমের মতো কণ্ঠ আমি আর কখনোই শুনিনি। তাঁর পাশে বসে, রাত জেগে গান শুনতাম। এরই মধ্যে একটি ঘটনা ঘটল। আমার বাবা ছিলেন বড় ব্যবসায়ী। বিক্রমপুর সমিতির সভাপতি। তখন ইন্দিরা রোডের একটি অফিসের সামনে বিশাল খালি জায়গায় শামিয়ানা টানিয়ে সেই সমিতির একটি অনুষ্ঠান হলো। বাবা বললেন, ‘আমার ছেলে গান গাইবে।’ বাবাকে বারণ করার সাহস কারো ছিল না। তখনই নিজের কথা ও সুরে আমি গান গাইতে বসলাম। প্রথম চার লাইন গাওয়ার পর দেখি প্রচুর তালি পড়ছে। আমি আরো জোশে গাইতে থাকলাম। তারপর হুট করেই পর্দা পড়ে গেল। উপস্থাপক এসে চিত্কার শুরু করলেন, ‘কোত্থেকে এদের নিয়ে আসে! অনুষ্ঠানটাই নষ্ট করে দিল।’ তিনি তো আমার পরিচয় জানতেন না। আমি খেয়াল করলাম, দূরে দাঁড়িয়ে বাবা মলিন চোখে তাকিয়ে আছেন। বাড়ি ফিরে বাবাকে বললাম, আমি গান শিখব। বাবা আমার জন্য মাস্টার রেখে দিলেন। কয়েকজন মাস্টারের কাছেই শিখেছি। সর্বশেষ পেলাম ওস্তাদ ফজলুল হককে। ওনার কাছে চার বছর ক্লাসিক্যাল শিখেছি।

 

গানে সরাসরি জড়ালেন কবে?

১৯৭২ সালে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। একদিন পরিচয় হলো ফিরোজ সাঁইয়ের সঙ্গে। তিনি তখন তবলা বাজাতেন, টিএসসির দোতলায়। অনেকক্ষণ ধরে আমার গান শুনলেন। তারপর বললেন, ‘তুমি গান করবে?’ আমি বললাম, ‘অবশ্যই করব, যদি আপনি সুযোগ দেন।’ তিনিই আমাকে নিয়ে গেলেন ‘স্পন্দন’ ব্যান্ডে। আমাকে গান গাওয়ালেন। এরপর ফিরোজ আমাকে নিয়ে গেলেন চিটাগং হোটেলে। তখন উদ্দেশ্যটা আমাকে বলেননি। আজম খানকে খবর পাঠালেন। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আজম এলো কিছু বন্ধুবান্ধব সঙ্গে নিয়ে। ফিরোজ সাঁই বললেন, ‘আজম, তুই একাই আয়। ওদের ছেড়ে দে।’ আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘ও কানাডা থেকে এসেছে।’ আর আমাকে বললেন, ‘ও আজম খান। মুক্তিযোদ্ধা। খুবই ভালো গান করে।’ মুহূর্তেই দুজন দুজনাকে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করলাম। এরপর পরিকল্পনা করতে থাকলাম, কী করা যায়। একসময় ফিরোজ বললেন, ‘আমরা গান রেকর্ড করতে চাই। তোমাকে হেল্প করতে হবে।’ কী হেল্প? বললেন, ‘টাকা-পয়সার ব্যবস্থা তুমি করবে। আর তুমি যেহেতু শহরে থাকো, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে প্রতি রবিবার দুটি বাঙালি ছেলে গান করে, ওদের সঙ্গে তোমাকে একটা যোগাযোগ করতে হবে।’

 

প্রথম রেকর্ডিংয়ের গল্পটি শোনান।

‘ঢাকা কুরিয়ার’-এর বর্তমান চিফ এডিটর এনায়েতউল্লাহ খান ছিল আমার বন্ধু। ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডটির নাম কিন্তু ওরই দেওয়া। ওকে ধরলাম। ও তখন শখে গান করত। ওর সঙ্গে ইন্টারকন্টিনেন্টালের ছেলেদের পরিচয় ছিল। ওর সাহায্যে ছেলে দুটিকে রাজি করালাম। সিদ্ধান্ত হলো, আমরা একবারেই গানের রেকর্ডিং করব। রেকর্ডিংয়ের টাকা কে দেবে? আমার ক্লাসফ্রেন্ড—এখন ‘ক্যাটস আই’র মালিক সৈয়দ সিদ্দিকী রুমি, অন্য বন্ধু গোলাম সারওয়ার খান, শামীম, মাসুদ আর আমি মিলে স্টুডিও বুকিংয়ের ২৬০ টাকা জোগাড় করলাম। ইন্দিরা রোডে ছিল ঢাকা রেকর্ড কম্পানি। সেটিতে এক শিফটের বুকিং দিলাম। এখন রেকর্ডিং করবে কে? আলম খান তত দিনে অনেক নামকরা সুরকার। কিন্তু তিনি যে আজমের বড় ভাই—এটা জানতাম না। জানার পর ফিরোজ সাঁইকে আবার ধরলাম। তিনি আজমকে বললেন। আমরা একসঙ্গে হাজির হলাম আলম খানের কাছে। তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের রেকর্ডিংয়ের দিন তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে থাকতে রাজি হলেন। রেকর্ডিংয়ের দিন ভরপুর চা-নাশতা খাওয়ায় আরো খরচ হলো ১০০ টাকা। এ খরচও আমি আর বন্ধুরা পকেট থেকে দিলাম। এটি ১৯৭৬ সালের ঘটনা। আলম খানের অর্গানাইজে চারটি গান রেকর্ড হলো—আজমের ‘হাইকোর্টের মাজারে’ ও ‘ওরে সালেকা, ওরে মালেকা’ আর আমার ‘দুনিয়াটা কত যে মজার’ ও ‘চাঁদ জাগে, তারা জাগে’। আমাকে আলম ভাই ডেকে নিয়ে বললেন, ‘তোমাকে তো চিনতাম না। তোমার গান শুনলাম। তোমাকে আমি সিনেমায় গান করাব।’ আমি তো আনন্দে দিশাহারা! তারপর উনি চলে গেলেন। আমি গেলাম রেকর্ডিং ডিপার্টমেন্টের হেড মজিদ সাহেবের কাছে। আমাকে দেখেই বললেন, ‘আমি জানি তোমরা কী বলতে চাও। তোমার কথায় আমি আগেই রাজি।’ আমি বললাম, ‘আপনি বুঝলেন কিভাবে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার গান আমার পছন্দ হয়েছে। আমরা রেকর্ডটি বের করব।’ দুদিন পর মজিদ সাহেব আমাকে ডাকলেন। বললেন, ‘আমাদের একটা ছোট দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। মেশিনটা একটু নষ্ট হয়ে গেছে। ঠিক করতে দুই-আড়াই মাস লাগবে।’ বললাম, ‘যাক, কপালে নাই!’ দুই-আড়াই মাস পর উনি আবার ডাকলেন। এবার বললেন, ‘কার রেকর্ডটা আগে বের করব?’ আমি তো আর বলতে পারি না—আমারটাই আগে করেন। বললাম, ‘আজম খানেরটা।’ সব যোগাযোগ আমার সঙ্গেই ছিল। আর সব সময় ফিরোজ সাঁই আমার সঙ্গে থাকতেন। প্রেরণা বলুন, যা-ই বলুন, সব কিছুর পেছনেই কিন্তু ফিরোজ সাঁই। ১১ দিন পর মজিদ সাহেব আমাকে আবার ডাকলেন। এবার হাতে ধরিয়ে দিলেন ১০টা রেকর্ডিং ডিস্ক, আজম খানের।

 

আজম খানের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

যারা ফিন্যান্স করেছিল, সব বন্ধুকে ডাকলাম। ওরা সবাই খুশি। এই ১০টা ডিস্ক আমার ব্যাগে নিয়ে সোজা চলে গেলাম কমলাপুর, আজম খানের বাড়িতে। এসবের কিছুই কিন্তু সে জানত না। ওকে বললাম, ‘আগে শিঙাড়া আন।’ বলল, ‘কেন?’ বললাম, ‘তুই আন না!’ সে বলল, ‘তোরে নিয়ে আর পারলাম না!’ তত দিনে ওর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। সে শিঙাড়া আনাল। আমি ডিস্কগুলো ওর হাতে দিলাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। পরের দিন ডিস্কগুলো মার্কেটে যাবে। ওর খুশি আমি ওর চোখে দেখতে পাচ্ছি। আজম এমনিতে আবেগ প্রকাশ করত কম। কিন্তু মাঝেমধ্যে বলে ফেলত। সেদিন শুধু বলল, ‘তাইলে রেকর্ড বাইরায়া গেল!’ এতটুকু কথায়ই আমি ওর সবটুকু আবেগ বুঝতে পারলাম। ফিরোজ সাঁই আমার সঙ্গে ছিলেন। মিটিমিটি হাসছিলেন। তাঁকে দেখিয়ে আজমকে বললাম, ‘এই লোকটার জন্যই সব...।’ তার পর ফিরোজ সাঁইকে জড়িয়ে ধরল আজম। দুটি গানের রেকর্ড—‘হাইকোর্টের মাজারে’ আর ‘ওরে সালেকা, ওরে মালেকা।’ ঢাকা রেকর্ড কম্পানির দ্বিতীয় হিট ডিস্ক ছিল এটি। বিক্রির পরিমাণ সাত হাজার কপি ছাড়িয়ে গেল। আজমকে সবাই বলে পপগুরু। আমি বলি, রকস্টার—সুপার রকস্টার আজম খান। চারদিকে একটা সুরের বন্যতা, নতুনকে গ্রহণ করা—আমি অবাক হয়ে দেখলাম।

 

আপনার রেকর্ড বের হলো কবে?

আমার রেকর্ডটি বের হলো আরো দেড় মাস পরে, ‘ফেরদৌস ওয়াহিদ’ নামে। এইগুলো দিয়ে তখন বাংলাদেশে একটা নতুন অধ্যায় সৃষ্টি হলো। এখন পর্যন্ত রেকর্ডিং কিংবা অন্য যেকোনো জায়গায় নতুন ধারার সংগীতের রাজমুকুটটা আজম খানের মাথায়ই পরানো হয়। আমি শুধু একটা কথা বলতে চাই, এই রাজমুকুট পরানোর ক্ষেত্রে যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি মরহুম ফিরোজ সাঁই।

 

সিনেমায় গান শুরু করলেন কখন?

আলম খানই আমাকে একের পর এক ছবিতে গান গাওয়াতে লাগলেন। ‘আসামী হাজির’ ছবিতে সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গে ডুয়েট গাইলাম ‘আমার পৃথিবী তুমি’। এই গানটি দিয়েই শুরু, তারপর তো অনেক গান গেয়েছি। ১৯৭৬ সালের একটি ঘটনা মনে পড়ে। ভোর ৭টা বাজে। আমি ঘুমে। বাসার কাজের ছেলেটি ধাক্কা দিয়ে আমাকে ঘুম থেকে ওঠাল। বলল, ‘একটা মোটামতো লোক আসছে। বলছে, ফেরদৌসকে ডাক দাও।’ নিচে নেমে দেখি, বিখ্যাত পরিচালক ইবনে মিজান। তিনি গাড়ি থেকে নামলেন। আমি তাঁকে বাসায় এনে বসালাম। তিনি বললেন, ‘তোমার যে গানটা শুনি, টিভিতেও তোমাকে গাইতে দেখলাম, সেই গানটা আমি ছবিতে ব্যবহার করব। তোমাকে দিয়েই গাওয়াব।’ গানটি ছিল ‘এই যে দুনিয়া’। এটি আসলে আব্দুল আলীমের গান। আমি গাইতাম। খুশি মনে সোজা চলে গেলাম আলম খানের কাছে। তিনি বললেন, ‘সুযোগ এসেছে, তুমি গাইবা না? অবশ্যই গাইবা।’ তিনি আমাকে দোয়া করে দিলেন। তারপর তো ‘একমুঠো ভাত’ সিনেমার এই গানটা সুপার ডুপার হিট হলো। যত দিন বেঁচে আছি, বলব, আলম খান আমার গুরু। তা সেটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে না-ই হোন। কিন্তু এই মাঠে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর নামটিই সবার আগে রাখব। অন্যদিকে ফিরোজ সাঁই না থাকলে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাস কী হতো—সেটা আমার জানা নেই। আবার, সত্য সাহার কাছেও আমার ঋণের শেষ নেই। এক দিন তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। ‘অশিক্ষিত’ সিনেমার জন্য রাজ্জাকের ঠোঁটে একটি গান রেডি করেছেন। সত্যদা বললেন, ‘তোমার গান আমার ভালো লেগেছে। আমি ডিসিশন নিয়েছি, তোমাকে দিয়েই গানটা করাব। আমি যেভাবে বলব, তোমাকে কিন্তু সেভাবেই গাইতে হবে। তোমাকে ভাবতে হবে, তুমি মাতাল, তাড়ি খেয়েছ।’ উনি নিজে গেয়ে, আমাকে ভীষণ সুন্দরভাবে বোঝালেন। ব্যস, তাঁর মতো আমিও শুরু করলাম মদ না খেয়েই মাতলামি। পরদিন রেকর্ড হওয়ার পর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন। অনেক দোয়া করলেন। তার পর থেকে ‘আমি এক পাহারাদার’ গানটা তো ইতিহাস!

 

টেলিভিশনে প্রথম লিপসিং আপনিই করেছেন।

বিটিভিতে ঈদ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান ‘আনন্দমেলা’র শুরু আমাদের দিয়েই। এটি ১৯৭৭ সালের কথা। নায়ক রাজ্জাক ছিলেন উপস্থাপক। তিনি তখন সুপার-ডুপার হিট নায়ক। আমি গান গাইলাম, আজম খান গাইল। ফিরোজ সাঁই তখনো গান গাওয়া শুরু করেননি। পরে আমিই তাঁকে গান গাইতে নিয়ে এলাম। ‘সাধের লাউ’, ‘মন তুই দেখলি না রে’ সুপার হিট হয়ে গেল তাঁর এই গানগুলো। যাহোক, এরই মধ্যে টিভিতে এক দিন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আমাকে ডাকলেন। বললেন, ‘তুমি আমাকে একটা অনুষ্ঠান করে দাও।’ ‘সপ্তবর্ণা’ নামের সংগীত প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান। আমি সব ব্যবস্থা করে দিলাম। স্যারকে বললাম, ‘আমার একটা শর্ত আছে। আমার একটা গান থাকবে, সেটি কিন্তু আমি সরাসরি গাইব না, ঠোঁট মেলাব।’ স্যার বললেন, ‘গানটা একটু শোনাবা?’ রেকর্ড করা ছিল। ‘এমন একটা মা দে না’। গানটা তিনবার শুনলেন তিনি। তারপর বললেন, ‘তুমি দেখবে, আজ থেকে ২০ বছর পরও এই গানটার জনপ্রিয়তা থাকবে। তখন থেকে আরো ২০ বছর পর, তখনো এটার জনপ্রিয়তা থাকবে।’ আমি দেখলাম, স্যারের কথাই ঠিক। আজকে গানটার বয়স ৪৪ বছর। চলছেই তো চলছে। এই গানটা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।

 

‘এমন একটা মা দে না’র জন্মকাহিনি জানতে চাই।

এই গানটি ডা. নাসির আহমেদ অপুর লেখা। সে চমত্কার গান লিখত ও সুর করত। ‘স্পন্দন’ থাকাকালে, ১৯৭৫ সালের শেষ দিকের ঘটনা। আমি ওকে বললাম, ‘গানটা আমাকে দিয়ে গাওয়াবা নাকি?’ ও বলল, ‘হ্যাঁ বন্ধু, তোমাকে দিয়েই গাওয়াব।’ ‘আগে যদি জানিতাম’ গানটাও লাকী আখন্দের কাছ থেকে আমি চেয়ে নিয়ে গেয়েছিলাম।

 

লাকী আখন্দের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী করে হলো?

লাকী আখন্দ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। আমার জন্য সে যা করে গেছে, সেটি অকৃত্রিম ভালোবাসার নজির। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ, থার্টিফাস্ট নাইট উদ্যাপন করতে আমরা কক্সবাজার গিয়েছিলাম। কক্সবাজারে তখন মোটেল ছিল মাত্র দুটি। আমরা উঠেছিলাম ‘শৈবালে’। ফাঁকা কক্সবাজার, চমত্কার সেই দিনগুলো। আমাদের সঙ্গে আরো ছিলেন রথীন্দ্রনাথ রায়, কাদেরী কিবরিয়া। রাতের বেলা লাকী গুনগুন করে মাত্র দুটি লাইনই বারবার গাইছিল—‘আগে যদি জানিতাম, তবে মন ফিরে চাইতাম, এই জ্বালা আর প্রাণে সহে না...’। আর কিন্তু লাইন নাই। এটাই খুব আকর্ষণ করল সবাইকে। সবাই বলল, ‘দোস্ত, গানটা আমাকে দে।’ আমি চুপচাপ। কিছুই বলিনি। ঢাকা ফেরার পরদিনই ওর বাসায় হাজির হলাম। বললাম, ‘দোস্ত, গানটা আমাকে দে।’ ‘তুই গাইবি? আচ্ছা, আমাকে চিন্তা করতে দে।’ তার পর হঠাত্ এক দিন লাকী ওরই পরিচিত লোক, নারায়ণগঞ্জের তখনকার ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ নুরুল হুদাকে গানের কথা কমপ্লিট করে দিতে বলল। তিনি এই দুই লাইনের ওপর বাকি গানটা লিখে দিলেন। এদিকে আমি লাকীর পেছনে লেগে আছি। ১৯৭৭ সালের জুন মাসের শেষ দিকে হঠাত্ এক দিন সে এসে বলল, ‘তুই যদি কালকের মধ্যে গানটা রেকর্ড করাতে পারিস, তাহলে তোকেই দেব।’ আমার মনে আছে সেদিন রাত ১২টা পর্যন্ত বংশীবাদক রহমান ভাই, ড্রামসবাদক কাজী হাবলু, কি-বোর্ডে লাকী নিজে, আরো যত বাদ্য ও বাদ্যযন্ত্রী দরকার—সব কিছুর ব্যবস্থা করলাম। পরদিন ৩টা সময়। যথারীতি লাকী এলো। ৬ মিনিট ১০ সেকেন্ডের গানটা হয়ে গেল! রেকর্ডিং শেষ হলো রাত ৯টার দিকে। রেকর্ড করা ডিস্কটা নিয়ে আমি সোজা চলে গেলাম আমার ছোট বোনের শ্বশুর, কবি ড. আশরাফ সিদ্দিকীর বাসায়। বললাম, ‘তালই সাহেব, একটা গান আনছি, শোনেন।’ তিনি শুনে বললেন, ‘বাহ, নতুন স্টাইল লাগছে! গানটা খুব চলবে।’ তাই হলো। সুপার-ডুপার হিট। আর ‘মামনিয়া’ গানটা আমি ধার করেছি স্প্যানিশ একটা গান থেকে। মামনিয়া মানে বাচ্চাদের গান। এ গানটা অবশ্য লাকী শুরু থেকেই আমার জন্য তৈরি করেছে। পরে গান দুটি সে নিজেও গেয়েছে। ওর কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ।

 

আপনাদের সময়ে একটা গান কিভাবে হয়ে উঠত?

তখন সব কিছুই ছিল বাছার মধ্যে। গীতিকাররা খুব যত্ন নিয়ে গান লিখতেন। সুরকাররা সুর করতেন খুব হিসাব করে। পারফেকশনের জন্য আমাকেই তাঁদের কাছে দুই-তিনবার করে যেতে হতো। গানের রেকর্ডিং তখন একবারেই হতো। ওই সব বিষয় চিন্তা করলে ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারি না, কী করে যে তখন এসব করে গেছি! তখনকার সংগীত পরিচালকরা খুব ভেবেচিন্তে কাজ করতেন। কোনো গানে হয়তো বিশটা যন্ত্র লাগত। এটা থেকে এই সাউন্ড, ওটা থেকে ওই সাউন্ড—এভাবে কাজ করতে গিয়ে তাদের মানসিক পরিশ্রমটাও বেশি হতো। তাতে একেকটা খাঁটি মধু তৈরি হতো। এখন মধু হচ্ছে; তবে খাঁটি কয়টা—বলা মুশকিল। এখন গানের কথা চেঞ্জ হচ্ছে, ধারণা চেঞ্জ হচ্ছে। সব কিছু ডিজিটাল হওয়ায় এখন ভাবনাচিন্তা অনেক কমে গেছে। অনেক সুরকার বোতাম টিপে সুর বের করছেন। তাই মস্তিষ্কের ব্যবহারও কমে গেছে।

 

কয়েক প্রজন্ম ধরে আপনার গানগুলোর জনপ্রিয়।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আমাকে একটা উপদেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘টিভিতে যত কম আসতে পারো, ততই ভালো।’ কারণ জানতে চাইলে বলেছিলেন, ‘লোকে তোমাকে যত কম দেখবে, তোমার প্রতি তাদের তত আকর্ষণ থাকবে। তুমি শুধু গান গাইতে থাকো।’ আসলেই টিভিতে আমি কম আসি; বছরে হয়তো আট-দশটা অনুষ্ঠানে। আমি এতেই তুষ্ট।

 

গান নিয়ে বিশেষ কোনো ঘটনা আপনাকে ধাক্কা দিয়েছে?

এ রকম দুটি স্মৃতি আছে। একটি হলো মানুষের ভালোবাসা পাওয়া। একবার এক ভদ্রমহিলা আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। তাঁকে এক মাস পর দেখা করার সময় দিলাম। খুলনা থেকে এসেছেন তিনি। ড্রয়িংরুমে বসে আছেন। আমি এলাম। ওনার জন্য চা-নাশতা রাখা। তিনি কিছুই ছুঁয়ে দেখলেন না। কোনো কথা বললেন না। অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। পলক পড়ল কি না, বলতে পারব না। নিশ্চয়ই পড়েছিল। পরে বললেন, ‘আচ্ছা, আসি।’ উঠে চলে গেলেন। আমি এর কোনো জবাব দিতে পারিনি।

আরেকটি বিষয় হলো, মানুষের উত্থান-পতন থাকেই। আমার জীবনেও খারাপ সময় এসেছে। এখন আবার আমি মানুষের কাছাকাছি আসতে পারছি, মূলত হাবীবের অনুপ্রেরণায়ই। তবে যে খারাপ সময়টি পার করেছি, দেখেছি, তখন অনেক নামকরা শিল্পী আমাকে দেখেও না দেখার ভান করেছেন। আমি নাম বলব না। খেয়াল করে দেখেছি, এখনকার শিল্পীদের মাঝে শিল্পীর আচরণ ১০ শতাংশ, বাকি ৯০ শতাংশই ঔদ্ধত্যপনা। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে না এলে শিল্পী হওয়া খুবই টাফ।

 

আপনাদের সময়কার আড্ডা কেমন ছিল?

আমাদের মধ্যে বন্ধুসুলভ আড্ডা হতো। কখনো আজমের চিটাগাং হোটেলে, কখনো আমার বাসায়, আবার কখনো ফিরোজ সাঁইয়ের ওখানে। কখনো টিএসসিতে, কখনো রমনা বটমূলে। আড্ডা চলতই। আমাদের আড্ডাবাজি খুবই স্ট্রং ছিল। আমরা রাত-বিরাতে সারা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াতাম। তখন যাত্রামঞ্চ ছিল। গানও হতো, যাত্রাও হতো। গান হতো আগে। আমরা ওখানে গান গাইতাম। আমরাই তো তখন! যাত্রাগানের পর আড্ডা মারতাম। কাজী হাবলু ছিল, ফকির আলমগীর পরে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে, জানে আলম এসেছে, পিলু মমতাজ দাওয়াত দিত। আড্ডাগুলো হতো বেশির ভাগই মজা করা। গানের আলাপ ১০ শতাংশ হতো, বাদবাকি ব্যক্তিগত আড্ডা। আজম তার মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা শোনাত। আমি মনে করি, আমাদের আড্ডা নিয়ে মান্না দের ‘কফি হাউস’-এর মতো একটা গান হওয়া দরকার।

 

আপনার ব্যক্তিজীবনের কথা জানতে চাই।

আমার জন্ম ২৬ মার্চ ১৯৫৩; ঢাকায়। পৈতৃক নিবাস বিক্রমপুর। পরিবারে এক ছেলে—হাবীব ওয়াহিদ। আর আছে গিন্নি—হাবিবের মা। আমাদের ছোট্ট সংসার। মা-বাবা চলে গেছেন! বাবা গেছেন ১৯৮৪ সালে; মা ২০০৫ সালে। বাবা মরহুম ওয়াহিদ উদ্দিন আহমেদ। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গেলে এখনো ওনার ছবি দেখতে পাবেন। তিনি তখনকার সময়ে বিরাট লঞ্চ ব্যবসায়ী ছিলেন। মা একেবারেই গৃহিণী ছিলেন। আমরা ছয় ভাই, তিন বোন। আমার পিঠাপিঠি বড় ভাই খসরু ওয়াহিদও গান করেন। ‘তোরা প্রেম করিস না, জীবনে ভালোবাসিস না’—এটা আমাদের দুই ভাইয়ের প্রথম ডুয়েট গান। সুপার-ডুপার হিট গান। রেডিওতে খুব বাজত। আরেকটি বিষয়, আমি যখন ক্লাস থ্রি-ফোরে পড়ি, ব্রিটিশ কাউন্সিলে আমার মায়ের পরিচালনায় একটি পারিবারিক নাটকে অভিনয় করেছিলাম।

 

আপনি তো নাটক-সিনেমা পরিচালনাও করেছেন?

এরই মধ্যে তিনটি টেলিফিল্ম পরিচালনা করেছি—‘ডেঞ্জার ম্যান’, ‘কয়েদি’ ও ‘দুরন্ত অভিযান’। একটি ফিচার ফিল্ম করেছি—‘কুসুমপুরের গল্প’। আরো ২০-২৫টি টিভি নাটক, কিছু শর্টফিল্ম আর তিনটা সিনেমা বানানোর ইচ্ছা আছে। এ জীবনে দেড় হাজারের মতো গান গেয়েছি। এ বছরের শুরুতেই একটি পণ করেছি—২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর আর গান করব না। যদি করতেই হয়, যাচাই-বাছাই করে করব। আর সম্মানী চাইব আকাশছোঁয়া। সেই টাকা আমাদের গরিব-দুঃখীর ফান্ডে চলে যাবে, তাদের চিকিত্সা সহায়তায়। এ সময়ের মধ্যে বেছে বেছে আরো ২০-৩০টি অডিও গান গাওয়ার ইচ্ছা আছে।

 

দীর্ঘজীবন গানে কাটানোর পর আপনার অনুভূতি কী?

আমার অনুভূতি ফিফটি-ফিফটি। অর্ধেক পাওয়া আর অর্ধেক না পাওয়া। সমষ্টিগতভাবে মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, সেটিই প্রাপ্তি। আর বাকি অর্ধেকের বেলায় বলব, আমার পুরস্কারভাগ্য ভালো না। এটি আমার দুঃখ না, কষ্টও না; শুধু চোখ মেলে চেয়ে থাকা!

শ্রতলিখন : মাসুদ রানা আশিক

(তেজগাঁও, ঢাকা; ৩০ নভেম্বর ২০১৮)



মন্তব্য