kalerkantho


পাশের মানুষদেরও অচেনা লাগত

নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নীপা। নৃত্য পরিবেশনা ও নির্দেশনার গুণগত মান এবং নৃত্যশিল্পী তৈরিতে বিশেষ অবদানের জন্য শিল্পকলায় পেয়েছেন একুশে পদক। তাঁর পথচলার গল্প শুনেছেন শেখ মেহেদী হাসান। ছবি তুলেছেন রাজীন চৌধুরী

১৬ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



পাশের মানুষদেরও অচেনা লাগত

একুশে পদক প্রাপ্তি আপনার দায়িত্ব আরো বাড়িয়ে দিল।

এই প্রাপ্তি শুধু আমার একার নয়; এর ভাগীদার নাচের সঙ্গে যুক্ত সব মানুষ। তবে আমি মনে করি, সম্মাননা অনেক সময় নিজের অক্ষমতাকে তুলে ধরে! মনে হয়, যেটুকু পেয়েছি, ততটা কি দিতে পেরেছি? পদকটি আমার কাছে অবশ্যই সম্মানের। শুধু নাচ করে যে ভালোবাসা পাই, সেটা রক্ষা করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। নিজের অক্ষমতা ঢাকার জন্য, নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছি। পদক নিয়ে বাড়তি উচ্ছ্বাস নেই; বরং অবস্থানটি ধরে রাখার জন্য কষ্ট, দায়িত্ব ও ভয় বেড়ে গেছে। তবে আমি ভীষণ ভাগ্যবতী, আমাকে বেশির ভাগ মানুষই ভালোবাসেন। আর যাঁরা নিন্দা করেন, তাঁরাও আমার জন্য আশীর্বাদ। তাঁরা যেন কিছু বলতে না পারেন, সে জন্য নিজেকে অনেক বেশি শাণিত করতে হয়েছে আমাকে।

নাচ শুরুর দিনগুলোতে কতটুকু সামাজিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়েছে?

সমাজে তখন রক্ষণশীলতা ছিল ঠিকই, তবে এখন সে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আমি কিশোরগঞ্জের মানুষ। বাবা ছিলেন চিকিৎসক। তাঁকে সমাজের বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে চলতে হতো। স্কুল, কলেজসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। আমরা ভাই-বোনরা কেউ গান শিখতাম, কেউবা নাচ। বাবাকে অনেকেই টিপ্পনী কাটতেন, ‘আপনি একজন পেশাজীবী মানুষ, আর আপনার ছেলে-মেয়েরা নাচ-গান করছে। ওদের ভবিষ্যৎ কী? ওরা কি বাইজি হবে? ডাক্তার সাহেবের ছেলে-মেয়েরা এসব কাজ করে—ভাবাই যায় না!’ শত মানুষের প্রশ্ন হজম করে বাবা আমাদের প্রশ্রয় দিয়েছেন। আমি এখন বুঝি—কী কঠিন দায়িত্ব তিনি তখন পালন করে গেছেন। তাঁর চিন্তাকে আমি শ্রদ্ধা জানাই। আমার বড় বোন মনসুরা বেগমকে গান শেখাতেন পণ্ডিত মিথুন দে। তাঁকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকেই বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। সেই সাংস্কৃতিক বলয়ে আমরা বড় হয়েছি। আমাকে নাচ শেখাতেন সুশান্ত সাহা, কমল সরকার—তাঁরাও অত্যন্ত আন্তরিক ও উদার মানুষ ছিলেন। আমরা সবাই একটি পরিবারের মতো ছিলাম। তাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। একটি মফস্বল শহরে বড় হওয়া আমরা প্রতিটি ভাই-বোন সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় কাজ করছি; কেউ কেউ প্রতিষ্ঠিত হয়েছি—এটা সত্যি অবাক ব্যাপার।

 

মায়ের অবদান কেমন ছিল?

আম্মা-আব্বা দুজনই ভীষণ সহযোগিতা করেছেন। বড় ভাই আনোয়ার আমাকে মোটরসাইকেল চালিয়ে অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতেন। অনুষ্ঠান শেষ হলে আবার বাড়িতে নিয়ে আসতেন। আমার বোন নাজমা বেগম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। স্কলারশিপের টাকা দিয়ে আমার নাচের গয়না, পোশাক কিনে দিতেন তিনি। তখন মনে হতো ভাই-বোন তো এ কাজটি করবেই। আজ বুঝতে পারি, ওই কাজগুলো কত প্রেরণাদায়ক ছিল। মহৎ ছিল। অন্যদিকে আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে বোঝাপড়া ও পৃষ্ঠপোষকতার মানসিকতা ছিল।

 

খুব ছোটবেলায় নৃত্যানুষ্ঠানে অংশ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন।

আমি তখন নবম শ্রেণিতে পড়ি। শিল্পকলা একাডেমির একটি নৃত্যানুষ্ঠানে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছিলাম। শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার তখন পারফর্মিং আর্টসে ছিলেন। তখন একটা ফোক ফেস্টিভ্যাল হতো। বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পীরা সেখানে নৃত্যনাট্য পরিবেশন করত। আমি ‘মহুয়া’ নৃত্যনাট্য নিয়ে সেখানে অংশগ্রহণ করতে এসেছিলাম। তখন মুস্তাফা মনোয়ার আমাকে সিলেক্ট করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘বর্ণালী’ অনুষ্ঠানের কথাও মনে পড়ে। সেদিন মঞ্চে নাচ শেষ করে আমি গ্রিনরুমে এসে দাঁড়াতেই শ্রদ্ধেয় নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুন আমাকে খুঁজতে এলেন। আলী যাকের এসে বললেন, ‘তোমার পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ হয়েছি।’ আমাকে আলাদাভাবে ডেকে তাঁরা উৎসাহিত করলেন। ওই ঘটনাগুলো আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করেছে। তারপর সরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে মিয়ানমার সফরে যাওয়ার সুযোগ পেলাম। বিদেশ সফরের সুযোগ পেয়ে আমার জীবনে ভীষণ পরিবর্তন এলো। রাহিজা খানম ঝুনু আমাদের নাচের কম্পোজিশন তুলে দিয়েছিলেন। তিনি এক দিন জানতে চাইলেন, ‘কোথায় বাড়ি?’ বললাম, কিশোরগঞ্জ। তাঁর শ্বশুরবাড়ি ছিল ময়মনসিংহ। তিনি বললেন, ‘ঢাকায় কবে আসবে? তুমি তো ভালো নাচ করো। তোমার অনেক সম্ভাবনা আছে।’ তাঁর কথা আমাকে ভাবিয়ে তুলল। আমি মফস্বল শহরের মেয়ে, আমার নাচ দেখে সবাই ভালো বলছে। এই প্রশংসা শুনে সিদ্ধান্ত নিলাম, নৃত্যশিল্পী হিসেবে আমাকে প্রতিষ্ঠা পেতেই হবে।

 

পারফর্মিং আর্ট সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন কখন?

কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে আমি বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নাচ শিখেছি। আমার বোনরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী মহিলা কলেজে ভর্তি হলাম। এরপর তো পারফর্মিং আর্টসে শিল্পী হিসেবে যোগ দিলাম। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে। এর উদ্দেশ্য ছিল সারা দেশে পেশাদার শিল্পী তৈরি করা। এখানে নাচ, গান, যন্ত্রসংগীত শেখার সুযোগ ছিল। এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমার জীবনের মোড় ঘুরে গেল। তবে এখানে চাকরিতে ঢুকেছি বলে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিল। তখন স্টেজ প্রগ্রাম হতো বেশ রাতে। রাত ১১টার আগে কোনো অনুষ্ঠান শুরু হতো না। অনুষ্ঠান শেষ হলে আমাদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হতো। আমি বোনের বাসায় থাকতাম। রাত করে বাড়ি ফেরায় কেউ আমাকে সাপোর্ট করেনি। আমরা কাজ করতাম মুস্তাফা মনোয়ারের অধীনে। তিনি ভীষণ প্রফেশনাল মানুষ। আমার ওপর নির্ভর করতেন। তাঁর প্রায় সব কম্পোজিশনে আমাকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, ‘আমি শিল্পী চিনতে ভুল করি না। এখানে অনেকেই নাচ করে, একদিন দেখবে তোমার নাচ সবাই দেখছে।’ এই মহান মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা থেকে পরিবারকেও কিছু বলতে পারতাম না। তা ছাড়া আমার তো তখনো জানা ছিল না, একদিন সত্যি সফল হতে পারব। তখন আমার জার্নিটা মাত্র শুরু হচ্ছে। আমাকে নিয়ে হয়তো এখন অনেকেই গর্ব করেন; কিন্তু একজন শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া আমার জন্য খুব কঠিন ছিল।

 

নাচের কারণে একাডেমিক পড়াশোনায় কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল কিনা?

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আমি পড়াশোনা করতাম আর্ট কলেজে (চারুকলা অনুষদ)। নৃত্যচর্চায় এতখানি নিবেদিতপ্রাণ ছিলাম, একাডেমিক পড়াশোনার চেয়ে নৃত্যবিষয়ক পড়াশোনা, প্রশিক্ষণকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।

 

বুলবুল ললিতকলা একাডেমির দিনগুলো কেমন ছিল?

বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (বাফা) ছিল নাচ শেখার প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে পারফর্মিং আর্টস ছিল শেখার পাশাপাশি পেশাদার শিল্পী হিসেবে চাকরি করার জায়গা। এ নিয়ে বুলবুল ললিতকলা একাডেমির শিল্পীরা আমাদের খুব একটা ভালো চোখে দেখতেন না। বাফার এক সদস্য একবার আমার বাসায় এসে অভিযোগ জানালেন, ‘আপনারা ঠিক করছেন না, মেয়েকে নাচ শেখাবার আগেই চাকরি করাচ্ছেন’ ইত্যাদি। আমি এসব পাত্তা দিইনি। আমি যখন নৃত্যচর্চাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই, তখন পাশের মানুষদেরও অচেনা লাগত। ভাই-বোনরা অনেকেই বিরোধিতা করেছেন। সে বিরোধিতা নিশ্চয় ভালোর জন্যই ছিল। তার পরও ওই কষ্ট সহ্য করা সহজ ছিল না। আমার মনে সাহস ছিল এই মাধ্যমে আমি প্রতিষ্ঠিত হতে পারব।

 

আপনার মনের জোর ছিল।

মনের জোরেই তো সব বাধা সামলে নিয়েছি। কষ্টের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, শুধু প্রতিভা বা সম্ভাবনা থাকলে হবে না, প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। শিল্পের প্রতি সৎ থাকতে হবে। আমরা কঠোর পরিশ্রম ও শৃঙ্খলা চর্চার রূপটি মঞ্চে তুলে ধরি। দর্শকের চোখ ফাঁকি দেওয়া যায় না। অনেক পরিশ্রমের পর যখন মঞ্চে পারফরম্যান্স করে দর্শকের প্রশংসা শুনি, তখন আনন্দ পাই। এ জন্য আমরা যারা নাচ, গান, যন্ত্রসংগীত শিখি বা চর্চা করি, তাদের মনে গভীর আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে।

 

দেশের বাইরে কখনো নাচের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন?

দেশের বাইরে দিল্লিতে পণ্ডিত বিরজু মহারাজের কাছে কত্থক, শান্তিবালা সিনহার কাছে মণিপুরী, সানি মহাপাত্রের কাছে ওড়িশি এবং চায়না পারফর্মিং আর্টস একাডেমিতে কোরিওগ্রাফির কোর্স সম্পন্ন করেছি।

 

নিজের চড়াই-উতরাইয়ের এমন একটি গল্প শোনাবেন, যা আগে কখনো বলেননি?

আমি অভিনেত্রী হতে পারতাম। বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল হতে পারতাম। প্রচুর নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব পেয়েছি। লাখ লাখ টাকার প্রস্তাব সেগুলো। সাড়া দিইনি। আমাদের শিল্পীদের মধ্যে অনেকেই নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, বিজ্ঞাপনে মডেল হন, আবার নাচও করছেন। এতে তাঁরা কোনো কাজ শুদ্ধভাবে করতে পারেন না। বেলা শেষে তাঁরা সাধারণত কোনো মাধ্যমেই সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারেন না। অথচ একেবারে ছোটবেলায়ই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নাচ ছাড়া কিছুই করব না। যদিও বাংলাদেশ টেলিভিশনের খ্যাতিমান নির্মাতা আবদুল্লাহ আল মামুন, মোস্তাফিজুর রহমান, আতিকুল হক চৌধুরীর অনুরোধে শখের বসে টেলিভিশনে কিছু নাটকে অভিনয় করেছিলাম, তবে নাচই সব সময় আমার ধ্যানজ্ঞান। মনে পড়ে, আবদুল্লাহ আল মামুন এক দিন চিঠি লিখে পাঠালেন, ‘আমার নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে যাঁর অভিনয় করার কথা, তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তোমাকে বেদের মেয়ের একটি চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। আমার বিশ্বাস, তুমিই পারবে।’ শুটিংয়ের দিনক্ষণ, সব আয়োজন প্রস্তুত। আমি অভিনয় না করলে সব আয়োজন নষ্ট হয়ে যাবে। তাই এক রাতের মধ্যে ওই চরিত্র মুখস্থ করে অভিনয়ে অংশ নিলাম। ওই কাজটি বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। অনেক সময় এমন অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে হয়েছে; কিন্তু এ প্রস্তাবগুলো এড়ানো ছিল নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করার মতো। এশিয়াটিক থেকে আসাদুজ্জামান নূর আমাকে একবার বললেন, ‘তোমাকে দিয়ে একটি মডেলিং করাব।’ তাঁর অনুরোধে রাজি হয়ে গেলাম। লাক্সের একটি বিজ্ঞাপনের একমাত্র নৃত্যশিল্পী হিসেবে মডেল হলাম। এমন ডাক আরো অনেকবার পেয়েছি, কিন্তু মন সাড়া দেয়নি।

 

আপনি টেলিভিশন নাটকে কাজ করেছেন। নৃত্যবিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপনার সঙ্গেও যুক্ত আছেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে অন্তত পঞ্চাশটি নাটকে অভিনয় করেছি। প্রথম অভিনয় করি আসকার ইবনে শাইখের ধারাবাহিক নাটক ‘নূরজাহান’র কেন্দ্রীয় চরিত্রে। তা ছাড়া বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড লাক্সের সেলিব্রিটি নৃত্য পরিবেশনাটিও পরিচালনা করেছি। এর পাশাপাশি ২০১১ সাল থেকে শিবলী মহম্মদের সঙ্গে বিটিভিতে ‘তারানা’ নামের একটি সাপ্তাহিক নৃত্যানুষ্ঠান উপস্থাপনা করছি।

 

পৃথিবীর বহু মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করেছেন। কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়েছে?

নৃত্যচর্চাকে আমি সিরিয়াসলি নিয়েছি। কখনো মনে হয়নি বিদেশে বেড়াতে যাচ্ছি। পৃথিবীর যে মঞ্চে নাচ করি না কেন, সেটি সম্পূর্ণ আনুগত্য দিয়ে, ভালোবেসে করার চেষ্টা করেছি। মনে পড়ে, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর পারিবারিক সমস্যার কারণে আমাদের এক শিল্পীকে তাত্ক্ষণিকভাবে দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল। তখন তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। আমি তখন জুনিয়র আর্টিস্ট। শিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ খুব ভরসা রেখে আমাকে বললেন, ‘নীপা, তুমি একবার চেষ্টা করে দেখো। আমার বিশ্বাস, তুমি চরিত্রটি করতে পারবে।’ আমি সে চরিত্রে নৃত্য পরিবেশন করেছিলাম।

 

নোবেল কনসার্টে আপনাদের পরিবেশনা বিশ্ববাসী দেখেছে।

আমি বিশ্বাস করি, আমার দেশ সবার ওপরে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর শিবলী মহম্মদ আর আমি তাঁকে অভিনন্দন জানাতে গিয়েছিলাম। তিনি বললেন, ‘আমার সঙ্গে যাবা নাকি তোমরা?’ তারপর আমরা যোগ দিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানজনক এক অনুষ্ঠানে। নোবেল কনসার্ট পৃথিবীর সব দেশের মানুষ উপভোগ করে। আমরাই এ অনুষ্ঠানে প্রথমবার নৃত্য পরিবেশন করেছি। রাস্তা দিয়ে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে যাচ্ছি, সবাই বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে চিত্কার করছে। হাত নেড়ে সম্মান জানাচ্ছে। সে এক অন্য অনুভূতি। সৌভাগ্যও বটে।

 

শিবলী মহম্মদের সঙ্গে জুটি বেঁধে প্রচুর কাজ করেছেন। তাঁর কাজের মূল্যায়ন জানতে চাই।

শিবলী মহম্মদ দিল্লিতে নাচ শিখেছেন বিশ্বখ্যাত কত্থক নৃত্যগুরু বিরজু মহারাজের কাছে। তিনি বাংলাদেশে আসার পর কত্থক নৃত্য পরিবেশনা ও কম্পোজিশনে কিছুটা হলেও গুণগত পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন। তিনি গুণী শিল্পী। আমরা একসঙ্গে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরি করেছি। দেশে-বিদেশে বহু পরিবেশনায় অংশ নিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য একসঙ্গে কাজ করে দেশকে ভালো কিছু দেওয়া। আমরা যখন দেশে বা দেশের বাইরে অনুষ্ঠান করতে যাই, তখন তারকাখ্যাতি তো দূরের কথা, নিজেদের পরিচয় পর্যন্ত ভুলে যাই। তখন মাথায় শুধু দেশের সম্মানের কথাটাই ঘোরে। তাই মনপ্রাণ উজাড় করে কাজ করি।

 

আপনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ নৃত্যনাট্যে অংশগ্রহণ করেছেন এবং নির্দেশনা দিয়েছেন।

আমার ধারণা, আমার চেয়ে বেশি নৃত্যনাট্যে অংশগ্রহণ আর কেউ করেনি। শ্রদ্ধেয় গওহর জামিল, জি এ মান্নান, আলতামাস আহমেদ, রাহিজা খানম ঝুনু, রওশন জামিল, আল্পনা মুমতাজসহ অনেকের নির্দেশনায় নৃত্য পরিবেশন করেছি। তাঁদের নৃত্যনাট্যের নায়িকা আমি। আমি কিন্তু গওহর জামিলের স্টুডেন্ট না। তার পরও তাঁর নির্দেশনায় ‘সামান্য ক্ষতি’ নৃত্যনাট্যে নৃত্য পরিবেশন করেছি। জি এ মান্নানের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’সহ বহু নৃত্যনাট্যে অংশ নিয়েছি। অনেক সিনিয়র শিল্পী আনন্দ নিয়ে আমার সঙ্গে গ্রুপে নেচেছেন। মানুষের ভালোবাসায় সেটা সম্ভব হয়েছে। হয়তো আমাদের জ্যেষ্ঠ নৃত্যগুরুরা আমার ওপর আস্থা রাখতেন, এ জন্য আমাকে সুযোগ দিতেন। আর আমি যখন নৃত্য নির্দেশনায় এলাম, তখন অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। আমি সব সময় আমার কম্পোজিশনগুলোতে নান্দনিক সৌকর্য সুনিপুণভাবে বজায় রাখার চেষ্টা করি। পারফর্মিং আর্টস কিন্তু সার্টিফিকেট দিয়ে হয় না। মঞ্চে মানুষ আমার নাচ দেখে, এ জন্য আমাকে বিশুদ্ধভাবে তৈরি হতে হয়। কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে আমি নিজেকে তৈরি করি, যা আমার নৃত্যনাট্যে প্রকাশ পায়। আমি কখনো দর্শকদের ফাঁকি দিই না। এ জন্য দর্শকরা আমাকে ভালোবাসেন। মনে পড়ে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে সরকারি চাকরি করতে গিয়ে কতজনের চক্ষুশূল যে হতে হয়েছে আমাকে! অনেকেই হয়তো ভেবেছেন, আমার হাত অনেক লম্বা, সবাইকে বশ করে রেখেছি। পরে অবশ্য কাজের ভেতর দিয়েই তাঁরা আমার প্রয়োজনীয়তা ঠিকই বুঝেছেন। নিন্দুকরাও স্বীকার করে নিয়েছেন, আমার নিষ্ঠার কোনো ত্রুটি ছিল না।

 

নাচ নিয়ে এ দেশের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আপনি আশাবাদী?

হ্যাঁ, উদ্যোগগুলোকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। সারা দেশে নাচ নিয়ে কাজ হচ্ছে, এটি ইতিবাচক। তবে এখন দরকার আরো মানসম্মত ও সুন্দর কিছু কাজ করা। কাজের পরিমাণের থেকে মানটা জরুরি। তা না হলে দর্শকরা হতাশ হবেন। আমাদের নাচ একটা সুন্দর জায়গায় পৌঁছেছে। এ জন্য আগের প্রজন্মকে কৃতজ্ঞতা জানাই। বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার কর্মকাণ্ডও উল্লেখযোগ্য। নতুন প্রজন্মের অনেকে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন।

 

নৃত্যাঞ্চল পারফর্মিং একাডেমি প্রতিষ্ঠা করার ভাবনাটি কখন এলো?

আমরা একবার ইতালিতে পারফরম্যান্স শেষে বাসে করে ফিরছিলাম। ড. মুহাম্মদ ইউনূসও ছিলেন আমাদের সঙ্গে। তিনি আমাদের পরিবেশনাটি দেখেছেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘তোমরা একটি স্কুল চালু কর। ছেলেমেয়েদের শেখাও।’ আমরা তাঁকে জানালাম, নৃত্য পরিবেশনার পাশাপাশি সংগঠন চালানোর মতো লোকবল নেই আমাদের। তিনি বললেন, ‘জাহাঙ্গীর (মুহাম্মদ ইউনূসের ভাই এবং সাংবাদিক ও শিক্ষক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর) দেখাশোনা করবে, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিবে।’ এর পর ২০০০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো নৃত্যাঞ্চল। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, শিবলী মুহম্মদ, আমি ও ছাত্রছাত্রীরা এই প্রতিষ্ঠানটিকে খুব ভালোবাসি। আমাদের বিশ্বাস, নৃত্যাঞ্চলের ছেলে-মেয়েরা আগামী দিনের নৃত্যচর্চার হাল ধরবে।

 

নৃত্যাঞ্চল নিয়ে ব্যস্ততা কেমন?

নাচ শেখানোর পাশাপাশি ছাত্রীদের নিয়ে নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছি। নৃত্যনাট্য ছাড়াও মঞ্চ ও টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছি। নৃত্যাঞ্চলের উদ্যোগে নৃত্যবিষয়ক কর্মশালা, আলোক নির্দেশনা, সেট ডিজাইন, পোশাক পরিকল্পনা, নৃত্যবিষয়ক বক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। আমাদের ১৫টি নিজস্ব ড্যান্স কম্পোজিশন রয়েছে। বিটিভির ‘তারানা’তেও নৃত্যাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পারফর্ম করছে। দেশে এবং দেশের বাইরেও কাজ করা হচ্ছে। এ ছাড়া সামনে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে আমাদের শিক্ষার্থীদের পারফর্ম করার কথা রয়েছে।

 

নৃত্যগ্রাম সম্পর্কে বলুন। কবে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে?

স্বপ্ন তো কেউ পরিকল্পনা করে দেখে না। এটা আমার একটা স্বপ্নের ইনস্টিটিউট। স্বপ্ন দেখি, একদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছেলে-মেয়েরা সেখানে শিখতে আসবে। ২৪ ঘণ্টা নাচে মগ্ন থাকবে। সেখান থেকে বছরে যদি দু-একজন শিল্পী বের হয়, তারা হবে দেশের নৃত্যাঙ্গনের সম্পদ। জানি না কবে শুরু করতে পারব; তবে আমি আশাবাদী, একদিন ঠিকই গড়ে উঠবে আমাদের স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠান।

(২২ অক্টোবর ২০১৮; মনিপুরীপাড়া, ঢাকা)



মন্তব্য