kalerkantho


জানার প্রতি দুর্নিবার আগ্রহ আমাকে সাহায্য করেছে

রূপালী চৌধুরী। বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। শিল্প খাতে অবদানের জন্য কমার্শিয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন (সিআইপি) হিসেবে সম্মানিত। স্বনামধন্য এই করপোরেট ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কথা বলেছেন রুদ্র আরিফ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



জানার প্রতি দুর্নিবার আগ্রহ আমাকে সাহায্য করেছে

কাজ তো কেউ একা করতে পারে না; টিম মেম্বার হয়েই করতে হয়। তবে নারী হওয়ার কারণে আমাকে কেউ বৈষম্যের শিকার করছে কি নাশুধু এ ব্যাপারেই নয়, বরং নিজের লিঙ্গপরিচয় নিয়ে আমি অতিরিক্ত রকমের সচেতন না হয়ে যেন উঠি, সে দিকটিও খেয়াল রেখেছি

করপোরেট জগতে কাজ করার ভাবনা কখন এলো?

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রিতে বিএসসি পাস করার পর, ১৯৮১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে ভর্তি হই। এখানে এমবিএ পড়ার সময় ভাবতে শুরু করি, পাস করে আমাকে কিছু একটা কাজ করতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। সুতরাং চাকরি করার ভাবনাটি এ সময়েই মাথায় এসেছে; তার আগে নয়। তবে করপোরেট জগতেই কাজ করব—এমন সুনির্দিষ্ট ভাবনা ছিল না। যেহেতু এমবিএতে আমার মেজর সাবজেক্ট ছিল মার্কেটিং, তাই এ বিষয়ে কোনো ভালো চাকরি খুঁজছিলাম।

 

কেমন ছিল চাকরি শুরুর দিনগুলো?

১৯৮৪ সালে এমবিএ পাস করার পর চার মাসের একটি ইন্টার্নশিপ করেছিলাম। সেটিই ছিল আমার একমাত্র প্রস্তুতি। সে বছরই চাকরিতে ঢুকি। প্রথম কর্মস্থল ‘সিবা গেইগি (বাংলাদেশ) লিমিটেড’ নামের একটি সুইস মাল্টিন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল কম্পানি। আমি যোগ দিয়েছিলাম প্ল্যানিং ইনফরমেশন অ্যান্ড কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্টে। আমার প্রথম দায়িত্ব ছিল ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) নিয়ে কাজ করা। বেশির ভাগ কাজই আমাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) তত্ত্বাবধানে করতে হতো। এ বিভাগে দু-তিন বছর কাজ করার পর প্রডাক্ট ম্যানেজমেন্ট বিভাগে বদলি হই। ১৯৯০ সালের শেষ দিকে, ব্র্যান্ড ম্যানেজার পদে থাকাকালে সেই কম্পানি ছেড়ে যোগ দিই ‘বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডে’। শুরুতে ছিলাম প্ল্যানিং ম্যানেজার। তবে পরে মার্কেটিং, সেলস, ডিস্ট্রিবিউশন, প্ল্যানিং ও সিস্টেমস—এসব নিয়ে সরাসরি কাজ করেছি। ছিলাম মার্কেটিং বিভাগের প্রধান, সিস্টেমস বিভাগের প্রধান, ডিরেক্টরস অব অপারেশনস। প্রডাকশনস, সাপ্লাই চেইন, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আর অ্যান্ড ডি)—পর্যায়ক্রমে এসব বিভাগেরও প্রধান ছিলাম। এরপর ২০০৮ সালের ১ জানুয়ারি এমডি হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছি।

 

এমডি হওয়ার পথে, এতগুলো ধাপ পার হতে নিজের কোন বৈশিষ্ট্যগুলো সাহায্য করেছে?

আমি মনে করি, যেকোনো লোকের সাফল্যের ক্ষেত্রে প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কন্টিনিউয়াস ডেভেলপমেন্ট। মানে নিজেকে প্রতিনিয়ত বিকশিত করা। ১৯৯০ সালে যে জ্ঞান নিয়ে বার্জারে এসেছিলাম, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলে আমি তো আর এগোতে পারতাম না, তাই না? সুতরাং প্রতিদিনই নতুন কোনো না কোনো কিছু শিখতে হচ্ছে। প্রতিদিনই আপডেট করতে হচ্ছে নিজেকে। তাই প্রতিনিয়ত জানাশোনা, আইডিয়া, বাস্তবায়ন, চিন্তাভাবনা এবং নতুন কিছু শেখার ও জানার প্রতি দুর্নিবার আগ্রহ আমাকে সাহায্য করেছে।

 

যখন শুরু করেছিলেন, আমাদের দেশের খুব বেশি নারী তখন করপোরেট জগতে ছিলেন না নিশ্চয়ই?

আইবিএতে আমাদের কয়েকজন সিনিয়র নারী শিক্ষার্থী ছিলেন, যাঁরা ব্যাংকে কিংবা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে কাজ করতেন। তবে সংখ্যায় খুব কম ছিলেন। ধরুন, আমাদের ব্যাচে ২৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মেয়ে ছিলেন মাত্র দুজন। সাধারণত প্রতি ব্যাচে চার-পাঁচজনের মতো নারী শিক্ষার্থী পড়তেন এখানে।

 

আপনাকে প্রেরণা দিয়েছেন কারা?

বাবা, ভাই, বন্ধু-বান্ধব এবং সে সময়ের বাগদত্তা ও পরবর্তী সময়ে স্বামী—এঁরা সবাই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। অন্যদিকে ভেতরের একটা তাড়না সব সময়ই ছিল। স্বীকার করছি, বার্জারের এমডি হবো—নারী হিসেবে এ রকম ভাবনা তখন ভাবতেও পারিনি। আমি স্রেফ কাজ করতে চেয়েছিলাম। ফলে যখনই যে কাজ পেয়েছি, চেষ্টা করেছি ভালোমতো করার।

 

শুধু নারী হওয়ার কারণে কতটুকু প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছেন?

আমি মনে করি, নারী হওয়ার প্রতিবন্ধকতাগুলো একটি পর্যায় পর্যন্তই থাকে। তারপর এটি আর বাধা হয়ে উঠতে পারে না। প্রথম যখন চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম, তখন অন্যদের মনে দ্বিধা নিশ্চয়ই ছিল—একটি মেয়ে প্রত্যেক পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে, সিনিয়র, সমপর্যায়ের ও জুনিয়রদের সঙ্গে কেমন আচরণ করছে, কতটুকু কমিউনিকেশন করতে পারছে ইত্যাদি। কারণ কাজ তো কেউ একা করতে পারে না; টিম মেম্বার হয়েই করতে হয়। তবে নারী হওয়ার কারণে আমাকে কেউ বৈষম্যের শিকার করছে কি না—শুধু এ ব্যাপারেই নয়, বরং নিজের লিঙ্গপরিচয় নিয়ে আমি যেন বাড়াবাড়ি রকমের সচেতন না হয়ে উঠি, সে দিকটিও খেয়াল রেখেছি। কেননা, আমি জানতাম, অতিরিক্ত মেয়েলি ভাব ধরলে অন্যরা হয়তো পেয়ে বসবে। যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করব, সবার আগে আমাকে একজন ‘ব্যক্তি’ হয়ে উঠতে হবে—এই ভাবনাটি আমার মধ্যে ছিল। অন্যদিকে, বাসায় বাবা, ভাইসহ অন্য পুরুষ সদস্যের সঙ্গে তো আমি কথা বলি। ফলে পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করার সময় কখনোই অস্বস্তি বোধ করিনি; বরং সহজ ও স্বাভাবিক থাকি। ‘আমি শুধুই নারী’—এ ধরনের অতিরিক্ত সচেতনতা অনুভব না করাটাও আমাকে সাহায্য করেছে।

আমার ধারণা, আমাকে কম্পানির এমডি করা হবে কি না—এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের একটি বাড়তি চিন্তা হয়তো ছিল। সেটি আমি পরে বুঝতে পেরেছি। কেননা, সিদ্ধান্ত নিতে সময়ক্ষেপণ করছিলেন তাঁরা। প্রত্যেকটি কারখানায় শ্রমিক থাকে, আমি তাদের সামলাতে পারব কি না—এ নিয়ে ওনাদের দ্বিধা ছিল। তবে মুখ ফুটে আমাকে কেউ কখনো এসব বলেননি। সে হিসেবে সে রকম কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়িনি; বরং যে কাজই করতে চেয়েছি, সেটি করতে পেরেছি। অন্যদিকে, ছোটখাটো অনেক প্রতিবন্ধকতা তো সব ক্ষেত্রেই থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো, অবকাঠামো না থাকার প্রতিবন্ধকতা। ধরুন, একজন নারী যখন মার্কেট ভিজিটে যায়, তাকে টয়লেট ব্যবহার করতে হয়, বাসযোগ্য পরিবেশে থাকতে হয়। এখানে নিরাপত্তার ব্যাপারটিও রয়েছে। তার সঙ্গে কোনো পুরুষ সহকর্মী না গেলে, তার সঙ্গে কোনো গাড়ি দেওয়া না হলে, সে কিন্তু যেতে পারবে না। এগুলো নারীদের ক্ষেত্রে একটু বাড়তি ঝামেলা। এটি সে সময় প্রবলভাবে ছিল।

 

প্রতিবন্ধকতাগুলো উতরে এসেছেন কিভাবে?

সহকর্মীরা সাহায্য না করলে কিছুতেই পারতাম না। আমি আগ্রহ দেখিয়েছি, যাব; তাঁরা সম্মতি দিয়েছেন। স্থানীয় অফিসারকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছেন। আমি তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গিয়েছি। আমাদের এমন জায়গায় থাকতে দেওয়া হয়েছে, যেটি যথেষ্ট নিরাপদ। এক কথায় বললে, সবার সম্মিলিত সহযোগিতা না থাকলে কারো পক্ষেই আগানো সম্ভব নয়।

 

এক দশক ধরে এমডির দায়িত্ব পালন করছেন। আপনার শক্তির জায়গা কোনটি?

আমি আসলে মানুষকে খুব ভালোবাসি। লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে, আলোচনা করতে আমার ভালো লাগে। অন্যদের কাছ থেকে আমি এনার্জি নিই। আমার শক্তির জায়গা হলো, নিজেকে সব সময়ই আপডেটেড রাখি। যেকোনো লিডারের জন্যই এটি জরুরি ব্যাপার। দায়িত্ব নেওয়ার সময় আমার স্বপ্ন ছিল, প্রতি চার-পাঁচ বছরের মধ্যে আমাদের ব্যাবসায়িক অবস্থার দ্বিগুণ উন্নতি ঘটানো। ভোক্তাদের শতভাগ সন্তুষ্টি অর্জন করতে চেয়েছি আমি। শুধু পেইন্টের মধ্যেই নয়, এর বাইরেও ব্যবসার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। অন্যদিকে আমাদের প্রত্যেক সহকর্মী যেন আনন্দে থাকেন—অন্তর থেকে সেই স্বপ্নও লালন করে এসেছি।

 

সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে করপোরেট কর্মকাণ্ডের বাইরে কতটুকু ভূমিকা রাখছেন?

২০-২১ বছর ধরে আমরা ‘বার্জার ইয়ং পেইন্টারস আর্ট কম্পিটিশন’ আয়োজন করে আসছি। আমি এমডি হওয়ার পর কার্যতালিকায় অটিস্টিক শিশুদের জন্য নতুন কর্মসূচি সংযুক্ত করেছি। ওদের জন্য পরিচালিত অনেক স্কুলকে আমরা নানাভাবে সহযোগিতা করি। আবার এই শিশুদের জন্য একটি আর্ট কম্পিটিশনের আয়োজন ও সেটির এক্সিবিশন করে থাকি। এ ছাড়া তরুণ আর্কিটেকচার শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করেছি স্কলারশিপের ব্যবস্থা।

 

আপনার কর্মজীবনে বাঁক বদল ঘটিয়ে দেওয়ার মতো কোনো বিশেষ ঘটনা মনে পড়ে?

একবার ভেবেছিলাম, বিদেশে গিয়ে ক্যারিয়ার গড়ব। ফলে অল্প কিছুদিনের জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম। আসলে চাকরি ছাড়ার আগে একটু দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম। সন্তানদের দেখভাল করা, ওদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া এবং আরো বেশি সময় দেওয়া—সব মিলিয়ে একজন ‘ভালো মা’ হওয়াই শ্রেয় মনে হয়েছিল তখন। তারপর এই যে হঠাত্ করে চাকরি ছেড়ে দিলাম, এই যে বিদেশে গিয়ে কিছুদিন থাকলাম, তখন একটা শূন্যতা অনুভূতি হলো আমার। মনে হলো, কী যেন হারিয়ে গেছে! পরে ফিরে এসে সিদ্ধান্ত নিলাম, আর কোনো দিন চাকরি ছাড়ব না। কেননা, বিয়ের আগে থেকেই চাকরি করি বলে এটি আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

 

একটি টার্ম প্রায়ই শোনা যায়—করপোরেট কালচার। এটিকে আপনি কিভাবে দেখেন?

করপোরেট কালচার খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা, প্রত্যেক কর্মী সকালে কাজে আসেন, তাঁদের জেগে থাকার ৮০ শতাংশ সময় এ নিয়েই কাটান। সুতরাং কর্মক্ষেত্রে তাঁদের জন্য রোমাঞ্চকর অনুভবের পরিবেশ তৈরি করা আমাদের জন্য খুবই জরুরি। তাঁরা যেন নিজেদের চার দেয়ালে বন্দি না ভাবেন। কারণ, আমি জানি, বিশ্ববিদ্যালয়ের খোলা পরিবেশ থেকে কর্মজীবনে এসে, অফিসের কোনো রুমে বা ডেস্কে বসে কাজ করা খুবই চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। ফলে তাঁরা যেন আনন্দ নিয়ে কাজের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেন, যেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে খোলামনে কথা বলতে পারেন—সেদিকে আমরা নজর রাখি।

 

করপোরেট ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজ প্রতিষ্ঠানের বাইরেও অনেক দায়িত্ব সামলিয়েছেন।

২০১৩-১৭ দুই মেয়াদে ‘ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির’ (এফআইসিসিআই) প্রেসিডেন্ট ছিলাম। এ সময় বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য যতটা সম্ভব বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত ও অনুপ্রাণিত করেছি। ২৫ নভেম্বর ২০১৩ থেকে ৩১ জুলাই ২০১৭ সাল পর্যন্ত ছিলাম ‘এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড অ্যান্ড এসএমসি হোল্ডিংসের’ ডিরেক্টর। এ ছাড়া দায়িত্ব পালন করেছি ‘ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের’ ইনডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর (২০০৯-১৪) ও ‘বাংলাদেশ পেইন্ট ম্যানুফ্যাকচারস অ্যাসোশিয়েশনের’ প্রেসিডেন্ট (২০১৩) হিসেবে। অন্যদিকে এখন ‘প্রথম আলো ট্রাস্টি বোর্ডের’ ভাইস চেয়ারম্যান, ‘সূর্যের হাসি গ্রুপের’ ডিরেক্টর ও ‘বাটা শু কম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের’ নমিনি ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি আরো কিছু সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত আছি।

 

সংগঠক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

সংগঠক হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতে গেলে দুই রকম ব্যাপারই ঘটে—কিছু শেখা ও কিছু শেখানো। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন করপোরেট সিদ্ধান্ত নিতে নিজের অভিজ্ঞতাকে আমি কাজে লাগাই। আবার অন্যদের কাছ থেকেও শিখি। একটি প্রতিষ্ঠানে এমডির পক্ষে পদাধিকারবলে অনেক কাজই করানো সম্ভব। অন্যদিকে, আপনি যখন কোনো সামাজিক সংগঠন পরিচালনা করবেন, তখন পদাধিকারবলে কাউকে দিয়ে কাজ করানো যাবে না। কেননা, সেখানে সবাই সমান। এ ক্ষেত্রে এই দলটিকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের দক্ষতার, ভিন্ন ধরনের নেতৃত্বের দরকার পড়ে। সুতরাং নেতৃত্বের যে স্টাইলে আমি বার্জারের এমডি হিসেবে কাজ করি, সেই একই স্টাইলে এফআইসিসির প্রেসিডেন্ট হতে পারব না। তার মানে, সংগঠনের প্রয়োজনে আপনাকে নেতৃত্বের ধরন বদলাতে হবে।

 

এই দীর্ঘ জার্নিতে নিজের সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনটি?

একই প্রতিষ্ঠানে এমডি হিসেবে ১০ বছর ধরে টিকে আছি—এটিকে যদি কেউ সফলতা হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে বলব, কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারাই আমার প্রকৃত সাফল্য। কারণ এটি আমাদের সমাজে অনেক বড় একটি সংকট। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট শেষ করে এই যে নতুন নতুন জনশক্তি চাকরির বাজারে আসছে, তাদের কোনো না কোনোভাবে পথ দেখাতে হবে। নিজের ছোটখাটো প্রচেষ্টায় এ ক্ষেত্রে অল্প হলেও অবদান রাখতে পেরে আমি আনন্দিত।

 

ব্যর্থতার পাল্লায় যদি নিজেকে মাপতে চান?

একজন এমডিকে তাঁর টিমের সাহায্যে নিজের স্ট্র্যাটেজিগুলোর বাস্তবায়ন ঘটাতে হয়। আমি যা স্বপ্ন দেখছি, একেবারেই আজকে চাকরিতে যোগ দেওয়া একজন কর্মীও একই স্বপ্ন দেখবেন, একই চিন্তা করবেন—এটি হয়তো সবাই চায়। কিন্তু কাজের সময় দেখা যায়, একেক মানুষের নেতৃত্বগুণ একেক রকম। তাদের কর্মশক্তিও এক রকম নয়। ফলে সেটির শতভাগ ব্যবহার ঘটানো সম্ভব নয়। তাই আমরা যে জিনিসটি চাই, সেটি কখনো কখনো শতভাগ বাস্তবায়ন করতে না পারাটা বেদনার ব্যাপার।

 

আপনার ব্যক্তিজীবনের কথা বলুন। শৈশব-কৈশোর কেমন কেটেছে?

আমার জন্ম ১৯৬০ সালের ১৩ আগস্ট। বাবা ডা. প্রিয়দর্শন চৌধুরী। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করেছেন। দেশে ফেরত এসেছেন অনেক পরে। এসেই এলাকার সাধারণ মানুষের চিকিত্সা দিতেন বলে অনেকে তাঁকে বলত, এক টাকা কি দুই টাকা ফির ডাক্তার! সে সময় দক্ষিণ চট্টগ্রামে যে অল্প কয়েকজন এমবিবিএস ডাক্তার ছিলেন, বাবা তাঁদের অন্যতম। আমার এক ভাই ইঞ্জিনিয়ার, আরেকজন ব্যবসায়ী। দুই বোনের একজন মারা গেছেন, অন্যজন গৃহিণী। পরিবারে আমার অবস্থান চতুর্থ। ছোটবেলা কাটিয়েছি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা শহরে। সেখানকার শশঙ্কমালা প্রাইমারি স্কুল ও আবদুর রহমান গার্লস হাই স্কুলে পড়েছি। তার পরে পড়েছি চট্টগ্রাম গার্লস কলেজে। ছোটবেলার সেই ছোট শহরের সাংস্কৃতিক পরিবেশটি বেশ সমৃদ্ধ ছিল। আমরা গান-বাজনাসহ স্কুলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতাম। বাসায় বই পড়ার ওপর খুব জোর দেওয়া হতো। সুতরাং পাঠ্য বইয়ের বাইরে সাহিত্য ও ম্যাগাজিন পড়া—এ জগতের সঙ্গে ভালো একটি সম্পর্ক ছিল। আমি মনে করি, একজন মানুষের শৈশব সমৃদ্ধ হলে বাকি জীবনটাও সম্ভবত স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভালো হতে থাকে! শৈশব অভিজ্ঞতার আলোকে যে আত্মবিশ্বাস জড়ো হয়, সেটি একজন মানুষকে অনেক দূর এগিয়ে দিতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ আমার সেই শৈশব-কৈশোরের সেরা ঘটনা—মুক্তিযুদ্ধ।

 

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো কেমন ছিল?

আমার বয়স তখন ১১-১২ বছর। ছিলাম পটিয়াতেই। এপ্রিলের কোনো এক দিন আমাদের শহরে প্রথমবার বোমাবর্ষণ হলো। নিরাপত্তার খাতিরে শহর থেকে অনেক দূরে, গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হলো আমাদের। মেয়ে ছিলাম বলে, এক বাড়িতে প্রতিদিন রাখা হতো না। আমার বড় ভাই তখন ঢাকার নটর ডেম কলেজে পড়তেন। তিনি আটকা পড়লেন। কোথায় আছেন, কেমন আছেন—কোনো খবর জানি না। গ্রামের চারদিকে আগুন জ্বলছে, সারাক্ষণ কেউ না কেউ গৃহহারা হচ্ছে, কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে, কাউকে না কাউকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে...। ভয়ংকর আতঙ্কের মধ্যে কাটছিল দিনগুলো। সারাক্ষণ রেডিওতে কান পেতে রাখতাম। এরই মধ্যে এক দিন রাজাকারের মাধ্যমে আমার বাবাকে গ্রাম থেকে শহরে ধরে নিয়ে গেলেন পাকিস্তানি আর্মির এক মেজর। তাঁকে বলা হলো, ‘আপনি তো হিন্দু না, বৌদ্ধ; আপনার কোনো ক্ষতি করব না। আপনি চেম্বারে বসছেন না কেন?’ ফলে নিজের চেম্বারে বসতে বাধ্য হলেন বাবা। রাতের বেলা গোপনে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ দিতেন। আমরা শহরে যাওয়ার সাহস না করলেও, দাদি ছিলেন পটিয়ার বাসায়। পরাজয় নিশ্চিত জেনে ১১ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা দুদিকে গুলি করতে করতে শহর ছাড়ছিল। এত গোলাগুলির শব্দে দাদি আতঙ্কিত হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আমাদের বাসার পাশেই ছিল পুকুর। সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তিনি।

 

একাত্তরের অভিজ্ঞতা আপনাকে পরবর্তী সময় কতটুকু প্রেরণা জুগিয়েছে?

সাংঘাতিকভাবে প্রেরণা জুগিয়েছে। আমি মনে করি, মুক্তিযুদ্ধ নিজেই একটা রেনেসাঁ। তখন বয়সের কারণেই এটির রাজনৈতিক গুরুত্ব অতটা বুঝতাম না। স্বাধীনতার পর যে পরিবেশে বড় হচ্ছিলাম, যেভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলছিল—আনন্দমুখর সেই অভিজ্ঞতা আমাদের প্রজন্মের কাছে সারা জীবনের প্রেরণা হয়ে রয়েছে। এই যে আজকে আমার অবস্থান, বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে কি এত দূর আসতে পারতাম?

 

বাংলাদেশ নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

বাংলাদেশের মানুষ নিয়ে আমি খুবই গর্বিত। তরুণদের নিয়েও গর্বিত। কারণ স্বাধীনতার আগে বলতে গেলে এ দেশে তেমন কিছুই ছিল না। যদিও এখনো বলার মতো তেমন কোনো রিসোর্স নেই; তবু ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর তৈরি হয়েছে। মেয়েরা কাজে আসছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের রয়েছে ট্রেইনেবল মেন্টালিটি এবং শেখার প্রচণ্ড আগ্রহ। এই যে বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন একটি জাতি, এরা যেকোনো কিছু সহজেই শিখে ফেলতে পারে। আমি বলব, যেখানে মানুষের শক্তি অনেক বেশি, সেখানে যেকোনো পরিবর্তন আনা অনেক সহজ হয়ে ওঠে। আবার যদি আমরা ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে না পারি, তাহলে এত বড় জনশক্তি কিন্তু অনেক বড় একটি বোঝায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়ে যায়। তবে সামগ্রিকভাবে যেহেতু আমরা এত দূর আসতে পেরেছি, তাই আমি খুবই আশাবাদী।

 

বিশ্ববিদ্যালয়জীবন কেমন ছিল?

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন কেটেছে শহর থেকে দূরে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এক পরিবেশে। সন্ধ্যাবেলা বন্ধুরা মিলে পাহাড়ে হাঁটতে বের হওয়া কিংবা কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে যাওয়া—ভীষণ রঙিন ছিল দিনগুলো। আমাদের প্রতিটি দিনই ছিল আনন্দের। তবে হোস্টেলে থাকতাম বলে খাওয়াদাওয়ার একটু কষ্ট ছিল। আমি বিশ্বাস করি, হোস্টেলে না থাকলে জীবনের একটি বিশেষ দিক পুরোটাই অন্ধকার থেকে যায়! তাই শিক্ষার্থীদের উচিত কিছু সময়ের জন্য হলেও মা-বাবার সান্নিধ্যের বাইরে, একা একা জীবন কাটানো শেখা। তাহলে আপনাকে একা সব সমস্যার সমাধান করতে হবে। খাবারদাবার থেকে শুরু করে নিজেকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা—এককথায় স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য এটি খুবই চমত্কার একটি ট্রেনিং। সেটি পরবর্তী সময় কর্ম ও সংসারজীবনে খুবই কাজে লাগে।

 

আপনার সংসারজীবনের কথা বলুন।

আমি বিয়ে করেছি ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯। স্বামী কবি সিদ্ধার্থ হক (আবদুল হক)। তিনিও করপোরেট ব্যক্তিত্ব। কবিরা যেহেতু খুবই সৃজনশীল মানুষ, তাঁরা সব কিছুকে একটু অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন, তাঁদের সব কিছুতেই মানবিক দিকটির প্রকাশ থাকে। যদিও সৃজনশীল লোকের সঙ্গে সংসার করাই কঠিন, তবে একই সঙ্গে তাঁরা যে অন্য রকম চিন্তাভাবনা করেন—এ বিষয়টি আমার ভালো লাগে। অন্যদিকে সন্তান হওয়ার পর একজন নারীর পক্ষে ক্যারিয়ার গড়া কঠিন হয়ে ওঠে। বাচ্চাদের বড় করা, সঙ্গ দেওয়া এবং একই সঙ্গে চাকরি সামলানো—যেকোনো কর্মজীবী নারীকেই ১০-১২ বছর একটি দুরূহ লড়াইয়ে পড়ে যেতে হয়। এই টানাপড়েন ও চাপের কারণে অনেকেই চাকরি ছেড়ে দেন। এদিক থেকে আমি সৌভাগ্যবতী। কেননা আমার দুই সন্তানকে বড় করার ক্ষেত্রে ননদ, শাশুড়ি, মা, ভাই-বোন, এমনকি পাড়া-প্রতিবেশীও আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন।

 

অবসর পেলে কী করেন?

গান শোনা, বই পড়া, সিনেমা দেখা—এই তিনটি কাজ আমার খুব ভালো লাগে। রবীন্দ্রসংগীত থেকে শুরু করে ইংরেজি—বিভিন্ন ধরনের গান শুনি। কোন গান শুনব—এটি নির্ভর করে মনমর্জির ওপর। অনেক ধরনের সিনেমাই ভালো লাগে। ইদানীং নেটফ্লিক্সে অনেক নতুন পরিচালকের সিনেমা দেখি। তবে পরিচালকের চেয়ে বরং অভিনেতা দেখেই সিনেমা দেখি বেশি। রবার্ট ডি নিরো, জ্যাকি চ্যান, টম হ্যাংকস—এদের অনেকের অভিনয় আমার প্রিয়। একটা সময় পর্যন্ত প্রচুর বাংলা উপন্যাস পড়েছি। করপোরেট জগতে প্রবেশ করার পর এত বেশি অফিশিয়াল রিপোর্ট, এত বেশি নিউজপেপার ইত্যাদি পড়ছি, ফিকশন পড়ার খুব একটা সময় পাচ্ছি না।

(১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮; উত্তরা, ঢাকা)

 



মন্তব্য