kalerkantho


নিজেকে সব সময় একই রকম দেখতে ভালো লাগে না

মাকসুদুল হক। বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক ইতিহাসের অন্যতম অগ্রপথিক। জন্মদিন সামনে রেখে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন রুদ্র আরিফ ও ইশতিয়াক হাসান। ছবি তুলেছেন মোহাম্মদ আসাদ

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০




নিজেকে সব সময় একই রকম দেখতে ভালো লাগে না

আজম খান মাঝেমধ্যে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আসতেন আমাদের গান শুনতে। এক দিন প্রগ্রাম শেষে রাতের বেলা রাস্তায় তাঁর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। একসময় তিনি বলে উঠলেন, ‘তুই বাংলা গানে আয়। এসব হোটেলফোটেল ছেড়ে রাস্তায় নাম, ফাইট দে...!’ উন্নাসিক ভাব নিয়ে আমি জবাব দিলাম, ‘গুরু, বাংলা গানটান আমাকে দিয়ে হবে না!’ শুনেই ঠাস করে এক চড় মেরে বসলেন! আসলে আমাকে খুব আদর করতেন তিনি। কথায় কথায় বলতেন, ‘ফাইট দিতে হবে, আরেকটা মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে।’ মূলত তাঁর স্নেহেই বাংলা গানে মন দিয়েছি

 

 

আপনার গানের যাত্রা কখন শুরু?

আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জে। পড়াশোনার হাতেখড়ি নারায়ণগঞ্জ প্রিপারেটরি ইংলিশ স্কুলে। সেটি ছিল মিশনারি স্কুল। তখন আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন মিসেস হাবার্ট নামের এক স্কটিশ ভদ্রমহিলা। পিয়ানো বাজিয়ে গান শেখাতেন তিনি। তাঁর কাছেই প্রথম গান শিখেছি। আমার বয়স যখন চার-পাঁচ বছর, স্কুলের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলাম। সেটি ছিল ধর্মীয় সংগীত। সেই কোরাসের লিড অংশটি ছিল ১০ লাইনের মতো। প্রধান শিক্ষিকা সে অংশটি গাওয়ার জন্য আমাকেই মনোনীত করলেন। এ জন্য সাত দিন রিহার্সাল করেছিলাম আমরা। কিন্তু ভাগ্য খারাপ, অনুষ্ঠানের দিনই আমি প্রবল জ্বরে পড়লাম। তবু ওষুধ খেয়ে চলে গেলাম। পুরস্কার বিতরণীর সময় হঠাৎ আমার নাম ডাকা হলো। অবাক হলাম। যেহেতু আমি কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিইনি, তা ছাড়া ক্লাসের মেধাতালিকায় প্রথম থেকে তৃতীয় স্থানেরও অধিকারী নই, তাই কোনো ক্যাটাগরিতে আমার পুরস্কার পাওয়ার কথা নয়! পরে দেখলাম গানের জন্য বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। সেটিই মঞ্চে আমার প্রথম গান গাওয়া এবং প্রথম কোনো পুরস্কার পাওয়া। সেই থেকে আমার গানের যাত্রা শুরু।

কোন ধরনের গান শুনে বেড়ে উঠেছেন?

আমাদের বড় হয়ে ওঠার সময়ে বাসায় ইংরেজি ভাষার চর্চা ছিল। বাবা আমাদের জন্য ইংরেজি ম্যাগাজিন, কমিকস বুক ইত্যাদি নিয়ে আসতেন। সে সময়ে রেডিওতে সপ্তাহে এক দিন ‘টপ অব দ্য পপস’ নামে ইংরেজি গানের একটি অনুষ্ঠান হতো। খুব মন দিয়ে শুনতাম। এর মাধ্যমেই সারা বিশ্বের নতুন নতুন গানের সঙ্গে পরিচয় ঘটতে থাকে। ‘বিটলস’, ‘রোলিং স্টোনস’—এসব ব্যান্ডের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকি। শুধু যে ইংরেজি গান শুনতাম তা কিন্তু নয়। নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, লোকগীতি—এককথায় যেকোনো ধরনেরই গান শোনার আগ্রহ বাড়তে থাকল। গান শুনতে গিয়ে ছোটবেলায় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। আমরা সাধারণত যেখানেই থাকতাম, সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ফিরে আসতাম বাসায়। তারপর পড়তে বসতাম। এটিই ছিল রেওয়াজ; কিন্তু এক দিন সন্ধ্যার পর আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আসলে আমাদের বাসার তিনতলায় তখন একটি মাড়ওয়ারি পরিবার বাস করত। তাদের বাড়িতে কীর্তন হতো। কীর্তনের প্রতি খুব টান ছিল আমার। বাদ্যযন্ত্রগুলো কিভাবে বাজছে, লোকগুলো কিভাবে গাইছে—সেদিন তা মুগ্ধ হয়ে শুনতে শুনতে সেই বাসার এক কোনায় আনমনেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম!

ব্যান্ড মিউজিকের প্রতি আগ্রহী হলেন কখন?

মুক্তিযুদ্ধের পরপরই, ১৯৭৩-৭৪ সালে আমরা বন্ধুরা মিলে একটি শৌখিন ব্যান্ড দল গড়ে তুলেছিলাম—‘ফিয়াস্কো’। তত দিনে নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে চলে এসেছি। এরপর ১৯৭৫-৭৬ সালের ঘটনা। মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় ‘আর্লি বার্ড’ নামে একটি স্থানীয় ব্যান্ড ছিল। একবার পল্লবী মাঠে তাদের একটি কনসার্ট ছিল। আমি গান গাই—এ কথা জেনে তাদের সঙ্গে পারফর্ম করতে ডাক পড়ল। তিন-চারটি গান করলাম—বাংলা ও ইংরেজি। এলাকায় বেশ নামডাক হলো। সেটিই ব্যান্ডের হয়ে আমার প্রথম কোনো কনসার্টে গাওয়া। সেই থেকে আর্লি বার্ডের সদস্য হয়ে গেলাম। কলেজের ক্লাস শেষ করে মালিবাগ চলে যাওয়া, দীর্ঘ সময় ধরে রিহার্সাল—রুটিন হয়ে উঠেছিল তখন। ব্যান্ডটির হয়ে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানেও পারফর্ম করেছি।

ফিডব্যাকে যোগ দিলেন কবে?

‘ফিডব্যাক’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৬ সালে। তখন ব্যান্ডটির ভোকাল ছিলেন জাকিউর রহমান জাকির। একদিন তাদের সারা রাত ধরে একটি কনসার্টে গান গাওয়ার কথা। একজন ভোকালের (ব্যান্ডের গায়ক) পক্ষে সারা রাত গান গাওয়া নিশ্চয়ই খুব দুরূহ ব্যাপার। তাই আমাকে ডেকে নেওয়া হলো। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমি ও জাকির ১০টি করে গান গাইলাম সেই কনসার্টে। সে বছরেরই শেষের দিকে, এক দিন ফিডব্যাকের কয়েক সদস্য আমার খোঁজে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে হাজির। আমার তখন ক্লাস চলছিল। প্রথমে ভাবলাম, হয়তো এবারও কোনো কনসার্টে তাদের হয়ে গান গাইতে হবে। তাদের অপেক্ষা করতে বলে আমি ক্লাসে ঢুকলাম। ক্লাস শেষ করে এসে জানলাম, বৃত্তি পেয়ে রাশিয়ায় উচ্চশিক্ষা নিতে চলে যাচ্ছেন জাকির; তাই ভোকাল হিসেবে সেদিনই আমাকে ব্যান্ডটিতে যোগ দিতে হবে। আসলে সেই যে সারা রাতের কনসার্টটিতে আমি তাদের হয়ে গান গেয়েছিলাম, সেটি ছিল আমাকে তাদের বাজিয়ে দেখা! তখন অবশ্য বুঝতে পারিনি। যাই হোক, এভাবেই ফিডব্যাকে যোগ দিলাম। ফিডব্যাক তখন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিল। সপ্তাহে দুই দিন শো করতে হতো সেখানে।

তখন তো ইংরেজি গান গাইতেন। বাংলা গানে কখন এলেন?

১৯৭৬ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছর হোটেলটিতে নিয়মিত গান করেছি আমরা। মাঝেমধ্যে অনুরোধ এলে বাংলা গানও গাইতাম; এই যেমন—‘নীল মনিহার’, ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’...। তবে তা কালেভদ্রে। এদিকে এ সময়ে সারা দুনিয়ার প্রায় ৩০০টি ইংরেজি গান গাইতে হয়েছে আমাকে। এত ধরনের গান গেয়ে, এত ধরনের মিউজিক চর্চা করে, গানের ক্ষেত্রে আমার শৈল্পিক উত্কর্ষ গড়ে উঠতে থাকল। ফলে যখন বাংলা গান করতে শুরু করলাম, তখন সব কিছুতেই পশ্চিমা সংগীতের ধাঁচ ফুটে উঠত। সম্ভবত এ কারণেই আমার মধ্যে শ্রোতারা ভিন্নতা খুঁজে পেয়েছিল। যাই হোক, ফিডব্যাকের প্রথম অ্যালবাম প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে ‘ফিডব্যাক ভলিউম-১’। বাংলা গানের প্রতি আমার উদাসীনতা তখনো অব্যাহত ছিল! সেই অ্যালবামে আমি তাই একটি গানও গাইনি; অ্যালবামটিতে আমার কোনো উপস্থিতি নেই। এরই মধ্যে এক দিন একটি বিশেষ ঘটনা ঘটল। আজম খান মাঝেমধ্যে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আসতেন, আমাদের গান শুনতে। এক দিন প্রগ্রাম শেষে রাতের বেলা রাস্তায় তাঁর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। একসময় তিনি বলে উঠলেন, ‘তুই বাংলা গানে আয়। এসব হোটেলফোটেল ছেড়ে রাস্তায় নাম, ফাইট দে...!’ উন্নাসিক ভাব নিয়ে আমি জবাব দিলাম, ‘গুরু, বাংলা গানটান আমাকে দিয়ে হবে না!’ শুনেই ঠাস করে এক চড় মেরে বসলেন! আসলে আমাকে খুব আদর করতেন তিনি। কথায় কথায় বলতেন, ‘ফাইট দিতে হবে, আরেকটা মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে।’ মূলত তাঁর স্নেহেই বাংলা গানে মন দিয়েছি।

প্রথম দিকের গান কোনগুলো?

‘মৌসুমি-১’ দিয়েই আমার বাংলা গানের যাত্রা শুরু। গানটি কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা। অন্যদিকে এরই মধ্যে ‘চিঠি’ ও ‘মাঝি’ লিখে ফেলেছি। এসব গান নিয়ে ১৯৮৭ সালে ফিডব্যাকের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘উল্লাস’ বাজারে আসে। অ্যালবামটিতে আমরা নিজেদের কোনো ছবি ব্যবহার করিনি। কেননা তখন ব্যান্ড মিউজিকের বিরুদ্ধে বেশ জোরালো নেতিবাচক প্রচারণা চালাত একটি বিশেষ গোষ্ঠী। তারা বলত, এ নাকি অপসংস্কৃতি! ফলে অ্যালবামটি নিয়ে আমরা বেশ আশঙ্কায় ছিলাম। তবে শ্রোতাদের মধ্যে দ্রুতই সাড়া ফেলে দিয়েছিল এটি। এতে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৯০ সালে আমরা পরবর্তী অ্যালবাম ‘মেলা’ প্রকাশ করি।

বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক ইতিহাসে এই অ্যালবামের টাইটেল সংটি একটি মাইলফলক।

‘মেলা’ নিয়ে কী বলব? এই গানটির প্রতি আমার এখন আর ভালোবাসা নেই! এক ধরনের বিরক্তি চলে এসেছে। ‘মেলা’ ছাড়াও অনেক ভালো গান করেছি আমরা। অথচ এটি একটি দানব হয়ে উঠেছে! এই দানবকে কিন্তু নতুন করে তৈরি করা যাবে না। ‘মেলা’র মতো আরেকটি গান করে ওঠা সম্ভব হবে না আর কখনো।

দানব হয়ে ওঠা বলতে আপনি নিশ্চয়ই গানটির অপার শক্তির কথাই বোঝাচ্ছেন?

ঠিক ধরেছেন! খেয়াল করে দেখবেন, আমার কোনো গানই একটি অন্যটির মতো নয়। যেমন ‘গীতিকবিতা’। এটির সিকোয়েন্সগুলোর একটির সঙ্গে অন্যটির মিল নেই। আমি ভিন্নতা পছন্দ করি। তাই আরেকটি ‘মেলা’ সৃষ্টির কথা কোনো দিনই ভাবিনি। এ গানটির ভাবনা আমার মাথায় এসেছিল নববর্ষকে ঘিরে। আমাদের রণসংগীত আছে, জাতীয় সংগীত আছে, অনেক ধরনের বিশেষ সংগীতই হয়তো আছে, কিন্তু কোনো উৎসব সংগীত ছিল না। ‘মেলা’ই সম্ভবত আমাদের একমাত্র উৎসব সংগীত।

ছোটবেলা থেকেই ছায়ানটের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তখন ঢাকায় ব্যাপক পরিসরে পহেলা বৈশাখ একমাত্র রমনা বটমূলেই হতো। গ্রামগুলোতে সরগরম হলেও ঢাকায় বৈশাখী মেলা ছিল নিষ্প্রাণ। আমার মনে হলো, বৈশাখী উৎসবে মানুষের ঢল নামাতে হবে। এই মেলার মাধ্যমে আমরা অনেক কিছু বলতে পারব—এমন ভাবনা থেকেই গানটি তৈরি করেছি। আমার বিশ্বাস, এই গানের মাধ্যমে মানুষের সব ইন্দ্রিয় ছুঁয়ে যেতে পেরেছি; যেমন ধরুন, ‘পলাশ শিমুল গাছে লেগেছে আগুন’ কিংবা ‘বিদেশি সুগন্ধি মেখে আজ প্রেমের কথা বলা...’। এখানে আমরা রং দেখাচ্ছি; আবার ঘ্রাণ শোঁকাচ্ছি। এমনকি জাগাতে পেরেছি আবেগও। আমি বিশ্বাস করি, মানুষের আবেগ ও ইন্দ্রিয়কে জাগ্রত করতে পারলে একটি গানের পক্ষে দীর্ঘায়ু লাভ করা সম্ভব হয়ে ওঠে। এ কারণেই ‘মেলা’ এমন শক্তি হয়ে উঠতে পেরেছে।

ব্যান্ড মিউজিকে আপনি প্রচুর নিরীক্ষা করেছেন। বাউলদের নিয়ে কাজ করেছেন। ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’র পর ফিডব্যাকের অ্যালবাম ‘বাউলিয়ানা’। ফোক গানের ফিউশন করার এই তাড়না কোথায় পেলেন?

এদিক থেকে আমি বোধ হয় একটু সুবিধাবাদী! বাঙালি সংস্কৃতি অনেক সরস উপাদানে ভরা। আমি একজন দেশপ্রেমিক বাঙালি। খেয়াল করে দেখলাম, বাংলা ক্যালেন্ডারে নতুন একটি শতাব্দী আসছে ১৪০০ সাল। এ নিয়ে শতবর্ষ আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতা লিখে গেছেন ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে’; অথচ এমন একটি মুহূর্তকে স্বাগত জানানোর মতো তেমন কোনো আয়োজন নেই। তাই ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত আমাদের অ্যালবামটির নাম রাখলাম, ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’। বলা যেতে পারে, গানে গানে নতুন শতাব্দীকে বরণ করে নেওয়ার এ এক উদ্যোগ। এরপর ভাবলাম বাঙালির গৌরবময় ঐতিহ্যের কথা। লালন শাহের মতো একজন কিংবদন্তি আমাদেরই গানের মানুষ, অথচ আমরা বাউল-ফকিরদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি! মনে হলো, এমনটা চলতে পারে না। তাই দিনের পর দিন আমি দেশের নানা প্রান্তে ছুটে বেরিয়েছি, বাউলদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি, বিস্ময়ভরা কান নিয়ে শুনেছি তাঁদের গান। নিজেদের ব্যান্ড মিউজিকের মেজাজে বাউল গানের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে দেখেছি, যেটিকে অনেকেই ফিউশন বলে ডাকে। এরই ফসল ‘বাউলিয়ানা’। এখন তো তথাকথিত ফিউশনের ছড়াছড়ি। অনেকে বুঝে, অনেকে না বুঝেই তা করছেন। আমরা চেষ্টা করেছি, অন্তর থেকে উপলব্ধি করে ফিউশন করার, তা-ও আজ থেকে ২২ বছর আগে।

আমি কিন্তু পোশাকি বাউল নই। বেশির ভাগ মানুষই আকাশে ওঠার চেষ্টা করে; মানে তারার কাছাকাছি চলে যেতে চায়। আর আমি চাই এই খাঁটি মাটির যত কাছাকাছি থাকা যায়। এই মাটির নিচে সোনা আছে, নাকি হীরা, নাকি রুপা—এগুলো গবেষণা করে অন্যদের দেখাতে চাই। এটিই তো বাউলসংগীত। একেকটি হীরার টুকরা যেন! ‘করি মানা কাম ছাড়ে না’—এই গানটি হীরার টুকরা নয় কি?

‘বাউলিয়ানা’র জন্য এ রকম একেকটি গানের ফিউশন করার আগে, নিজেদের মতো গেয়ে উঠার আগে বিভিন্ন বাউল সাধকের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করেছি। তারপর তাঁদের অনুমতি নিয়েই করেছি কাজটি। দেখেছি, বাউল গান গাওয়া, বাউল দর্শন বোঝা খুব সহজ। আর সহজ থাকাটা সব সময়ই অতি জটিল ব্যাপার। আবার জটিল হওয়াটা অতি সহজ! এই সহজে যে কী জটিলতা আছে, ভেতরে না ঢুকলে বোঝা যাবে না। সেটি বুঝতে গিয়েই সাধকদের সঙ্গে ৪০টি বছর কাটিয়ে দিলাম। এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি, এখনো সাধকদের পর্যায়ে যেতে পারিনি; শুধু চেষ্টা করে যাচ্ছি।

ফিডব্যাক ও মাকসুদ—অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিল। ছাড়লেন কেন?

ব্যান্ড দলে ভাঙন ধরা কোনো নতুন ঘটনা নয়। এর পেছনে সাধারণত আর্থিক জটিলতা কলকাঠি নাড়ে। তবে আমার ফিডব্যাক ছাড়ার সঙ্গে টাকার কোনো সম্পর্ক নেই। শুধুই টাকার জন্য গান আমি কোনো দিন করিনি। অন্যদিকে ফিডব্যাকের সদস্যরা আমার বন্ধু হলেও নানা কারণে একসঙ্গে আর চলা যাচ্ছিল না। মূলত বাউলদের নিয়ে কাজ করার প্রতি এক প্রবল ঝোঁক পেয়ে বসেছিল আমাকে। শহুরে আয়েশি জীবন ছেড়ে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টি-রোদে, খেয়ে-না খেয়ে শত শত বাউলের সঙ্গে মেশা, তাঁদের সঙ্গে ভাববিনিময় ফিডব্যাকের মতো জনপ্রিয় একটি ব্যান্ডে থেকে এমনটা আর করা যাচ্ছিল না। একসময় মনে হলো, সরে যাওয়াই ভালো।

ফিডব্যাক ছাড়া নিয়ে পত্রপত্রিকায় যখন উল্টাপাল্টা লেখালেখি হচ্ছিল, আজম খান একদিন ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই ফিডব্যাক ছেড়ে দিলি কেন? তোর সমস্যা কী?’ তাঁকে বোঝালাম, জোর করে তো প্রেম হয় না; এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসতে হয়। অনেকক্ষণ ধরে মন দিয়ে আমার যুক্তি শুনলেন। তিনি আমার আদর্শ। আমার গুরু। অনেক বিপদে-আপদে আমাকে পরামর্শ দিয়েছেন। আমার কথা তিনি বুঝলেন; তাই আর কিছু বললেন না। মূলত নিজের মতো কাজ করার ইচ্ছা থেকেই ফিডব্যাক ছেড়ে ‘মাকসুদ ও ঢাকা’ গড়ে তুলেছি।

এ ব্যান্ডের হয়ে রাজনীতিসচেতন ‘(অ)প্রাপ্তবয়স্কের... নিষিদ্ধ’ অ্যালবামটি প্রকাশ করার পর আপনি আবার বাঁকবদল করলেন। আপনার কাছ থেকে শ্রোতারা পেল জ্যাজ ফিউশন অ্যালবাম ‘ওগো ভালোবাসা’।

১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘(অ)প্রাপ্তবয়স্কের...নিষিদ্ধ’ অ্যালবামটিতে আমি খুব স্পষ্টভাবে তরুণ প্রজন্মের কাছে কিছু বার্তা রেখে যেতে চেয়েছি। মেগা হিট এই অ্যালবামটির জন্য তখন নানা আলোচনা-সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে। এখনো যখন বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে তরুণ প্রজন্মের কানে অ্যালবামের গানগুলো বাজে, আমার খুব ভালো লাগে। আমি বিশ্বাস করি, কোনো গান যদি মানুষের কানে ঠিকমতো ছোঁয়ানো যায়, তাহলে সেটি টিকে যেতে বাধ্য। এর তিন বছর পর, ‘নিষিদ্ধ’র চেয়ে একেবারেই আলাদা ধাঁচের গান নিয়ে ‘ওগো ভালোবাসা’ কেন করলাম, সে কথা হয়তো অনেকেরই অজানা। আসলে তখন ইংরেজি নতুন শতাব্দী সামনে। খেয়াল করে দেখলাম, সারা পৃথিবী দীর্ঘকাল ধরে জ্যাজ ফিউশনে আচ্ছন্ন হয়ে থাকলেও এ ধারায় কোনো বাংলা গান হয়নি। যদি বিদেশি কোনো বন্ধু, কোনো বিদেশি শ্রোতা টিপ্পনী কেটে বলে, ‘তোমরা তো জ্যাজ মিউজিক শিখেছ এক শতাব্দী পর!’ তাই সেই শতাব্দীতেই জ্যাজ ফিউশনের সৃষ্টি করেছিলাম ‘ওগো ভালোবাসা’। আসলে ব্যান্ড মিউজিকের জনপ্রিয় গায়ক হওয়ার লোভ আমার কোনো দিনই ছিল না; বরং বাংলা ব্যান্ড মিউজিকে নানা ধারার গানের সমাবেশ ঘটাতে চেয়েছি।

আপনার গানের মধ্যে ‘গীতিকবিতা’ একটি বিশেষ সৃষ্টি। এই সিরিজ গানের অনুপ্রেরণা কী?

আমি আমার গানে ও লেখায় নিজের বিশ্বাসেরই প্রতিনিধিত্ব করি। যা বিশ্বাস করি না, তা নিয়ে কথা বলি না। যা কিছু আমার বাস্তবজীবনে ঘটেছে, সেগুলো নিয়েই ‘গীতিকবিতা’। শুধু পার্থক্য হলো, গানে গানে লেখা এ কবিতাগুলো বই আকারে মুদ্রিত না হয়ে গান হয়ে বাজছে। তবু এগুলো মূলত কবিতাই। অবশ্য গীতিকার ও কবির মধ্যে পার্থক্য অনেক। কবিদের লেখার মধ্যে আমি শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানই করেছি। খুবই কঠিন ছিল এ কাজ। কেননা, কবিদের একটি ব্যাপক সম্মানের জায়গা রয়েছে। তাই গানে গানে কবিতা লিখতে গিয়ে আমি যা কিছুই করেছি, তাতে সুন্দর কোনো বার্তা দিতে চেয়েছি। ফলে ‘গীতিকবিতা’ আমার জীবনের একটি বিশেষ পর্যায়।

শুরুর দিকে ‘অপসংস্কৃতি’ তকমা দিয়ে ব্যান্ড মিউজিককে প্রবলভাবে হেয় করা হতো। এই প্রচারণার বিরুদ্ধে জোরালো লড়াই করা প্রথম প্রজন্মের আপনি একজন প্রতিনিধি।

নিজেদের সংস্কৃতির প্রতিপালক গণ্য করা এক ধরনের মুরব্বি ছিলেন তখনকার সময়ে যাঁরা এ রকম প্রচারণা চালাতেন। তাঁদের আমি ডাকি ‘সংস্কৃতির শকুন’! শকুনের মতো খবরদারি করাই যেন তাঁদের কাজ। তাঁরা সব সময়ই তরুণ প্রজন্মকে আড়চোখে দেখে অভ্যস্ত। এই যেমন এখন তাঁরাই ‘ফেসবুক’ নিয়ে, ছেলে-মেয়েদের পশ্চিমা ঢঙে কথা বলা নিয়ে হৈচৈ করেন; অথচ সংস্কৃতি কোনো স্থবির জিনিস নয়, এটি একেবারে সাগরের মতো। এর ঢেউ বিভিন্ন তীরে গিয়ে ধাক্কা খাবে। নতুন করে তৈরি হবে। ভাঙবে, আবার গড়বে। এভাবেই এগিয়ে যায় সংস্কৃতির স্রোত। আমার ধারণা, ব্যান্ড মিউজিকের বিরুদ্ধে সেসব অপপ্রচারের অনেকটাই কেটে গেছে এখন। তবে অবস্থার উন্নতি হলেও সৃজনশীল তরুণ প্রজন্মকে সেইসব শকুনের বিরুদ্ধে সব সময়ই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

আপনি ভীষণ রাজনীতিসচেতন। শুধু গানই নয়, আপনার লেখালেখিতেও সেটির ছাপ স্পষ্ট।

‘মেলা’ গানটির আগে প্রথম যে দুটি গান লিখেছি, তার একটি ‘স্বদেশ’, অন্যটি ‘জন্মেছি এই যুগে’। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সে সময়ে এমন গানের কথা ভাবাই যেত না। তবু আমার উদ্দেশ্য ছিল তরুণ প্রজন্মকে অধিকারের প্রশ্নে খেপিয়ে তোলা। আমি জানি, অসাধু ভাষা দিয়ে মানুষকে খুব সহজেই উদ্বুদ্ধ করা যায়। কিন্তু একটি ভালো কথা দিয়ে, ভালো চিন্তা দিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে চাইলে অনেক কষ্ট সইতে হয়। সেই কষ্টটা করতে আমি রাজি। মস্তিষ্কের ভেতরে রয়েছে আমার সারা জীবনের সঞ্চয়। সেগুলোকে ভালো কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা আমি সব সময়ই করেছি। গান লেখার পাশাপাশি লিখেছি কলাম, লিখেছি বই। ইংরেজি কবিতার বই ‘দ্য বাংলাদেশ : পোয়েট অব ইম্প্রায়রিটি’, ইংরেজি গবেষণা গ্রন্থ ‘বাউলিয়ানা : ওয়ারশিপিং দ্য গ্রেট গড ইন ম্যান’, বাংলায় প্রবন্ধগ্রন্থ ‘আমি বাংলাদেশের দালাল বলছি’ এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনের (বাম্বা) আপনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

১৯৮৭ সালের শুরুর দিকের ঘটনা। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তখন আমরা ছাড়াও ‘সোলস’ ও ‘মাইলস’ শো করত; তবে আলাদা আলাদা দিনে। সেখানেই ‘ফ্লাড এইড ফর বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি তিন দিনব্যাপী কনসার্ট আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কনসার্টটিতে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে শুরুতে আমরা রাজি ছিলাম না। যৌথভাবে শো করা নিয়ে নিজেদের মধ্যে অনেক তর্ক-বিতর্ক হলো। কেননা, প্রত্যেক ব্যান্ডেরই আলাদা আলাদা সমর্থকগোষ্ঠী। আমাদের আশঙ্কা ছিল, যদি তাদের মধ্যে মারামারি লেগে যায়! তখন বড়জোর ১০-১২টি ব্যান্ড ছিল দেশে। সেই তিন দিনব্যাপী শোতে কোনো রকম গোলযোগ ছাড়াই যেন একসঙ্গে কাজ করতে পারি, এমন ভাবনা থেকে আমরা সারগাম স্টুডিওতে একটি সভা করলাম। সেখানে একটি সংগঠন করার আইডিয়া এলো। ‘বাম্বা’ নামটির প্রস্তাব দিলেন ‘রেনেসাঁ’র ফয়সাল সিদ্দিকী বগি। তিনিই সভাপতি হিসেবে আমার নামটি ঘোষণা করলেন, আমাকে একেবারেই চমকে দিয়ে। সেই দায়িত্ব আমি টানা ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পালন করেছি।

‘বাম্বা’ সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কনসার্ট করেছিল। সম্ভবত সেটিই বাংলাদেশ ব্যান্ড মিউজিকের প্রথম ওপেন এয়ার কনসার্ট।

এরশাদ সরকারের পতনের ছয় দিন পর, ১৯৯০ সালের ১৬ ডিসেম্বর, ‘বাম্বা’র আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই কনসার্ট। ৩০-৪০ হাজার দর্শকের সামনে ১২টি ব্যান্ড পারফর্ম করেছিল। আমরা কনসার্ট শেষ করেছিলাম শাহজাহান মুন্সীর পরিবেশনায় বাউলসংগীত দিয়ে। কেননা, ব্যান্ড মিউজিক যেকোনো অপসংস্কৃতি নয়, এ দেশের মাটি-হাওয়া-সংস্কৃতির সঙ্গে এর যে কোনো সংঘাত নেই—সেটি আমরা বোঝাতে চেয়েছিলাম।

চলচ্চিত্রেও গান গেয়েছেন আপনি। ‘অঞ্জলি’ চলচ্চিত্রের ‘তোমাকে দেখলে একবার...’ গানটি এখনো অনেকেরই প্রিয়। এরপর নিয়মিত প্লেব্যাক করেননি কেন?

এর পরও চলচ্চিত্রে কয়েকটি গান গেয়েছি, তবে সেগুলো এত সাড়া ফেলেনি। একসময় খেয়াল করলাম, হিন্দি গানের নকল করে গান তৈরি হচ্ছে এখানে। খুব বাজে ও সস্তা ধরনের লিরিক। তাই চলচ্চিত্রে গাইতে ইচ্ছা করেনি। অবশ্য দীর্ঘ বিরতির পর বছর দুয়েক আগে চলচ্চিত্রের জন্য আরেকটি গান গেয়েছি।

আপনি সব সময়ই ফ্যাশন সচেতন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনার পোশাক ও স্টাইলে পরিবর্তন আসে। এ বিষয়টি কি সচেতনভাবেই করেন?

ইংরেজিতে একটি কথা আছে—আপনি কী পোশাক পরছেন, সেটি নয়; বরং স্বয়ং আপনিই ফ্যাশন। তবে আমি সজ্ঞানে ফ্যাশন করি না। বরং ফ্যাশনই স্বজ্ঞানে আমার কাছে ধরা দেয়। আমি একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার চেষ্টা করি। চুল একটু ভিন্নভাবে কাটি। নিজেকে সব সময় একই রকম দেখতে আমার ভালো লাগে না। শুধু পোশাকেই নয়, বরং মিউজিকেও পরিবর্তন আনতে পছন্দ করি।

গীতিকার, সুরকার, লেখক, উপস্থাপক, গায়ক, গবেষক—অনেক পরিচয়। নিজের কোন পরিচয়টি আপনার কাছে বেশি অর্থবহ?

নিজেকে আমি একজন কমপ্লিট আর্টিস্ট বলে মনে করি। নিজের পরিবেশকে কিভাবে মনের মতো করে সাজাতে হবে—আমি তা জানি। আমার ঘরের সব কিছুই আমার নিজ হাতে সাজানো।

ব্যান্ড মিউজিকে এক সুদীর্ঘ জার্নি রয়েছে আপনার। বাংলাদেশের ব্যান্ড সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

নিশ্চিতভাবেই ব্যান্ড মিউজিকের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখি আমি; কিন্তু ব্যান্ড মিউজিক তো একা চলতে পারবে না। অস্তিত্বের প্রশ্নে, উপার্জনের প্রশ্নে গণমাধ্যম, শ্রোতাসহ অন্যদেরও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলা চাই। মানের প্রশ্নে আমাদের দেশের ব্যান্ড মিউজিক এই উপমহাদেশের শীর্ষস্থানে রয়েছে বলেই আমি বিশ্বাস করি; কিন্তু শিল্পী যদি না বাঁচে, তাহলে ব্যান্ডও বাঁচবে না। তাই শিল্পীর প্রাপ্য সম্মান ও সম্মানী দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রুতলিখন : মাসুদ রানা আশিক

(১৩ আগস্ট ২০১৮; পল্লবী, ঢাকা)



মন্তব্য