kalerkantho


‘লিখিস, গল্প লিখিস’

একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। শিক্ষকতায়ও তিনি রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। তাঁর ব্যক্তিজীবন ও সাহিত্যযাত্রার গল্প শুনেছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৭ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



‘লিখিস, গল্প লিখিস’

আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠার গল্পটি শুনতে চাই।

আমার জন্ম সিলেট শহরে, ১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি। মাঘ মাসের প্রচণ্ড শীতের সময় তখন। আমাদের ওখানে একটি কথা প্রচলিত আছে—যার শীতে জন্ম হয়, সে একটু আলসে হয়। কুঁড়ে হয়। আমিও একটু আলসে! এই আলস্যের সঙ্গে আমার ভালোবাসার সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও আমাকে প্রচুর কাজ করতে হয়। যদিও বিষয়টি একটু বড় হয়ে টের পেয়েছি। তবে আলস্যের সঙ্গে দায়িত্বশীলতার একটি দ্বন্দ্ব আমার ভেতরে সব সময় ছিল। আমার বাবা কাজ করতেন শিক্ষা বিভাগে, মা ছিলেন শিক্ষক। মা-বাবার বদলির চাকরি ছিল। আমরা ছিলাম সাত ভাই-বোন। আমার যখন পাঁচ-ছয় বছর বয়স, আমরা চলে গেলাম কুমিল্লায়। আমরা সেখানে চার বছর ছিলাম। ছোটবেলায় আমার অসুখবিসুখ লেগেই থাকত। এ জন্য একটু দেরিতেই স্কুলে পা রেখেছি। বাড়িতে মায়ের কাছেই পড়ালেখার হাতেখড়ি। তারপর ভর্তি হয়েছি কুমিল্লার এক পাঠশালায়। এরপর ১৯৬০ সালে আবার সিলেট চলে আসি আমরা। সেখানে প্রথমে ভর্তি হই দুর্গাকুমার পাঠশালায়, তারপর সরকারি স্কুলে। ইন্টারমিডিয়েট পাস করি সিলেট এমসি কলেজ থেকে। আমি ছিলাম বিজ্ঞানের ছাত্র। ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট—দুই পরীক্ষায়ই রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় লেটার মার্কস পেয়েছি। আমাদের সময় লেটার মার্কস পাওয়া ছিল খুব কঠিন ব্যাপার। তা ছাড়া বিজ্ঞানের প্রতি বেশ টানও ছিল আমার। বলা যায়, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হিসেবেই আমি গড়ে উঠেছিলাম। তাই আবেগতাড়িত না হয়ে, বরং সব কিছুর যুক্তিভিত্তিক বিচার-বিশ্লেষণ করতে ভালোবাসি।

 

বই পড়ার অভ্যাস কিভাবে তৈরি হলো?

বই পড়া ছিল আমাদের পারিবারিক রেওয়াজ। এ ছিল আনন্দের ব্যাপার, স্বস্তির ব্যাপার। পরিবারের কেউ যদি বই পড়ত, তাকে তখন অন্য কোনো কাজ দেওয়া হতো না। তখনকার দিনে কিন্তু ছোটদের অনেক কাজ করতে হতো। নিজের কাপড় ধোয়া, বাজার করা। তাই কখনো বাজার করতে ইচ্ছা না করলে কোনো একটি বই নিয়ে বসে যেতাম। আম্মা বলতেন, ‘আচ্ছা, ও বই পড়ছে, অন্য কাউকে পাঠাই।’ অন্যদিকে স্কুলের লাইব্রেরি থেকে প্রতি সপ্তাহে একটি করে বই নেওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। দেশ-বিদেশের উন্নতমানের প্রচুর বইয়ে সাজানো ছিল লাইব্রেরিটি। আরো ছিল একটি ইউএসআইএস লাইব্রেরি। আমেরিকান বই পাওয়া যেত সেখানে। ইংরেজি বই ছিল। কিছু বাংলা বইও ছিল। সেখান থেকে আমার ইংরেজি বই পড়ার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। আবার নিউজ কর্নার নামে সিলেট শহরের জিন্দাবাজারে একটি লাইব্রেরি ছিল। আমেরিকায় বার্নস অ্যান্ড নোবেল নামে একটি চেইন বুকশপ রয়েছে, যেখানে গিয়ে বই পড়া যায়, বই কেনা যায়। নিউজ কর্নার আমাদের কাছে ওই রকম ছিল। সেখানে গিয়ে যেকোনো বই নিয়ে দু-এক ঘণ্টা পড়ে আবার রেখে চলে আসা যেত। পড়ার জন্য প্রচুর জায়গা ছিল সেখানে। লাইব্রেরিটির মালিক জানতেন, আমাদের কাছে টাকা নেই। তিনি বলতেন, ‘যত্ন নিয়ে পড়ো, বই যেন না ছেঁড়ে। ছিঁড়লে টাকা দিতে হবে।’ আমরা বেশ যত্ন নিয়ে বই পড়তাম।

এ ছাড়া মা আমার জন্য স্কুল থেকে বই নিয়ে আসতেন। বাবার সংগ্রহেও অনেক বই ছিল। তিনি বই লিখতেনও। তাঁর লেখা ‘বড়দের লেখাপড়া’ ও ‘বড়দের ভূগোল’ নামে দুটি বই বাজারে ছিল। বই দুটি লিখে সে সময় তিনি পাঁচ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়েই সিলেট শহরে আমাদের জন্য বাড়ি কিনেছিলেন। এ কিন্তু এক অদ্ভুত ব্যাপার। এদিকে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে বিখ্যাত এক লাইব্রেরি ছিল। বাবা সেখানে বই দিয়েছিলেন বলে আমাদের ছিল প্রবেশাধিকার। এমসি কলেজের লাইব্রেরিটিও ছিল সমৃদ্ধ। আর রবীন্দ্রনাথ পাঠে আমার হাতেখড়ি হয় ব্রাহ্মসমাজ লাইব্রেরিতে।

 

মনে দাগ কেটে যাওয়া প্রথম বইটির কথা মনে আছে?

ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ইউএসআইএস লাইব্রেরি থেকে একটি বই নিয়েছিলাম। লরা ইঙ্গেলস ওয়াইল্ডারের ‘লিটল হাউস অন দ্য প্রেইরি’। এটি পরে ‘ঘাসের বনে ছোট্ট কুটির’ নামে বাংলায় অনূদিত হয়েছিল। পরে সেটি নিয়ে সিনেমাও হয়েছিল। সেই বয়সে এই বইটি আমাকে খুব টেনেছিল। এ ছাড়া জুলস ভার্নার ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’ বইটিও মনে দাগ কেটেছিল।

 

আপনার ইংরেজির ভিত্তি কেমন করে শুরু হলো?

নিউজ কর্নারে আমরা গিয়ে ইংরেজি বই পড়তাম। যেসব শব্দ বুঝতাম না, নিউজ কর্নারের মালিককে জিজ্ঞেস করলে অর্থ বলে দিতেন। যেটি জানতেন, বলে দিতেন; যেটি জানতেন না, অভিধান দেখে বলতেন। এ ছাড়া স্কুল-কলেজে পড়া ইংরেজি বইগুলো থেকেও শিখেছি। মফস্বলের এক বাংলামাধ্যম স্কুল থেকে উঠে এসে ইংরেজি শিখতে আমার কোনো সমস্যা হয়নি। এ ক্ষেত্রে আমার শিক্ষকদের অবদানও স্বীকার করতে চাই। আমাদের হামেদ আলী স্যার ছিলেন ব্রিটিশ কাউন্সিলের বল সাহেবের ছাত্র। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, কী করে সুন্দরভাবে ইংরেজি উচ্চারণগুলো করা যায়। ভুল উচ্চারণ করলেই পেটাতেন! আরো ছিলেন মইনুদ্দিন স্যার। অসাধারণভাবে ইংরেজি শেখাতেন তিনি। চেরাগ আলী স্যার, নাসির উদ্দিন স্যারও আমাদের ইংরেজি শিখিয়েছেন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির গল্পটি কেমন?

যেহেতু আমি বিজ্ঞানের ছাত্র, শখ ছিল রসায়ন পড়ার। আমাদের সময় লিখিত পরীক্ষা ছিল না, ইন্টারভিউ নিয়ে ভর্তি করানো হতো। আমি রসায়ন বিভাগে ভর্তি হতে গেলাম। বাস থেকে নামার সময় আমার শার্টের বোতাম ছিঁড়ে গিয়েছিল। ইন্টারভিউরুমে ঢুকতেই একজন শিক্ষক বললেন, ‘তুমি দেখি অভদ্র ছেলে!’ আমি বললাম, ‘স্যার, মাত্রই বাস থেকে নামতে গিয়ে শার্টের বোতামটি ছিঁড়ে গেছে।’ স্যার বললেন, ‘তুমি শুধু অভদ্রই নও, মিথ্যুকও!’ এ কথা শুনে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। বললাম, ‘স্যার, আমি এই বিভাগে পড়ব না। তবু আপনি আমাকে বিশ্বাস করুন। আমি মিথ্যা বলে বড় হইনি।’ স্যার আমাকে আরো অনেক বকাঝকা দিয়ে বের করে দিলেন। ইন্টারভিউ রুম থেকে মফিজুদ্দিন স্যার বের হয়ে এসে বললেন, ‘এই তুমি! এসো, ভর্তি হও!’ আমি বললাম, ‘স্যার, যিনি আমার মনের রসায়ন বুঝতে পারেননি, আমি তাঁর রসায়ন বিভাগে পড়বই না!’ এই বলে চলে এলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার উৎসাহ দমে গেল আমার।

 

তারপর কী হলো?

সেদিন বিকেলে আমি আমার মামা সৈয়দ মোহাম্মদ আলীর বাসায় গেলাম। সে সময় তিনি ব্যাংককের কোনো একটি পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতেন। পরবর্তীকালে ডেইলি স্টার পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। মামা জানতে চাইলেন, কী করব? আমি সকালের ঘটনা তাঁকে খুলে বললাম। জানালাম, সিলেটে ফিরে যাব। মামা বললেন, ‘রসায়নে পড়তেই হবে কেন? তুই ইংরেজি পড়। আমার সঙ্গে সাংবাদিক হবি।’ আমি বাবাকে চিঠি লিখে জানালাম, ইংরেজি পড়ব। বাবা সম্মতি দিলেন। মামা দারুণ খুশি হয়ে র্যাক থেকে নানার সংগ্রহের একটি ইংরেজি কবিতার বই উপহার দিলেন আমাকে। ফ্রান্সিস টার্নার পলগ্রেভের লেখা ‘গোল্ডেন ট্রেজারি’। তাতে নিজের হাতে মামা ইংরেজিতে এ কথাটি লিখে দিয়েছিলেন, ‘তুই ঠিক রাস্তায়ই বেছে নিয়েছিস। মামার আশীর্বাদ রইল।’ আমি তারপর সেই বইটি হাতে নিয়ে, ইংরেজি বিভাগ থেকে ভর্তির ফরম তুলে, ইন্টারভিউ দিয়ে ভর্তি হয়ে গেলাম।

 

ছাত্ররাজনীতিতে আপনার সংশ্লিষ্টতা কেমন ছিল?

ছাত্রসংগঠনগুলো তখন সেরা ছাত্রদেরই দলে ভেড়াতে চাইত। আমি প্রথমে ছাত্রলীগ করতে শুরু করলাম। তারপর জাসদে যোগ দিয়েছিলাম। জাসদ ছাত্রলীগের কমিটিতেও আমি ছিলাম। তবে রাজনৈতিক সক্রিয়তা খুব একটা ছিল না আমার। আমি থাকতাম সূর্যসেন হলে। ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছি বলে আমাকে হলের ভিপি পোস্টের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হলো। আমি তখন হল থেকে পালিয়ে চলে গেলাম! এই পোস্টটি আমি নিইনি; কেননা জানতাম, আমাকে দিয়ে প্রশাসনিক কাজ হবে না। এ জন্যই শিক্ষকজীবনেও আমি ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান আর ইন্টারন্যাশনাল হলের ওয়ার্ডেনের কাজ ছাড়া অন্য কোনো বাড়তি দায়িত্ব নিইনি কখনো। এখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের রাজনীতি দেখে আমার খুব খারাপ লাগে। দলভুক্ত হয়ে রাজনীতি করাকে আমার কাছে শিক্ষকতা নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বলে মনে হয়। ছাত্র অবস্থায় আমি কখনোই আমার কোনো শিক্ষককে দলীয় আনুগত্যের ভারে নুইয়ে পড়তে দেখিনি। অথচ এখন দেখছি, কোনো শিক্ষকই দলের সিদ্ধান্তের বাইরে একটুকুও যাচ্ছেন না!

 

সাংবাদিকতা করার ভাবনা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। সে পেশায় না গিয়ে শিক্ষক হলেন কেন?

ইংরেজিতে ভর্তি হয়ে আমি যখন প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম হচ্ছিলাম, তখন মনে হলো, শিক্ষকতা তো দারুণ পেশা! তখন জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আহসানুল হক, রাজিয়া খানম প্রমুখের মতো জাঁদরেল শিক্ষকদের সান্নিধ্য পেয়েছি। অনার্স পাস করার পর ঠিক করে ফেললাম, শিক্ষকই হব। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে মাস্টার্সের ফল বের হলো। এর কয়েক মাসের মধ্যেই শিক্ষকতায় ঢুকে গেলাম আমি। তবু মামার নিরন্তর প্রেরণায় সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছাটা জেগে থাকল। তাই প্রভাষক হওয়ার পরও আমি সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা কোর্স করতে সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু এখানকার শিক্ষকদের আচরণ ভালো লাগেনি বলে সেই পাঠে আমাকে ইতি টানতে হয়েছিল।

 

দাম্পত্যজীবনে প্রবেশ করলেন কখন?

আমি বিয়ে করি ১৯৭৬ সালের জুন মাসে। আমার স্ত্রী ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক বছরের জুনিয়র। আমাদের প্রেমের বিয়ে। তারপর তিনি আর ইংরেজিতে থাকলেন না; বরং হেলথ কমিউনিকেশন বিষয়ে পড়াশোনা করতে চলে গেলেন কানাডায়। কিছুদিন পরই আমিও কানাডা পাড়ি জমালাম পিএইচডি করার জন্য।

সাহিত্যের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন কোথায়?

আমার নানা সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন আমার সাহিত্যের অনুপ্রেরণা। ১৯৬৩ সালে তিনি আমাদের সিলেটের বাড়িতে এসে তিন দিন ছিলেন। ভীষণ আড্ডাবাজ মানুষ ছিলেন তিনি। এক ফাঁকে বুকে সাহস নিয়ে ‘শিক্ষক সমাচার’-এ ছাপা হওয়া আমার গল্পটা তাঁকে দেখিয়েছিলাম। তিনি খুব উৎসাহের সঙ্গে আমার চুল নাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘লিখিস, গল্প লিখিস।’

 

সে সময়ের সাহিত্য বলয়ের সঙ্গে আপনার পরিচয় ঘটে কিভাবে?

কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের সঙ্গে আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই পরিচয় ঘটে। তিনি তখন সিলেটের এমসি কলেজের শিক্ষক ছিলেন। ঢাকায় গিয়ে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পরামর্শ আমি তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। তারপর পরিচয় হলো শামসুর রাহমান, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, রশীদ করীম, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ও আল মাহমুদের মতো কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয়েও বেশ কয়েকজন সাহিত্যিক ছিলেন—কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা ও খোন্দকার আশরাফ হোসেন ছিলেন আমার এক বছরের সিনিয়র। আমরা আড্ডা দিতাম শরিফ মিয়ার ক্যান্টিনে। সেখানে কবি মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, সিকদার আমিনুল হক, কথাসাহিত্যিক কায়েস আহমেদ—এঁরা আসতেন। অন্যদিকে কবি হেলাল হাফিজ, শান্তনু কায়সার—এঁরা ছিলেন আমার বন্ধু। এভাবেই সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসাটা আরো গাঢ় হলো।

 

গল্পকার সত্তাটি তৈরি হলো কেমন করে?

সিলেটে, আমাদের পাড়ায় এক হিন্দু বিধবা নারী থাকতেন। আমরা তাঁকে দিদা বলে ডাকতাম। মাসে একদিন তিনি আমাদের গল্প শোনাতেন। গল্প বলার নিজস্ব একটি ভঙ্গিমা ছিল তাঁর। সুপারি ছিলতেন আর গল্প করতেন। মাঝখানে হুটকরে চুপ হয়ে গিয়ে অন্য কাজ করতে আরম্ভ করতেন। আমরা তাগাদা দিলে বলতেন, ‘আরে থাম, গল্প কখনো ফুরায় না!’ এই নারী কখনো কখনো আমাদের দিয়ে গল্প বলাতেন। সেই সময়টি বেশ মজার ছিল। আমার কোনো বন্ধু হয়তো রাজার ছেলে-মেয়ের মিলন ঘটিয়ে দিত। আবার আমি হয়তো তাদের মেরে ফেলতাম! আর এ নিয়ে বেশ ঝগড়া চলত। এই অভিজ্ঞতা থেকেই গল্পের একটি পাঠ আমি পেয়েছি। অন্যদিকে, সুরমা নদীর কিন ব্রিজের [স্যার মাইকেল কিন ব্রিজ] নিচে, প্রতিদিন সকাল ৯টায় এক লোক আসতেন। তারপর অদ্ভুত সুন্দর করে পুঁথি পাঠ করতেন। বাসা থেকে একটু আগে বের হয়ে, সকাল ৯টায় সেখানে হাজির হতাম আমি। পুঁথি শুনে তারপর স্কুলে যেতাম। কখনো কখনো পুঁথির মধ্যে যখন ক্লাইম্যাক্স চলে আসত, আমি স্কুলে যাওয়ার কথা বেমালুম ভুলে যেতাম। এ জন্য কত যে মার খেয়েছি! এই ব্যাপারটি আমার মাথায় গেঁথে আছে। অনেক পরে যখন গ্যাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের লেখা পড়লাম, সেখানে ম্যাজিক রিয়্যালিজম বা জাদুবাস্তবতার দেখা পেয়ে মনে হলো, আরে এসব তো আমার দেশেই আছে! জাদুবাস্তবতার প্রায় প্রতিটি উপাদানই আমাদের কথ্য সাহিত্যে উপস্থিত। লিখিত সাহিত্যে সেসব পরে এসেছে। আমি এখন যে গল্প লিখছি, আমার গল্পের ভেতর কথ্য সাহিত্যের এই ঐতিহ্যটা রয়েছে। যিনি গল্প বলছেন, তিনি গল্পের কেন্দ্রে নিজেকে স্থাপন করে নিচ্ছেন।

 

আপনার গল্প লেখার গল্পটি কেমন?

আমি প্রথম লিখেছিলাম আদিষ্ট হয়ে। ১৯৬০ সালে আমরা সিলেট ফিরলেও বাবা চলে গেলেন ময়মনসিংহে। তারপর সেখান থেকে খুলনা ও ঢাকা হয়ে আবার ১৯৬৮ সালে ফিরে এলেন তিনি। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ আনন্দের একটি জীবন কাটাচ্ছি। বাবা আমাকে ইংরেজিতে চিঠি লিখতেন। আমাকেও ইংরেজিতেই উত্তর দিতে হতো। বাবা আমার চিঠির ভুলগুলো চিহ্নিত করে রেখে দিতেন। সেসব পরের চিঠিতে জানাতেন। যা হোক, ময়মনসিংহ থেকে একবার এক চিঠিতে বাবা লিখলেন, ‘তুমি একটি গল্প লিখে পাঠাও।’ সিলেট শহরে ‘রংধনু’ নামে একটি পত্রিকা ছিল। সেটা পড়ে আমি তখন শিশুসাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হই। গল্পটি বাবা ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত ‘শিক্ষক সমাচার’-এর জন্য লিখতে বললেন। আমি পড়লাম মহাবিপদে। তখন আমি ‘রংধনু’র চার-পাঁচটি সংখ্যা নিয়ে বসে পড়লাম। আমার মনে হলো, লিখতে তো পারবই! লেখাটি বাবার পছন্দ হলো। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। সেই লেখাটি ১৯৬১ সালে ‘শিক্ষক সমাচার’-এ ছাপা হয়েছিল। লেখাটি এখন আর আমার সংগ্রহে নেই। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পর্যন্ত আর কোনো সাহিত্যকর্ম লিখিনি আমি। ইচ্ছাও করেনি। তবে যেহেতু সাংবাদিকতা করার ইচ্ছা ছিল, তাই প্রতিবেদন লেখার পেছনে যথেষ্ট সময় ব্যয় করতাম। মাঝেমধ্যে ব্রিটিশ কাউন্সিলে যেতাম। বিভিন্ন ইংরেজি পত্রিকার নিউজ কপি করে এনে নিজের মতো লিখতাম। আমার এক বন্ধু ‘বিচিত্রা’ ম্যাগাজিনে কাজ করত। সোনা চোরাচালান নিয়ে সিরিজ রিপোর্ট করে বিখ্যাত হয়েছিল। ওকে আমি আমার ছোটবেলার গল্প লেখার কথাটি শুনিয়েছিলাম। একদিন সে জানাল, সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী তাকে দুই-তিনটি বাছাইকৃত গল্প নিয়ে যেতে বলেছেন। সে আমাকে একটি গল্প লিখে দেওয়ার অনুরোধ জানাল। সেই বছর মার্চের দিকে আমি আজিমপুর কলোনিতে থাকা এক বন্ধুর মুমূর্ষু বাবাকে দেখতে গিয়েছিলাম। ক্যান্সার হয়েছিল ভদ্রলোকের। তাঁর শোবার ঘরে একটি ঘড়ি ছিল। আওয়াজ করত বলে সেটিকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঘড়িটি অনেক দিন থাকায়, এই ফাঁকা জায়গাটিতে একটি চাঁদের মতো দাগ হয়ে গিয়েছিল। আমি দেখলাম, ভদ্রলোক এক দৃষ্টিতে ওই দাগের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি তখন তাঁকে বোঝার চেষ্টা করলাম। তাঁর মনোজগতে ঢুকে যেতে চাইলাম। তিনি কি চাঁদের কথা ভাবছেন? তারপর সেই প্রেক্ষাপটে একটি গল্প লিখলাম—‘বিশাল মৃত্যু’। গল্পটি শাহাদত ভাই পছন্দ করলেন; ‘বিচিত্রা’য় ছেপে দিলেন। কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তখন জগন্নাথ কলেজে থাকতেন। আমাদের সবার কাছেই তিনি নমস্য সাহিত্যিক। তাঁর ভাই খালিকুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন আমাদের সহপাঠী। আমরা অনেকেই মাঝেমধ্যে সেখানে যেতাম। গল্প করতাম। ইলিয়াস ভাই আমাকে চিনতেন। বেশ স্নেহ করতেন। একদিন হুটকরে বললেন, ‘আপনার গল্পটি পড়লাম; ভালো লাগেনি!’ এ কথা শুনে আমি দমে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম, এত বড় লেখকের যেহেতু ভালোই লাগেনি, আর কোনো দিন গল্পই লিখব না! তারপর শিক্ষকতা, পিএইচডি—এসব ব্যস্ততায় সময় বয়ে গেল। 

 

নিয়মিত লিখতে শুরু করলেন কবে থেকে?

সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্তের মাধ্যমে আমার চিত্র-সমালোচনা লেখার সূচনা হয়। তিনি নিজেও ছিলেন খ্যাতিমান চিত্র-সমালোচক। তখন ‘বাংলাদেশ অবজারভার’ পত্রিকার অ্যাসোসিয়েট এডিটর ছিলেন নজরুল ইসলাম। তিনি চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোর মৃত্যুর পর আমাকে দিয়ে প্রথম ইংরেজিতে চিত্র-সমালোচনা লেখান। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় চারুকলার বেশ কয়েকজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল আমার। শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ, ছবিঘরের ইব্রাহিম প্রমুখ। আমি তাঁদের কাছে চারুকলাবিষয়ক অনেক কিছু হাতে-কলমে শিখেছি। তাঁদের সুবাদে বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গেও পরিচয় ঘটে আমার। তাঁরাও আমাকে খুব স্নেহ করতেন। ১৯৭৫ সালে পটুয়া কামরুল হাসানের ওপর একটি লেখা লিখি আমি। অসম্ভব বলবান লোক ছিলেন তিনি। আমার পিঠে এত জোরে চাপড় দিয়েছিলেন, এখনো মনে পড়লে পিঠ ব্যথা করে আমার! ১৯৮১ সালে আমি কানাডা থেকে ফিরলাম। আগের বছরই আমার প্রথম সন্তানের জন্ম। সংসারের একটি দায়িত্বশীল মনোভাব ভালোভাবে তৈরি হয়ে গেছে আমার মনে। তখন দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাত আমাকে বললেন তাঁর পত্রিকায় বিশ্বসাহিত্য নিয়ে একটি নিয়মিত কলাম লিখতে। ‘অলস দিনের হাওয়া’ শিরোনামে কলামটি একটানা ১৪-১৫ বছর ছাপা হলো। এই লেখার জন্য আমাকে অনেক পড়তে হয়েছে। আফ্রিকান, ইউরোপিয়ান, লাতিন সাহিত্য, চিত্রকলা, রবীন্দ্রনাথ—এসব পড়া হয়ে গিয়েছিল আমার।

 

গল্প লেখায় ফিরলেন কখন?

১৯৮৯ সালে আফসান চৌধুরী আমাকে একটি গল্প দিতে বললেন। তখন লিখলাম ‘কঙ্কাল’। গল্পটি ‘বিচিন্তা’য় ছাপা হলো। তখন পুরান ঢাকায় আসা-যাওয়া, বেশ কিছুদিন থাকাও হয়েছিল আমার। সেখানকার পটভূমিতে জাদুবাস্তবতার প্রভাবে গল্পটি লিখেছি। ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে একদিন মনজুরে মওলা আমাকে জগন্নাথ কলেজের এক সাহিত্যসভায় নিয়ে গেলেন। সেখানে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে আবার দেখা। আমাকে দেখেই তিনি বললেন, “আপনার একটি গল্প বেরিয়েছে ‘বিচিন্তা’য়। ভালো গল্প।” আমি তখন সাহস করে বলে ফেললাম, ‘অনেকদিন আগে আমার একটি গল্প পড়ে বলেছিলেন, আপনার ভালো লাগেনি।’ তিনি স্মরণ করতে পারলেন না। তারপর বললেন, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেহেতু বলেছে, কোথাও না কোথাও সমস্যা ছিল নিশ্চয়! তুমি আরেকবার পড়ে দেখো, নিজের খুঁত নিজেই ধরতে পারবে।’ এবার আমার মনে হলো, তাহলে গল্প লেখা যায়! তারপর থেকে নিয়মিত গল্প লিখতে শুরু করলাম।

 

প্রথম গল্পের বই প্রকাশ হয়েছিল কবে?

১৯৯১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৫০তম প্রয়াণবার্ষিকী ছিল। দিল্লিতে বেশ সাড়ম্বরে দিনটিকে পালন করা হয়। বাংলাদেশ থেকে নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আমি আর সন্জীদা খাতুন গেলাম। সেখানে সুরজিত ঘোষের সঙ্গে পরিচয় হলো আমার। তিনি ‘প্রমা’ পত্রিকাটির সম্পাদক। তাঁর একটি প্রকাশনীও ছিল। কিন্তু সেটির খুব একটা প্রসার ছিল না। তিনি আমাকে গল্প দিতে বললেন। আমার দুই-তিনটি গল্প ছাপা হলো ‘প্রমা’তে। এরপর তিনি সাত-আটটি গল্প চাইলেন—বই ছাপবেন। ১৯৯৪ সালে আমার আটটি গল্প নিয়ে তিনি প্রকাশ করলেন—‘শ্রেষ্ঠ গল্প’। আমাকে বললেন, ‘দোস্ত, তুমি যদি কিছু মনে না করো, আমি তোমার, মহাশ্বেতা দেবী আর সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের তিনটি গল্পের বই বের করব একই শিরোনামে।’ সে বছর কলকাতার বইমেলায় আমার এই প্রথম গল্পের বইটি প্রকাশ পেল। মুস্তাফা সিরাজ ও মহাশ্বেতা দেবীর বইয়ের মাঝে আমার বই রেখে বিক্রি করলেন সুরজিত। কৌতূহলে অনেকেই বইটি কিনল। এরপর তিনি পাঁচ-ছয় হাজার ভারতীয় রুপি ধরিয়ে দিলেন আমার হাতে। তারপর লেখা চেয়ে কলকাতা থেকে বেশ চাপ আসতে থাকল। কিন্তু বই আমি বাংলাদেশ থেকেই করতে চেয়েছিলাম।

 

এরপর ১৯৯৬ সালে প্রগতি প্রকাশনী থেকে বের হলো—‘থাকা না থাকার গল্প’। তাই না?

এরপর আরো বই বেরিয়েছে। কিন্তু প্রকাশকরা ঠিক কী কারণে কখনোই আমার বইগুলোকে যত্ন নিয়ে বিপণন করেননি, আমি ঠিক জানি না! বই ছাপিয়েই যেন দায়মুক্ত হয়েছেন তাঁরা। ‘একুশে পদক’সহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু পুরস্কার আমি পেয়েছি। অন্য দেশে হলে বইয়ের মলাটে এ বিষয়গুলো হাইলাইট করে বিপণন করা হতো। তাহলে মানুষ হয়তো আরো কিছু বই কিনত। বই কিনলে তো প্রকাশকেরই লাভ। আমাদের এখানে সমস্যা হলো—বই ছাপিয়ে প্রকাশকরা বিপণনের যথাযোগ্য ব্যবস্থা করেন না।

 

জাদুবাস্তবতা—আপনার গল্পের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। এটির প্রভাবের ক্ষেত্রে মার্কেজের মতো কিংবদন্তিতুল্য সাহিত্যিকদের লেখার সঙ্গে নিজের গল্পের কোনো পার্থক্য দেখেন?

মার্কেজের লেখা আমাকে অনুপ্রাণিত করলেও, তার সঙ্গে আমার গল্পের যে মৌলিক তফাৎ রয়েছে—সেটি রাজনীতিবিষয়ক। মার্কেজের সমাজে একনায়কতন্ত্র চেপে বসেছে, রাজনীতি অলিতে গলিতে পরিত্যক্ত হয়েছে। আমাদের দেশে তেমনটা হয়নি। এখানে ১৯৭১ এসেছে। যে দেশে ১৯৭১ সালের মতো মুক্তিযুদ্ধ আসে, সে দেশের মানুষ রাজনীতিসচেতন হতে বাধ্য। এ জন্য আমাদের কোনো সরকারই স্বস্তিতে থাকতে পারে না। এ ছাড়া ধর্মও একটি পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। মার্কেজের দুনিয়ায় ধর্ম জনগণের বন্ধু হিসেবে এসেছে। অথচ আমাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি জনগণের উদ্দেশে পরিচালিত হয়নি। বরং একটি মতাদর্শের উদ্দেশে পরিচালিত হয়েছে। আমাদের তারুণ্যের যে শক্তি, তা ওদের গল্পে দেখি না। ওদের ওখানে শ্রেণিবৈষম্য বেশি। আমাদের এখানে কম। তাছাড়া এ ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ব্যাপারটিও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের গল্পে মানুষের প্রাধান্য বেশি; ওদের গল্পে প্রকৃতির। কোন সমাজ মানুষকে কিভাবে দেখছে—সেটিই তো গল্পের প্রাণ। আমার গ্রামকেন্দ্রিক গল্পে মানুষই প্রধান; প্রকৃতি নয়। যখনই কোথাও যাই, মানুষের সঙ্গে গল্প করি। তাদের কথা শুনতে চাই। এই যে এত গল্প চারদিকে ছড়িয়ে আছে, সেগুলোকে যখন আমি একত্র করি, তখন মনে হয়—এত গল্প তো এক জীবনে ফুরাবে না। সেখান থেকে কয়েকটি গল্প বেছে নিই—নিজের মতো করে লিখব বলে। আমি সব সময়ই চেয়েছি, আমার গল্পের একটি আলাদা ভাষা ও চিহ্ন থাকুক। যেন পড়ামাত্রই সচেতন পাঠক বুঝে যান, এই গল্পটি আমার লেখা।

 

আপনার এই সময়ের কাজ সম্পর্কে কিছু বলুন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ঋণ থেকে এ নিয়ে কাজ করছি এখন। যেখানেই যাই, মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে চাই। এমন ১৬-১৭টি গল্প জমা হয়েছে আমার ভাণ্ডারে। এই অভিজ্ঞতা অসাধারণ। সেদিন এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে গল্প হচ্ছিল। তিনি একবারও ‘মুক্তিযুদ্ধ’ কিংবা ‘মুক্তিযোদ্ধা’ কথাটি বললেন না; বললেন, ‘গণ্ডগোল’। ‘পাকসেনা’ও বলেননি, ‘রাজাকার’ও না; বললেন, ‘খবিশ’! ‘বঙ্গবন্ধু’কে বললেন—‘শেখ সাব’। জানতে চাইলাম, ‘দেখেছেন তাঁকে?’ জবাব দিলেন, ‘দেখা লাগব কেন? তাঁর একটা বক্তৃতা শুনেছি।’ অদ্ভুত এক সারল্য এই ভদ্রমহিলার। মুক্তিযুদ্ধের জন্য নির্ধারিত হয়ে যাওয়া শব্দমালার কিছুই তিনি ব্যবহার করলেন না। অথচ সে সময়ের সম্পূর্ণ কাহিনি বুঝিয়ে দিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আসল চেতনা আমি তাঁর মাঝে দেখতে পেয়েছি। তাঁর গল্পটি লিখতে বসে প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এ ভাষা চলবে কি না। পরে মনে হলো, এই নারীর তো দিব্যি চলছে!           

 (১০ মে ২০১৮, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)



মন্তব্য