kalerkantho


আমি এক্সট্রা ছিলাম

আমাদের চলচ্চিত্রের জীবন্ত কিংবদন্তি আমজাদ হোসেন। একাধারে চলচ্চিত্রকার, কাহিনিকার, গীতিকার, অভিনেতা। ১৪ আগস্ট তিনি পা রাখবেন ৭৬ বছর বয়সে। চলচ্চিত্রে তাঁর পদার্পণের প্রেক্ষাপট তৈরির গল্প শুনেছেন ওমর শাহেদ।ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১০ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



আমি এক্সট্রা ছিলাম

আপনি বড়লোক পরিবারের সন্তান। থিয়েটার বা নাটকের নেশা মাথায় ঢুকল কিভাবে?

এই ধারণা ভুল। বড়লোকের বংশধর হতে পারি, তবে আমার বাবা ছিলেন গরিব। জামালপুরে আমাদের একটি দোতলা টিনের ঘর ছিল। তখন এত বাড়িঘর হতো না। শহরের মাঝখান থেকে সেই পুরনো বাড়িটি দেখা যেত। সেটি আমার দাদা বানিয়েছিলেন। আমার বাবা ছিলেন দাদার একমাত্র ছেলে। বাবার নাম নূর উদ্দিন সরকার। আমার ফুফু ছিলেন পাঁচ-ছয়জন। তাঁরা সয়সম্পত্তি ভাগ করে নিলে, বাবার ভাগে যতটুকু পড়েছিল—তা-ই ছিল তাঁর সম্পদ। ধানি জমি ছাড়া উপার্জনের অন্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বাবা নানা দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। গ্যাস্ট্রিক হয় তাঁর। সারা বছরই পেটের ব্যথায় পড়ে থাকতেন বিছানায়। আমাদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। তখন আমি পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। ছেলেবেলায় ওই বড়লোকির ব্যাপার কিছুটা পেয়েছি। স্নেহ পেয়েছি। দাদাকে দেখিনি। তাঁর জিনিসপত্রের কারুকাজ, দামি জামা-কাপড়, জুতা...এসব দেখেছি।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় আমি টিউশনি শুরু করি। এক ওসি সাহেবের স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন। আট-দশ বছরের দুটি বাচ্চা ছিল তাঁর। সেই দুই ছেলেকে আমি পড়াতাম। তখনকার দিনে আমাকে ২০০ টাকা দেওয়া হতো। তখন কিন্তু ৪০-৪৫ টাকায় এক ভরি সোনা পাওয়া যেত। এই টাকা আমি মায়ের কাছে দিয়ে দিতাম। তিনি যেন সংসার চালাতে পারেন।

আমাদের পরিবারে আমার পরে সাত ভাইয়ের জন্ম হয়। কিন্তু জন্মের কয়েক দিনের মধ্যেই একে একে মরে যায় তারা। তারপর যে ভাইটির জন্ম, সে এখনো বেঁচে আছে। তারপর জন্ম নেয় তিন বোন। ওরাও বেঁচে আছে। এত বড় সংসারে আমাকে ছোটবেলা থেকেই সাহায্য করতে হতো। কাজেই ছোটবেলার স্বপ্নগুলো আমার পূরণ হয়নি। অনেক বেশি লেখাপড়া করতে চেয়েছিলাম। ইংরেজিতে অনার্স করতে চেয়েছিলাম। টাকা-পয়সার কারণে কোনোটাই হয়নি।

ছড়া লেখার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই। প্রথম ছড়াটি ছাপা হয়েছিল আজাদ পত্রিকার ‘মুকুলের মাহফিল’ পাতায়। তখন এলাকায় বেশ হৈচৈ পড়ে যায়। নাম ছড়িয়ে পড়ে আমার। দশম শ্রেণিতে ওঠার আগেই বিরাট খ্যাতি পেয়ে যাই। তারপর স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির লোকজন আমাকে ডাকতেন; সাহায্য করতে চাইতেন—যেন ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারি। ইমামুর রশিদ নামে এক কবি ছিলেন। সম্ভবত হাসান হাফিজুর রহমানের খালাতো ভাই। তিনি ও আল মাহমুদ একসঙ্গে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন। তাঁর একটি বই বেরিয়েছিল। তারপর আর কবিতা লেখেননি। সেই ইমামুর রশিদ একদিন আমার হাতে জীবনানন্দ দাশের একটি বই তুলে দেন। ‘বনলতা সেন’। আমি তখন নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মগ্ন। ‘বনলতা সেন’ পড়ে মনে হলো, এ এক আলাদা জগৎ; কবিতায় তৈরি হওয়া এক ধূসর জগৎ আমাকে ডাকছে। আমি প্রাণপণে জীবনানন্দের কবিতা পড়তে শুরু করলাম। তারপর বিদেশি কয়েকজন কবির কবিতাও পড়েছি। এর মধ্যে ফ্রান্সের আর্তুর র্যাবোর কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে।

 

চলচ্চিত্রের কথা ভাবনায় এসেছে তখন?

চলচ্চিত্রের কথা তখনো ভাবিনি। র্যাবো, জীবনানন্দ দাশ পড়তে হঠাৎ মনে হলো, আয়নায় যেন নিজের চেহারা দেখছি। আসলে ছেলেবেলায় মানুষ সাধারণত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক—এসব হতে চায়; ফিল্ম মেকার কেউ হতে চায় না। যখন যৌবনে পা রাখে, সিনেমা দেখে, প্রথম যৌবন শরীরে প্রবাহিত থাকে—তখন সে চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী হয়। যা হোক, আমার চেহারা ভালো ছিল না বলে চলচ্চিত্রের কথা ভাবিনি। এর মধ্যে ১৯৫৮ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় একটি কবিতা পাঠালাম। কবিতাটির শিরোনাম ছিল ‘নরকে এক ঋতু’। তখন আমি উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথমবর্ষে পড়ি। আমাদের বাংলার অধ্যাপক ছিলেন গোপেশ দত্ত। রবীন্দ্রনাথের কোন কবিতাটি কোন বইয়ের কত নম্বর পৃষ্ঠায় আছে—তিনি বলে দিতে পারতেন। এত বড় অধ্যাপক যখন আমাকে পড়াচ্ছেন, ‘দেশ’-এ কবিতা পাঠিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকলাম। পত্রিকাটি তখন জামালপুরে পাওয়া যেত।

কবিতা পাঠিয়ে প্রহর গুনছি, হঠাৎ একটি পোস্ট-কার্ড পেলাম। তাতে লেখা—‘কল্যাণীয়েষু, পূর্ব পাকিস্তানে তুমি কী অবস্থায় আছো, আমি জানি না। আমার পত্র পাওয়ামাত্রই কলিকাতায় চলিয়া আসো। তোমার শিক্ষা, তোমার খাওয়াদাওয়া, তোমার আশ্রয়স্থান—সব ব্যবস্থা আমার। শুভেচ্ছান্তে—সাগরময় ঘোষ।’ চিঠি পেয়ে আমি কাঁপছি! দু-একজন বন্ধুবান্ধবকে বলা দরকার। গোপেশ স্যারকেও বললাম। তিনি আবেগাক্রান্ত হয়ে বললেন, “আমি সারা জীবন ‘বসুমতি’, ‘ভারতবর্ষ’—নানা পত্রিকায় লেখা লিখলাম, ‘দেশ’ পত্রিকায় কোনো দিন আমার লেখা ছাপানো হয়নি। আমার ছাত্র, তার লেখা ‘দেশ’-এ ছাপা হয়েছে!... তুমি অভিনয়টভিনয় যা কিছু করো, বাদ দাও। ভগবান তোমার হাতে কলম দিয়েছেন, এ নিয়েই থাকো। কলকাতায় যাবে কি না—এ তোমার পারিবারিক ব্যাপার।’ এই বলে আশীর্বাদ করলেন তিনি। বুদ্ধদেব বসু, অজিত দত্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র—এমন বড় বড় কবিদের সঙ্গে নিজের কবিতা দেখে আমিও উচ্ছ্বসিত। যাঁদের আমি ভক্ত, যাঁদের লেখা পড়ি—তাঁদের মাঝখানে আমার এই ছোট্ট কবিতা ছাপা হয়েছে, এ অনুভূতি ব্যাখ্যা করার মতো নয়। পরে কলকাতায় অবশ্য যাওয়া হয়নি আমার।

 

অভিনয়ের ব্যাপারটি কী আসলে?

মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় থেকেই আমার মধ্যে অভিনয় ব্যাপারটি ঢুকে গেছে। এটি মফস্বলীয় ব্যাপার। পেশা হিসেবে নয়; গ্রামে যাঁরা নাটক করেন, সেই দলে আমারই বন্ধুবান্ধব বা বড়রা ছিলেন—তাঁদের সঙ্গে মিশে গেছি। আমি তৃতীয় শ্রেণি উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত আবৃত্তিতে নিয়মিতই প্রথম পুরস্কার পেতাম। তখন জামালপুর গভর্মেন্ট হাই স্কুলে (বর্তমানে জামালপুর জেলা স্কুল) পড়ি। তাই অভিনয়ের ব্যাপারে সবাই উত্সাহ দিতেন।

 

অভিনয়ের টানেই ঢাকামুখী হলেন?

না। আমার এক দিদি ছিলেন; তিন-চার বছরের বড়। এক মেঘলা দিন, সন্ধ্যা। পারিবারিক কারণে রাগের মাথায় মনে মনে ঠিক করলাম, ঢাকা চলে যাব। দিদিকে বললাম, ‘আমাকে ৫০০ টাকা দিতে পারবে?’ বলতে গেলে সকাল-বিকেল-দুপুর—সারা দিন তাঁদের বাসাতেই খেতাম। তাঁর ছোট ভাই পীযূষ রায় ছিল আমার সহপাঠী। মারা গেছে সে। যাই হোক, দিদি মুখ দেখেই বুঝতে পারলেন আমার মনের অবস্থা। জানতে চাইলেন, ‘টাকা দিয়ে কী করবি?’ বললাম, ‘খুব দরকার। কারণ জিজ্ঞেস করো না।’ দিদি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। কাকিমাও করতেন। আমাকে ৫০০ টাকা দিলেন দিদি। সেদিন খুব ঝড়-বৃষ্টি। যেন জামালপুর শহর বাধা দিচ্ছে, যেন পালাতে না পারি। ঝড়ের মধ্যে আমি রেলস্টেশনে চলে এলাম। ট্রেনে উঠে বসেছি। জামালপুর থেকে এক ঘণ্টা লাগে ময়মনসিংহ আসতে। আসার পরে মনে হলো, এখানেই থাকি। মন খুব খারাপ। মা নিশ্চয়ই কাঁদছেন। বাবা নিশ্চয়ই চোখভরা জল নিয়ে স্টেশনের এদিক-সেদিক খুঁজছেন আমাকে। ময়মনসিংহে অবশ্য কোনো বন্ধুর বাসায় গেলাম না। একটি হোটেলে উঠলাম। পরের দিন শহরজুড়ে ঘুরলাম। তখন নতুন বই দেখলেই কিনে ফেলা ছিল খুব প্রিয় একটি শখ আমার। প্রিয় লেখক ছিলেন সুবোধ ঘোষ। এক লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখি, তাঁর অনেক বই। আট-দশটা উপন্যাস কিনে ফেললাম। তারপর ‘ছায়াবাণী’ হলে গিয়ে সিনেমা দেখলাম। তখন হুট করে মনে পড়ল, টাকা তো খরচ করে ফেলছি, ঢাকায় যাব কী করে! কিন্তু ঢাকা আমাকে যেতেই হবে। গুনে দেখি, পকেটে আড়াই-তিন টাকার মতো পড়ে আছে। তা নিয়েই ট্রেনে উঠলাম। রাতের বেলা। মানে, বিকেল সাড়ে ৫টা-৬টার ট্রেন। দেখি কয়েকজন পুলিশ নিজেদের বউ-বাচ্চাকে মহিলা কম্পার্টমেন্টে রেখে, গামছা বিছিয়ে জুয়া খেলছেন : চার আনা, আট আনা, এক টাকা...। আমাকে একজন বললেন, ‘খোকা, খেলবে নাকি?’ এর আগে এক উত্সবে গিয়ে পকেটে থাকা মাত্র একটি পয়সা দিয়ে সাতটি খেলনা হাতি জিতে নিয়েছিলাম। তাই এবার মনে হলো, পকেটে টাকা নেই, ঢাকায় কাউকে চিনি না, খেলেই দেখি। গেলে এই আড়াই-তিন টাকাও যাবে! খেলতে বসলাম। তাস বণ্টন হচ্ছে, পয়সা তুলছি, পয়সা দিচ্ছি। যখন আমার টাকা ফুরিয়ে এলো, তাস তুলে দিখি—তিনটা গোলাম! অমনি ঢেকে রাখলাম। পয়সা নেই—এ কথাও বলতে পারছি না। আমার পেছনে ৮০ বছরের বেশি বয়েসী এক বুড়ো বসেছিলেন। শিক্ষিত। বললেন, ‘এই নাও টাকা; তুমি খেলো।’ তিনি সম্ভবত আমার তাসটি দেখে ফেলেছিলেন। আমি খেলছি আর খেলছি। বাকি সবাই থেমে গেছেন; দুজন খেলছি শুধু। টাকার স্তূপ জমে গেছে। আমি জিতে গেছি। এবার বুড়ো ভদ্রলোককে বললাম, ‘আপনি কত টাকা দিয়েছেন, খেয়াল করিনি।’ তিনি গুনে গুনে নিজের বিনিয়োগটুকুই নিলেন। আর কানে কানে পরামর্শ দিলেন, যেন আমি আর না খেলি। পুলিশদের জানিয়ে দিলাম না আর খেলার কথা। তাঁরা খুব রেগে গেলেন। তখন পুলিশ দেখলে খুব ভয় পেতাম। বুড়ো ভদ্রলোক আমার হাত ধরে বললেন, ‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি।’ ফুলবাড়ী স্টেশনে যখন নামলাম, তিনি আমাকে হাত ধরে নিয়ে এলেন প্ল্যাটফর্মের বাইরে। জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোথায় যাবে?’ বললাম, ‘কোর্ট হাউস স্ট্রিটে যাব।’ এটি বর্তমানের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ছড়াকার রফিকুল হকের ঠিকানা। ভদ্রলোক আমাকে রিকশায় তুলে দিলেন। এমন ঘোরের মধ্যে ছিলাম, এত উপকার করা মানুষটির নামধাম জিজ্ঞেস করা হয়নি।

 

রফিকুল হকের ঠিকানায় কেন? আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল?

রফিকুল হক, আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ—আমরা একই সময়ে ছড়া লেখতাম। রফিকুলের সঙ্গে পত্র যোগাযোগ ছিল আমার। তাই তাঁর ঠিকানা জানতাম। এর আগে সামনাসামনি দেখা হয়নি আমাদের। সেদিন প্রথম দেখাতেই ভীষণ খুশি হয়ে গেলাম দুজন। সারা রাত আলাপ করলাম। তিনি তখন জগন্নাথ কলেজের (জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্র। সকালে উঠে বললেন, ‘আমি তো রংপুরে চলে যাব। তুমি এখানেই থাকো।’ আমি রইলাম। তিনি চলে গেছেন সকাল ৭টার ট্রেনে। দুপুর বেলা আমি খেতে বসলে হোটেলওয়ালা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কাছে পয়সা আছে তো?’ বললাম, ‘কেন?’ তিনি বললেন, ‘রফিক সাহেব তো বাড়ি চলে গেছেন পয়সা আনতে। আমি আর বাকি খাওয়াতে পারব না!’ জবাবে বললাম, ‘হ্যাঁ, পয়সা আছে।’ কোনোমতে খেলাম তখন। খেয়ে হোটেল বারান্দার চেয়ারে বসে আছি, তখন জামালপুরের মত্স্য বিভাগের এক পদস্থ কর্মকর্তা আমাকে দেখতে পেলেন। আমার মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল তাঁর। চমকে গিয়ে বললেন, ‘তুমি এখানে! তোমার মা-বাবা তো কেঁদে অস্থির।’ বললাম, ‘আমি আর জামালপুরে ফিরে যাব না।’ নিজের বর্তমান অবস্থার কথা জানালাম তাঁকে। জানালাম, আমার কাছে পয়সাকড়ি খুব একটা নেই। তিনি ২০ টাকা আমার পকেটে পুড়ে দিলেন। বললেন, ‘দেখি, তোমার জন্য কী করতে পারি।’ আমি দুপুর বেলার খাবারের বিল দিইনি। বিকেলের দিকে একজন লোককে সঙ্গে নিয়ে তিনি ফিরে এলেন হোটেলে। সঙ্গের লোকটার পোশাক কাবুলিওয়ালাদের মতো। কোঁকড়ানো চুল। আমাকে জানানো হলো, এই লোকের দুটি ছেলে আছে, তাঁর বাড়িতে থেকে ওদের পড়াতে হবে। বাড়িটি নবাবপুর রাইশা বাজারের পূর্বে, কারকুন বাড়ি লেনে। ফলে সঙ্গে থাকা সামান্য বিছানাপত্র নিয়ে সেখানে গিয়ে উঠলাম।

 

সেখানে থাকার অভিজ্ঞতা যদি একটু শোনাতেন...।

সেই বাসায় যেদিন প্রথম উঠলাম, সে রাতে খেতে বসে দেখি, আমাকে পুড়ে যাওয়া রুটি আর সবার খাওয়ার শেষে পড়ে থাকা ঝোলটুকু দেওয়া হয়েছে। আমি এত আদরের মধ্যে বড় হয়েছি। চোখ দিয়ে ঝড় ঝড় করে পানি পড়ল। বাড়ির ভদ্রমহিলাকে আমি খালাম্মা বলে সম্বোধন করতাম। তিনি বললেন, ‘আমাকে যেহেতু খালাম্মা বলে ডেকেছ, তোমাকে একটা কথা বলি। সিনেমা দেখেছ? সিনেমাতে খুব উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্য থাকলে লোকে চুপ করে দেখে। এই বাড়িতে থাকতে হলে তোমাকে চুপ করে থাকতে হবে। মুখে টুঁ শব্দ করতে পারবে না।’ ভাবলাম, এ কোথায় এসে পড়লাম আমি!

সকালে বাজার করতে পাঠানো হলো আমাকে। তাঁরা দিয়েছিলেন আট আনা। নিজের পকেট থেকে আরো আট আনা ভর্তুকি দিয়ে একটি কালিবাউশ মাছ কিনলাম। বাড়ি আসার পর লোকটি বললেন, ‘এই ব্যাটা চোর! বাজার থেকে টাকা মেরেছে সে!’ খুব ভয়ংকর অবস্থায় পড়ে গেলাম আমি। এক ঘণ্টা পর তিনি বললেন, দুই বোতল মৃতসঞ্জীবনী (মদ) কিনে আনতে। আমি তো এসব দোকান চিনিও না। তখন খালাম্মা জানালেন, ‘বাবা, এই রাস্তা দিয়ে গিয়েই ওখানে সারিবাদী সালসার দোকান আছে, ওই দোকানে পাবে।’ মাথানত করে সেই দোকান থেকে মৃতসঞ্জীবনী এনে দিলাম। লোকটা তো মাতাল হয়ে গেলেন। বিকেলে আমাকে বাসা থেকে বের হতে দিলেন না। বাড়ির গেট বন্ধ করে রাখলেন। দুই ছেলেকে পড়াচ্ছি। ওদের খাবার দিচ্ছেন। আমি যে মাছ কিনে এনেছি, আমাকে খেতেই দিলেন না। রাতে মনে মনে ঠিক করলাম, এ বাড়ি থেকে পালাতে হবে। পরদিন সকালে মাতাল অবস্থায় লোকটি আমাকে নির্দেশ দিলেন, যেন এই বাচ্চাদের বইগুলো সদরঘাটে গিয়ে বিক্রি করে দিয়ে আসি। বাচ্চা দুটিকে আমার সঙ্গে দিয়ে দিলেন, যেন পয়সা মারতে না পারি! আমি কোর্ট হাউস স্ট্রিটে এসেই বাচ্চাদের ধমক দিয়ে বললাম, ‘তোমরা যাও!’ বাচ্চা দুটি ভয় পেয়ে দৌড়ে পালাল বাড়ির দিকে; আর আমি সোজা চলে গেলাম সদরঘাটের ওপারে।

 

তারপর আশ্রয় নিলেন কোথায়?

মোজাফফর নামের এক ভদ্রলোক চাকরি করতেন ওয়াপদায় [বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড]। আমাদের এলাকার মানুষ; একই স্কুলের সিনিয়র ভাই। তার সৌজন্যে নাজিরা বাজার মসজিদ কোয়ার্টারে আশ্রয় পেলাম। সেখানে ’আলাউদ্দিন সুইট মিট’ নামে সাইনবোর্ড রয়েছে  এখনো। সেটির মালিকের ছেলে-মেয়েকে পড়ানোর দায়িত্ব পেলাম। তাঁরা আমাকে দু-তিনবেলা খেতে দেবেন—এই শর্তে। হঠাৎ একদিন আমার কলেরার মতো হলো। ডাক্তার নেই, কিছু নেই। এটি ১৯৫৮-৫৯ সালের ঘটনা। পুরান ঢাকার লোকজন খুব অতিথিপরায়ণ হয়ে থাকেন। তাঁদের কেউ আমাকে শাল এনে দিলেন, কেউ তোশক। আগের বাসায় আমার টিনের সুটকেসটি ফেলে এসেছিলাম। অসুস্থ শরীর নিয়ে একদিন দেয়াল ধরে ধরে সেই বাড়িতে পৌঁছলাম। লোকটি তখন বাড়ি ছিলেন না। ভদ্রমহিলা দরজা খুললেন। বললাম, ‘খালাম্মা, আমার সুটকেসটা একটু দিবেন?’ তিনি বললেন, ‘তোমার হোটেলের খরচ আড়াই টাকা দিয়ে এসেছিলাম। ওই টাকা ফেরত না দিলে সুটকেস নিতে পারবে না।’ আমি আবার ক্লান্ত হয়ে, দেয়াল ধরে ধরে মসজিদ কোয়ার্টারে ফিরলাম। নাজিরাবাজারের লোকজনের সেবাশুশ্রূষাতেই সুস্থ হয়ে উঠেছিলাম সেবার। সুস্থ হয়ে লেখালেখি করি আর ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়াই। নাটক করি।

 

ঢাকায় এসে নাটকে যুক্ত হলেন কিভাবে?

জয়নুল আবেদীন নামের এক ভদ্রলোক স্টেডিয়ামে নাটক করতেন। আমি তাঁর নাটকে সুযোগ পেয়েই অভিনয়ে প্রথম পুরস্কার পেলাম। তখন ‘খেলাঘর’, ‘কচিকাচার আসর’, ‘মিল্লাত’—দৈনিকের শিশুদের পাতায় বাচ্চাদের লেখালেখি করি। কষ্টের কথা কাউকে বলি না। এ সময় জেলখানার নাটক করেছি পাঁচ বছর। কয়েদিদের বিনোদনের জন্য বছরে দু-একবার এ ধরনের নাটকের আয়োজন করা হয়ে থাকে। একজন কারা কর্মকর্তা আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর অধীনে কাজ করেছি আমি। তারপর বিখ্যাত নাট্যদল ‘ড্রামা সার্কেল’-এর সদস্য হলাম। আনোয়ার হোসেন, সৈয়দ হাসান ইমাম, মাসুদ আলী খান প্রমুখ প্রখ্যাত অভিনেতা তখন এই নাট্যদলের সদস্য ছিলেন। নাটক করলে হাত খরচ দেওয়া হতো ১০ টাকা, আর নির্দেশনা দিলে ৫০০ টাকা। ১০ টাকার তখন অনেক দাম। ১৯৬০-৬৩ সময়কালে অসংখ্য নাটক আমি করেছি। প্রতি মাসে চার-পাঁচটি নাটক হতো। তখন পাড়ায় পাড়ায়, অলিগলিতে নাটক হতো। যেখান থেকেই ডাক আসত, সময়-সুযোগ পেলে নাটক করতে ছুটতাম আমি।

 

এগুলো কি আপনার নিজের লেখা নাটক? নাকি বিভিন্ন বিখ্যাত লেখকের নাটক করতেন তখন?

বিখ্যাত লেখকের নাটক করতাম। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের লেখকই বেশি। নাটক তখন আমার পেশা। নাটক করে বাড়িতে টাকা পাঠাই। তখনো বাড়ি ফিরে যাইনি। এরই মধ্যে রেডিওতে অডিশন দিলাম। এক-দেড় হাজার প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে আমি আর রাজু আহমেদ (প্রয়াত খল-অভিনেতা)—দুজন উত্তীর্ণ হলাম। কিন্তু কাজ পেয়েছি তিন বছর পরে। তখন স্কুল রিপোর্ট, কলেজ রিপোর্ট, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কি না—এসব রিপোর্টের ফাইল চালাচালি শেষে ক্লিয়ারেন্স পেতে দুই-তিন বছর লেগে যেত। তারপর পাওয়া যেত প্রগ্রাম।

 

এফডিসিতে কি এ সময়েই প্রবেশ করেছেন?

নাটক করার ফাঁকে ফাঁকে বন্ধুরা মিলে এফডিসিতে ঘুরতে আসতাম। এখানে এক্সট্রা হিসেবে দাঁড়ালে টাকা পাওয়া যেত। কখনো কখনো সারা দিন থাকতাম। তখন দুপুরের খাবার আর ১০-২০ টাকা করে দিত।

 

আপনি এক্সট্রা ছিলেন?

হ্যাঁ। আমি এক্সট্রা ছিলাম। মোহাম্মদ মহীউদ্দিনের ‘তোমার আমার’, মোস্তাফিজুর রহমানের ‘তালাশ’—এ রকম তিন-চারটা সিনেমায় এক্সট্রা ছিলাম কিংবা দু-একটি দৃশ্যে অভিনয় করেছি। একবার ৮০ বছরের বৃদ্ধের চরিত্রে অভিনয় করেছি ‘তোমার আমার’-এ। তবে চলচ্চিত্র জগতে পুরোপুরি আসার কথা ভাবিনি তখনো। একটু আগে যা বলছিলাম, তখন আমরা শুধু পশ্চিমবঙ্গের নাটক করতাম। বাংলাদেশের নাট্যকারদের মধ্যে মুনীর চৌধুরী, নুরুল মোমেন, আশকার ইবনে শাইখ প্রমুখ। নাটক করতে গিয়ে ‘মিনার্ভা থিয়েটারে’ যোগ দিলাম। প্রতি রাতে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে অভিনয় করতাম। পয়সা রোজগার করতাম। তখন সেগুনবাগিচার সিঅ্যান্ডবি (বর্তমানে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর) অফিসে ময়নুল ইসলাম নামে একজন সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার আমাকে চাকরি দিলেন। চাকরিটি হলো, তাঁর ডিপার্টমেন্টে আমি শুধু নাটক করব। বছরে দু-চারটি যা হয়। মাসিক বেতন ১১০ টাকা। প্রতি মাসে একবার অফিসে গিয়ে আমি শুধু স্বাক্ষর করে বেতন তুলে আনতাম। তখন ১০০ টাকায় তিন ভরি সোনা পাওয়া যেত। পুরো টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে দিতাম ছোট ভাই-বোনের জন্য। এখানে সেখানে নাটক করে যে হাত খরচ পেতাম, তা দিয়েই আমার হোটেল খরচ, যাতায়াত খরচ, খাওয়াদাওয়া চলে যেত। হঠাৎ মনে হলো, শুধু পশ্চিমবঙ্গের নাটকই করব? আমি নিজেই তো নাটক লিখতে পারি। আসলে যে নাটকগুলো তখন করতাম, সেগুলো আমার পছন্দ হচ্ছিল না। তখন বিখ্যাত লেখক শওকত আলী থাকতেন ঢাকা হলের চার তলায়। তাঁর সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল আমার। তিনি চলে গেলেন দিনাজপুরে। আমি তখন তাঁর রুমে থাকি। সেখানে বসেই একটি নাটক লিখে ফেললাম। নাম রাখলাম, ‘ধারাপাত’। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ছিলেন আমার সঙ্গে। নাটকটি তাঁরাই মঞ্চস্থ করলেন। মঞ্চায়নের পর সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ‘চিত্রালী’ পত্রিকার দুই পৃষ্ঠাজুড়ে তুমুল প্রশংসামূলক আলোচনা লিখলেন নাটকটির।

 

এমন প্রশংসার কারণ কী?

নাটকটি খুব ভালো ছিল। নায়ক আসবে আসবে...করে নায়ককে ঘিরে সব আয়োজন হচ্ছে বাড়িতে। তার বাবা স্কুল মাস্টার। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তার জন্য মেয়ে ঠিক করা হচ্ছে। বাড়ি এলেই তাকে বিয়ে করানো হবে। শেষে দেখা যায়, বাড়িতে একটি রক্তাক্ত শার্ট এসেছে; সে আসেনি। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে এ নাটক। নাটকটি নিয়ে খুব হৈচৈ হলো। এর সাত দিন পর খ্যাতিমান পরিচালক সালাহ্উদ্দিন আমাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি বললেন, ‘আপনার এই নাটকটি নিয়ে আমি সিনেমা বানাতে চাই।’ জানতে চাইলাম, ‘আপনি কি নাটকটি দেখেছেন?’ বললেন, ‘না। সৈয়দ শামসুল হকের লেখাটি আমি পড়েছি। মনে হলো, নাটকটি নিশ্চয় ভালো হবে।’ এভাবেই আসলে চলচ্চিত্রে সত্যিকারের প্রবেশ ঘটল আমার—লেখক, নাট্যকার, অভিনেতা ও গীতিকার হিসেবে।

 

‘ধারাপাত’ সিনেমায় অভিনয়ও করেছিলেন, তাই না?

হ্যাঁ। এই কাহিনিতে কোনো নায়ক নেই। নায়কের পরে যে মূল চরিত্র—সেটিতে আমি অভিনয় করেছি। কাজী খালেক, নাসিমা খান প্রমুখও অভিনয় করেছেন। এটি সুজাতার প্রথম সিনেমা। মুক্তির পর সাড়া পড়ে যায়। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ফতেহ্ লোহানী, জহির রায়হান, খান আতাউর রহমানের মতো গণ্যমান্য ব্যক্তিরা আমাকে স্নেহ করতে শুরু করেন। বলতে থাকেন, চলচ্চিত্রে একজন লেখক এসেছে। তখন অভিনেতার চেয়ে লেখকের দাম বেশি ছিল। আর তখন ইন্ডাস্ট্রির সবাই খুব শিক্ষিত ছিলেন। চলচ্চিত্রকার সালাহ্উদ্দিন ও কাজী জহির করতেন অধ্যাপনা, মোহাম্মদ মহীউদ্দিন চাকরি করতেন রেডিওতে। এই সিনিয়র ব্যক্তিদের স্নেহ নিয়ে চলচ্চিত্রে প্রকৃত যাত্রা শুরু করেছিলাম আমি।

            (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়)

 



মন্তব্য