kalerkantho


‘একটি ফিশারিজ ইউনিভার্সিটি করার ইচ্ছে ছিল’

২০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



‘একটি ফিশারিজ ইউনিভার্সিটি করার ইচ্ছে ছিল’

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মেয়াদের উপাচার্য, প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক তিনি। শুধু মাছ নিয়ে আলাদা বিভাগ করবেন বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন বহু দূরের গ্রামগঞ্জে। জাতীয় অধ্যাপক ড. আবুল কালাম মুহাম্মদ আমীনুল হক’র অনেক কীর্তি। সেগুলোই জানলেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন হাবিবুর রহমান

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার ছাত্র হয়েও কৃষিবিজ্ঞানের দিকে ঝুঁকে পড়লেন কিভাবে?

সেটার কারণ হলো মাছ। ছাত্রজীবন থেকেই দেখে আসছি, বাংলাদেশের মানুষের জন্য মাছ বিরাট বিষয়। তাই মাছ চাষ ও গবেষণাকে আরো উন্নত করতে হবে—সব সময় ভেবেছি। সে আমলে সরাসরি পিএইচডি প্রগ্রামে ভর্তি হওয়া যেত না, এমএস করতে হতো। এই উচ্চতর শিক্ষার জন্য তিনটি স্কলারশিপ (বৃত্তি) পেয়েছিলাম। ঢাকা, লাহোর ও পেশোয়ারে পরীক্ষা ও সাক্ষাত্কার নেওয়া হয়েছিল। তিনটিতেই প্রথম হয়েছি। ছাত্রজীবনে কোথাও কোনো পরীক্ষায় দ্বিতীয় হইনি। মত্স্য গবেষণা ও শিক্ষার উন্নয়নের জন্য ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যামে ফের এমএস (মাস্টার্স অব সায়েন্স) পড়তে গেলাম। সেখানে গবেষণার কাজ শুরু করলাম।

 

কী বিষয়ে?

আমার গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল ‘মাছের আচরণ’। আমরাও যেমন ম্যামল বা স্তন্যপায়ী প্রাণী; গরু-ছাগলের মতো মাছও স্তন্যপায়ী। মাছের ওপর স্তন্যপায়ী প্রাণীর হরমোনের প্রভাব  নিয়ে আমি গবেষণা করেছি। ব্রিটেনের ‘লেক ডিস্ট্রিক্ট’র উইন্ডারমেয়ার লেকে মাছ ধরতাম। তখন দেখেছি, মাছের ডানে-বামে, বামে-ডানে চলার অভ্যাস আছে। সেই লেকে স্রোত ডান দিকে বেশি চলে বলে লেকের মাছগুলো স্রোতের বিপরীতে বাম দিকে চলে। অধ্যাপক এ জে ডব্লিউ ব্যারিংটন আমার সুপারভাইজার ছিলেন। বছর দুয়েকের মতো গবেষণা করেছি, কিন্তু তখনো তিনি কিছু বলেন বলে মনটিই খারাপ হয়ে গেল। ফলাফল কেমন হবে—এই ভয়ে আছি। স্যার নিজেই একদিন এসে বললেন, ‘মিস্টার আমীনুল হক, ইউ হ্যাভ বিন প্রমোটেড টু পিএইচডি প্রগ্রাম।’ পিএইচডি শেষে ১৯৫৭ সালে পুরনো কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপকের পুরনো পদে যোগ দিলাম।   

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মত্স্য বিষয়ে কোনো বিভাগ চালু করেননি?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফিশারিজ’ কোর্স চালু করতে চেয়েছিলাম, সেখানে এনটোমলজি, সাইটোলজি ইত্যাদির ওপর এমএসসিতে থিসিস করা যেত, কিন্তু ফিশারিজে যেত না। তবে আমার শিক্ষক অধ্যাপক ইউসুফ জাই কোনোভাবেই রাজি হচ্ছিলেন না, অনেক জোরাজুরির পর শেষে ফিশারিজ নয়, ‘ফিশেস’ নামে আমাকে কোর্স চালু করতে অনুমতি দিলেন। কোর্সটিতে প্রথম ব্যাচে যারা ছাত্র হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন বেশ নাম করেছে। মাহমুদুল করিম মত্স্য বিভাগের পরামর্শক ছিল। কাজী হাবিবুর রহমান, মোল্লা ফজলুল হকও বিখ্যাত হয়েছে। কিন্তু আমি তো এতে খুশি নই। এর মধ্যে সরকার সিদ্ধান্ত নিল, একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করবেন এবং উপাচার্য হিসেবে বিএনপির সরকারের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুকের বাবা ড. ওসমান গণিকে নিয়োগদান করা হলো। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও উপাচার্য ছিলেন। তিনি তখন ‘পাকিস্তান কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ’র পেশোয়ারের জেনারেল ল্যাবরেটরিতে দায়িত্বরত ছিলেন। তখন পূর্ব বাংলার কোথাও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল না। আর বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ছিল ‘ইস্ট পাকিস্তান কলেজ অব ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড এনিম্যাল হাজবেন্ড্রি’। সাধারণ মানুষ এই কলেজকে ‘গরুর কলেজ’ নামে ডাকতেন। এটি দ্বিতীয় সারির সরকারি কলেজ। ময়মনসিংহে এর অবস্থান হলেও ড. গণি ঢাকার তেজগাঁও থানার কাছে ‘সংশয়’ নামের একটি বাড়িতে উঠেছিলেন। তিনি ডাকলেন, আমি গেলাম। ড. গণি প্রথমেই বললেন, ‘আমীনুল হক, দ্বিতীয় শ্রেণির একটি কলেজকে প্রথম শ্রেণির স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে গেলে কলেজের বর্তমান লোকবল দিয়ে তো আমার চলবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার অভিজ্ঞতা আছে, আবার প্রশাসনিক কাজও বুঝতে পারবেন, এমন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে আমার প্রয়োজন। তুমি কি আসবে?’ আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। নিচের ফলে আগ্রহের কথাই আগে বললাম, ‘স্যার, আমাকে ফিশারিজ ফ্যাকাল্টি করার সুযোগ দিলে আসতে পারি।’ গণি স্যারের কথাটি এখনো মনে পড়ে, ‘নিশ্চয়ই তুমি সেই সুযোগ পাবে। আর আকাশই হবে তোমার একমাত্র সীমানা।’

 

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কবে যোগদান করলেন?

১৯৬২ সালের জানুয়ারিতেই যোগদান করলাম। বিভাগ না থাকায় আমাকে পুরনো জুওলজি বা প্রাণিবিদ্যা বিভাগে আমাকে নেওয়া হলো। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডারশিপের জন্য আবেদন করেছি। সেখানে পদটি পেয়ে গেলাম। ড. গণির কাছে গিয়ে বললাম, ‘স্যার আমি তো ওখানে রিডার হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে গিয়েছি। এখন কী করব? তিনি বললেন, ‘না তোমাকে এখানেও আমরা পদোন্নতি দেব। এখানেই থাকো। তোমাকে আমার দরকার আছে।’ ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডারশিপের প্রস্তাব আর গ্রহণ করলাম না। তিনিও আমাকে ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরে আমাকে রিডার (সহযোগী অধ্যাপক) হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে দিলেন। কয়েক বছর পর তাঁরা অধ্যাপক হিসেবেও পদোন্নতি দিয়ে দিলেন।

 

প্রথমবার গিয়ে ময়মনসিংহের অবস্থা কেমন দেখলেন?

ময়মনসিংহের অবস্থা কখনোই ভালো ছিল না। যত দিন ছিলাম ভালো দেখিনি। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মভূমি এখন কেমন আছে তা অবশ্য আমি জানি না। তবে শহরটি থেকে কয়েকজন কিন্তু মন্ত্রী হয়েছেন; তার পরও শহরের কোনো উন্নতি হয়নি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে যখন বৃত্তি পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম, তখনো যেমন দেখেছি, শিক্ষক হয়ে ১৯৬২ সালে যাওয়ার পরেও একই অবস্থা দেখেছি। সেখানে যাওয়ার পর ‘সি’ টাইপের একটি বাড়িতে উঠলাম। সেখানে থাকতে থাকতেই বিয়ে হলো। 

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কেমন দেখলেন?

এটি তো আগে থেকেই কলেজ ছিল। ছাত্র-ছাত্রীরা ম্যাট্রিক পাসের পর পাঁচ বছরের জন্য এই কৃষি কলেজে ভর্তি হতো। শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর একবার আমাকে অন ডিউটিতে আমাকে রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তখন এসডি চৌধুরী উপাচার্য ছিলেন। তখন বলেছিলাম, ‘কলেজের নিয়মে তো বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কারিগরী ও পেশাদার ডিগ্রি প্রদান করতে হবে এবং মেডিক্যাল, বুয়েটে আইএসসি পাস করে ছাত্র-ছাত্রীরা যেভাবে ভর্তি হয়, আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়েরও সেই নিয়মটি চালু করতে হবে। কেন তাঁরা ম্যাট্রিক পাস করে পাঁচ বছরের পড়া পড়তে আসবে?’ ফলে ভর্তির নিয়মটি অনেক চেষ্টার পর বদলাতে পেরেছিলাম। এর পর বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তার পদে তিনি উন্নীত করলেন। খবরটি পত্রিকায় এসেছিল। তাঁর ঘোষণার স্থলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে। এখনো আছে।   

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যান কিভাবে তৈরি করেছেন?

আমাকে নিয়োগ দানের পর থেকে আমার কাজকর্মে ড. গণি বুঝতে পারলেন—এই ছেলেটিকে দিয়ে অনেক কাজ করাতে হবে। তিনি আরো কর্মে আমায় নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ইউএসএআইডি প্রস্তাব দিলো, তাদের সাহায্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসহ পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হোক। সেজন্য কমিটি করা হলো। তাতে তিনজন ছিলেন। যেহেতু তখনো অধ্যাপক হইনি, ফলে এক অধ্যাপককে কনভেনার করে আমাকে সদস্য করা হলো। তবে পুরো কাজ আমিই করেছি। স্ত্রী ও ছেলেকে শশ্বরবাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম। আমাদের বাড়িকে অফিস বানিয়ে ফেললাম। দোতলা বাড়ির নীচতলার ড্রইংরুমে বাড়তি টেবিল চেয়ার স্থাপন করে লিখে গিয়েছি। আমার সহকারী টাইপ রাইটার মেশিনে টাইপ করেছে। এই ভয়ংকর পরিশ্রমে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাষ্টারপ্ল্যান তৈরি করেছি। পরে বিদেশী বিশেষজ্ঞরা এটি দেখে বলেছেন, আমরা বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানের মাষ্টার প্ল্যান দেখেছি, কিন্তু এত সুন্দর মাস্টার প্ল্যান আর কোথাও দেখিনি। আমি তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথায় কী থাকবে, কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠবে সেটি তুলে ধরেছি। ১৯৬৪ সালে আমার তৈরি মাষ্টার প্ল্যানের ওপর ভিত্তি করে আজকের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দাঁড়িয়ে আছে। সেভাবেই এটি গড়ে উঠেছে। আজো সবাই বলেন, এটি অসাধারণ দলিল; এত ডিটেইল কাজ হয় না। সেখানে স্টাফ রিকয়ারমেন্ট থেকে শুরু করে সম্ভাব্য সবকিছুই আলোচনা করেছি। পুরো পরিকল্পনাটি মোট ২৪০ পাতার! খুব ভেবেচিন্তে, পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে আমাকে এই পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়েছে, যাতে বাংলাদেশের কৃষি বিষয়ক একমাত্র ও প্রথম পূর্ণাঙ্গ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কিছুই বাদ না পড়ে, চাইলেও কেউ কোনো কিছু বাদ না দিতে পারে। আমার মাষ্টার প্ল্যান পিসিওয়ান (প্ল্যানিং কমিশন ওয়ান) দেখলো। মাষ্টারপ্ল্যানের ২৫ নম্বর পাতায় আমি স্টুডেন্টস এনরোলমেন্টের কথা বলেছি। কী রকম ছাত্র দরকার হতে পারে তাও বলেছি। নিউ প্রগ্রাম অব স্টাডিজের কথা আছে। কোর্সেস অ্যান্ড স্টাডিজ, ইনট্রোডাকশান অব নিউ কোর্সেস আন্ডার একজিসটিং ডিপার্টমেন্টস—সবই আছে। আমার মাস্টার প্ল্যান বিশ্ববিদ্যালয় গ্রহণ করেছেন। পাকিস্তান সরকারকে পাঠানো হলো। ইউএসএআইডির কাছেও বোধহয় পাঠাতে হয়েছে। তাঁরা দেখেছেন, পাকিস্তানের এক্সিকিউটিভ কমিটি অন ন্যাশনাল অ্যান্ড ইকনমিক কাউন্সিলের কাছেও পাঠাতে হয়েছে। তাঁরাও দেখেছেন। আমাদের এই মহাপরিকল্পনায় ফিশারিজের সঙ্গে ফ্যাকাল্টি অব ফরেষ্ট্রিরও প্রস্তাব ছিল। তবে পাকিস্তান সরকার বন বিষয়ক অনুষদের প্রস্তাবটি মানেনি, ফিশারিজেরটি মেনেছে। ফ্যাকাল্টি অব বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টসও তাঁদের প্রস্তাবে গৃহীত হয়নি। এখানে যেহেতু আগেই ফিজিক্স, কেমিষ্ট্রি, বোটানি, জুওলজি চালু আছে, এই বিভাগগুলোতে কিছু ছাত্র, শিক্ষক আছেন, তাহলে কেন এই ডিগ্রিগুলো মাষ্টার্স ডিগ্রি পর্যন্ত উন্নীত করা হবে না—এই ছিল আমার যুক্তি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছাত্ররা আপত্তি করলো, শিক্ষকরাও করলেন। পরে অবশ্য ফাকাল্টিই হলো না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ফ্যাকাল্টি চালু আছে এবং সেখানে বোটানি, জুওলজি বিভাগও আছে, সেখানকার মতো এখানেও এগুলো থাকতো। অতিরিক্ত ভালো ভালো বিষয়ের সৃষ্টি হতো। তবে সরকার প্রস্তাবগুলো বাদ দিয়ে দেওয়ার ফলে পরে কখনোই সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। আমার প্রস্তাব ছিল, ফরেষ্ট্রি অনুষদের অধীনে যে বিভাগগুলো পড়ানো হবে, সেগুলোর কতগুলো ময়মনসিংহে এই অনুষদে পড়ানো হবে, বাকিগুলো চট্টগ্রামের ফরেষ্ট রিসার্চ ইনিস্টিটিউটে ছাত্র-ছাত্রীরা পড়বে। পরে অবশ্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্যাকাল্টি অব ফরেষ্ট্রি’ চালু হয়েছে। এভাবে পুরো মহাপরিকল্পনা তৈরি করে ১৯৬৪ সালে উপাচার্য এসডি চৌধুরীর হাতে তুলে দিলাম। এটির নাম ছিল, ‘ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট অব দি ইউনিভার্সিট ইন রিভাইস পিসি ওয়ান ফর্ম।’ এই কাজ করতে গিয়ে আমাদের বাসাকে লাইব্রেরি বানিয়ে ফেলেছিলাম। বাংলাদেশের কৃষি ক্ষেত্রে কিভাবে বিকাশ হবে সেটিও এখানে উল্লেখ করেছিলাম। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, চীন ইত্যাদি দেশে চাউল প্রতি একরে কত টন উত্পাদিত হয়, ভুট্টা কেমন উত্পাদিত সেই হিসেব দিয়েছিলাম। আমি বিদেশী প্রশিক্ষণের কথা, আবাসনের কথাও বলেছি। আমার এই মহাপরিকল্পনার আগে সরকারের ‘স্কিম ফর দি স্টাবলিশমেন্ট অব ইউনিভার্সিটি’ নামে একটি স্কিমে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি ও ভেটেরিনারি সায়েন্স বিভাগের কথা উল্লেখ ছিল। তাতে আরো বলা ছিল—ডিপার্টমেন্ট অব এপিকালচার (মৌমাছির চাষ), ডিপার্টমেন্ট অব সেরিকালচার (রেশম কীট), ডিপার্টমেন্ট অব ফিশারিজ থাকবে। তবে সেগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব ছিল না। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে প্রথমে এগ্রিকালচার ফ্যাকাল্টি করা হলো ও এগ্রিকালচারাল ইকনমি ও সেন্ট্রোনাইজ সোশিওলজি করা হলো। এগ্রিকালকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড রুরাল টেকনোলজি বিভাগ চালু করা হলো।

 

ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট কিভাবে করলেন?

পাকিস্তান আমলে ফিশারিজকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না, কিন্তু ইউএসএইড বলল, তোমাদের এখানে যখন দরকার, আমরা তোমাদের একটি ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট করে দিতে চাই, করে দিই? বাংলাদেশের লোকেরা দরকারটি না বুঝলেও তারা কিন্তু বুঝেছে। এরপর সরকার সাভার অঞ্চলে জায়গা ঠিক করে দিল, কিন্তু জায়গাটিতে গিয়ে দেখা গেল, মাটিতে গর্ত করলে পানি এসে খুব ঘোলা হয়ে যায়। তাহলে তো আর ফটো সিনথেসিস হবে না, মাছও থাকতে পারবে না। সুতরাং প্ল্যানিং কমিশন থেকে সাইট সিলেকশন কমিটি করে দিল। আমাকে সেটির কনভেনর করল। দেখলাম—এই হলো আমার কাজের সুযোগ। সাভার অঞ্চল নিজেও পছন্দ করি না। যেহেতু এখানে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, ফিশারিজ ফ্যাকাল্টি হবে, এর কাছে যদি জায়গাটি হয়, তাহলে আমরা ভালোভাবে সহযোগিতা করতে পারব। তখন অ্যাগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটির সাউথ-ওয়েস্টার্ন (দক্ষিণ-পশ্চিম) কর্নারের পুরোটার খালি জায়গাগুলো জিওলজি বিভাগ, সরকারের সার্ভে ডিপার্টমেন্ট—এদের কাছ থেকে এরিয়াল ফটোগ্রাফ নিলাম। এরিয়াল ফটোগ্রাফ দেখার জন্য বাইনোকুলার ভিউয়ার লাগে; ভিউআর জোগাড় করেছি। গর্ত করার জন্য মেশিন লাগে, ঢাকা ইউনিভার্সিটির জিওলজি ডিপার্টমেন্ট থেকে সেটি নিয়েছি। অনেক জায়গায় আমি গবেষণা করে রিপোর্ট সাবমিট করলাম। এরপর সেটি প্ল্যানিং কমিশনে গৃহীত হলো। তার পরে রিসার্চ ইনস্টিটিউট আরম্ভ হলো। ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটকে আমরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকটা জায়গা দিয়েছি, কিন্তু দাম নিয়েছি ‘এক টাকা’। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্ম এরিয়া থেকে অনেকটুকু জায়গাই একে দেওয়া হয়েছে। তাতে অনেক পুকুর করা হয়েছে। আগে এর নাম ছিল ‘অ্যাকোয়াকালচার এক্সপেরিমেন্ট স্টেশন (এইএস)’। পরে আস্তে আস্তে সেটি ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট হলো। শুরুর দিকে এখানে বিনা বেতনে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছি। এখন তো এটি নতুন অনেক কিছু করছে। বিভিন্ন মাছ চাষ, সেগুলোর বাজারজাতকরণ, হাইব্রিডাইজেশন, তেলাপিয়ার নতুন জাত উত্পাদন ইত্যাদি অনেক কাজ করছে। ডানিডা থেকে প্রথম যে ভদ্রলোক এখানে কাজ করতে এসেছিলেন, তাঁকেও এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। প্রথম যে পরিচালক ছিল, সেও আমার ছাত্র। এখানে যারা কাজ করেছে সবাই তো আমার ছাত্র। ফিশারিজ ফ্যাকাল্টির বছর দুয়েক পর এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ বছর ফিশারিজ ফ্যাকাল্টির ৫০ বছর হয়েছে। আমি চেয়েছি শিক্ষা ও গবেষণার মেলবন্ধন ঘটুক।

 

আপনার প্রধান অবদান ফিশারিজ ফ্যাকাল্টি কিভাবে চালু হলো?

বাংলাদেশের প্রথম এই মত্স্যবিজ্ঞান বিভাগটি ১৯৬২ সালে চালু হয়েছে। আস্তে আস্তে আমার প্রমোশন হতে থাকল ও এই বিভাগটিকে সম্প্রসারিত করতে থাকলাম। মাস্টারপ্ল্যান যখন করলাম তখন ফিশারিজ ফ্যাকাল্টির জন্য আলাদা পরিকল্পনাও সরকারের কাছে দিলাম। ফরেস্ট্রির জন্য ড. চৌধুরী সরকারের কাছে আরেকটি পরিকল্পনা জমা দিয়েছিলেন, কিন্তু সরকার সেটি মানেনি, কিন্তু ফিশারিজেরটি মেনেছে। এরপর আমার ফ্যাকাল্টি হলো। প্রথম যখন আমরা সরকারের কাছে গেলাম, তখন তো আমরা পাকিস্তানের অংশ, তাদের প্রভেনশিয়াল প্ল্যানিং অথরিটি ছিল। তারা কোনো পরিকল্পনা দেখে, যাছাই-বাছাই করে পাকিস্তানে পাঠাত। আমি পাঁচটি বিভাগের জন্য ফ্যাকাল্টি করার আবেদন করেছিলাম। পাকিস্তান সরকার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করল এবং ফ্যাকাল্টিগুলো তো পরে হলো।

 

শুরুতে আপনার বিভাগে কত ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়েছিল?

১৯৬৭ সালে শুরুতে বিভাগে ১২ জনের মতো ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়েছিল। তখন আমি একাই শিক্ষক ছিলাম। পরে দেখলাম, একা চালাতে পারব না। ফলে ড. শামসুদ্দোহা বগুড়াতে অধ্যাপনা করত, তাকে টেলিফোন করলাম—‘তুমি চলে আসো।’ আরেকজনকে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে নিয়ে এলাম। এরপর এক আমেরিকানকে নিয়ে এলাম। এভাবে আমার বিভাগে অন্তত ১০-১২ জন শিক্ষক হয়ে গেল। এখানে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছি। তখন কিছু রিসার্চ করেছি, অন্য শিক্ষকদেরও রিসার্চ করতে উত্সাহ দিয়েছি। ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে বারবার পড়ালেখা করার জন্য বলেছি। দ্বিতীয় বছর বোধ হয় ২৪ জন ছাত্র-ছাত্রী হলো। ফিশারিজ তো শুধু ক্লাসরুমে পড়লে হবে না, সমুদ্রেও ছাত্রদের গবেষণার জন্য যেতে হবে। তখন রাশিয়ান এক প্রগ্রামে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে চুক্তির অধীনে রাশিয়া থেকে পাঁচটি জাহাজ এসেছিল। এক ভদ্রলোক, নামটি এখন ভুলে গেলাম... চট্টগ্রামে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দুবার আলাপ করে তাঁকে রাজি করালাম। তাঁকে বললাম, ‘আপনার জাহাজগুলো আমাকে দিন। আমার ছাত্রদের সমুদ্রের মাছ ধরার পদ্ধতি, সমুদ্রে মাছ সম্পর্কে ধারণা লাভের জন্য নিয়ে যেতে চাই।’ তিনি রাজি হয়ে পাঁচটি জাহাজ—প্রভাতী, সন্ধানী ইত্যাদি আমার অধীনে পরিচালনার অনুমতি দিলেন। বললাম, ‘আপনার জাহাজে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অফ হোল্ড করে দিন।’ আমার ৩৬ জন ছাত্রের মধ্যে একজনের অসুখ হলো, সে আসতে পারল না, বাকিদের প্রগ্রাম করে দিলাম—তোমরা এ সময়ে ঘুমাবে, এই সময়ে এই কাজ করবে। রেডিওতে তাদের নির্দেশ দিয়ে কিভাবে জাহাজ পরিচালনা করতে হবে, কোথায় যেতে হবে—সেই নির্দেশনাগুলো দিতাম। সাগরে মত্স্য গবেষণাও আমার হাত ধরে এভাবে শুরু হলো।

 

আর ফ্যাকাল্টির উন্নয়নে কী ভূমিকা রেখেছেন?

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে তো অ্যাগ্রিকালচার ফ্যাকাল্টি বিল্ডিং হয়েছে, এরপর অন্যগুলো হয়েছে। পল রুডলফ নামের একজন আর্টিটেক্ট এনিমেল হাজবেন্ড্রি, ফিশারিজ, অ্যাগ্রিকালচারাল ইকোনমিকস ফ্যাকাল্টি করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক ফ্যাকাল্টির ডিনদের পল রুডলফের সঙ্গে আলাপের সুযোগ দিয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা নয়, আমি সারা দিন তাঁর সঙ্গে আলাপ করেছি। এর ফলে আমি আমার ফ্যাকাল্টির ভবনগুলো বড় করতে পেরেছিলাম। আমার গ্যালারিগুলোতে লম্বা বেঞ্চ করেছি। এমনকি ফ্যাকাল্টির বাথরুমগুলোও যথাযথভাবে পুনঃস্থাপনের ব্যবস্থা করেছি। আমার ফ্যাকাল্টি তখনকার আমলে তৈরি তিনটি ফ্যাকাল্টির সবচেয়ে বড়।

 

আপনার বিখ্যাত ছাত্র?

সেই ১২ জনের মধ্যে একজন আবদুল মজিদ। ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রথম পরিচালক ছিল। আমার বিখ্যাত ছাত্রদের সবার নাম তো এখন বলতে পারব না। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্র-ছাত্রীই আমাকে শিক্ষক বলে মান্য করবে।

 

আপনার বিভাগে পিএইচডি কতজনকে দিয়েছেন?

এখানে করার চেয়ে তারা বাইরে গিয়ে বেশি পিএইচডি করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় কয়েকজনের এমএসসির সুপারভাইজার ছিলাম।

 

স্বাধীনতার পরে উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রম?

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে এ দেশে প্রথম যে সিম্পোজিয়ামটি হয়েছিল, সেটি কৃষির ওপরই হয়েছে। নাম ছিল ‘সিম্পোজিয়াম অন এগ্রিকালচারাল রিসার্চ’ বা এই জাতীয় কোনো নাম। এই মুহূর্তে নামটি ঠিক মনে পড়ছে না। আমাকে সেই সিম্পোজিয়ামের কনভেনার করা হলো। দায়িত্বটি গ্রহণের পর দেশে-বিদেশে যোগাযোগ করে এই ক্ষেত্রের নামকরা ব্যক্তিত্ব, কৃষি বিজ্ঞানীদের দাওয়াত করে এনেছি। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সিম্পোজিয়ামের উদ্বোধন করেছিলেন। দুজন মন্ত্রী এসেছিলেন। দেশ-বিদেশী অতিথিরা ছোট প্লেনে চড়ে আমাদের ময়মনসিংহের যেখানে প্লেনে চড়ে নামা যায়, সেই রাস্তায় এসে বিমান থেকে নেমে সিম্পোজিয়ামে উপস্থিত হয়ে আলোচনা করেছেন। ইন্দোনেশিয়ার কৃষি মন্ত্রী লেখা পাঠিয়েছেন।

 

প্রশাসনিক দায়িত্ব?

একসময় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার ছিলেন না, তখন প্রফেসর হিসেবে আমাকেই রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। সেটি বোধ হয় প্রফেসর ড. কামাল আহমদের আমলের ঘটনা। রেজিস্ট্রার হিসেবে তখন এসএসসির পরে পাঁচ বছরের কোর্স পড়ানোর ব্যবস্থাটি চালু করেছি। আর আমি বাংলাদেশের সেই কয়েকজন ভাইস-চ্যান্সেলরের অন্যতম, যাঁরা দুই মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছেন। আমার জানা মতে ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, তিনি আমার সমসাময়িক, তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মেয়াদে ভিসি ছিলেন। প্রথম তো ১৯৮০ সালে চার বছরের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট হলো।

 

উপাচার্য হিসেবে আপনার অবদান?

সেখানে অনেক কাজ বন্ধ হয়ে ছিল। যেমন—জয়নুল আবেদিন সেন্ট্রাল অডিটরিয়ামটি কিন্তু আমি করেছি। খেলার স্টেডিয়ামটির কাজ বন্ধ হয়ে ছিল, সেটি করেছি। স্টেডিয়ামে গ্যালারি করেছি। কেন্দ্রীয় মসজিদও আমার করা। আগে তো একটি হলই ছিল ইস্ট আর ওয়েস্ট নামে; ছাত্রসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় টিনশেড করা হয়েছিল, সেখানে ছাত্ররা থাকত! আমি বললাম, এভাবে তো চলবে না। আমাদের হল করতে হবে। এখন যেটি শাহজালাল হল, সেটি আমি করেছি। আমি তার ওয়ার্ডেনও ছিলাম। তখন অবশ্য উপাচার্য ছিলাম না। এরপর তো কয়েকটি হল হয়েছে। মেয়েদের জন্য প্রথম সুলতানা রাজিয়া হল আমি করেছি। মেয়েদের কী চাহিদা সেটি ভালো বুঝবেন বলে এই হলের নকশা একজন নারী স্থপতিকে দিয়ে করিয়েছি। বোটানিক্যাল গার্ডেনকে উন্নত করেছি। আমি ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত উপাচার্য ছিলাম। জিমন্যাশিয়ামটিও আমি করেছি। হল লাইব্রেরিগুলোর পড়ার রুমগুলো আলাদা করে দিয়েছি।

 

আরো তো অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন?

আগে তো এটি একটি কলেজ ছিল। নাম ছিল ইষ্ট পাকিস্তান কলেজ অব ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি। সেখানে কিছু শিক্ষক ও তাদের বাসা ছিল। কিন্তু যখন এটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হবে, তখন তা অনেকগুলো ফ্যাকাল্টি হবে; ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকের সংখ্যাও অনেক বাড়বে। ফলে আস্তে আস্তে সবই উন্নত করতে হবে। আমার পরিকল্পনায় সবই ছিল। তখন এখানে একটিমাত্র হল ছিল। সেটি ইষ্ট আর ওয়েষ্ট হাউজ নামে বিভক্ত ছিল। আমি অবকাঠামোর কথাও ভালোভাবে বলেছি। ফলে এখন পাঁচ-ছয়টি হল হয়েছে। আমিই প্রথম মেয়েদের ভর্তি করা শুরু করেছি। আমি যখন মেয়েদের ভর্তি করবো, তখন তারা বলেছিলেন, মেয়েরা কী মাছ ধরতে পারবে, নৌকা বাইতে পারবে? আমার ফ্যাকাল্টি থেকেই আপত্তি করা হয়েছে। উত্তরে বলেছিলাম, তোমরা দেখ নাকের ওপর আর আমি দেখি অনেক দূরে। ফলে আমি ছাত্রী ভর্তি করবো। এরপর আমি ছাত্রী ভর্তি করতে শুরু করলাম আর তাঁরা তার পরের বছর থেকে মেয়েদের ভর্তি করা আরম্ভ করলেন। সেই ছাত্রীদের মধ্যে থেকে নারী শিক্ষকও হয়েছে। পিএইচডি করে তাঁরা বিদেশ থেকে এসেছেন।

 

কোনো আক্ষেপ?

একটি ফিশারিজ ইউনিভার্সিটি করার ইচ্ছা আমার ছিল, চেষ্টা করতে পারিনি মানে আসলে কুলাতে পারিনি বলে সেটি করতে পারিনি। আমি মনে করি, বাংলাদেশে ফিশারিজ ইউনিভার্সিটি দরকার। কারণ ফিশারিজ আলাদা বিষয়, এর সঙ্গে কৃষির তেমন যোগসূত্র নেই। এটি মাছ, পানি নিয়ে কাজ করে। ভারতে কিন্তু অ্যাগ্রিকালচারের বাইরে বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে।

 

আপনার রচিত গ্রন্থ? 

নবম-দশম শ্রেণির জন্য পাঠ্যপুস্তক বই লিখেছি, নাম ‘সরল জীববিজ্ঞান’। এখনো সেই বইয়ের আলোচনা করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত একজন যুগ্ম সচিব আবুল হাশেম আমাকে বলেছেন, ‘আপনি যে বইটি লিখেছেন, সেটির প্রথমে যে উপক্রমণিকা, সেটিই তো আলাদাভাবে পড়ার মতো।’ সেখানে যেমন আমি লিখেছি—‘জীববিজ্ঞান জীবনের জয়গান। শেখার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিজেরা সেই পড়া বিষয়টিকে নিয়ে আলোচনা করা।’ নবম-দশম শ্রেণির এই পাঠ্য বইটি উপমহাদেশের প্রথম পাঠ্য বই যেটি ‘ইউনেসকো প্রাইজ’ পেয়েছে। ইউনেসকো স্কুলের একটি বইকে পুরস্কার দিয়েছে। এর কয়েকটি সংস্করণ হয়েছে। আবার চোখের সামনে যেসব পাখি দেখি, সেগুলো নিয়ে একটি বই লিখেছি। ড. ফেরদৌস খান নামে ব্যুরো অব রিকন্সট্রাকশনের একজন যুগ্ম সচিবের পদার্থবিজ্ঞানের ওপর লেখা একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি দেখে দিয়েছিলাম। পরে আমার লেখা এই বইটির পাণ্ডুলিপি তাঁকে দেখতে দিলাম। তারপর আর কিছু জানি না। একদিন হঠাৎ বাংলা একাডেমি থেকে আমার কাছে এক কর্মকর্তা এলেন, ‘আপার এই বইয়ের ইলাস্ট্রেশনের সাজেশন দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’ পরামর্শ দিলাম। বই বেরোল। পাকিস্তানের তত্কালীন প্রধান বিচারপতি কর্নেল ইলিয়াস ঢাকায় এসে আমাকে এই বইয়ের পুরস্কার দিয়েছেন। বইটির নাম ‘চিল, ময়না, দোয়েল, কোয়েল’। এটি বাজারে আছে। বাংলা একাডেমির পরে একটি বেসরকারি প্রকাশনাকে দিয়েছিলাম। তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ না রাখলেও বইটি প্রকাশ করেছে। এই বইটিও ‘ইউনেসকো প্রাইজ’ পেয়েছে।

শ্রুতলিখন : রনি খাঁন, (৩ মার্চ ২০১৮, গুলশান, ঢাকা)



মন্তব্য