kalerkantho


ফিল্মের মাইক্রোফোনেই আমার জীবন বেঁধেছি

পাকিস্তানে একসময় প্লেব্যাকজগৎ শাসন করেছেন তিনি। বলিউডেও গেয়েছেন আপন মহিমায়। বাংলা ছবির অপ্রতিদ্বন্দ্বী গায়িকা ‘রুনা লায়লা’ই এ দেশের সবচেয়ে বড় তারকা। তাঁর মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

২৫ মে, ২০১৮ ০০:০০



ফিল্মের মাইক্রোফোনেই আমার জীবন বেঁধেছি

আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন।

আমার জন্ম সিলেটে, ১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর। আব্বা সৈয়দ মোহাম্মদ ইমদাদ আলী কাস্টমসে চাকরি করতেন। যখন আমার মাত্র কয়েক মাস বয়স, আব্বা পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি হলেন। সেই থেকে অনেক বছর আমরা সেখানেই ছিলাম। তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য হিসেবে অবসর নিয়েছেন। মা আমিনা লায়লা গৃহবধূ ছিলেন, কিন্তু শখে গান করতেন। রেডিওতেই বেশির ভাগ গান করেছেন। আমরা তিন ভাই-বোন—মরহুমা দিনা লায়লা, এরপর আমি, সবার ছোট ভাই সৈয়দ আলী মুরাদ।

 

ছোটবেলায় কী হতে চেয়েছিলেন?

নাচের দিকে আমার খুব আগ্রহ ছিল। সুযোগ পেলেই তো নাচতাম। মা বলতেন, রেডিও চালু করে আমি নাকি নিজের মনে নেচে বেড়াতাম। নাচের মুদ্রা তৈরি করতাম। নাচের প্রতি এই আগ্রহ দেখে করাচির বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে আমাকে ভর্তি করে দেওয়া হলো। চার বছর নাচ শিখেছি। কিন্তু মা যেহেতু গানের মানুষ ছিলেন, বাড়িতেও গানের পরিবেশ ছিল, ফলে গানের প্রতি দুর্বলতা বাড়তে লাগল। রেডিওতে তখনকার দিনের নামকরা শিল্পীদের গান শুনতাম আর ভাবতাম—একদিন এভাবে আমার নামও যদি রেডিওতে ঘোষণা করত। আমার গান বাজবে, শ্রোতারা শুনবে—এই স্বপ্ন আমার ছিল। আল্লাহ সেটি পূরণ করেছেন। সে জন্য ভক্ত-শ্রোতা, মা-বাবা—সবারই অনেক অবদান আছে। সবার ভালোবাসা, দোয়া ও আশীর্বাদেই আমি এত দূর আসতে পেরেছি। একেক সময় অবাক লাগে, ছয় বছর বয়সে স্টেজে ওঠা মেয়েটি কী করে এতগুলো বছর গানের ভুবনে ভালোভাবে কাটিয়ে দিল। এখনো যে গাইছি, সেটি আমার জন্য বিরাট পাওয়া।

 

গানের শুরু?

আমরা নিজেদের জন্য গান শিখতাম। বাড়িতে অনুশীলন করতাম। ওস্তাদজি দিনা আপাকে শেখাতেন। আমার তখন মোটে বছর তিন-চার, রেওয়াজেও তেমন বসতাম না; বোন গান শিখতেন, পুরো বাসা ঘুরে বেড়াতাম; খেলতাম-নাচতাম; কিন্তু আপা যা শিখতেন, সেটি আমার স্মৃতিশক্তি ধরে ফেলত, হঠাৎ করে এসে গানটি গেয়ে চলে যেতাম। ফলে ওস্তাদজি মাকে ডেকে বললেন, ‘এতটুকু শিশু, নিজের খেয়ালে বসছে আবার উঠে চলে যাচ্ছে; কিন্তু গানের সব কিছুই আয়ত্ত করে ফেলছে, দিনাকে যেভাবে শেখাচ্ছি, ও ঠিক সেভাবেই গাইছে—এ অসাধারণ প্রতিভা। এই প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে হবে। রুনার গলা ভালো, ঘষামাজা করে একে মসৃণ করতে হবে। ওকে গান শেখাব।’ তখনো কিন্তু আমি মাঝেমধ্যে রেওয়াজে বসতাম, আবার পালিয়ে যেতাম। এভাবেই শেখা শুরু।

 

ছোটবেলায় কাদের গান শুনতেন?

ভারতের লতাজি (লতা মুঙ্গেশকর), আশাজি (আশা ভোঁসলে), রাফি সাব (মোহাম্মদ রফি), কিশোরদা (কিশোর কুমার), পাকিস্তানের নূরজাহান ম্যাডাম (নূরজাহান বেগম),

পাকিস্তানের মালা (নাসিম নাজিল), নাসিম বেগম, আমাদের আবদুল আলীম সাহেব, ফেরদৌসী আপা (ফেরদৌসী রহমান), আমার ফুফাতো বোন আঞ্জুমান আরা বেগম—তাঁদের গান শুনেই তো আমাদের প্রজন্ম বড় হয়েছে। তাঁদের গানই গাইতাম। তাঁরাই আমাদের সবার সংগীতের অনুপ্রেরণা।

 

প্রথম স্টেজে উঠলেন কবে?

ছয় বছর বয়সে। করাচিতে কয়েকজন বাঙালি মিলে ‘ঢাকা ওল্ড বয়েজ অ্যাসোসিয়েশন’ নামে সংগঠন করেছিলেন। তাঁরা নিয়মিত অনুষ্ঠান করতেন, বাঙালিরাই তাতে নাচ, গান, আবৃত্তি—সব কিছুতে অংশ নিতেন। তাঁদেরই এক অনুষ্ঠানে দিনা আপার গাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাঁর গলায় সমস্যা হওয়ায় তিনি আর গাইতে পারবেন না, আয়োজকদের মা-বাবা সে কথা বললেন; কিন্তু তাঁরা বললেন, ‘আমরা তো আগে থেকেই দিনা লায়লার কথা প্রচার করেছি, না গাইতে পারলে তো আমাদের খুব অসুবিধা হবে।’ তখন মা বললেন, ‘তাহলে আমার ছোট মেয়েকে দিয়ে গান গাওয়ান।’ আমি যে গাইতে পারব, তাঁরাও বিশ্বাস করলেন না। বলেও ফেললেন, ‘অতটুকু বাচ্চা কি পারবে?’ মা বললেন—‘ঠিকই পারবে, ওকে নিয়ে যান আর স্টেজে তুলে দিন।’ পরে মায়ের কাছে শুনেছি, স্টেজে উঠে নির্ভয়ে ক্লাসিক্যাল রাগ গেয়েছি আমি। দর্শকরা খুব পছন্দ করেছেন। আমাকে ফুলের মালা, নগদ অনেক সম্মানীও দিয়েছেন।

 

পেশাদারি জীবনের শুরু কবে থেকে?

পেশাদার হিসেবে গাইব, ছবিতে গান করব, আমি কিন্তু কোনো দিনও ভাবিনি। সেই ছবিটির নাম ‘জুগনু’। পাকিস্তানের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি লাহোরে। ১২ বছরের এক ছেলের কণ্ঠে গান গাওয়ার জন্য কোনো শিল্পীকে না পেয়ে সেই ছবির প্রযোজকরা করাচিতে চলে এলেন। ৯ বছর বয়সে করাচি রেডিও আয়োজিত এক আন্ত স্কুল প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। তেমন শিল্পীর খোঁজে তাঁরা যখন স্টেশনে গেলেন, কর্মকর্তারা বললেন, ‘বছর তিনেক আগে আমাদের প্রতিযোগিতায় একটি মেয়ে সেরা হয়েছিল। তার গলাটি ভালো, তাকে দিয়ে চেষ্টা করে দেখতে পারেন।’ তাঁরা আব্বার অফিসের টেলিফোন নম্বর দিলেন। আব্বা তো ছবির কথা শুনেই না করে দিলেন, আমার মেয়ে ছবিতে গাইবে না, এটি হবে না। তাঁরা খুব বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আমরা এসে আপনার সঙ্গে অন্তত একবার কথা বলি, দেখা করি, তাহলে হয়তো বুঝবেন। আব্বা রাজি হলেন। সেই বিকেলেই বাসায় এসে তাঁরা মা-বাবার সঙ্গে আলোচনা করলেন, আমার গানও শুনলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা টের পেয়ে গেলেন, আমার গলাটি সিনেমার জন্য খুব ভালো। আমার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বললেন। প্রযোজকরা জানালেন, ফিল্মে গাওয়ার কিছু কৌশল আছে। রুনাকে ছবিতে গাওয়াতে রাজি হলে আমরা তার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। আমি কিন্তু এসব আলাপের সবই শুনছি। আমারও সিনেমায় গাওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছা। কিন্তু মা-বাবার কথার ওপর তো কথা নেই। যা-ই হোক, এরপর তো মা-বাবা রাজি হয়ে গেলেন।

 

ওনারা সিনেমার গানের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলছিলেন। কেমন ছিল সে প্রশিক্ষণ?

আমার খুব সৌভাগ্য যে সংগীত পরিচালক ‘মনজুর হোসেন’কে ওস্তাদ হিসেবে পেয়েছি। প্রথম দিকে গানের কয়েক জায়গায় গলা আটকে যেত, ঠিকমতো গলা চলত না। কিভাবে গানটি তুলে ধরতে হবে, বুঝতাম না। এই ভদ্রলোক আমাকে টানা এক মাস ট্রেনিং দিয়ে একটি গান তুলে দিলেন। আমার সামনে একটি চেয়ার রেখে বলতেন—‘রুনা, তুমি ভাবো, তোমার সামনে মাইক্রোফোন আছে, সেভাবে গাও।’ তিনি আমাকে এভাবে অনুশীলন করালেন। ফিল্মের গানের সব টেকনিকও শিখিয়ে দিলেন। তাতে আমার অসম্ভব লাভ হয়েছে। এই অনুশীলনের পর যখন মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে অনুশীলন শুরু করলাম, আমার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়ে গেল যে সিনেমায় গান গাওয়া খুব সহজ, কোনো কষ্টই আমার হচ্ছে না। এই ওস্তাদজি গলার দুর্বলতাগুলো সারিয়ে আমাকে সিনেমার গানের জন্য সেই ১২ বছর বয়সেই পরিপূর্ণভাবে তৈরি করে দিয়েছেন।

 

সামাজিক কোনো সমস্যা হয়নি?

তখনকার দিনে ধারণা ছিল, ফিল্ম লাইন ভালো নয়, সেখানে খারাপ লোকেরা কাজ করে। ফলে প্রথমে তাঁরা মনে করলেন, ফিল্মে গেলে মেয়ের কি না-কি হয়? আসলে সব জায়গায়ই তো ভালো-মন্দ মিশিয়েই মানুষ থাকেন। সিনেমায় যখন প্রথম একটি গান গাইলাম, তখন কিন্তু সবাই খুব আদর-স্নেহ করলেন। মা-বাবাও দেখলেন, এতটুকু মেয়েকে সবাই শিল্পীর মর্যাদা দিচ্ছেন! এ ভুবনেও তো অনেক গুণী আছে; ফলে আস্তে আস্তে তাঁদের ধারণাটি বদলাল। আমিও স্বাচ্ছন্দ্যে গাওয়া শুরু করলাম। এর পর থেকে তো ফিল্মের মাইক্রোফোনেই জীবনকে বেঁধেছি।

 

সে সময় আপনার উল্লেখযোগ্য সিনেমার গান?

এখন আর আলাদা করে নাম বলা তো মুশকিল। ১৯৭৪ সালে দেশে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত সে দেশের উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, পশতু—সব ভাষার ছবিতে গান করেছি। এমন একসময় গেছে—এক ছবিতে ছয়টি গান থাকলে পাঁচটিই আমার ছিল। সেখানে বিখ্যাত, নামকরা চলচ্চিত্র পরিচালক, সংগীত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। অনেক বিখ্যাত ছবিতে গান গেয়েছি। আমার গাওয়া কাওয়ালি ‘দামাদাম মাস্ত কালান্দার’ তো সারা বিশ্বে সুপারহিট।

 

প্রথম বাংলা গান গেয়েও হিট হয়েছেন?

‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে’ গানটি তো অনেক পরে গেয়েছি। সেদিন লাহোরে এক সিনেমার গানের রেকর্ড করছি। শুনলাম, বাংলাদেশ থেকে সিনেমার লোক এসেছেন। তাঁরা বললেন, একটি বাংলা ছবিতে গান গাইতে পারবেন কি? বললাম, অবশ্যই পারব; কিন্তু সে জন্য তো সময় বের করতে হবে। তখন মা-বাবার সঙ্গে করাচি থাকি, স্কুলে যাই; দিন দশেকের জন্য লাহোর গিয়ে অনেক গানের রেকর্ড করে ফিরি। তাঁরা আমার ভীষণ ব্যস্ততার কথা জানতেন বলে বললেন, আপনাকে শুধু এক ঘণ্টা দিতে হবে। আমরা গানটি ট্র্যাক করে নিয়ে যাব। এরপর আপনাকে শুধু এক ঘণ্টার জন্য গিয়ে ভয়েসটি দিতে হবে। গানটিকে মাহমুদুন্নবী সাহেবের অংশও ছিল। তাঁরা বললেন, মাহমুদুন্নবীর অংশটি আগে নিয়ে নেব, আপনি এসে গেয়ে দিলে গানটি হয়ে যাবে। তারপর আর কোনো বাংলা ছবির গানের রেকর্ডিং ওখানে হয়নি। সেই একটি গানই সুপারহিট হয়েছে।

 

বলিউডেও তো গেয়েছেন?

১৯৭৫ সালে মুম্বাইয়ে কল্যাণজি-আনন্দজির সুরে ‘এক সে বারকার এক’ ছবিতে গেয়েছি। এতে আমার সহশিল্পী ছিলেন লতা মুঙ্গেশকর। তিনি আমার গান শুনে আমাকে আশীর্বাদ করেছেন। ‘জান-ই-বাহার’ (১৯৭৭) ছবিতে মোহাম্মদ রফি সাহেবের সঙ্গে বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে ‘মার গায়ো রে’ গেয়েছি, ‘ঘরোন্দা’ (১৯৭৭) ছবিতে গেয়েছি—‘তুম হো না হো মুজকো তো’, অমিতাভ বচ্চনের ‘অগ্নিপথ’-এ (১৯৯০) একটি গান গেয়েছি। জয়াপ্রদা-জিতেন্দ্রর ‘স্বপ্ন কা মন্দির’-এ (১৯৯১) একটি গান গেয়েছি। ‘ঘর দুয়ার’-এ (২০০৭) আমার ‘ও মেরা বাবু চল ছবিলা মে তু নাচুঙ্গি’ সুপারহিট হয়েছে। মুম্বাইয়ে অনেক গান গাওয়া হয়নি, তবে যেগুলো গেয়েছি, সেগুলো এখনো খুব জনপ্রিয়। হিন্দিতে আমার ‘লাভ সংস অব রুনা লায়লা’ নামে অ্যালবাম আছে।

 

আপনাকে নাকি পাকিস্তানে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল?

আব্বার একটি বাড়ি ছিল মোহাম্মদপুরে, তার পরও আমরা কখনো দেশে থাকিনি। খুব একটা আসতামও না। বছরে হয়তো একবার এসে আত্মীয়-স্বজনের কাছে বেড়িয়ে চলে যেতাম। বোনের বিয়েও হয়েছে ওখানে। ওখানেই সে সংসার করত, থাকত। মুক্তিযুদ্ধের আগেই কিন্তু আব্বা অপশন দিয়েছিলেন, দেশে চলে যাবেন। আমার মধ্যেও দেশে ফেরার আকুলতা তৈরি হলো। একাত্তরে যখন গণহত্যা শুরু হলো, কেন জানি ভেতরে দেশের জন্য অন্য রকম ভালোবাসা, আকুলতা কাজ করতে লাগল। কিছু ছবির কাজ বাকি ছিল, সেগুলো শেষ করে আসতে সময় লেগেছে। হ্যাঁ, এটা ঠিক, সেখানকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আমাকে রাখার জন্য খুব চেষ্টা করেছে, তার পরও নিজের দেশে আমি চলে এসেছি।

 

দেশে ফেরার পর?

১৯৭৪ সালে প্রয়াত সত্য সাহার সুরে ‘জীবন সাথী’ ছবিতে প্রথম গাওয়া শুরু করলাম। সহশিল্পী খন্দকার ফারুক আহমেদ। এখানে আমি সিনিয়র, জুনিয়র এমনকি নতুনদের সঙ্গেও কাজ করেছি। অসংখ্য গান গেয়েছি বাংলা সিনেমায়। আলাদা করে বেছে গানের কথা বলা খুব কঠিন। তার পরও গীতিকার মাসুদ করিমের লেখা, সুবল দাস সাহেবের সংগীত পরিচালনায় একটি অনুষ্ঠানে গাওয়া ‘যখন থামবে কোলাহল’, আলাউদ্দিন আলীর সুরে ‘যখন আমি থাকব না কো আমায় রেখো মনে’, আলাউদ্দিন আলীর সুরে ‘বুকে আমার আগুন জ্বলে’, ‘বাহাদুর’ ছবিতে (১৯৭৭) ‘রূপে আমার আগুন জ্বলে’, আনোয়ার পারভেজের সুরে ‘দি রেইন’ (১৯৭৬) ছবিতে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ‘আয় রে মেঘ আয় রে’, ববিতার ঠোঁটে সত্য সাহার সুরে ‘আনারকলি’ (১৯৮০) ছবিতে সুপারহিট ‘আমার মন বলে তুমি আসবে’, আলম খান সাহেবের সুরে ‘লাভ ইন শিমলা’ ছবিতে ‘হেরে গেছি আজ আমি নিজের কাছে’, সত্যদার সুরে ‘শিল্পী’ ছবিতে সৈয়দ আবদুল হাদী ও আমার দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া ‘কে জানে কত দূরে সুখের ঠিকানা’—এমন অসংখ্য গান আছে। ‘শিল্পী’ ছবির মাধ্যমেই আলমগীর সাহেবের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। যা হোক, এগুলো ছাড়া আমার আরো প্রিয় গান আছে। একটু মেলোডিয়াস ও একটু ক্লাসিক্যাল বেইজড গানগুলো গাইতে আমি পছন্দ করি।

 

অনেকবার চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।

ছয়বার। আমার ভুলও হতে পারে—প্রথমবার ‘যাদুর বাঁশি’ ছবিতে ‘জাদু বিনা বাঁশি’ গানের জন্য পুরস্কার পেয়েছিলাম। সালটি এখন আর মনে নেই। কোনো জাতীয় পুরস্কার পাওয়া তো খুব সম্মানের বিষয়। আমার খুব ভালো লেগেছে। 

 

১৯৮২ সালের ১ ডিসেম্বর ‘সুপার রুনা’ অ্যালবামটি প্রকাশের দিনই এক লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। সেই অবিশ্বাস্য ঘটনাটি মনে পড়ে?

‘দি গ্রামোফোন কম্পানি অব ইন্ডিয়া’ ‘ইএমআই ইন্ডিয়া’ নামেও পরিচিত, এখন সারেগামা ইন্ডিয়া লিমিটেড হয়ে গেছে। তারা আমাকে প্রস্তাব দিল, “আপনার একটি অ্যালবাম করতে চাই। আমাদের লন্ডন শাখার মাধ্যমে বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে লন্ডনের ‘অ্যাবি রোড স্টুডিওস’ নামের রেকর্ডিং স্টুডিওতে সেটির রেকর্ড করা হবে।” এই রেকর্ডিং স্টুডিওতে বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড বিটলস তাঁদের অ্যালবামগুলোর রেকর্ড করেছেন। ‘অ্যাবি রোড’ নামে তাঁদের অ্যালবামও আছে। স্যার ক্লিফ রিচার্ড ওবিইসহ আরো অনেক বিখ্যাত শিল্পী এই রেকর্ডিং স্টুডিওতে অ্যালবাম করেছেন। তত দিনে মুম্বাই, দিল্লি, পশ্চিম বাংলায় অনেক স্টেজ পারফরম্যান্স ও টিভি অনুষ্ঠান করে আমি খ্যাতি লাভ করেছি। পাকিস্তানে আমার বিখ্যাত গানগুলোর কথাও তাঁরা জানতেন। বাপ্পি তখনো এতটা নাম করেননি। তবু রাজি হলাম। আমিই প্রথম এশীয় শিল্পী হিসেবে অ্যাবি রোড স্টুডিওসে অ্যালবামের রেকর্ড করলাম। ইএমআই অ্যালবামটির জন্য অনেক প্রচারণা চালাল। অ্যালবাম প্রকাশের প্রথম দিনই পত্রিকায় বিরাট করে বিজ্ঞাপন দিল। পরদিন তারা আবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিল, এক দিনের মধ্যে ‘সুপার রুনা’ অ্যালবামের এক লাখ কপি বিক্রি হয়ে গেছে। তারা আমাকে স্বর্ণের ডিস্ক উপহার দিল। এই অ্যালবামে সব ধরনের গানই ছিল। দর্শকরা এখনো সেই গানগুলো আমার কাছে শুনতে চান।

 

এখন তো গানে অনেক প্রযুক্তির ব্যবহার হয়। আগে আপনারা কিভাবে প্রস্তুতি নিতেন?

তখন তো আমাদের পুরো এক কী দুই দিন মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে মহড়া দিতে হতো। সবাই মিলে এরপর স্টুডিওতে গিয়ে লাইভ রেকর্ডিং করতাম। আগে একটি গানের পেছনে অনেক কষ্ট করতে হতো, অনেক সময় দিতে হতো, কিন্তু দিন শেষে যখন গানটি তৈরি হয়ে যেত খুব প্রশান্তি লাগত। মনকে বলতাম, সবাই মিলে একটি ‘গান’ তৈরি করতে পেরেছি। এখন গান তো খুব সহজ হয়ে গেছে (হাসি)। স্টুডিওতে গেলেই দেখি, মিউজিক করা আছে। অনেক সময় মিউজিকও করা থাকে না। কম্পিউটারে একটি ক্লিক দিয়ে বলে, ‘রুনা আপা, আপনার নোট ধরছি, প্লিজ গেয়ে দেন’; এমনও হয়েছে। আগে আমাদের গান মানুষের মনে থাকত। সবাই মিলে গান তৈরি করা হয় না বলে এখন রেকর্ডিং করে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নিজেই গানটি ভুলে যাই। আগে যেমন পুরো গানটি একবারে গাইতে হতো, এখন তো আর সেটি হয় না। এখন লাইন বাই লাইন কেটে গান তৈরি করা যায়। একটি লাইন গাওয়ার পর হয়তো বললাম, আচ্ছা এই লাইনটি ভালো হয়েছে, রেখে দাও। পরে কাট, পেস্ট করে লাগিয়ে দাও। এভাবে কাজ হচ্ছে। ফলে আগের আবেগও আসে না, গান গেয়ে প্রশান্তিও পাই না। কী আর বলব, সারা দুনিয়ায়ই, ভারত-পাকিস্তানেও এভাবেই গান তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তাতে আমার মনে হয় গানের ‘কোয়ালিটি’ অনেকটাই মার খেয়ে যায়।

 

অনেক ভাষায় গান করতে পারেন আপনি?

আমি ১৮টি ভাষায় গান করতে পারি। আমার ভাষা শেখার খুব নেশা আছে। ছোটবেলা থেকেই অন্য ভাষা শেখার চেষ্টা করি। বাংলা তো মাতৃভাষা, ইংরেজিটা জানি; উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি—বুঝতে, বলতে পারি। কিছুটা ফরাসি বলতে পারি। যখনই যে ভাষার গান শুনি, ভালো লাগলে গলায় তুলে নেই। এ আমার একটা শখ। আরবি, স্প্যানিশ তো বলতে পারি না, কিন্তু এই ভাষার গান গাইতে পারি। বলতে পারেন আমার এই গুণটি আল্লাহ প্রদত্ত। তবে ভাষা শেখার আগ্রহ থাকলে অন্য ভাষার গান শেখা সম্ভব।

 

রুনা লায়লা স্টাইলের জন্ম কিভাবে?

যখন পাকিস্তানে থাকতাম, তখনো গানের সঙ্গে পারফরম্যান্সের ধারণাটিই ছিল না। দাঁড়িয়ে বা বসে খুব গম্ভীরভাবে গান গাওয়া হতো। বলতে পারেন আমার এই স্টাইলের জন্ম পাকিস্তানে টিভি প্রগ্রামের সময়। টেলিভিশনের প্রযোজক একদিন বললেন, ‘রুনা, শুধু আপনাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করব, সেই পাক্ষিক অনুষ্ঠানের নাম ‘বাজম এ লায়লা’, প্রতিটি পর্বে পাঁচটি গান থাকবে। প্রতিটি গান ভিন্ন মেজাজের হবে।’ বললাম, ‘ঠিক আছে কিন্তু আপনারা যেভাবে পোশাক পরে আসতে বলবেন, গাইতে বলবেন, সেটি হবে না; আমি যেভাবে চলাফেরা, মেকআপ, হেয়ার স্টাইল করি, গয়না পরি, ঠিক সেভাবেই দর্শকদের সামনে আসব। আমাকে স্বচ্ছন্দে কাজ করতে দিতে হবে।’ তখন তো আমি টিন এজার, জিন্স, টি-শার্ট, ম্যাক্সি, সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি সবই পরি। প্রথমে তাঁরা একটু বেঁকে বসেছিলেন। পাকিস্তান দেশটি খুব রক্ষণশীল। ফলে সরকার, সাধারণ দর্শকরা আমার এই আধুনিকতা কিভাবে নেবেন, এ নিয়ে তাঁরা ভয়ে ছিলেন? তাঁদের বুঝিয়েছি, ‘আমার বন্ধুমহল কিন্তু এভাবেই চলাফেরা করে। এটি তো খারাপ কিছু নয়, অবাক হওয়ারও কোনো বিষয় নয়। ভাববেন না হঠাৎ করে কিছু হচ্ছে। আমাদের বয়সের সব ছেলে-মেয়েই এভাবে পোশাক পরে।’ রেকর্ডিংয়ের সময় তাঁরা খুব ভয়ে ছিলেন। প্রথম পর্ব প্রচারের পর প্রযোজক, টিভির কর্মকর্তা, আমার বন্ধু, পরিচিত, দর্শক—সবার কাছ থেকে এত ভালো সাড়া এলো। তাঁরাও বললেন, এই প্রথম আমরা গানের শিল্পীর অংশগ্রহণ দেখলাম। দেশে ফেরার পর বিটিভিতেও আমাকে এই একই কাজ করতে হয়েছে। বিটিভির কর্মকর্তারা বলেছিলেন, এভাবে পারফর্ম করলে দর্শকরা কী বলবেন? কী না কী হয়! আমিও জানি কী হবে। ফলে বলেছি, যা হবে, দেখা যাবে। যেভাবে আমি পারফর্ম করি, সেভাবেই আমাকে গাইতে দিতে হবে। এরপর তাঁরা সবাই খুব প্রশংসা পেলেন, আমার প্রশংসা করলেন। ভারতেও যখন ১৯৭৪ সালে পারফর্ম করতে গিয়েছি, গানের সঙ্গে একাত্মতার এ ধারণাই সেখানে ছিল না। পর পর মুম্বাই, দিল্লি ও কলকাতায় আমি স্টেজ শো করলাম। এরপর তো সেই দেশগুলোর পত্রিকায়ই লিখল, গান যে দেখারও বিষয় আছে, আগে কোনো শিল্পীই সেটি করেননি। আমাদের খুব ভালো লেগেছে, দর্শকরাও খুব উপভোগ করেছেন। ভারতের সরকারি টেলিভিশন ‘দূরদর্শন’-এ অনুষ্ঠান করার পর কর্মকর্তাও খুব তারিফ করলেন। এখন গানের সঙ্গে একাত্মতার মুদ্রা সবাই ব্যবহার করছেন, মুদ্রাগুলোও জীবন্ত হয়েছে, কিন্তু আমি বলব, আগে গানটি ঠিক রেখে তারপর পারফরম্যান্সে মুদ্রা বা দেহভঙ্গিমায় যেতে হবে। এমন যেন না হয় দেহভঙ্গিমার দিকে খেয়াল রাখতে গিয়ে সুরটি এদিক-ওদিক হয়ে গেল। তাহলে এই ভঙ্গিমার কোনো মানে হয় না।      

 

এই স্টাইলটি কিভাবে তৈরি করলেন?

এটি আমি তৈরি করিনি, আপনা থেকেই হয়ে গেছে। স্টেজে, টিভিতে, এমনকি সিনেমার প্লেব্যাকেও আমার যে টোটাল পারফরম্যান্স, সেটি ভেতর থেকে আসে। এটি মোটেও পরিকল্পিত নয় যে হাতটি আমি এভাবে নাড়ব, চোখটি এভাবে নাড়াব। এটি কিন্তু কখনোই, কোনো দিন আমার মাথায় আসেনি। গানটি গাইতে গাইতে আমার মধ্যে যে অনুভূতির তৈরি হয়, সেটি আপনা-আপনি প্রকাশিত হয়।     

 

অনুষ্ঠানে জমকালো পোশাক পরেন। হাতে-গলায় অলংকার থাকে। এগুলো কিভাবে নির্বাচন করেন?

এটি আমার পারসোনাল টেস্ট; বাসায় খুব সাধারণভাবে থাকি, কিন্তু স্টেজ বা টিভিতে গেলে আমি মনে করি, ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যমান মাধ্যম বলে আমাকে দেখারও বিষয় থাকে। গান শোনার আগে মানুষ প্রথমে আমাকে দেখে। আমি কী শাড়ি, গয়না পরেছি, মেকআপ করেছি, চুল কিভাবে রেখেছি—আমার সম্পর্কে প্রথম প্রতিক্রিয়াটি কিন্তু সেসব দেখেই হয়। তাই আমি মনে করি এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই মাধ্যমগুলোতে আমার উপস্থিতি যদি ভালো হয়, গানগুলোও যদি খুব ভালো হয়, তাহলে তো অসাধারণ মিশ্রণ হয়। ফলে এই বিষয়গুলো আমি সব সময়ই করি, যাতে মনে হয় আমি আলাদা। আমার পোশাক, স্টাইল, পারফর্ম করার পদ্ধতি আমার মতো। একটু জমকালো থাকা সে জন্যই আমি পছন্দ করি।

 

‘সিগনেচার বাই রুনা লায়লা’র জন্ম কিভাবে?

আমার মেয়ে তানি লায়লা একদিন বলল, ‘মা এখন যাঁরা আন্তর্জাতিক তারকা, তাঁরা হয় কোনো ফ্যাশন লাইন বের করছেন, নয় কোনো পারফিউম, জুয়েলারি করছেন। তুমিও কিছু একটা করো। তোমার পোশাকের বিষয়ে সবার যেহেতু আগ্রহ আছে, দর্শকরাও পছন্দ করেন, তুমি নিজের নাম দিয়ে ড্রেস লাইন বের করো। যেটি একমাত্র তোমারই হবে। যাঁরা তোমার ড্রেস সেন্স, ফ্যাশন সেন্স পছন্দ করেন, তাঁরা আগ্রহ করে নেবেন।’ আমিও চিন্তা করে দেখলাম, এটি ভালো আইডিয়া। সে হিসেবেই করা। কিন্তু আমার ড্রেস ডিজাইন দোকান খুলে বসার মতো বিষয় নয়। আপাতত যমুনা ফিউচার পার্কে, ‘মেহজাবিন’ নামের এক দোকানে তাঁরা কাপড়গুলো প্রদর্শনী ও বিক্রি করছেন।

 

আপনাকে নায়িকা করে তো সিনেমা হয়েছে?

পাকিস্তান আমলে একেবারে তরুণ বয়সে অনেক প্রযোজক, পরিচালকই বলেছেন, আমরা আপনাকে নিয়ে ছবিতে কাজ করতে খুব আগ্রহী। নায়িকা হয়ে আপনি ছবিতে অভিনয় করুন। কিন্তু আমি বলেছি, না গানই করব। বাসা থেকেও খুব একটা অনুমতি ছিল না। সে জন্য অভিনয় করা হয়নি। মুম্বাইতে যাওয়ার পর অনেক বড় প্রযোজকও আমায় সিনেমায় অভিনয় করতে প্রস্তাব দিয়েছেন। তখনো ভেবেছি, গান নিয়েই থাকি। দুদিকে কাজ করতে গেলে কোনোটিই তো হবে না। আমার জন্য গানই ভালো। কিন্তু তার পরও ঠেকাতে পারিনি। পাকিস্তানে, বাংলাদেশে, এমনকি বলিউডেও আমাকে নিয়ে সিনেমা হয়েছে।

 

অনেক বিখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে পারফর্ম করেছেন, বন্ধুত্ব হয়েছে। কারো কথা আলাদা করে বলবেন?

মুঙ্গেশকর পরিবারের সঙ্গে আমার খুবই ভালো সম্পর্ক আছে। যখনই ভারতে যাই, লতাজির সঙ্গে দেখা করি, আলাপ হয়। তিনি আমার জন্য উপহার পাঠান, আমিও পাঠাই। আশা ভোঁসলে, আমি ও পাকিস্তানের বিখ্যাত শিল্পী আবিদা পারভীন মিলে একটি তরুণ প্রতিভা অন্বেষণের বিচারক ছিলাম। সেটি ভারতের কালার্স ও সাহারা টিভিতে সম্প্রচার করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানের রেকর্ডিং করা হয়েছে দুবাইতে। সে সময় আশাজির সঙ্গে খুবই অন্তরঙ্গ হওয়ার সুযোগ হয়েছে। আমরা এত বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম যে তিনি আমাকে বলতেন ‘রুনা, তুমি আমার বন্ধু’। পাশাপাশি মেকআপের ভ্যান ছিল আমাদের। শুটিংয়ের বিরতিতে যখন ভ্যানে গিয়ে বিশ্রাম নিতাম, তিনি আমার দরজায় টোকা দিয়ে বলতেন, আমি কি ভেতরে আসতে পারি? আমি বলতাম, এ কোনো কথা হলো? অবশ্যই আপনি আসতে পারেন। এরপর আমাদের দুজনের অনেক গল্প, হাসাহাসি হতো। এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে আমাদের গল্প, হাসির জন্য শুটিং করতে পারছেন না বলে আমরা অনুষ্ঠানের প্রযোজকদের ধমকও খেয়েছি। পরে আবিদা পারভীনকে তাঁরা আমাদের মাঝখানে বসিয়ে আলাদা করেছেন। পরে আশাজি যখন বলেছেন, রুনা পাশে না থাকলে আমি শুটিং করে মজা পাচ্ছি না, তখন আবার বাধ্য হয়ে আমাদের একসঙ্গে করা হলো। তিনি খুব ভালো রান্না করেন। আমাকে তখন বিরিয়ানি ও চিংড়ি মাছ রান্না করে এনে খাইয়েছেন। এর পর থেকে প্রায়ই আমাদের ফোনে কথা হয়। দুবাইতে ‘আশা’জ রেস্টুরেন্ট নামে তাঁর একটি রেস্তোরাঁ আছে। সেখানে তিনি আমাদের দাওয়াত করে খাইয়েছেন। অনেক উপহারও তখন দিয়েছেন। ভারতের মুম্বাইয়ের বাড়িতে দাওয়াত করে নিয়েও অনেক কিছু রান্না করে খাইয়েছেন। এত বড় একজন শিল্পী হয়েও তিনি আমাকে খুব স্নেহ করেন, তাঁর সুখ-দুঃখ আমার সঙ্গে সবই ভাগাভাগি করেন।

 

অনেক সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন।

আমি মনে করি, আমাদের মতো যাঁদের সামাজিক, রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, যাঁরা সম্মানিত হয়েছেন, আমরা যারা দেশ ও বিশ্বের মানুষের কাছ থেকে এত ভালোবাসা পেয়েছি; তাঁদের সেটির প্রতিদান দেওয়া উচিত। আমি ছোটবেলা থেকেই মানুষের উপকার করতে চাইতাম। আমার বোন দিনা লায়লা তো ক্যান্সারে মারা গেছেন, গান গেয়ে ফান্ড তুলে তাঁর নামে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে শিশুদের জন্য একটি ক্যান্সার ওয়ার্ড করার সৌভাগ্য হয়েছে। ভারতের জন্মু ও কাশ্মীরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহর আমন্ত্রণে সেখানে গিয়ে একটি হাসপাতালের জন্য ফান্ড তোলার সৌভাগ্য হয়েছে। দিল্লিসহ আরো নানা প্রদেশে, নানা দেশে এমন কাজ করেছি। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করা সুইড বাংলাদেশের রমনা শাখার আমন্ত্রণে আমি ও আলমগীর সাহেব দুজনে গান, পারফর্ম করে যে টাকা উঠেছিল সেগুলো সেই শিশুদের কল্যাণের জন্য ফিক্সড ডিপোজিট করে দিয়েছি। আমরা দুজনেই ইউএনএইডের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, আমরা এইচআইভি এইডসের ওপর তরুণদের মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। গত দুই বছর ধরে আমি সার্কের গুডউইল অ্যাম্বাসাডর বা শুভেচ্ছা দূত হিসেবে এইচআইভি এইডস ও যক্ষ্মা রোগের ওপর সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। কয়দিন আগে এ রকম রোগীদের দেখতে দিল্লিতে গিয়েছিলাম। তখন ভারতের পররাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। এত কিছু আমি মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি, তাই মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে আমার খুব ভালো লাগে।     

 

ব্যক্তিগত জীবন?

আমার মেয়ে ‘তানি লায়লা’ লন্ডনে থাকে। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই সে ওখানে পড়ালেখা করছে। পড়ালেখা শেষে তার বাংলাদেশে বিয়ে হলো। এখন স্বামীসহ সেখানেই থাকে। তার দুটি সন্তান। বড় ছেলে জেইন (১৩), ছোটটি অ্যারন (৯)। এই দুটি নাতিই এখন আমার সব। প্রায়ই তাদের কাছে লন্ডনে যাই। তাদের সঙ্গে সময় কাটাই। ওদের সঙ্গ আমার খুব ভালো লাগে। তারাও খুব উপভোগ করে। আমরা এদিক-সেদিক ঘুরতে যাই, যেখানে আমাকে কেউ চেনে না।

(২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, মহাখালী ডিওএইচএস, ঢাকা)



মন্তব্য