kalerkantho


খোকন আমার সন্তানের মতো

১৮ মে, ২০১৮ ০০:০০



খোকন আমার সন্তানের মতো

‘ওরা ১১ জন’-এর প্রাণপুরুষ, বাংলা ছবির ‘মাসুদ রানা’, পারভেজ ফিল্মসের প্রধান সোহেল রানা এ দেশের চলচ্চিত্রে প্রথম অ্যাকশন হিরো। তাঁর হাত ধরেই উঠে এসেছেন পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন, নায়ক রুবেলের মতো আরো অনেক তারকা। তাঁর চমকপ্রদ সিনেমাজীবনের কথা বললেন ওমর শাহেদকে।

ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

 

ছাত্রজীবন থেকেই তো রাজনীতি করতেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলাম। ইকবাল হলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলাম সত্তর-একাত্তরে। সারা দিন রাজনীতি, নিউ মার্কেটে ঘোরাঘুরি করে বিকেলে একবার হলেও ৩২ নম্বরে গিয়ে লিডারকে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) দেখে আসা—এই ছিল তখনকার রুটিন। ২৫ মার্চও হলে গিয়েছি। বিকেলে হলের সিঁড়ি দিয়ে নামছি, দেখি, ইকবাল হলের প্রেসিডেন্ট এ টি এম জাফর আলম সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। সে মাস দুয়েক আগে পাস করে হল ছেড়ে গ্রামের বাড়ি উখিয়া চলে গিয়েছিল। আমি তো অবাক, ‘কী রে, জাফর? তুই কোত্থেকে?’ ও বলল, ‘পারভেজ ভাই, সারা দেশ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি গ্রামে বসে আছি? তাই চলে এসেছি। আপনে কই যান?’ বললাম, ‘বারবার ভাবি বাসায় যেতে ডাকছেন, শরীরটাও ভালো লাগছে না। চলে যাচ্ছি।’ আমি নেমে গেলাম, ও উঠে গেল। আল্লাহই আমার হায়াত লিখে রেখেছিলেন! কারণ মুক্তিযুদ্ধ করে আবার হলে ফিরে আসার পর যে বৃদ্ধ দারোয়ানকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা মেরে ফেলেনি, তিনি এগিয়ে এলেন। বললাম, ‘এ কার রক্ত? রক্তের মধ্যে রাবারের মতো এসব কী?’ কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন, ‘জাফর স্যারের রক্ত, পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে গুলি করে মেরে দুই পা ধরে টেনে টেনে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়েছে। একেকটি সিঁড়ি দিয়ে তাঁর লাশটি নেমেছে, মাথা ফেটে মগজ চারদিকে ছড়িয়ে গেছে। রক্তের মধ্যে মগজ মিশে শুকিয়ে রাবারের মতো শক্ত হয়ে গেছে।’ তাঁর ছোট ভাই (মোহাম্মদ শফিউল আলম) মন্ত্রিপরিষদসচিব ছিলেন। বহু বছর পর তিনি টেলিফোন করে আমাকে খুঁজলেন। সন্তানের বিয়েতে দাওয়াতও দিলেন; কিন্তু কাজে আটকা পড়ায় যেতে পারিনি। পরে তিনি বলেছেন, ‘আপনি ছাড়া তো কেউ আর আমার ভাইয়ের কথা বলেন না।’

 

রাজনীতি থেকে সিনেমার প্রতি আগ্রহ কিভাবে হলো?

মুক্তিযুদ্ধের কথা মনে হলেই জাফরের কথা আমার মনে পড়ে। যুদ্ধের পর পরই আমরা দু-চারজন মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু প্রতিদিন হলে আড্ডা দিতাম, যুদ্ধের স্মৃতি শেয়ার করতাম। একদিন মনে হলো এই ঘটনাগুলো লিখে রাখলে কেমন হয়। ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। ছোটবেলা থেকেই সিনেমা দেখার প্রতি দুর্বলতা ছিল বলে ইত্তেফাকে সাপ্তাহিক সিনেমা পাতা ‘রূপবাণী’তে মাঝেমধ্যে লিখতামও। প্রয়াত চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। সহকারী পরিচালক হিসেবে তাঁর ১০-১২ বছর কাজের অভিজ্ঞতাও হয়ে গেছে। তাঁকে বললাম, ‘চাষী, মাসুম ইয়াহুদীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারবেন?’ ভদ্রলোক সাপ্তাহিক চিত্রালীতে লিখতেন, লেখা খুব ভালো ছিল। পরিচয়ের পর আমাদের গল্পগুলো নিয়ে তাঁকে লিখতে অনুরোধ করলাম, কিন্তু তিনি বললেন, ‘খণ্ড খণ্ড কাহিনিতে খুব ভালো গল্প হয় না, কিন্তু অন্য কিছু হতে পারে।’ তখন মনে হলো, এসব গল্প নিয়ে তো একটি সিনেমা হতে পারে। তাহলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জীবনগুলোও রেকর্ড হয়ে থাকবে।

 

টাকা জোগাড় হলো কিভাবে?

১৯৬৮-৬৯ ‘ইউসুফ রায়হান’ নামের একটি গোয়েন্দা সিরিজের চার-পাঁচটি বই লিখে, হায়ারে ফুটবল খেলে, এভাবে নানা কিছু করে আমার কাছে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা জমেছিল। মাকে (দেলোয়ারা বেগম) গিয়ে বললাম, ‘হাজার বিশেক টাকা দিতে পারবেন?’ তিনি কারণ শুনে কাঁদতে কাঁদতে টাকা দিলেন। তাঁর তিনটি ছেলেই তো মুক্তিযোদ্ধা; একটি ছেলে মাহমুদ পারভেজ জুয়েল তো চোখ-পা হারিয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বেঁচে আছে। একমাত্র বোন ফেরদৌস আরা বেগম মারা গেছে। তাঁর কাছ থেকে আট-দশ হাজার টাকা ধার নিলাম। এভাবে হাজার পঞ্চাশেক টাকা জোগাড় হলো। চাষীকে নিয়ে স্টার ফিল্মসের মালিক ইফতেখারুল আলমের কাছে গিয়ে গল্প শুনিয়ে বললাম, ‘আমার ছবিতে কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারাই অভিনয় করবে।’ তিনি বললেন, ‘আইডিয়াটি খুব ভালো। কাল আসেন, অংশীদারদের সঙ্গে আলাপ করে জানাব।’ পরদিন তিনি বললেন, ‘রাজ্জাক, শাবানার মতো বিখ্যাত তারকাদের নিলে আমরা আপনার ছবিটি হলে চালাতে পারব।’ রাজ্জাক-শাবানা শুনেই রাজি। এক পয়সাও নেননি, পারিশ্রমিক দেওয়ার সামর্থ্যও তো তখন আমার ছিল না। খসরু সব সময় পেছন পেছন ঘোরে, স্বাস্থ্যও খুব ভালো। ওকে অফার দেওয়ার পর বলল, ‘পারভেজ ভাই, জীবনে কোনো দিন নাটক করিনি, সিনেমায় অভিনয় করতে পারব?’ বললাম, ‘সত্যিকারের অস্ত্র নিয়ে ছবি করব। তোকে তো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ফুটিয়ে তুলতে হবে, কেন পারবি না?’ এরপর অস্ত্রের জন্য বিমানবাহিনীর তত্কালীন প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারের কাছে গেলাম। তিনি সিওডির (কমব্যাট অপারেশন ডিভিশন) চার্জে ছিলেন, পরে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার মেজর (অব.) শওকত আলীর কাছে পাঠালেন। জিপ ভর্তি করে অস্ত্রশস্ত্র দিলেন তিনি। শুটিং শুরু করলাম জয়দেবপুরে।

 

ছবির মার্কেটিং নিয়ে কি ভেবেছিলেন কিছু?

শুটিং শুরুর কয়েক দিন পর থেকে ছবিটি নেওয়ার জন্য আমার পেছনেই পরিবেশকদের লাইন বেঁধে গেল; কিন্তু আমি স্টারের সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি করলাম—‘ওরা ১১ জন’ মুক্তি পাওয়ার পর তাঁরা ছবির সব খরচ বাদ দিয়ে পাঁচ বছর লাভের ২০ শতাংশ নেবেন, ৮০ শতাংশ আমি পাব। আমার এ ছবির মাধ্যমেই চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালক হিসেবে জন্ম নিয়েছেন, কোনো দিন তিনি সে কথা স্বীকার করেননি। তাতে কোনো দুঃখ নেই—আল্লাহ তাঁকে বেহশত নসিব করুন। ছবির পোস্টার ডিজাইন করলেন দেশের শ্রেষ্ঠ সেট ডিজাইনার মরহুম আবদুস সবুর। এটিই ছিল তাঁর প্রথম ও শেষ পোস্টার ডিজাইন।

 

সেই রাগী সময়ে আপনাদের মধ্যে কোনো ঝামেলা হয়েছিল?

চাষীর বউ জ্যোত্স্না কাজী তো খুলনার চেউরার মেয়ে; কাজী জাফর আহমদের নিকটাত্মীয়, কিন্তু আমাকে খুব মানত। সে একদিন বলল, ‘পারভেজ ভাই, ও তো সারাক্ষণই আপনার পেছনে ঘোরে; রোজগার না হলে আমার সংসার কিভাবে চলবে?’ সোনার ভরি তখন ১০০ টাকা, সে আমলে আমি চাষীকে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে দিয়েছি। বলেছি, ‘আপনি শুধু সিনেমাটি নিয়ে ভাববেন।’ নিজের জন্য শার্ট-প্যান্ট কিনলে তাঁর জন্যও এক সেট কিনতাম। যা হোক, শুটিংয়ের শেষ দিকে যখন বোঝা গেল ছবিটি বাম্পার হিট করবে, তখন চাষীর বউ খসরুদের বলল, ‘তোমরা তো কিছু নাওনি, এখন পারভেজ ভাই স্টারের কাছ থেকে টাকা পাবেন, তোমরাও ভাগ চাও।’ গুঞ্জন উঠল। খসরু একদিন বলল, ‘দোস্ত, বাড়িতে থাকলেও তো কিছু আয়-রোজগার হতো।’ রাগ উঠে গেল। তাকে নায়ক বানাচ্ছি, অথচ সে আমাকে এই কথা বলে! বললাম, ‘উল্টাটাও হতে পারত। গুলি খেয়ে মরতেও তো পারতি।’

 

ছবি রিলিজ পেল কবে?

মাস ছয়েক শুটিংয়ের পর ১৯৭২ সালের ১৩ আগস্ট সারা দেশের ১৫ থেকে ২০টি হলে মুক্তি পেল ‘ওরা ১১ জন’। পাঁচ-দশ দিন আগে সব টিকিট বিক্রি হয়ে যেত। মাসখানেকের মধ্যে লগ্নি উঠে এলো। আমার যা পাওয়ার তা তো পেয়েই গেলাম। বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম সিনেমার প্রযোজক হিসেবে আমার নাম ইতিহাসে উঠে গেল।

 

তারকারা কি আর টাকার দাবি নিয়ে আসেনি?

হ্যাঁ। বন্ধু, ছোট ভাইয়েরা নানা কথা শুনে আবার এলো। বললাম, ‘কী চাস তোরা, বল।’ তখন কেউ আর কথা বলার সাহস পায় না। পরে তারা এক বছর আমার লাভ থেকে ৪০ পারসেন্ট চাইল। আমি কিচ্ছু বললাম না। সেভাবেই একটি বছর ১০ জনকে টাকা দিয়ে গেলাম। চাষীকেও ভাগ নিলেন। ওরা না চাইলে হয়তো আরো বেশিই দিতাম; তখন তো স্টারের কাছ থেকে আমি টাকা গুনে আনতে পারতাম না, বস্তায় ভরে আনতাম, টাকার ওপর ঘুমাতাম। আজও এই ছবির লাভের টাকা আমি পেয়ে আসছি। বঙ্গবন্ধুও ছবিটি দেখেছেন। আমাকে বলেছেন, ‘ভালোই তো বানাইছস, এই লাইনে থেকে যা।’ লিডারের নির্দেশ মেনে থেকে গেলাম।

 

প্রযোজক থেকে পরিচালক হলেন কিভাবে?

হিরো বা পরিচালক হওয়ার ইচ্ছা ছিল না আমার কোনো দিন; কিন্তু যে চাষীর পরিবারকে আল্লাহ আমার মাধ্যমে এক বছর চালিয়েছেন, যাঁকে পরিচালক বানিয়েছি, সেই তিনি যখন ওদের দলে ভিড়ে গিয়ে ওভাবে পারিশ্রমিক নিলেন, কষ্ট পেলাম। তিনি আলাদাভাবে বলতে পারতেন। যা হোক সিদ্ধান্ত নিলাম, নিজেই পরিচালনা করব। আগে থেকেই ফিল্মের ওপর কিছু পড়ালেখা ছিল, তা ছাড়া আমার ছবির সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত ছিলাম বলে পরিষ্কার ধারণাও হয়েছিল। ঠিক করলাম মাসুদ রানাকে নিয়ে ছবি করব। ছবির নায়ক নির্বাচনের জন্য পাঁচজনের কমিটি করলাম। বিখ্যাত পরিচালক এহতেশামের ছোট ভাই মুস্তাফিজ, সুমিতা দেবী, এস এম শফি, খোকা জামান (আহমেদ জামান চৌধুরী) ও আমি। সারা দেশ থেকে অসংখ্য তরুণের ছবি এলো। শেষ দিন বাছাই করা ৪০টি ছবি থেকে চূড়ান্তভাবে নায়ক নির্বাচন করার কথা। সেদিন আমার পৌঁছতে মিনিট পাঁচেক দেরি হয়ে গেল। গিয়ে দেখি সবাই বসে আছেন। বললাম, ‘এই বিষয়টি নিয়ে কিন্তু আর ঝোলাঝুলি করা যাবে না, আজকেই নায়ক ফাইনাল করতে হবে।’ তখন আর কেউ কথা বলেন না। পরে সুমিতাদি বললেন, ‘আপনিই ছবিটির নায়ক হবেন।’ আমি আকাশ থেকে পড়লাম। বলেও ফেললাম ‘বলেন কী? আপনি কী পাগল হয়ে গেছেন? কোনো দিন নাটক দেখিনি, অভিনয়ের কাছ দিয়ে পর্যন্ত যাই না; কেমন করে নায়ক হব?’ শফি ভাই বললেন, ‘আগেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আপনিই নায়ক হবেন। প্রথম দিকে হয়তো নার্ভাস লাগবে। টেনশন নেই, আমি চার-পাঁচ দিন আপনার সেটে থাকব।’ ‘কিন্তু আমার তো তার মতো উচ্চতা নেই, সে প্রায় ছয় ফিট লম্বা, আমি সাড়ে পাঁচ; তার গোঁফ নেই, আমার গোঁফ আছে। সব মিলিয়ে কোনোভাবেই এই জনপ্রিয় থ্রিলারের নায়ক হিসেবে আমাকে দর্শক গ্রহণ করবে না।’ তিনি যুক্তি দিলেন, ‘সে কথা ঠিক, কিন্তু চলনে-বলনে আপনি তো তার মতোই কোনো কিছুর পরোয়া করেন না; নিজের মতো চলেন, গলার স্বরও আপনার আলাদা, চরিত্রটির অনেক কিছুই আপনার সঙ্গে মেলে।’ শেষে বন্ধু খোকা জামানের দিকে তাকালাম। সে আমার চোখের দিকে চাইলই না, মাথা নিচু রেখেই বলল, “তুমিই ‘মাসুদ রানা’। আজ থেকে তোমার নাম সোহেল রানা।”

 

কাজী আনোয়ার হোসেন কী বললেন?

তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের পর বললেন, ‘হিরো কে?’ বললাম, ‘আমি।’ ‘গোঁফ ছাঁটবেন?’ ‘না।’ ‘তাহলে রানার সঙ্গে মিলবে কিভাবে?’ শেষ পর্যন্ত তিনি রাজি হলেন। রানা সিরিজের ‘বিস্মরণ’ অবলম্বনে চিত্রনাট্য লিখে দিলেন। পরিচালক হিসেবে সেটির অনেক অংশ আমাকে পরিবর্তন করতে হয়েছে। এটিই তাঁর প্রথম ও শেষ চিত্রনাট্য।

 

‘মাসুদ রানা’ কিভাবে তৈরি করলেন?

শুটিং করেছি ৩৫ মিলিমিটারের ক্যামেরায়। চিত্রনাট্য-কল্পনা মিলিয়ে অ্যাকশন হিরোকে আমি তৈরি করেছি। প্রথম দিকে ভালো ছেলে হিসেবে আমার বিপরীতে মিষ্টি, শান্ত মেয়ের প্রয়োজন বলে কবরীকে নিয়েছি। আর স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার পর আমাকে দিয়ে খুন-খারাবি করায় সে চরিত্রে কাঠিন্য আছে, একটু নেগেটিভ, অ্যাগ্রেসিভ, লোভী, সাহসী নায়িকা হিসেবে অলিভিয়াকে নিলাম। ছবিটিতে গোলাম মোস্তফা, খলিলউল্লাহ খান, ফতেহ লোহানী ভাই অভিনয় করেছেন। শুটিং শেষে রাশপ্রিন্ট বের করে দেখে আত্মবিশ্বাস হলো, ‘না, খুব খারাপ একটা করিনি।’

 

সাড়া পেলেন কেমন?

একদিনের মধ্যে পুরো সপ্তাহের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেল। অতি জনপ্রিয় এই সিরিজের নায়ক হিসেবে দর্শক আমাকে কিভাবে নিচ্ছেন, সেটি দেখার জন্য মধুমিতায় এক শো দেখতে গেলাম লুকিয়ে। একটি দৃশ্য আছে—একটি মেয়েকে ভিলেন অপমানের চেষ্টা করছে। আমি মারামারি করতে কোর্টের দুটি বোতাম খুলছি মাত্র, দর্শকদের তালির চোটে হল ফেটে পড়ার অবস্থা। নিশ্চিন্তে বাসায় ফিরে সেই যে ঘুম দিলাম, পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল। খাওয়ার জন্যও ডাকেনি। প্রথম ছবিই আমাকে সুপারস্টার বানিয়ে দিল। জনপ্রিয়তায় রাজ্জাকের কাছাকাছি নিয়ে গেল। এখনো যাঁরা ছবিটি দেখেন, বলেন— “আপনাকে কল্পনা করেই ‘মাসুদ রানা’ পড়ি।” তবে ছবিটিতে অভিনয় করার সময় অনেকের টিটকারি শুনতে হয়েছে। সিনেমায় তখন মেলোড্রামা বা নাটকীয়ভাবে অভিনয় করতে হতো। সেটি ভেঙে দিয়েছি। এমনকি কাশির শব্দও বাংলা ছবিতে নিয়ে এলাম। মারপিটে নতুনত্ব এনেছি। তখনকার ছবিগুলোতে বড়জোর তিন-চারবার মারামারি হতো। কলেজে পড়ার সময়ই তো লাইট ওয়েট বক্সিং শিখেছি, অ্যাকশন গ্রুপ ‘জ্যামস’ (জসীম, আমান, বাবুল, গুই) গ্রুপের জসীম জাপানি এক লোকের কাছে জুডো শিখেছিল, তার কাছে শিখে ‘মাসুদ রানা’য় জুডো-বক্সিং মিলিয়ে মারামারি করেছি। এটি জসীমের দ্বিতীয় ছবি; একটি দৃশ্যে সে আমার সঙ্গে মারপিট করেছে। তাই সারা জীবন সে আমাকে ‘বস’, ‘বড় ভাই’ ডাকত। মাসুদ রানার মাধ্যমে আমি পরিবেশনায় গেলাম, আমার ‘পারভেজ ফিল্মসে’র জন্ম হলো।

 

অ্যাকশন হিরো থেকে প্রেমিক হলেন কেন?

পাকিস্তান আমলে করাচি থেকে ‘মুসলিম ডাইজেস্ট’ নামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশিত হতো। অনেক ইসলামী গল্প ছাপা হতো তাতে। সেখানে শিরি-ফরহাদের কাহিনির মতোই অটোমান সাম্রাজ্যের সময়কার বুলগেরিয়ার ‘আলী-আসমা’র সত্যি প্রেমের কাহিনি ছাপা হলো। খুব ভালো লেগেছে বলে গল্পটি দিয়ে ছবি বানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। বাংলায় গল্পটির নাম দিলাম ‘এপার-ওপার’। পশ্চিম বাংলায়ও তখন কোনো ছবিতে নায়ক-নায়িকা একসঙ্গে মারা যেত না, ফলে কোনো নায়িকাই ইমেজ নষ্ট হওয়ার ভয়ে ছবিটিতে অভিনয় করতে রাজি হলেন না। ববিতা বলল, ‘এক মাস আউটডোরে থাকতে পারব না।’ সুচরিতা শুটিংয়ের একদিন আগে বলে বসল, ‘পারভেজ ভাই, নানির অসুখ, আমাকে হাসপাতালে থাকতে হবে।’ শাবানাকে আগের ছবিতে পয়সা দিতে পারিনি, এখন পয়সা আছে, গেলাম। সকালে সে যে টাকায় অন্য একটি ছবিতে সাইন করেছে, আমার কাছে তার ডাবল চাইল। রেগে বলে বসলাম, ‘তুমি কী আগের ছবির পারিশ্রমিকের সঙ্গে মিলিয়ে টাকা চাইছ? তাতে কোনো অসুবিধা নেই।’ তখন সে বলে, ‘না না, পারভেজ ভাই, কী যে বলেন? বাবাকে নিয়ে এত দিন কিভাবে আউটডোরে থাকব বলেন?’ তত দিনে পুরো ইউনিট শুটিংয়ে চলে গেছে। আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে যেভাবে পারেন মেয়ে নিয়ে আসেন বলে সুমিতা দেবীকে কলকাতায় পাঠিয়ে দিলাম। তিনি যাকে নিয়ে ফিরলেন, দেখে তো আমার মাথায় হাত! জসীমরা সব শিয়ালের ডাক ডাকতে লাগল! আবদুল লতিফ বাচ্চু এফডিসির সেরা ক্যামেরাম্যান, সে কমেডিয়ানের মতো করে বলল, ‘পারভেজ ভাই, মেয়েটির কোন অ্যাঙ্গেল থেকে ক্যামেরা ধরব?’ টানা পথ শ্রমের পর সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন মেয়েটি গোসল করে সামনে এসে দাঁড়াল, খুব প্রাণবন্ত লাগল। কিছুক্ষণ পর পুরো ইউনিট ‘দিদি, দিদি’ বলে তার পেছনে ঘুরতে লাগল। ওকে নিয়ে বাবা শাহজালাল, শাহ পরাণের দরগায় মানত করে এলাম, ‘বাবা, আপনারা আমার মানসম্মান রাখবেন।’ ছবি করে সে চলে গেল। সোমা মুখার্জি ও সোহেল রানা জুটির ‘এপার-ওপার’ এত হিট করল যে তার তুলনা হয় না। ‘ভালোবাসার মূল্য কত’সহ গানগুলোও সুপারহিট হলো। ছবিটি আমাকে নারী দর্শকদের কাছে খুব জনপ্রিয় করল। তখন এক পাঠক জরিপে জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে মাত্র ৪৩ ভোটে রাজ্জাক আমার চেয়ে এগিয়ে থাকল! তারপর থেকে আড়াই শর বেশি ছবি করেছি, একটিও ফ্লপ করেনি। এই ছবির পর রাজনীতি থেকে সামান্য দূরে সরে গেলাম। ১৯৭৬ সাল থেকে শুধু ‘বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট’ করতাম।

 

পরিচালক হিসেবে কেমন করেছেন?

এপার-ওপারে ফিল্মে অনেক গ্রামার আমি ভেঙে দিয়েছি, বাংলা ছবি এখনো সেভাবেই চলছে। আকাশে আপেল উড়ছে, আকাশ থেকে মাটিতে পড়ছে—এই শটটি আমি নিয়েছি, কোনো পরিচালকই তখন তা ভাবতে পারেননি। মারা যাওয়ার পর আমিসহ পুরো পৃথিবী ঘুরেছে—শট অনেকে এখন নিচ্ছেন, কিন্তু ‘এপার-ওপার’ মুক্তি পাওয়ার তিন-চার বছর পরও কিভাবে শটটি নিয়েছি, কেউ-ই বলতে পারেননি। এসব কারণে ইফতেখার ভাই আমাকে খুব ভালোবাসতেন। ‘মাসুদ রানা’, ‘এপার-ওপার’ দেখার পর আমাকে বড় মাপের পরিচালক মনে করতে লাগলেন। একদিন ডেকে ত্রিশের দশকের আমেরিকান ছবি ‘বনি অ্যান্ড ক্লাইডে’র গল্প করলেন। অপরাধী দম্পতির গল্পটি এত ভালো লেগে গেল যে সেটিকে বাংলাদেশের উপযোগী করে ‘গুনাহগার’ করলাম। আমি পকেটমার, নায়িকা ববিতা। ছবিটিতে আমরা মারা গিয়েছি। তারপর থেকে বাংলা ছবিতে নায়কের মৃত্যুবরণের একটি ধারাই তৈরি হয়ে গেছে। আমার মতো কোনো হিরো এতবার মরেনি। এ ধরনের চরিত্রই ভালো লাগত আমার।

 

আপনার নায়িকারা কেমন ছিলেন?

কবরী খুব সিরিয়াস অভিনেত্রী। তার সঙ্গে অনেক ছবি করেছি। গ্রামের চরিত্রে সে আজও তুলনাহীন। ববিতার চেহারায় শহরের আভিজাত্যটি আছে। শহুরে চরিত্রে আমরা জুটি হয়েছি। সে পেশাদার অভিনেত্রী। নায়িকা হিসেবে শাবানার চেয়ে ববিতার অভিনয় ভালো। তবে মেকআপ-সচেতন। তখন থেকে এখনো সব সময় সে নিজেকে কাচের দেয়ালের আড়াল করে রেখেছে। মনে হয় খুব কাছের; কিন্তু আসলে দূরের মানুষ। জুটি হিসেবে ‘সুচরিতা-সোহেল রানা’ও খুব সফল। সুচরিতা শুধু বাংলাদেশেই নয়, পুরো উপমহাদেশেরই অন্যতম সেরা অভিনেত্রী। অসাধারণ মেধাবী তো, তাই সামান্য পাগলাটে। এখনো আমাকে ‘বড় ভাই’ হিসেবে মানে। পাগলামো করলে বকা দিই। এ দুজনের সঙ্গেই আমার ছবি বেশি হিট হয়েছে। শাবানার সঙ্গে সুপার-ডুপার হিট, রোজিনার সঙ্গে অনেক বাম্পার হিট ছবি আছে। রোজিনাও ভালো অভিনেত্রী। এরাই তো বাংলা ছবির প্রথম শ্রেণির অভিনেত্রী।

 

ছবিতে মার্শাল আর্ট নিয়ে এলেন কিভাবে?

আশির দশকে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বের করে দেওয়া হয়েছিল। তখন জাহাঙ্গীর আলম নামের একটি ছেলে কক্সবাজারের উখিয়ায় চলে এসেছিল। এখনো সে ভালো করে বাংলা বলতে পারে না। সে এত ভালো কুংফু জানত যে সরকারের কারাত ফেডারেশনের কোচও হয়েছিল। মারামারি পছন্দ করে বলে আমার ছবি খুব পছন্দ করত। একদিন বলল, ‘ওস্তাদ, আপনি একটু নতুন ধারার মারামারি করলে ভালো হয়।’ ‘কেন? এ ধারায়ই তো আমার সামনে কেউ নেই।’ তখন সে কারাতে শিখে মারপিটের স্টাইল বদলাতে অনুরোধ করল। বললাম, ‘কারাতে শিখতে অনেক সময় লাগবে।’ ‘ছবিতে পুরোটা পারতে হয় না, সামান্য জানলেই করতে পারবেন।’ ‘কিন্তু না শিখে তো আমি অভিনয় করব না। আপনি শেখাবেন?’ এরপর তার কাছে কুংফু, কারাতে শেখা শুরু করলাম। ছোট ভাই রুবেল এসে বলল, ‘ভাইয়া, আমিও শিখব, ওস্তাদকে বলো।’ প্রতিদিন এক ঘণ্টা আমি ও রুবেল কারাতে শেখা শুরু করলাম। আমি ‘ব্রাউন বেল্ট’ হোল্ডার হয়ে আর শিখলাম না। এর পরের ধাপে উচ্চৈঃস্বরে চিত্কার করতে হয়। তাতে আমার স্বর নষ্ট হয়ে যাবে। রোমান্টিক, সামাজিক ছবিতে অভিনয় করতে পারব না। পরের দুটি ছবিতেই দর্শকরা মার্শাল আর্টকে দারুণভাবে গ্রহণ করলেন। যে রুবেল আগে ভালো গাইত, তার গলাটি নষ্ট হয়ে গেল। সে সর্বোচ্চ ‘ব্ল্যাক বেল্ট’ হোল্ডার হয়েছে। সারা দেশের সব প্রতিযোগীর মধ্যে এক লড়াইয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

 

এ কারণেই কি রুবেলকে নায়ক বানালেন?

কিছুটা তাই। রুবেল তখন এম এ পাস করে বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরছে, কিছু একটা করবে। আমি তো এ লাইনেই আছি; ভাবলাম ওকে দাঁড় করিয়ে দিই। আমার কথা শুনে অন্য ভাই-বোনরা খুব খেপে গেল। বলল, পারভেজ ভাই টাকা-পয়সা যা জমিয়েছিল, সব নষ্ট করে ফেলবে। আমার সহকারী শহীদুল ইসলাম খোকনকে নিয়ে পুরো ছবির পরিকল্পনা করে ‘খোকন-রুবেল’ জুটির প্রথম ছবি ‘লড়াকু’ করলাম। গল্পটি এমনভাবে সাজালাম, যাতে আমি মরে দর্শকের সমবেদনা নিলাম, রুবেল ভিলেন রতনের (ড্যানি সিডাক) সঙ্গে মারামারি করে ভাই হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। ড্যানিরও এটি প্রথম ছবি। রুবেলের কারাতে ফাইটার হিসেবে অসামান্য কারিশিমায় ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর এই শারীরিক কসরত দেশের ঘরে ঘরে চলে গেল। এক ছবিতেই সে সুপারস্টার হয়ে গেল। এরপর থেকে সে কুংফু, কারাতের ছবিতেই অভিনয় করেছে।

 

তাহলে আপনার কী হলো?

আমি এরপর থেকে চরিত্র, ভালো গল্প খুঁজে অভিনয় শুরু করলাম। এ দেশের যেকোনো পুরনো দর্শককে জিজ্ঞেস করলে তাঁরা বললেন, তাঁদের অত্যন্ত প্রিয় সামাজিক ছবি ‘মিন্টু আমার নাম’। এ জে মিন্টুর প্রথম এই ছবিতে আমিই নায়ক। বিপরীতে ছিল ববিতা। প্রবীর মিত্রও ছিলেন। পরিচালক দেওয়ান নজরুলের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। পাগলাটে, কাজপাগল নজরুল বাংলা ছবিতে আধুনিকতার জনক। একদিন নতুন প্যান্ট কিনে সে ছিঁড়ে ফেলল। আমি অবাক হয়ে গেলাম, ‘এ তুই কী করলি?’ বলল, ‘এটি হলো স্টাইল, আপনাকে এই ছবিতে এভাবে প্যান্ট পরতে হবে।’ আজব স্টাইল আবিষ্কার করে সে ছবিতে প্রয়োগ করত। তখন তো ড্রেস ডিজাইনার বলে কিছু ছিল না, পরিচালকরাই পোশাক ডিজাইন করতেন। সে আমাকে ‘রক হিরো’ বলত। ‘শোলে’ ছবির রিমেক করেছে ‘দোস্ত-দুশমন’। তখন বলত, ‘ওই যে দাড়িওয়ালা লোকটি অভিনয় করেছে, ওর চেয়ে আপনার অভিনয় যেন খারাপ না হয়; তাহলে কিন্তু আর সম্পর্ক থাকবে না।’ এভাবে বলত আর হাসত। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর দেখলাম, খারাপ তো করিনি। তার বিখ্যাত সিনেমা ‘আসামী হাজির’-এর নায়ক হয়েছি। তাতে ওয়াসিমের সঙ্গে আমার জুটি গড়ে উঠেছে। ওয়াসিমের স্বাস্থ্য খুব ভালো ছিল। মিস্টার ‘ইস্ট পাকিস্তান’ ছিল সে। পারিশ্রমিক কম পেলেও ভালো গল্প পেলে অভিনয় করতাম। ‘স্ত্রী’ ছবিতে সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে অভিনয় করেছি অধ্যাপক চরিত্রে। মনোজ বসুর ‘আংটি চাটুজ্যের ভাই’ গল্প অবলম্বনে ভারতে হয়েছে ‘পলাতক’, আমাদের এখানে হয়েছে ‘মা’। ছবিটিতে ছন্নছাড়ার চরিত্রে অভিনয় করেছি। এমন পাগল যে বাসররাতে স্ত্রীকে (ববিতা) পর্যন্ত ফেলে চলে যায়। সারা জীবন আসেনি।

 

শহীদুল ইসলাম খোকনকে পেলেন কিভাবে?

সে তখন কলেজের ছাত্র। মারুফ হোসেন মিলন আর সে আমার ছবি দেখত। বাবার টাকা চুরি করে মিলনকে নিয়ে আমাকে দেখতে খুলনা থেকে ঢাকায় এলো। আমার বাড়ির সামনে দুদিন দাঁড়িয়ে থাকল। পরে হালকা-পাতলা মিলন থাকতে না পেরে চলে গেল। তৃতীয় দিন খোকন সাহস করে গেট নক করল। তখন আমি তুমুল ব্যস্ত, পুরো সপ্তাহ রাত ১০টা পর্যন্ত শুটিং করতে হয়। ওকে শুক্রবার সময় দিলাম। ছেলেটি ভদ্র, বলল, ‘আপনাকে স্ক্রিপ্টসহ সব কিছু আমি এগিয়ে দেব, তাও আপনার সঙ্গে কাজ করব।’ তখন আমার চার অ্যাসিস্ট্যান্ট। একজনকে পরিচালক বানিয়ে, নতুন আরেকজন নেই। ‘জাদুনগর’ ছবির মাধ্যমে খোকনের সহকারী হিসেবে যাত্রা। তারপর থেকে ১২ বছর সে আমার সহকারী পরিচালক ছিল। এরপর নিজের ছবি করেছে ‘রক্তের বন্দী’। আমি প্রযোজক ছিলাম। ফ্লপ করল। কোনো পরিচালক তৈরি হওয়ার পর আমি আর তাকে ছবি দিই না, কিন্তু দেড় বছরেও খোকন ছবি পেল না। আমারই তৈরি ছেলে, খারাপ লাগছিল, তাই তাকে নিজের টাকায় ছবি করতে দিলাম। ছবির নাম ‘লড়াকু’। ভালো চলেছে। রুবেল-খোকন জুটির প্রায় সব ছবিই হিট। প্রথম ছবিতেই সব টেকনিশিয়ানের সঙ্গে খোকনের এত ভালো সম্পর্ক হয়ে গেল যে ওর জীবনের প্রায় শেষ ছবিটি পর্যন্ত তাদের নিয়েই সে কাজ করেছে। আমাকে নিয়ে সে ছবি বানিয়েছে, অনেক টাকা হওয়ার পর নিজে নায়ক হয়েছে। তবে শেষের দিকে ওর অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। ট্র্যাকের বাইরে গিয়ে ছবি করা শুরু করল। ফলে পড়ে গেল। আমার সম্মানটুকুও রাখেনি। সব সময়ের সঙ্গী, তার হিট ছবিগুলোর নায়ক রুবেলকে পর্যন্ত সে ছেড়ে দিল। বলেছিলাম, আগে ব্যবসা কর পরে অন্য আশা পূরণ কর। দুঃখ করে এও বলেছি, ‘আগে চিত্রনাট্য দেখাতে আসতে। এখন আস না কেন?’ সে আসেনি। নামতে শুরু করল। উত্তরার বাড়িটি বিক্রির সময় বলেছি, একটা অ্যাপার্টমেন্ট কিনে রাখো, যাতে ছেলে-মেয়েদের মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকে। শোনেনি। শেষ পর্যন্ত বলেছি, রুবেলকে নিয়ে ‘বজ্রমুষ্টি’র মতো আরেকটি ছবি বানাও, দরকার হলে আমি বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করে দেব। শুনল না। শেষে আমাকে আর আলমগীরকে নিয়ে ‘টাকা’ বানাল। বিনা পয়সায় আমরা কাজ করেছি। জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে তার ছেলে। পরে তো অসুস্থ হয়ে গেল। তখনো তার পাশে থেকেছি। খোকন যে আমার সন্তানের মতো।

শ্রুতলিখন : মীর মাঈনুল ইসলাম

(২০ নভেম্বর, ২০১৭, উত্তরা, ঢাকা)   


মন্তব্য