kalerkantho


‘আমি কই বিখ্যাত?’

২৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



‘আমি কই বিখ্যাত?’

দেশ-বিদেশ ঘুরে, রাজধানীর মায়া কাটিয়ে অবশেষে ফিরে এলেন জন্মস্থানে। নড়াইলের ‘লাল মিয়া’র খেয়ালগুলো ডালপালা মেলল। অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে এস এম সুলতান ‘শিশুস্বর্গ’ করলেন। বিশ্ববিখ্যাত এই শিল্পীর জীবনের শেষ ২২টি বছর পাশে ছিলেন নীহারবালাতারেক আলম তাঁর সঙ্গে আলাপ করে সেই যৌথ জীবনের গল্পই লিখলেন। আর শিল্পীর প্রতিকৃতি আঁকলেন বিপ্লব চক্রবর্তী  

 

এস এম সুলতানের সঙ্গে আপনার জীবনের শুরু কিভাবে?

তাঁর ও আমাদের বাড়ি একই জায়গায়। আমরা নড়াইলের মাছিমদিয়ার বাসিন্দা। সে হিসেবে আগে থেকেই পরিচয় ছিল। আমি তাঁকে ‘কাকু’ ডাকতাম। তবে যশোরে থাকার সময় তাঁর সঙ্গে যুক্ত হই। তখন যশোর সদর হাসপাতালে নার্স হিসেবে কাজ করি। তৎকালীন ডিসি (জেলা প্রশাসক) সাহেবের স্ত্রী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তাঁর সেবা-শুশ্রূষা করতাম। তিনি সুস্থ হয়ে উঠলে ডিসি সাহেব আমাকে এস এম সুলতানের কাছে নিয়ে গেলেন। শিল্পী তখন যশোর এম এম কলেজের পুরনো হোস্টেলে থাকতেন। একটি স্কুলও বানিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি তখন আর যশোর থাকতে চাইছিলেন না। ডিসি সাহেব আমাকে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘দেখেন তো তাঁকে (সুলতান) ঠেকাতে পারেন কি না?’ কাকু বললেন, ‘এখানে আর থাকা যায় না। সারা দিন পান্তা ভাত খেতে হয়, খেতে আর ভালো লাগে না।’ ঘরে ঢুকে দেখি, মাটির হাঁড়িতে ভাতে পানি দেওয়া। রান্না করলাম। তিনি গরম ভাত খেলেন। ফলে যশোর থেকে তাঁর চলে যাওয়া আপাতত ঠেকানো গেল। হাসপাতালে কাজ করি, কাকুর সেবা করি—এভাবে দিন চলে। পাঁচ-ছয় মাস পর তিনি বললেন, ‘নীহারবালা, চলেন, এখানে আর থাকব না।’ বললাম, ‘আমার স্বামী অসুস্থ। দুই মেয়ে পদ্ম, বাসনা এখনো কোলে। ছোট ভাই দুলাল সাহা আছে। তাদের নিয়ে থাকতে হয়। আমরা কোথায় যাব?’ তিনি বললেন, ‘চিন্তা করবেন না, চলেন।’ ১৯৭২-৭৩ সালে আমরা নড়াইলে তাঁর বাড়িতে চলে গেলাম।

 

তাঁকে কিভাবে আঁকায় ফিরিয়ে আনলেন?

তিনি আগে যে ছবিগুলো এঁকেছেন, সেগুলো কোথায় ছিল, তা তিনি নিজেও জানতেন না। কোনো ছবিই তাঁর কাছে ছিল না। তাঁর ছবি দিয়ে অনেকে ঘরের বেড়া দিয়েছেন। ফলে ছবি আঁকতেও তাঁর তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না, কিন্তু সংসার তো আমাকে চালাতে হয়। বাধ্য হয়ে একদিন বললাম, ‘কাকু, ছবি না আঁকলে তো আর চলে না।’ তিনি বললেন, ‘না, আঁকব না। আমার ছবি দিয়ে মানুষের ঘরের বেড়া হবে, চাল হবে—সে দরকার নেই।’ ‘পাগলের মতো কী কথা কন? দেশে কী টিন-পাটকাঠি নেই?’—এরপর তাঁকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে রাজি করাতে হলো, ‘আপনার ছবি দিয়ে আর বেড়া হবে না। রংতুলি নিয়ে আসেন।’ আমি কী নিজের স্বার্থে এসব করেছি? আমার মেয়েরা মানুষ হবে, আমাদের চিড়িয়াখানার জীবজন্তু—আমার চন্দন, মিনি, ভিকি, টাইগার ভালো থাকবে, গাছপালাগুলো ফুল দেবে—এই ছিল তখন চিন্তা। আর আমাদের এই বিরাট সংসারের ব্যয় নির্বাহ করার চাপটি তাঁকে ঘরে থাকতে বাধ্য করেছে। সে সুযোগই আমরা নিয়েছি। তিনি ঘরে থাকায় এত ছবি আঁকা সম্ভব হয়েছে। সেই কাজটি করেছি বলে আজ তাঁর এত ছবি দেখা যাচ্ছে। আমাদের অভাব কাটাতে তাঁর ছবির দরকার ছিল। তিনি ছবি না আঁকলে তো শিল্পকলা একাডেমি টাকা দেবে না। তাহলে কাকু, আমি, আমার দুই মেয়ে, ছোট ভাই, জীবজন্তু—এরা খাব কী? তিনি ছবি না আঁকলে তো আমরা সবাই না খেয়ে মরে যেতাম।

 

এরপর তো তিনি ঢাকায় গেলেন?

অনেক রাগারাগি করতে হলো। তার পর তিনি ঢাকায় গেলেন। কাগজ, রংতুলি নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। বাজার থেকে ‘গাব’ কিনে নিয়ে এসে মাটির বড় কলসে ভেজানো হলো। আমরা গাব বেটে তাঁর ক্যানভাসে লাগিয়েছি, ক্যানভাস রোদে শুকিয়েছি, পাতা বেটে তাঁর ‘রং’ তৈরি করে দিয়েছি। এতে ক্যানভাস মোটা ও টেকসই হতো। ক্যানভাস টানানোর পর তিনি তাতে কয়লার আঁচড় দিতেন। সেটি শুকানোর পর বিদেশি রঙের সঙ্গে তিনি প্রয়োজন মতো দেশি ফুল-লতা-পাতার রং বানিয়ে নিতেন। তাঁকে এই কাজে আমার ছোট ভাই দুলাল সহযোগিতা করত। তাঁর নির্দেশমতো গাছের পাতা এনে রং তৈরি করে দিত। তাঁর রং বেটে দিত। আঁকার সময় তাঁকে জিনিসপত্র এগিয়ে দিত। আমাদের বাড়িভরা দেশি-বিদেশি ফুল, ফলের গাছ ছিল। তিনি কোন পাতার কী রং, কোন সময়ে কেমন রং হয়; রোদ-ছায়াতে ফুল-লতাপাতার রংগুলো কেমন হয়—সবই গভীরভাবে খেয়াল করতেন। পরে ছবিতে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতেন। ছবি আঁকার সময় তাঁর কখনো তাড়াহুড়া ছিল না। এই ছবিটি তাড়াতাড়ি এঁকে পরেরটি ধরবেন—কখনো এই চাপ তাঁর ছিল না। ছবির নিচের অংশে স্বাক্ষর করে তিনি শেষ আঁচড় দিতেন, ছবি শেষ না করে কখনো স্বাক্ষর করতেন না।

 

তিনি তো খুব খেয়ালি মানুষ ছিলেন। কিভাবে তাঁকে ধরে রাখতেন?

টানা কয়েক দিন যখন ছবি আঁকতেন না, বলতাম, ‘কাকু, ছবি আঁকেন না?’ তিনি জিজ্ঞেস করতেন, ‘কোন ছবিটা আঁকব?’ তখন বলতাম, ‘গাছগাছালি, তার মধ্যে মানুষ বসে হুঁকা খাচ্ছে—এভাবে একটা ছবি এঁকে দিন।’ তিনি হাসতেন। তারপর বলতেন, ‘আমি কী আঁকতে চাইছি বুঝলেন কী করে?’ ছবি নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি আছে। একদিন চা বানিয়ে নিয়ে গিয়েছি। তিনি আমাকে ডাক দিয়ে একটি ছবি দেখালেন, সেটি তাঁর ‘উড়িরচরের ঝড়ের ছবি’। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে তিনি ছবিটি এঁকেছিলেন। তিনি বললেন, ‘দেখেন, ঝড়ে মানুষ কিভাবে মারা গেছে।’ ছবিটি ভালো করে দেখে বললাম, ‘কাকু, এত মানুষ মারা গেছে?’ তিনি বললেন, ‘এই তো বুঝতে পেরেছেন।’

 

কখন আঁকতে ভালো লাগত তাঁর? কী পরিবেশ, কী ধরনের ছবি আঁকতে চাইতেন?

ছবি আঁকার সময় নিরিবিলি পরিবেশ পছন্দ করতেন। ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো তিনি ছবি আঁকতেন। আঁকার সময় কোনো কথা বলতেন না, কোনো শব্দই সহ্য করতে পারতেন না। এমনকি রান্না ঘরে খুনতি দিয়ে ঘটর ঘটর, ঘটি-থালা-বাটি ঝনঝন—ও সবও তখন করা যেত না। যদি মাছ ভাজতাম—খুনতি নয়, আঙুল দিয়েই আমাকে মাছ ওল্টাতে হতো, যাতে কোনো শব্দ তাঁর কানে না যায়। শব্দ কানে গেলেই হলো—এস এম সুলতান আর আঁকতে পারবেন না। সকালে চা পান করেই তিনি গ্যালারিতে ঢুকতেন। কাগজ, রং, তুলি নিয়ে বসতেন। আগের দিন ঠিক যেখানে আঁকা শেষ করেছিলেন, সেখান থেকে ফের শুরু করতেন। রং না মিললে ঠিক করে নিতেন। আঁকার সময় তাঁর পাশে সব সময় একটা বাটি থাকত। কোনো কিছুর অভাব বোধ করলে সেই বাটিতে লাঠি দিয়ে আঘাত করতেন। আমি কান খাড়া করে রাখতাম। টের পেতাম, হয় তাঁর রঙে কম পড়েছে, নয় পানি লাগবে, নয়তো চা খাবেন। আমি যেতাম। তিনি ইশারায় কী লাগবে দেখিয়ে দিতেন। পরে তাঁর প্রয়োজন অনুসারে সেটি এনে দিতাম।

 

তাঁর ছবির মানুষগুলো কেন বিশাল?

আমি তো তাঁর ছবির গাছপালা, মাঠ, নদী, পাট, ধান, মাছ—এসব দেখে বুঝতে পারি; কিন্তু এত মোটা নারী-পুরুষ তো আশপাশে চোখে পড়ে না। তাই একদিন জিজ্ঞেসও করে ছিলাম, ‘ও কাকু, এই যে মোটা মোটা মহিলা-পুরুষের ছবি আঁকেন—আমাদের দেশে কি এমন মোটা মানুষ আছে?’ তিনি উত্তর করলেন, ‘না থাকলেও আমার ছবিতে তাঁরা এভাবেই থাকবেন। তাঁরা দুর্বল নন। আমাদের এই জাতি কখনো কারো কাছে মাথা নত করেনি; করবেও না। আমরা বাংলাদেশের মানুষ। আমরা সব সময় মাথা উঁচু করে থাকব; মাথা নিচু করে কেন থাকব? এই জন্য আমার কিষান-কিষানি এমন স্বাস্থ্যবান।’ তাই তাঁর মানুষগুলো কখনো মাথা নিচু করে থাকেন না। তাঁর সেই স্বপ্নই তো এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ দেশের কৃষকরা কী এখন আর দুর্বল আছেন? তাঁরা তো আগের চেয়ে অনেক সবল। তাঁদের ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে; তাঁদের ঘর থেকেই তো এখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে।

 

কারা তাঁর কাছ থেকে ছবি কিনতেন?

এস এম সুলতানের ছবি কে নেননি? তাঁর কাছ থেকে ছবি নেওয়ার সুযোগ কেউই হাতছাড়া করেননি। তাঁরা সবাই তাঁর ছবির দাম বুঝতেন, একমাত্র তিনিই তাঁর ছবির কোনো মূল্য বুঝতে চাইতেন না। কেউ তাঁকে নামমাত্র পয়সা দিতেন, কেউ আবার ভালো অঙ্কের টাকা দিতেন, কেউবা তাঁকে ভুলিয়ে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে খাওয়াদাওয়া করিয়ে তাঁর সঙ্গে ফিরে তাঁকে দিয়ে ছবি আঁকিয়ে আবার ফিরে যেতেন। অনেকে তো ছবি নিয়ে টাকাই দেননি। তবে সেসব নিয়ে তাঁর কোনো খেদ ছিল না। আমরা কিছু বললে তিনি বলতেন, ‘টাকা-পয়সা না দেয়, না দিক; তাতে কী? ওদের আমার একটি ছবি দরকার, আমার কাছ থেকে আঁকিয়ে নিয়েছে।’ বাধ্য হয়ে আমরা চুপ করে যেতাম। এসব নিয়ে তো তাঁর কোনো আক্ষেপ ছিল না। আমি জিজ্ঞেস করেছি, ‘কাকু, আপনি তো অনেক বিখ্যাত, এ জন্য কত লোক আসে, সবাই আপনার কাছে ছবি চায়।’ তিনি হেসে বলতেন, ‘আমি কই বিখ্যাত? আমি অত বড় শিল্পী নাকি? যেদিন অত বড় শিল্পী হব, তখন দেখবে মানুষে মানুষে আমার এই স্বর্গ ভরে যাবে।’ তিনি আজ আর নেই। তাঁর নামে এই নড়াইলে নৌকাবাইচ হয়, সুলতান মেলা হয়। মেলায় লাখ লাখ মানুষ আসেন। আমি তাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার মনে হয়, আমার কাকু নিশ্চয়ই ওপার থেকে দেখছেন—কত মানুষ তাঁকে ভালোবেসে তাঁর টানে নড়াইলে আসছেন। এখন তো তিনি মনে করছেন—তিনি অনেক বড় শিল্পী। ডিসি অফিসে কাকুর শেষ আঁকা ড্রয়িংটি ছিল, সেটিও হারিয়েছে। অনেকের কাছেই তাঁর ছবি আছে। শুধু আমার কাছেই স্মৃতি ছাড়া আর কিছু নেই। এই আমার সাত রাজার ধন, তাঁকে ঘিরে আমার একমাত্র সম্বল। কাকু তাঁর শেষ জীবনের স্মৃতি আমায় দিয়ে গেছেন।

 

সরকার আপনাদের যে বাড়িটি দিয়েছিল, সেখান থেকে চলে গেলেন কেন?

সরকার তাঁকে আগে সোনারগাঁয়ে একটি বাড়ি দিয়েছিল। সেখানে আমরা দুই-তিন মাস ছিলাম। এরপর ঢাকার ধানমণ্ডি এলাকায় একটি বাড়ি দিল। সেখানে গিয়েও কিছুদিন থাকলাম। ভাবলাম, এই বুঝি থাকার একটি জায়গা হলো, কিন্তু সেখানে থাকতে তাঁর ভালো লাগে না। তিনি এদিক-ওদিক, কোথায় কোথায় যান, বাড়ি এসে পায়চারী করেন। কয়েক দিন পর দেখলাম, তিনি বাইরেই বেশি থাকেন, বাড়িতে কম থাকেন। টের পেলাম, এখানে তাঁর আর ভালো লাগছে না। বুদ্ধি করে বললাম, ‘কাকু, এখন থেকে আমরা এখানে থাকব, আপনি ছবি আঁকবেন। কত মানুষ আমাদের খোঁজ নেবে। আমাদের কষ্ট আর থাকবে না।’ তিনি কিন্তু কোনো কথা বলেননি, চুপ করে ছিলেন। জীবনে কোনো দিন তিনি আমার ওপর রাগ করেননি। আমার ওপর কেন, কোনো মানুষের সঙ্গেই তিনি রাগ করে কথা বলতেন না। কোনো কিছু ভালো না লাগলে চুপ করে থাকতেন। একদিন গভীর রাতে আমাকে ডেকে বললেন, ‘আপনারা এখানে থাকেন, আমি চললাম।’ পালিয়ে তিনি ঢাকা ছাড়লেন।  সরকারের সঙ্গে কিসের চুক্তি? কিসের দামি বাড়ি? খোঁজ নিয়ে জানলাম, তিনি তাঁর নড়াইলে চলে গেছেন। আমরা আর কী করব? চলে এলাম।

 

নড়াইলে কোথায় উঠেছিলেন?

প্রথমে একটি পুরনো দোতলা বাড়িতে তিনি বাস করতেন। সরকারী পরিত্যক্ত এই বাড়িটির চারদিকে গাছগাছালি ঘেরা, কিন্তু দোতলার ছাদ ভাঙা, বট-পাকুড়ে ভরা, পলেস্তারা খসে পড়ছে; ফাঁকফোকরে জোড়ায় জোড়ায় সাপ কিলবিল করে। তিনি তো সাপ মোটেও ভয় পেতেন না। এসব জীবজন্তুর প্রতিই তাঁর খুব মায়া ছিল। তাদের নিয়েই তাঁর বসবাস। তিনি কালো বা ছাই রঙের লম্বা আলখাল্লা পরে বের হতেন। তাঁর ছিপছিপে লম্বা দেহ, ঘাড় বেয়ে চুল নেমেছে। নানা সময়ে তাঁর সঙ্গে নানা ধরনের জীবজন্তু থাকত। কোনো দিন খেয়ালের বশে আলখাল্লার পকেটে সাপের বাচ্চা নিয়েও বের হয়েছেন। তাঁর ঘাড়ের ওপর কখনো বানরের ছানা থাকত। কখনো থাকত সজারুর ছানা, দু-একটি বেজি নিয়েও তিনি বাড়ি থেকে বের হতেন। তিনি যেখানে আরাম করে বসতেন, বেজিগুলোকে ছেড়ে দিতেন। ফিরে আসার সময় ডাক দিতেন, বেজিগুলো এসে কাকুর হাতে উঠত। তিনি ওগুলোকে নিয়ে বাড়ি চলে আসতেন। তাঁর শখের কী কোনো শেষ ছিল? তিনি বিড়াল, বানর পালতেন; সাপের খোঁজখবর রাখতেন। ৪০-৪২টা বিড়ালই ছিল তাঁর। একদিন তিনি বাড়ি ফিরে এলেন। খেয়াল করে দেখি, তাঁর কপাল কাটা! আমার চোখ দিয়ে পানি চলে এলো, ‘কাকু, কাটল কিভাবে? কে এত বড় কাজ করার সাহস করল? কে আপনাকে ইট মেরে কপাল কেটে দিয়েছে?’ রক্তে ভেসে যাচ্ছে তাঁর সুন্দর মুখখানি। তিনি কিন্তু একটুও রাগ করলেন না। আমাকে শুধু বললেন, বোধহয় কয়েকটি দুষ্টু ছেলে পাগল ভেবে হয়তো তাঁকে ঢিল মেরেছে। আমি ড্রেসিং করে দিলাম। পরে তাঁকে মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হলো। তিনি সুস্থ হলেন।

 

তাঁর বাঁশি বাজানোর কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?

শিশুস্বর্গের আগে তিনি নড়াইলের জমিদারবাড়ির শিবমন্দিরে বেশির ভাগ সময় কাটাতেন। সেখানে বসে এক মনে বাঁশি বাজাতেন। একদিন রাতে তিনি বাড়ির পুব পাশে নদীর ধারে বাদামগাছের শিকড়ের ওপর বসে বাঁশি বাজানো শুরু করলেন। একবার বাঁশি ধরলে তিনি টানা দুই-তিন ঘণ্টা বাজাতেন। তাঁর বাঁশির সুর অন্য রকম ছিল, মানুষের মন কেড়ে নিত। তিনি যখন বাজাতেন, তখন মনে হতো—তিনি শুধু বাঁশিই বাজাতে পারেন। ছবি আঁকার সুলতান আর বংশীবাদক সুলতান—পুরোপুরি আলাদা। আশ্চর্য কী জানেন—তাঁর এই বাঁশির সুরে আশপাশের কোনো মানুষই বিরক্ত হতেন না। পরদিন কত বউ-ঝি আমায় বলেছে,  সুলতান কাকার বাঁশিতে অপূর্ব টান আছে। এই জাদুকরী সুর শেষ না হলে তো ঘুমানো যায় না। তবে অসুস্থ হওয়ার পর থেকে তিনি বাঁশিতে সেই সুর আর তুলতে পারতেন না, তিনি আর বাঁশি বাজাননি।

শিশুস্বর্গ নিয়ে তাঁর ভাবনা কী ছিল?

তাঁর জীবন আর ভাবভঙ্গি তো রাজার মতোই ছিল; কিন্তু তাঁর হাতে রাজাদের মতো টাকা তো থাকত না। তার পরও তাঁর এই স্বর্গে তিনি এসব বাঘ, ভালুুক, বিড়াল, হনুমান ইত্যাদি পশু-পাখির বিরাট এক হাট বসিয়েছিলেন। এই তাঁর মহত্ত্ব! সেটি বোঝার ক্ষমতা আমাদের নেই। এ তো সবাই বুঝবে না, গ্রামের সাধারণ লোকে তো বুঝবে না। ফলে তারা তাঁকে ‘পাগল’ বলত। শিল্পকলা একাডেমি তাঁকে মাসে মাসে ছয় হাজার করে টাকা দিত। তিনি একটি ওয়াটার কালার ছবি বিক্রির পর সাজু আর্ট গ্যালারি তাঁকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিল। তাই নিয়েছি, কী আর করব? তিনি ছবি না আঁকলে তো আমাদের কারো পেটে ভাত জুটবে না। তখন আমাদের এই পরিবারের মাসে ৩০-৩৫ হাজার টাকা খরচ। এর মধ্যে তিনি বিরাট এক নৌকা বানালেন। সেই নৌকায় দুইবার চিত্রা নদীতে ঘুরতেও বেরোলেন। শিশুস্বর্গ থেকে গাজীরহাট পর্যন্ত গিয়েছিলেন। দেখে ভালো লাগল যে এত কষ্টে তৈরি নৌকা তিনি নদীতে ভাসাতে পারলেন। তাঁর এই নৌকায় বসার সুন্দর জায়গা ছিল। ওপরে গ্রিল দেওয়া ছিল। তিনি চাইতেন, ছেলে-মেয়েরা নৌকায় এসে বসবে। তাদের নিয়ে নৌকাটি নদীতে ভাসবে। তিনি ফলের ঝাঁকা থেকে ওদের একটি একটি করে ফল বিলিয়ে দেবেন। ওরা খাবে আর ছবি আঁকবে। ওদিকে সূর্য ডুববে। তারা সেই ছবি এঁকে নিয়ে আসবে। তারা নদীতে বসে নদীর জলে আকাশের রং দেখবে—এই তাঁর স্বপ্ন ছিল।

 

আত্মার বাঁধনে জড়িয়ে ছিলেন দুজনে—নীহারবালা ও এস এম সুলতান

নিজের জন্য তিনি খরচ কেমন করতেন?

মাসে আমাদের যত টাকা খরচ হতো, সেই টাকা তো তিনিই আয় করেছেন; কিন্তু নিজের জন্য, তাঁর নিজের জন্য কোনো কিছুই তিনি খরচ করেননি। তাঁর জন্মদিন এলে আমরা বলতাম, ‘কাকু, এবার আপনার জন্মদিন পালন করব।’ তিনি বলতেন, ‘হ, একটা হুজোগ উঠিয়ে টাকা খরচ করবার ধান্দা? বুড়োকালে আবার জন্মদিন?’ টাকা না থাকলে তিনি এভাবে জন্মদিন এড়িয়ে যেতেন; কিন্তু হাতে টাকা এলে তিনি ইচ্ছামতো খরচ করতেন। তাঁর পশু-পাখির পেছনে খরচ করতেন। তখন তিনি যে এই হাটের সত্যিকারের রাজা। শেষ তিন বছর ঘরোয়াভাবে আমরা তাঁর জন্মদিন পালন করেছি। ১৯৯৪ সালে মৃত্যুর কয়েক দিন আগে এখানে বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে তাঁর জন্মদিন পালন করা হয়েছে।

 

তাঁর কাছে যাঁরা আসতেন, কেমন সময় দিতেন?

তিনি ঢাকায় থাকেননি, থাকতে চাননি কেন? এ কথার উত্তর এখন আর কেউ পাবেন না। সরকারের দেওয়া ভালো বাড়ি, জমজমাট রাজধানী ছেড়ে কেন নড়াইলের এই বাগানে, নদীর পারে এসে তিনি উঠলেন? সে কারণ কী কেউ কখনো খুঁজে দেখেছেন? দেখেননি। যে শহর তিনি ত্যাগ করে চলে এসেছিলেন, সেই শহর থেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসা মানুষদের তিনি অনেক সময় দিতেন। ঢাকা থেকে যাঁরা আসতেন, তাঁদের প্রতি তাঁর আলাদা শ্রদ্ধাবোধ ছিল। তিনি বলতেন, ‘দেখেন, এঁরাই হলেন আমার প্রকৃত বন্ধু। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তাঁরা আমার কাছে এসেছেন। কী আছে আমার কাছে?’ আহমদ ছফা, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হকের মতো মানুষেরা শিল্পীর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। মামুন (নাসির আলী মামুন) ছবি তুলতে আসত। তিনি তাকে সহযোগিতা করতে বলতেন। দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, গবেষকরা এলে সময় দিতেন। বিদেশি কেউ এলে তিনি বলতেন, যাতে আমার দেশের কোনো বদনাম না হয়, সে জন্য তাঁদের দিকে বেশি করে খেয়াল রাখবেন।’ ছফা ভাই তো প্রায়ই আসতেন। আমরাও ঢাকায় গেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতাম। তিনি তাঁকে খুব বিশ্বাস করতেন। ছফা ভাই আমাকে বলতেন, ‘আপনি আমার মেয়ে’। আমাকে আদর করে বলতেন, ‘ভালো করে চা বানিয়ে আনেন, আমরা দুজনে খাব।’ রাতের বেলা তাঁরা আড্ডায় বসতেন। মাঝেমধ্যে আমিও বসেছি। কাকুর ছবি, বাংলাদেশের কৃষক, তাঁদের দুরবস্থা ইত্যাদি নানা বিষয়ে তাঁরা গভীর আলাপ করতেন। অত সব তো আর আমি বুঝতাম না। তাই উঠে যেতে চাইতাম। তখন আবার কাকু বলতেন, ‘নীহারবালা, আপনি উঠবেন না, আপনি উঠে গেলে আমাদের কথা কে শুনবে?’ কাকুর সঙ্গে থাকতে থাকতে আমারও বুদ্ধি ঢের বেড়েছে। তাই মাফ চেয়ে বলতাম, ‘কাকু, আমি সকালে না উঠলে আপনাদের চা কে বানিয়ে দেবে?’  শিশুর মতো সরল এই দুটি মানুষ তখন প্রাণ খুলে হাসতেন।

 

১৯৮২ সালে অসুস্থতার পর থেকে তাঁর রুটিন কেমন ছিল?

পেটে আলসার ধরা পড়ার পর থেকে ডাক্তাররা তাঁর খাওয়াদাওয়ার বিধি-নিষেধ আরোপ করে দিলেন। তাঁরা বললেন, আপনি আর রাত জাগতে পারবেন না। তাঁকে সেটি মানাতে আমার যে কী কষ্ট হয়েছে! তাঁর তো রাত জাগাই স্বভাব ছিল। শরীর ভালো থাকলে তিনি কারো কথা শুনতেন না। তখন আবার তাঁর শরীর খারাপ হতো। ফলে আবার ১০-১১ দিন রাতে তিনি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাতেন না, রাত জাগতেন না। তাঁকে তো নিয়মিত চেক আপ করতে হতো। যশোরের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে সরকার তাঁর চিকিৎসা দিয়েছেন। তা ছাড়া ঢাকার এলে লালমাটিয়ার এক হাসপাতালে আমরা তাঁর চেক আপ করাতাম। সব ডাক্তারই আমাকে তাঁর নিয়মিত যত্ন নিতে বলতেন। তাঁর সেবা করার পর থেকে কাকুর সঙ্গে আমার আত্মার বাঁধনটি আরো বেড়ে গিয়েছে। তাঁর যত্ন নেওয়ার বিষয়ে কোনো কষ্টকেই কোনো দিন আমার কষ্ট মনে হয়নি।

 

জীবনের শেষ দিনগুলোতেও কী তিনি আঁকতেন?

কোনো দিনও ছবি আঁকায় তাঁর বিতৃষ্ণা ছিল না। তবে শেষ জীবনে আঁকতে বসলে তাঁর শরীর খারাপ হয়ে পড়তো, তিনি কষ্ট পেতেন। তার পরও সকালে ঘুম থেকে উঠতেন। একটু হাঁটাহাঁটি করতেন। চা, বিস্কুট খেতেন। এর পর আমি তাঁকে মুরগির স্যুপ বানিয়ে খাওয়াতাম। তিনি ছবি আঁকতে বসতেন। মাঝে বিরতি দিয়ে হলেও আঁকতেন। আঁকা শেষে তাঁর ফুল, ফল, পশু-পাখিগুলোর খোঁজখবর নিতেন, তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। ভালো লাগলে নিজেই কৃষকের মতো মাটি কোপাতে শুরু করতেন। তিনি সব সময় ব্যস্ত থাকতে চাইতেন। প্রতিদিন দুপুরে গোসল করতেন। তাঁর জন্য জাউ (নরম ভাত) রান্না করতে হতো। ভাতের সঙ্গে কাঁচকলা, শিং কী মাগুর মাছের তরকারি থাকত। তিনি আস্তে আস্তে খেতেন। রাতেও প্রায়ই একই রকম খাবার খেতেন। তার পরও বিকেলে অতিথি এলে তাঁদের সময় দিতেন, কথা বলতেন। অনেক সময়ই আমরা তাঁর বাইরে বেড়ানো ঠেকাতে পারতাম না।

 

শরীর ভালো থাকতে তাঁর প্রিয় খাবার কী ছিল?

তিনি খাদ্যরসিক ছিলেন না। অল্প খেতেন। তবে কচুরপাতা, কচুরলতি, কলার থোড় খেতে পছন্দ করতেন। যদিও অসুস্থ হওয়ার পর শেষ ১০-১২ বছর মুরগির স্যুপ, শিং, মাগুর মাছ, কাঁচকলার তরকারিই বেশি খেয়েছেন। তবে সারা জীবনই তাঁর চায়ের নেশা ছিল। সেটি ছাড়াতে পারিনি।

 

তিনি কী করতে পছন্দ করতেন?

সব সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে আড্ডা দিতে, ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন। পশু-পাখি খুব পছন্দ করতেন। ফুল তাঁর খুব প্রিয় ছিল। সারা বাড়ি তিনি ফুলবাগানে ভরে রাখতেন। কাজ-পাগল মানুষ ছিলেন। অসুস্থতা তাঁকে থামিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত ঘুম বাদে সারাক্ষণই নিজের ভুবনে, কাজ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। নিজের হাতে বাগানের গাছগুলোর যত্ন নিতে খুব ভালোবাসতেন। 

 

তাঁর প্রিয় পোশাক?

যৌবনে তো তিনি ইউরোপ-আমেরিকা ঘুরেছেন। ওসব দেশের জামা-জুতা পরেছেন, সেভাবেই ঘুরে ঘুরে শেষ পর্যন্ত তাঁর আলখাল্লা পরতে ভালো লাগত। তিনি কালো রঙের আলখাল্লা পরতে খুব ভালোবাসতেন, কিন্তু এই পোশাক তো আমাদের দেশে পরলে খুব গরম লাগে। তার পরও তিনি আলখাল্লা পরা ছাড়তে পারেননি। তাঁকে জীবনের শেষ দিকে অনেক বুঝিয়ে পাঞ্জাবি, লুঙ্গি পরতে রাজি করাতে পেরেছিলাম। আর তখন তাঁর গায়েও আগের মতো শক্তি ছিল না, বাইরেও কম বের হতেন।

 

দেশ-বিদেশের গল্প করতেন?

তিনি তো নানা দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ফলে বিদেশে যাওয়ার প্রতি তাঁর আর আগ্রহ ছিল না। তিনি তাঁর শিশুস্বর্গের মায়ায় পড়ে গিয়েছিলেন। শত কষ্ট, শত শারীরিক অসুস্থতা, আর্থিক দৈন্যতা কোনো কিছুই তাঁকে এখান থেকে সরাতে পারেনি। অনেকবার তিনি আমাকে বলেছেন, ‘আমি অনেক মানুষের সঙ্গে চলেছি, অনেকের সঙ্গে কাজ করেছি; লন্ডন, আমেরিকা, পাকিস্তান, ভারত গিয়েছি; সাদা-কালো সব ধরনের মানুষ দেখেছি, কিন্তু আমার এই দেশের মতো মানুষ আর পাইনি। আসল মানুষ কারা জানেন? এই দেশের কৃষক, এই দেশের শ্রমিক। তাঁরা কষ্ট করে ফসল ফলান, বোঝা বহন করেন। আমরা তাঁদের তৈরি জিনিশ চেয়ারে বসে খাই।’ তিনি বিখ্যাত শিল্পীদের গল্প করতেন, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে তাঁর ছবি প্রদর্শিত হয়েছে, সেটি যে গর্বের বিষয়—তিনি তা মনে করতেন না। বিদেশ গিয়ে ছবির প্রদর্শনী করবেন—এরকম ইচ্ছাও কোনো সময় তাঁর ভেতরে দেখিনি। নিরাসক্ত মানুষ ছিলেন ‘সুলতান’।

 

ব্যক্তি মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন?

কাকু একদিন আমাকে বললেন, ‘নীহারবালা, কালকের খাওয়া কিভাবে হবে সে চিন্তা করবেন না।’ বুঝলাম, মানুষটি সংসারের খোঁজ না নিলেও ঠিকই অভাব-অনটন সব টের পান। মানুষ হিসেবে তো তিনি অনেক বড় মাপের ছিলেন।  অভাব তাঁর কোনো সিদ্ধান্তই পরিবর্তন করাতে পারেনি। একদিন এক অস্ত্রধারী পুলিশ এসে তাঁর ছবি এঁকে দেওয়ার জন্য কাকুকে ১০ হাজার টাকা দেবার প্রস্তাব দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, ‘লাখ টাকা দিলেও আমি অস্ত্রের ছবি আঁকব না।’ যে মানুষটি লন্ডন-আমেরিকা ছেড়ে, ঢাকার বিনা পয়সার বিরাট বাড়ি ফেলে কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না করে, খ্যাতি-যশ-অর্থ সব ছেড়ে সাধারণ মানুষের কাছে এসে তাঁদের সঙ্গে থাকতে পারেন, তিনি অনেক বড় মানুষ।

 

(১৫ ডিসেম্বর ২০১৫, নড়াইল)



মন্তব্য