kalerkantho


মানুষের জন্য কাজ করছি

লেখক, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড, একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের দাবিতে ১৯৭২ সাল থেকে আন্দোলন করছেন। তাঁর সেই জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

২৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মানুষের জন্য কাজ করছি

বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার আন্দোলনে কিভাবে যুক্ত হলেন?

আমার বাবার বড় ভাইয়ের ছেলে শহীদুল্লা কায়সার ও জহির রায়হান। বড়দা, মেজদা ডাকতাম। তাঁরা আমাদের যৌথ পরিবারের কেন্দ্র ছিলেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে খুব মিল ছিল। এক ভাইয়ের কথা ছাড়া অন্য ভাই নড়তেন না। বড়দা চেয়েছিলেন, আমি লেখক হব, মেজদার ইচ্ছা, চলচ্চিত্র নির্মাতা। তাঁর সঙ্গে ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে কিছুটা কাজও করেছি। কিন্তু পরে বড়দা রাগ করায় মেজদা বারণ করে দিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় জহির রায়হানের সঙ্গে তাঁর ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর চিত্রনাট্যেও কাজ করেছি। কিন্তু পরে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করতে চাই বলে তিনি ৭ নম্বর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল (অব.) কাজী নুরুজ্জামানের মাধ্যমে আমাকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠালেন। কয়েকটি অপারেশনে অংশ নিয়েছি। পরে জহির রায়হান আমাকে ডেকে পাঠালেন। তাঁরা যে কালচারাল স্কোয়াড তৈরি করেছিলেন, সেখানে জহির রায়হানের নির্দেশে কাজ করেছি। ‘রূপান্তরের গান’ গীতিনকশার চিত্রনাট্য আমার লেখা। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর কলকাতার খবরের কাগজে প্রকাশিত হলো—আলবদর বাহিনী এ দেশের শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। সেই তালিকায় শহীদুল্লা কায়সারও রয়েছেন। খবরটি দেখেই মেজদা পাগলের মতো হয়ে গেলেন। তাঁদের দুই ভাইয়ের অসম্ভব মিল ছিল। দেশে ফিরে তিনিই প্রথম বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং দোষীদের খুঁজে বের করতে তদন্ত কমিশন তৈরি করলেন। বড়দা, তাঁর শিক্ষক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, মুনীর চৌধুরীকেও তো আলবদররা হত্যা করেছে। তিনি বাংলার ছাত্র ছিলেন, আমিও। সাপ্তাহিক ললনায় আমার সহকর্মী কবি সেলিনা পারভীনকেও হত্যা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে আমাদের যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য প্রকাশিত রানার পত্রিকার মূল পরামর্শক, ললনার কর্ণধার মোহাম্মদ আখতারকে নৃশংসভাবে তাঁর পল্টনের বাড়িতে হত্যা করেছে। স্বজন, পরিচিত, কাছাকাছি যে বাড়িতেই গিয়েছি, এমন কোনো বাড়ি নেই, যেখানে কাউকে না কাউকে হত্যা করা হয়েছে।

 

জহির রায়হান বিচারপ্রক্রিয়া কিভাবে শুরু করলেন?

বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকদের নিয়ে তিনি প্রেস ক্লাবের এক ঘরে শুনানি শুরু করলেন।  কিভাবে তাঁদের মা-বাবা, ভাইদের ধরে নিয়ে গেছে, স্বজন হারানো পরিবারগুলো তা কমিশনের কাছে বলল। তারা লিপিবদ্ধ করল। জহির রায়হান তদন্ত কমিশনের আহ্বায়ক, ছাত্র ইউনিয়নের তরুণ নেতা বাশারত আলী সদস্যসচিব। আমার ছোট ভাই বাবলুও কাজ করত। তাঁদের সঙ্গে আরো কিছু তরুণ ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠিত হয়েছিলেন। মুক্তিসেনারা কোনো রাজাকার, আলবদরের খোঁজ পেলে ধরে নিয়ে আসতেন। আলবদরদের খোঁজ করতে করতেই তাঁরা শহীদুল্লা কায়সারের ঘাতক জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরীর আমির খালেক মজুমদারকে খুঁজে নিয়ে এসে পরে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছিলেন। শুনানির পর তার বিচার হয়েছে এবং সাত বছরের কারাদণ্ডেও সে দণ্ডিত হয়েছে। তবে মিরপুর মুক্ত করার অভিযানে জহির রায়হান শহীদ হওয়ার পর কমিশন বন্ধ হয়ে গেল। এরপর এই বিপর্যস্ত পরিবারের হাল ধরতে সবার বড় বড়দি নাফিসা কবির যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে এলেন। তিনি পরস্পরের পরিচিত ঢাকার শহীদ বুদ্ধিজীবীর পরিবারগুলোকে একত্র করলেন। তখনই শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সঙ্গে আমার পরিচয়। তখন আমরা রাজপথে কয়েকটি মিছিল করেছি। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শহীদ মিনারে সমাবেশ করে মিছিল করেছি। পরের মাসে আরেকটি মিছিল নিয়ে বঙ্গভবনে বঙ্গবন্ধুর কাছে হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে স্মারকপত্র দিয়েছি। সেটিই ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে প্রথম আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু সেই বিচারকার্য শুরু করেছেন বলে রাজপথে থাকার প্রয়োজন পড়েনি। আর আমাদের এই আন্দোলনের নেতা বড়দি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার পর জোটবদ্ধভাবে এগোতেও পারিনি। তবে এ বিষয়ে সাংবাদিকতার সূত্রে বিচিত্রায় নিয়মিত লিখেছি।

 

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্র কেন গড়েছিলেন?

কারণ পঁচাত্তরের পর থেকে আমরা দেখেছি, জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ খুব সচেতনভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছেন এবং রাজাকার, আলবদরদের মন্ত্রী করছেন। তাঁরা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হচ্ছেন, প্রশাসনিক দায়িত্বে যাচ্ছেন। ক্রমেই মুক্তিযোদ্ধারা কোণঠাসা হচ্ছেন। তারই প্রতিবাদে, মুক্তিযুদ্ধকে সামনে নিয়ে আসতে ১৯৮৩ সালে আমরা সংগঠনটি করেছি। প্রথমে মাসিক বুলেটিন করতাম। তারপর দেখি, বুলেটিনের অত আবেদন নেই, বই প্রকাশ করতে হবে। সংগঠনটি থেকে অনেক বই প্রকাশ করেছি। প্রথম বইটি ছিল ‘একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়?’। ‘বাংলাদেশ জেনোসাইড’, ‘জামায়াতের অতীত-বর্তমান’, ‘ছড়া, ছবিতে মুক্তিযুদ্ধ’সহ অনেক বই প্রকাশ করেছি। শেষ বইটি ছড়াকার লুত্ফর রহমান রিটনকে দিয়ে লিখিয়েছি। কয়েকটি প্রকাশনা খুব গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় ছিল। ‘একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়?’ বইমেলায় এক সপ্তাহে পাঁচ হাজার কপি বিক্রি হলো। মানুষ লাইন ধরে বইটি কিনেছে। এই ঘটনাগুলো ঘটেছিল, আমরা ঘটিয়েছিলাম।

 

গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে কিভাবে সংগঠিত হলেন?

১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর কাগজে দেখি, জামায়াতে ইসলামী অধ্যাপক গোলাম আযমকে তাদের আমির ঘোষণা করেছে। তিনি পাকিস্তান আমলে, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাদের আমির ছিলেন। কিন্তু পরে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেননি, পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন। ১৯৭৮ সালে অসুস্থ মাকে দেখতে পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে তিন মাসের ভিসায় বাংলাদেশে এলেন। তারপর থেকে গেলেন। যেহেতু চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী, পাকিস্তানের নাগরিক, ১৯৭২ সালে তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিল; ফলে সরাসরি যুক্ত না থেকে তিনি গোপনে এর পর থেকে দলের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভের জন্য বিএনপির জামায়াতের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। সেভাবেই বোধ হয় তাঁকে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে দল দুটি চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। যেইমাত্র বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন, জামায়াত তাঁকে আমির ঘোষণা করল। কর্নেল (অব.) নুরুজ্জামান আমাকে ফোন করে বললেন, খবরের কাগজ দেখেছ? বললাম দেখেছি। তিনি বললেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সভা আহ্বান করো। বললাম, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে শুধু আমাদের সংগঠনের মাধ্যমে হবে না, বড় আকারের প্রতিবাদ করতে হবে। তিনি বললেন, কিভাবে? বিচিত্রা থেকে আমরা প্রতিবছরের ৩১ ডিসেম্বর সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর হাটখোলা রোডের বাড়িতে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করতাম। সেখানে সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের কর্মী, বুদ্ধিজীবীরা সবাই আসতেন। সেই বাড়িতেই  আমরা গাড়ির গ্যারেজে বসে আলোচনা করলাম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে পরের সভায় কারা থাকবেন, সেই তালিকা প্রস্তুত করে কর্নেল জামানের বাসায় আরেকটি সভার আহ্বান করা হলো।

 

একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি নামটি কি সেখানেই ঠিক হলো?

১৯৯২ সালের ৩ জানুয়ারি তাঁর সিদ্ধেশ্বরীর বাসভবনে ৩৪ কি ৩৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক একত্র হলেন। আমার ‘জাহানারা ইমাম ও গণ আদালত’ বইতে এটি বিস্তারিত লেখা আছে। সেই সভায় সিদ্ধান্ত হলো, আমরা সংগঠন তৈরি করে সেটির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাব। এর আগেই ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল’ শব্দবন্ধটি আমাদের ছিল, ‘একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়?’ বইটির মাধ্যমে পরিচিত পেয়েছিল। ফলে এটি সংগঠনের নামের সঙ্গে যুক্ত রাখার প্রয়োজন বোধ করলাম। আমি ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল প্রতিরোধ কমিটি’ নামটি প্রস্তাব করলাম। তবে মুক্তিযোদ্ধারা আরো আক্রমণাত্মক নাম চাইলেন। ফলে হাসান ইমাম প্রতিরোধের বদলে ‘নির্মূল’ শব্দটি যোগ করলেন। তবে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও ড. আনিসুজ্জামান শব্দটি নিয়ে সামান্য আপত্তি জানালে বললাম, ‘নির্মূল’ অর্থ হত্যাকাণ্ড নয়, আমরা তাদের মূলোত্পাটনের কথা বলছি।

 

জাহানারা ইমাম কিভাবে নেতৃত্বে এলেন?

কর্নেল জামান আহ্বায়ক হতে চাইলেও আমি পুরো জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য বলে সুফিয়া কামালের নাম প্রস্তাব করলাম। তাঁর সঙ্গে দেখা করে বলার পর তিনি বললেন, ‘আমি তো জাতীয় মহিলা পরিষদের সভাপতি ছাড়াও অনেক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, জাহানারা ইমাম মুক্তিযুদ্ধে স্বামী-সন্তান হারিয়েছেন, তিনি এই কর্মকাণ্ডে অনেক ভালো নেতৃত্ব দিতে পারবেন।’  শহীদ জননী তখন যুক্তরাষ্ট্রে ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তিন-চার দিন পরে দেশে ফিরলে তাঁকে অনুরোধের পর সামান্য ইতস্তত করলেন, ‘আমি কি পারব?’ তাঁকে বললাম, পারলে আপনিই পারবেন। কারণ ১৯৭৮ সালে গোলাম আযম দেশে ফেরার পর যে নাগরিক কমিটির মাধ্যমে আমরা বায়তুল মোকাররমে সভা করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম, সেখানে তিনি প্রথম ভাষণ দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষণে মুক্তিযোদ্ধারা আপ্লুত হয়ে স্লোগানও দিয়েছিলেন—‘মাগো তোমায় কথা দিলাম, অস্ত্র আবার হাতে নেব।’ তাঁদের ভেতরে তাঁর প্রবল জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি আছে। মুক্তিযোদ্ধা সন্তান রুমী শহীদ হওয়ায় তাঁরা তাঁকে ‘আম্মা’ ডাকতেন। ‘একাত্তরের দিনগুলি’ তো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যুগান্তকারী একটি বই। ফলে তিনি আমাদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। সেদিনের আলোচনার ভিত্তিতে আমরা ১০১ সদস্যের নাগরিক কমিটি গঠন করলাম, যেখানে বরেণ্য শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্রনেতা, মুক্তিযোদ্ধা—সবাই ছিলেন। পরে আরো অনেকে স্বাক্ষর করলেও আমরা এটি ‘১০১ নাগরিকের কমিটি’ই বলেছি। সেই ঘোষণায় আমরা সরকারকে বললাম, যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম পাকিস্তানের নাগরিক, বাংলাদেশের সংবিধান লঙ্ঘন করে জামায়াতের আমির হয়েছেন। একাত্তরের গণহত্যা, সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য ১৯৯২ সালের ২৫ মার্চের মধ্যে তাঁর বিচার করতে হবে। সরকার বিচার না করলে আমরা ২৬ মার্চ গণ-আদালত গঠন করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাঁর বিচার করব।

 

কিভাবে নির্মূল কমিটি বিস্তৃত হলো?

১৯ জানুয়ারি খবরের কাগজে ঘোষণাটি প্রকাশের পর প্রতিটি পত্রিকায় দুই কলাম, তিন কলামে সংবাদটি প্রকাশিত হলো। ২০ জানুয়ারি থেকে প্রতিটি দৈনিক মারফত আমরা জানতে পারলাম, সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, তাঁদের কমান্ড কাউন্সিল, রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবীমহল থেকে এই ঘোষণাকে সমর্থন করা হচ্ছে, তাঁরা বিচারের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছেন। এমন জনসমর্থনে আমরা অভিভূত হয়ে গেলাম। দীর্ঘকাল ধরে একাত্তরের গণহত্যা, স্বজন হারানো এবং ঘাতকদের ক্ষমতায় যাওয়ার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভে মানুষ ফেটে পড়ল। ফলে আমাদের আরো উদ্যোগী হতে হলো। গণ-আদালতের সঙ্গে শুধু বুদ্ধিজীবীমহল নয়, রাজনৈতিক দলকেও সংশ্লিষ্ট করতে হবে। শেখ হাসিনা বিদেশে অবস্থান করায় আওয়ামী লীগের সংসদীয় কমিটির সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে আমরা বড় মোর্চা গঠনের উদ্যোগ নিলাম। সেখানে রাজনৈতিক, সামাজিক, মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী—সবাই থাকবেন। আগেই নির্মূল কমিটি থেকে আমরা পোস্টার, লিফলেট প্রকাশ শুরু করেছি। সেগুলো একাত্তরের প্রথম ও দ্বিতীয় ঘোষণা ছিল। লাখ লাখ কপি সারা দেশে বিলি করা হয়েছে। এরপর সারা দেশেই জেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নির্মূল কমিটির শাখা তৈরি হতে লাগল। জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশেও কমিটি হলো। জাগরণটি মানুষ প্রত্যাশা করেছে, তারা শুধু ডাকের অপেক্ষায় ছিল। সেই ডাকটি দিয়েছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। ফলে রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সারা দেশের মানুষ তাঁর পাশে এসে দাঁড়াল।

 

শেখ হাসিনা আপনাদের কিভাবে সহযোগিতা করলেন?

তিনি ২৯ জানুয়ারি দেশে ফিরলেন। তিনি তখন বিরোধী দলের নেতা। আমরা তাঁর বাসায় যেতে চাইলাম। তিনি আমাকে বললেন, কারা কারা আসবেন? জানালাম, সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম, কর্নেল নুরুজ্জামান, আমি ও সৈয়দ হাসান ইমাম। সুফিয়া কামালকে তিনি ‘খালা’ ডাকেন। তিনি বললেন, খালা আমার বাসায় আসবেন? আমিই তাঁর সঙ্গে দেখা করব। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের কাছেই তো তাঁর বাড়ি। সেখানে তিনি আমাদের সব কথা শুনে সব রকমের সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধারা বিভক্ত হয়েছেন, পক্ষের শক্তিগুলো, রাজনৈতিক দলগুলোও বিভক্ত হয়েছে। এই একটি ডাক সব শক্তিকে একত্র করল। সেটিরই প্রমাণ হলো ১৯৯২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি আমরা ৭২টি সংগঠনকে নিয়ে ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’ গড়ে তুললাম। সংক্ষেপে একে ‘জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ বলি। নির্মূল কমিটির আহ্বায়ক জাহানারা ইমাম সমন্বয় কমিটিরও আহ্বায়ক নির্বাচিত হলেন। সদস্যসচিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী। আট সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটিতে সৈয়দ হাসান ইমাম, আওয়ামী লীগ থেকে আবদুর রাজ্জাক, কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নুরুল ইসলাম নাহিদ, মুক্তিযুদ্ধ কমান্ড কাউন্সিল থেকে অধ্যাপক আহাদ চৌধুরী আর নির্মূল কমিটি থেকে আমি রইলাম। পরে আওয়ামী লীগের সহযোগিতার প্রয়োজন অনুভব করে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট থেকে নাসির উদ্দীন ইউসুফ সমন্বয় কমিটির স্টিয়ারিং কমিটিতে এলেন। ফলে সেটি বেড়ে ১১-১২ সদস্যের হলো।

 

গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দলগুলোর কেমন সহযোগিতা পেয়েছেন?

সব রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনের সমর্থন পেয়েছি। গণমাধ্যমের প্রবল সমর্থন পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব পত্রিকা আমাদের পক্ষে লিখেছে। ১ মার্চ থেকে তারা ‘গণ-আদালতের আর ২৫ দিন’—এভাবে কাল গণনা করে ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। কিভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, ভেতরের খবর প্রকাশ করেছে। এমন অনেক প্রস্তুতির কথা তারা বলেছে, যেগুলো আমাদের মাথায়ও ছিল না। কাদের বিচার হবে, কারা সাক্ষ্য দেবেন, সেসব লিখেছে। গণমাধ্যম ও সারা দেশের মানুষ যেভাবে যুক্ত হয়ে গেছে, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে এত ব্যাপক, এত বৃহৎ নাগরিক আন্দোলন আগে কখনো দেখা যায়নি, ভবিষ্যতেও হবে মনে হয় না। এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নাগরিক আন্দোলন ছিল। ১ মার্চই আমরা সব রাজনৈতিক দলকে আহ্বান জানিয়েছিলাম, গণ-আদালত অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আপনারা দয়া করে দলীয় কর্মসূচি স্থগিত রাখুন। সব কর্মকাণ্ড গণ-আদালতকেন্দ্রিক হোক। সমাবেশ করলেও গণ-আদালত সফল করতে সমাবেশ করুন। ফলে আওয়ামী লীগ তো বটেই, কৃষক শ্রমিক সমাজবাদী—ছোট-বড় সব দলই আমাদের অনুরোধ রেখেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে প্রচেষ্টা নিয়েছে। ১৩টি রাজনৈতিক দল জাতীয় সমন্বয় কমিটির শরিক হয়েছে।

 

সরকারের ভূমিকা?

১৯৯২ সালের ২৩ মার্চ খালেদা জিয়ার সরকার ১৪৪ ধারা জারি করল। তারা জানাল, যাঁরা গণ-আদালতের মাধ্যমে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন, তাঁদের বিপক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই বিরাট কর্মসূচিতে তত্কালীন সরকার বাধা দিলে রক্তগঙ্গা বয়ে যেতে পারে ভেবে আমরাও শঙ্কিত হলাম। উদ্বেগ চরম আকার ধারণ করলে স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য জাসদের কাজী আরেফ আহমেদ জাহানারা ইমামকে সঙ্গে নিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে সরাসরি দেখা করে কথা বলার পরামর্শ দিলেন। আমরা গেলাম। জাহানারা আপা তাঁকে ‘তুমি’ করে বলতেন। তিনি বললেন, ‘তারা ১৪৪ ধারা জারি করেছে, ঢাকায় সমাবেশ করতে দেবে না বলে দূরপাল্লার সব যানবাহন, নৌযান বন্ধ করে দিয়েছে। এখন আমরা গণ-আদালত কিভাবে করব?’ শেখ হাসিনা জানতে চাইলেন, ‘খালাম্মা, আপনি কত লোকের সমাগম প্রত্যাশা করেন?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘চার-পাঁচ লাখ লোক জমায়েত না হলে তো আদালতের কার্যক্রম অর্থবহ হবে না।’ শেখ হাসিনা আমাদের সামনেই আদমজীর শ্রমিক নেতা রেহানকে ফোন করে বললেন, ‘আমার সামনে খালাম্মা বসে আছেন, তাঁদের সমাবেশে গণ-জমায়েতের জন্য আমি চাই, কাল আদমজী থেকে আপনি ৫০ হাজার মানুষ জমায়েত করবেন।’ এভাবে তিনি আরো কয়েক জায়গায় ফোন শেষে বললেন, ‘খালাম্মা, আপনাদের সমাবেশে আওয়ামী লীগ থেকে দুই লাখ কর্মী যাবেন। এবার অন্য দলগুলোকে অনুরোধ করুন।’ বিকেলে ন্যাপের অফিসে আমরা বাম ও প্রগতিশীল দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করলাম। তারাও সাধ্যমতো জমায়েতের চেষ্টা করবে বলে জানাল। তাদের ঐকান্তিক চেষ্টায় গণ-আদালতের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মী জোগাড় হলো।

 

আপনাদের পলাতক থাকতে হলো কেন?

গণ-আদালতকে বাধা দিতে বিএনপি-জামায়াতের সরকার সম্ভব সবই করেছে। তারা একে বেআইনি ঘোষণা দিয়েছে, প্রচলিত বিচারব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে বলে ঘোষণা করল, তারা আদালত বসতে দেবে না। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় রাতে আমরা আত্মগোপনে গেলাম। আমাদের ১২ সদস্যের বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি জাহানারা ইমাম; সেখানে ব্যারিস্টার শওকত আলী খান, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, অ্যাডভোকেট গাজীউল হক প্রমুখ ছিলেন। গাজীউল হক রায় লেখার দায়িত্ব নিয়ে গভীর রাতে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে গেলেন। রায় লিখে ২৫ মার্চ ঢাকায় ফিরলেন। রাতে ১০০টি অনুলিপির জন্য শেখ হাসিনার বাসভবনে সারা রাত ফটোকপি করা হলো। তখন তো ফটোকপি মেশিন খুব কম ছিল। আগের দিন বিকেলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যেখানে সরকার বাধা দেবে, সেখানে বসে পড়ে রায় পাঠ করা হবে। সারা রাত আত্মগোপনে থেকে পরদিন ভোরে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনে গেলাম। সেটি তখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির দখলে ছিল। বারের নেতা ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ প্রমুখ আমাদের নিরাপত্তা দিলেন। গণ-আদালতের রায়ের খসড়া পাঠের পর ১২ বিচারক স্বাক্ষর করলেন। আমরা রায়ের অনুলিপি নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গেলাম।

 

কিভাবে গোলাম আযমের বিচার হলো?

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তখন লোকারণ্য। আগের রাতে নাসির উদ্দীন ইউসুফের উদ্যোগে বসানো ৫০০ মাইকের সবই পুলিশ নিয়ে গেছে, মঞ্চও বানাতে দেয়নি। দুটি ট্রাক জোড়া দিয়ে সেখানে তুলে খালাম্মা ও আদালতের কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তিকে রেখে মঞ্চ তৈরি হলো। মাইকের অভাবে জাহানারা ইমাম এক লাইন রায় পড়ে শোনান, আরেকজন সেটি উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করেন। এভাবে পুরো উদ্যানে আদালতের রায় ঘোষিত হলো। রিলে করলে যা হয়—আমরা গোলাম আযমের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করিনি; প্রমাণ দিয়ে বলেছিলাম, তিনি ১০ অপরাধে অভিযুক্ত, সবই মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। সরকারকে দণ্ড কার্যকর করতে হবে। কিন্তু গণমানুষ স্লোগান দিল, ‘ফাঁসি, ফাঁসি, ফাঁসি; গোলাম আযমের ফাঁসি।’ সাধারণ মানুষই তাঁর ফাঁসি দিল। কিন্তু প্রতীকী আদালতের তো সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া, কার্যকরের পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা নেই। সারা দেশে মানুষের কাছে বার্তাটি ছড়িয়ে গেল, অসংখ্য বিদেশি সাংবাদিক সেটি কাভার করলেন। জাপানের আশাহি শিম্বুন টেলিভিশন খালাম্মার ওপর প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে জানাল, সেদিন প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ জমায়েত হয়েছে। সেখানে বিএনপিরও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকে ছিলেন।

 

আপনাদের গ্রেপ্তার করা হলো কেন?

প্রধানমন্ত্রী জানতে চেয়েছিলেন, গণ-আদালতে আওয়ামী লীগের বাইরে আর কারা আছেন। তাঁর একান্ত সচিব সাবিহ উদ্দিন আহমেদ তখন আমাদের নাম বলেছেন। সাবিহ ভাই সেন্ট গ্রেগরীজ স্কুলে আমার দুই ক্লাস সিনিয়র ছিলেন। তাঁর মাধ্যমে খালেদা জিয়া আমাকে ও নাসির উদ্দীন ইউসুফকে ডেকে পাঠালেন। খালাম্মাও যেতে অনুমতি দিয়ে তাঁর কাছে নির্মূূল কমিটির বক্তব্য জানাতে বললেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী আলাপ হলো। তিনি আমাদের বলার চেষ্টা করলেন, কেন আপনারা গণ-আদালত না করে প্রচলিত আদালতে গোলাম আযমের বিচারের চেষ্টা করছেন না? বললাম, প্রচলিত আদালতে এই অপরাধের বিচার সম্ভব নয়, সে জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল করতে হবে। সেখানে আমরা সাক্ষ্য দিতে যাব। কিন্তু তথ্য-প্রামাণাদি সরকারকেই সংগ্রহ করতে হবে। তিনি তা করতে রাজি হলেন না। বরং আওয়ামী লীগের খুব সমালোচনা করে বললেন, ‘এই আন্দোলনের কারণে দেশে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আপনারা তাদের ক্রীড়নক।’ বাড়ি ফিরেই শুনি, আমাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে। সাবিহ ভাইকে জানানোর পর তিনি কিছু জানেন না বললেন। পরে খবর নিয়ে বললেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন মামলা করেছেন। তিনি কোর্টে জামিন নিতে পরামর্শ দিলেন। পরদিন হাইকোর্টে ড. আমীর, ড. কামাল, ড. ইশতিয়াক আহমেদসহ অন্য শতাধিক আইনজীবী বললেন, এটি তো প্রতীকী বিচার, বিচারব্যবস্থার অধীনে তো হয়নি, এখানে মানুষের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে; সব অভিযোগ গোলাম আযমের বিপক্ষে করা হয়েছে। তিনি কি বাংলাদেশ রাষ্ট্র যে তাঁর বিপক্ষে কিছু বললে সেটি রাষ্ট্রদ্রোহ হবে? যাঁরা এই আদালত করেছেন তাঁরা সেক্টর কমান্ডার, মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী; তাঁদের রক্তের বিনিময়ে এই দেশের জন্ম হয়েছে। এরপর জামিন হলো। ১৯৯৪ সালে খালাম্মা ক্যান্সারে মারা গেলেন। এর তিন দিন আগে খালেদা জিয়ার সরকার আদালতের মাধ্যমে গোলাম আযমকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিল। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাপ্তাহিক বিচিত্রার নির্বাহী সম্পাদক পদ থেকে আমাকে ছাঁটাই করা হলো। লেখা চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে।

 

কেন পদচ্যুত করা হলো?

এই ঘটনার সাত দিন আগে তত্কালীন তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা সচিবালয়ে ডেকে পাঠিয়েছেন। তথ্যসচিব, প্রধান তথ্য কর্মকর্তাসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সবাই ছিলেন। তিনি বললেন, ‘সরকারি পত্রিকা বিচিত্রায় চাকরি করে আপনি এই আন্দোলন করতে পারবেন না।’ উত্তর দিলাম, বিচিত্রায় নির্মূল কমিটি, জাহানারা ইমামের খবর ছাপা যাবে না তা বলতে পারেন। কিন্তু পেশাগত জীবনের বাইরে কী করব না করব সে তো আমার ব্যক্তিগত। ‘না, আপনি এই আন্দোলন করতে পারবেন না।’ ‘আমাদের কাগজে এমন অনেকে আছেন, যাঁরা বিভিন্ন সংগঠনে যুক্ত, নির্মল সেন তো একটি দলের সভাপতি।’ ‘তাঁকে সরকার বিপজ্জনক মনে করে না, আপনাকে করে।’ তিনি তিন দিন পরের সমাবেশেও থাকতে নিষেধ করলেন। কর্নেল জামান দেশের বাইরে থাকায় ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী হিসেবে সেই সমাবেশ আহ্বান করেছিলাম বলে বলতে হলো, ‘আমি সমাবেশ আহ্বান করেছি, জাহানারা ইমাম সভাপতিত্ব করবেন। সেখানে যেতেই হবে।’ তিনি পরিষ্কার বললেন, ‘তাহলে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। জানালাম, ‘যা-ই ঘটুক, সমাবেশে যাব।’ ফিরে আসার পর পদচ্যুতির পত্র এলো। অফিসে প্রবল প্রতিবাদ হলো। ড. কামাল হোসেনের মাধ্যমে আদালতের দ্বারস্থ হলাম। তিনি প্রচণ্ড পরিশ্রম করে রাজনৈতিক কারণে আমাকে নির্যাতন করা হচ্ছে—১৬৭ পাতার যুক্তিমালা তৈরি করলেন। হাইকোর্টে গিয়ে এক বেঞ্চে এক প্যারা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচারক বললেন. ‘ড. হোসেন, আমি বিব্রত বোধ করছি, অন্য কোর্টে চেষ্টা করুন।’ আমাকে নিয়ে আরেক বেঞ্চে গেলেন। তাঁরা বললেন, ‘এখানে নয়, লেবার কোর্টে যান।’ সেখানে বললেন, সরকারি পত্রিকায় সরকার তার কর্মচারীকে তো পদচ্যুত করতেই পারে। ড. কামাল বললেন, ‘কেন পারে না, সেটিই জানাতে চাই। তাঁরা পদচ্যুতির পত্রে লিখেছেন, বিচিত্রায় লোকসান হচ্ছে বলে তাঁকে পদচ্যুত করা হয়েছে। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন, এটি বছরে ছয় থেকে আট লাখ টাকা লাভ করে। শেষ ছয় মাসে ছয় লাখ টাকা লাভ করেছে। সমস্ত প্রমাণ আছে। লোকসানি প্রতিষ্ঠানে শেষ কর্মকর্তা থেকে পদচ্যুত করা শুরু হয়। তিনি তো দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা। আদালত কোনো কিছুই শুনতে রাজি হলেন না। শেষে ড. কামাল আমাকে বললেন, ‘এটি রাজনৈতিক বিষয়, আপনাকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করতে হবে।’

 

এরপর কিভাবে সংসার চালিয়েছেন?

২৬ বছর ধরে পথে পথে আছি, চাকরি নেই। পদচ্যুত করা হলে পাওনাদি পরিশোধ করা হয়, পদচ্যুতির ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। এক পয়সাও পাইনি। বিচিত্রা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমার নিম্নপদস্থ সাংবাদিকরাও প্রত্যেকে ২৪-২৫ লাখ টাকা পেয়েছেন। আমি তো কোনো সঞ্চয় করতে পারিনি, পুরোটাই নির্মূল কমিটির আন্দোলন সংগঠনে ব্যয় করেছি। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বন্ধু মুনতাসীর মামুনের মাধ্যমে চিত্রকর্মের সংগ্রহশালার ছবি বিক্রি করে চলেছি, ঘরের ব্যবহার্য জিনিসও বিক্রি করে খেতে হয়েছে। ১৯৯৬ সালে নেদারল্যান্ডসের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল হিস্ট্রি নামের সামাজিক বিজ্ঞানের ইতিহাসের বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালায় সাউথ এশিয়ান ডেস্কে এক বন্ধুর মাধ্যমে কাজ পেয়েছি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম, শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস সংগ্রহ এবং সাক্ষাত্কারসহ নানা কিছু সংগ্রহ করতাম। সেই টাকায় ২০১২ সাল পর্যন্ত চলেছি। টিভি টক শো, লেখার রয়ালটি থেকে সামান্য আয় হয়। উপায় না পেয়ে পৈতৃক বাড়িটিও আবাসন কম্পানিকে দিয়ে দিতে হয়েছে, ফ্ল্যাটগুলো বিক্রি করে চলি। এই বাড়িতে নির্মূল কমিটির অফিসটি ভাড়া দিলে এই দুটি অ্যাপার্টমেন্টে ৫০ হাজার টাকা পেতে পারি। সেটি করিনি।

 

আপনাকে কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।

২০০০ সালে সন্ধ্যায় ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলের সামনে আমার সিএনজির গতি রোধ করে মাইক্রো থেকে চারজন দুটি পিস্তল ও দুটি ছুরি নিয়ে নামল। দুজন দুই পাশে বসে মাইক্রোতে উঠতে নির্দেশ দিল। কনুই দিয়ে তাদের ঠেলে ফেলে ডাকাত ডাকাত, বাঁচাও বাঁচাও বলে চিত্কার করতে করতে দৌড়াতে শুরু করলাম। আশপাশের লোক ছুটে এলে ওরা ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে গেল। হাত-পায়ে জখমের দাগ আছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের কর্মী, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ভোট না দেওয়ার জন্য নজিরবিহীন নির্যাতন, ভয়ভীতি দেখানো হলো। তাদের নির্বিঘ্নে ভোটদানের জন্য ‘এসওএস’ একটি ছবি তৈরি করেছি। আমাদের পর্যবেক্ষণ, সেবার ৩০ শতাংশের বেশি হিন্দু ভোট দিতে পারেনি। ভোরের কাগজের রাজনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে চাঁদপুর, নোয়াখালী, বাগেরহাট—যেখানেই সহিংসতা ঘটেছে, ঘটনাস্থলে গিয়ে রিপোর্ট করেছি। সিরাজগঞ্জের ধর্ষিতা পূর্ণিমাকে ঢাকায় এনে সংবাদ সম্মেলন করেছি। ক্ষুব্ধ হয়ে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগেই জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী প্রকাশ্য জনসভায় বলেছেন, ‘আমরা ক্ষমতায় যাচ্ছি। শাহরিয়ার কবির ও নির্মূল কমিটিকে দেখে নেব।’ তখন যুগান্তরে প্রকাশিত এক রাতে এক হাজার ৫০০ হিন্দুর দেশত্যাগের খবর দেখে কলকাতায় চলে গেলাম। তাঁরা কেন দেশ ছেড়েছেন, নির্যাতিতদের সঙ্গে কথা বলে রেকর্ড, নথি জোগাড় করেছি। ভারতের সাবেক স্পিকার পি এ সাংমা আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আমাদের ‘সাউথ এশিয়ান পিপল’স ইউনিয়ন এগেইনস্ট ফান্ডামেন্টালিজম অ্যান্ড কমিউনালিজম’-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য; তিনি বলেছিলেন, ‘দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার হবে; যেয়ো না।’ বলেছি, নিজের দেশে যেতেই হবে। পরিচিত সাংবাদিক, মুনতাসীর মামুন, কাজী মুকুলদের জানিয়ে সব তথ্য নিয়ে ২০০১ সালের ২২ নভেম্বর সন্ধ্যায় এয়ারপোর্টে নামার পর পুলিশ, গোয়েন্দাবাহিনীর নির্দেশে আর বের হতে দেয় না। নির্মূল কমিটির সদস্য, আমার বন্ধুরা বাইরে স্লোগান দিতে লাগলেন। রাত দেড়টায় সাদা পোশাকের একদল লোক তাদের সঙ্গে যেতে বলল। পরিচয় জানতে চাইলে বলল না। বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে জুলফিকার আলী মানিক, ফজলুর রহমানসহ সাংবাদিক বন্ধুদের চিত্কার করে গুম, ক্রসফায়ারের আশঙ্কার কথা জানালে সাদা পোশাকের বাহিনীর প্রধান তা অস্বীকার করে জিপে তুললেন। পেছনে মোটরসাইকেলে সাংবাদিকরা অনুসরণ করলেন। শান্তিনগরের এসবি অফিসে সাংবাদিকদের সামনে আমার সব তথ্য, অডিও সিজ করা হলো। কোর্টে হাজির করল না। পরে ব্যারিস্টার শওকত আলী খান সহকর্মীদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তখনই ঢাকা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে নেওয়া হলো। এক সিনিয়র আইনজীবীর মাধ্যমে খবর পাঠানোর পরপর অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনসহ আওয়ামী লীগের আইনজীবীরা এলেন।   তা-ও ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো। রিমান্ডে নির্যাতনসহ সবই করা হয়েছে। জেলজীবন নিয়ে ‘অবরুদ্ধ স্বদেশ থেকে প্যারোলে ইউরোপ’ নামে আমার বই আছে। গ্রেপ্তারের দুই সপ্তাহের মধ্যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নেলসন ম্যান্ডেলার পর আমাকে দ্বিতীয় বন্দি হিসেবে ‘প্রিজনার অব কনশেনস’ (রাষ্ট্র যে বন্দির রাজনৈতিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি সহ্য করে না) ঘোষণা করল। অ্যামনেস্টির প্রধান দেশে এসে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করলেও তিনি আমাকে ছেড়ে দিতে রাজি হননি, বরং কঠিন শাস্তির কথা বলেছেন। গুন্টার গ্রাসের মতো নোবেল বিজয়ী আমার মুক্তির জন্য চিঠি দিয়েছেন। তার পরও বিএনপি-জামায়াত সরকার আমার বিপক্ষে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করেছে। দুই মাস পর জামিন পেয়ে আবার এক বছর পর গ্রেপ্তার হলাম। ২০০২ সালেও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার হলাম। এক মাস পর জামিন হলো। এই মামলাগুলো ২০০৮ সাল পর্যন্ত লড়তে হয়েছে। ২০০২ সালের ২২ নভেম্বর চট্টগ্রামের নাগরিক কমিটির সংবর্ধনায় আমার গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। প্রচুর পথচারী আহত, এক রিকশাচালক নিহত হয়েছেন। ২০০৪ সালের নভেম্বরে উত্তরবঙ্গে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় নির্যাতিত নারীদের চিকিৎসার জন্য নির্মূল কমিটির যুক্তরাষ্ট্র শাখার অর্থ গণধর্ষণের শিকার রাধা রানীকে দেওয়ার জন্য যাচ্ছি; আমাদের মাইক্রোবাসকে ট্রাক চাপা দিল। ঢাকা মহানগরের নেতা পিয়াল ঘটনাস্থলে নিহত, কাজী মুকুলসহ আমরা গুরুতর আহত হলাম। হেলিকপ্টারে ঢাকায় এনে আমাদের চিকিৎসা হলো। এর পর থেকে ডান পায়ের হাড় নেই। মানুষের জন্য কাজ করতে গেলে এসব হবেই। ১৯৯২ সাল থেকে শিশুসাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক, মানবতাবাদী কর্মী হলেও ফেসবুক, ইন্টারনেটে আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করা হয়। আমি সাম্প্রদায়িকতা ঠেকাতে, মানুষের জন্য কাজ করছি; এগুলোর পরোয়া করি না। এই দেশে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িতা. অন্ধকারের যে আবর্জনা চারপাশে জমে আছে, এ দেশে যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে যে কলঙ্ক জাতির কপালে আছে, সেটি দূর করতে হবে। এই জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার লড়াইটি আমাকে করতে হচ্ছে।

শ্রুতলিখন : হারুন-অর-রশিদ

(১১ মার্চ ২০১৮, মহাখালী, ঢাকা)


মন্তব্য