kalerkantho


স্মৃতিগুলোও ঠিক তেমনই দুঃসহ

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু রেখে গেলেন এক নির্মম, কষ্টের ইতিহাস, যা তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন একাত্তরের পর থেকে সারাটি জীবন। বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে জড়িত তাঁর সেই দুঃসহ, সম্ভ্রমহানির, বারবার অত্যাচারের কাহিনিই জানালেন। শুনেছেন মোহসিনা লাইজুওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



স্মৃতিগুলোও ঠিক তেমনই দুঃসহ

কেন জীবনের সংগ্রামে নামতে হলো?

আমার স্বামী ছিলেন সিরাজুল ইসলাম। সেই সংসারে তিনটি ছেলে হয়েছে—তাপস, তিতাস ও তূর্য। গৃহবধূ, চাকরি—এই আমার তখন যাপিত জীবন ছিল। স্বামী সংসার খরচ দিতেন না। আমার সঙ্গে অকারণেই খারাপ ব্যবহার করতেন। প্রতিবাদ করলে বিনা দোষে অনেক চারিত্রিক দুর্নাম ছড়াতেন। কর্তৃপক্ষের কাছে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমার চাকরিও শেষ করে দিয়েছিলেন। যখনই কিছু বলতে চাইতাম, ছেলেদের নিয়ে চলে যাওয়ার হুমকি দিতেন। মুখে গরম চা ছুড়ে মেরে মারাত্মক জখম করেছিলেন। ছেলেদের খরচ, সংসার চালাতে আমাকে চাকরি করতে হলো। পরে তাঁর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হলো।

একাত্তর কেমন করে হাজির হলো?

১৯৭১ সালের শুরুতে খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের ক্রিসেন্ট জুটমিলে পিএ কাম রিসেপশনিস্টের চাকরি করি। তারও আগে ইপিআইডিসির প্লাটিনাম জুটমিলের অ্যাকাউন্টসে কাজ করার সময় সৈয়দ আহসান উল্লাহ আহমেদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। ‘বিয়ার ভাই’ নামে পরিচিত এই মানুষটি তার পর থেকে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। এই সুদর্শন ভদ্রলোকটি অবিবাহিত ছিলেন। যা হোক, একাত্তরের ২৩ মার্চ জ্বালাও-পোড়াওয়ের মধ্য দিয়ে কোনোমতে বাসায় ফিরে দেখি, হাঁ করে দরজা খোলা, ঘরের কোথাও কেউ নেই। ঘরের যেখানে-সেখানে আমার ছেলেদের ছোট ছোট স্যান্ডেল পড়ে আছে। তিন সন্তানকে নিয়ে ওদের বাবা চলে গেছেন! আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। এর কিছুক্ষণের মধ্যে বাঙালি শ্রমিক ও অফিসারদের ওপর বিহারিদের দফায় দফায় আক্রমণের অন্যতম শিকার বিয়ার ভাই পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়েও আমার খোঁজ নিতে এলেন। পরদিন তিনি মাকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন। কোনো একভাবে খুলনার মুনশিপাড়ায় ছেলেদের খবর নেওয়ার জন্য টেলিফোন করলাম। কিন্তু ওরা সেখানেও নেই, দাদির সঙ্গে কোথায় যেন চলে গেছে!

যুদ্ধের হত্যালীলা তত দিনে শুরু হয়েছে?

খালিশপুর কবরস্থানের পেছনে এক খালি বাড়িতে আমি ও আমার মা ছিলাম। সেই বাড়িগুলো যে বাঙালিদের জবাই করার বাড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল, তা-ও আমরা মা-মেয়ে জানতাম না। সেই বাড়িতে থেকেই দেখলাম, ৭ এপ্রিল রাজাকার মতিউল্লাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান আর্মির সেনাবোঝাই তিনটি গাড়ি থামল। তখন বিয়ার ভাইও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি আমাদের এখানে খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গিয়েছিলেন। গাড়িগুলোর গতিবিধি দেখে তাদের পরবর্তী ভয়াবহতা বুঝে ওঠার আগেই তিনি ঝটপট জানালা-দরজা বন্ধ করে দিয়ে খাটের নিচে আমাদের লুকাতে বলে নিজেও লুকিয়ে পড়লেন। সামনের মুনশিবাড়ির সামনে গাড়িগুলো থামল। পাকিস্তান আর্মির সদস্যরা আওয়ামী লীগ করার অপরাধে বাড়িটির ১৪ সদস্যের সবাইকে ‘ব্রাশফায়ার’ করে মারল। এরপর আমরা জীবনের তাগিদে বেরিয়ে পড়লাম। পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বিয়ার ভাই আমার খোঁজে আবার বেরিয়ে গেলেন। পেলেনও। পাবলা দৌলতপুর বন্দর উপশহর এলাকার পাবলা মুরগির ফার্মের কাছে এক অর্ধনির্মিত দোতলা বাড়িতে আমরা আশ্রয় নিলাম। দোতলায় কয়েকটি ঘর তোলা হয়েছে। বিয়ার ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, নিকটতম প্রতিবেশী ইঞ্জিনিয়ার হক সাহেব, তাঁর স্ত্রী, তিন মাসের ছোট্ট মেয়ে; ব্যবসায়ী সিরাজ ভাই, তাঁর কিশোরী স্ত্রী রঞ্জুসহ আরো দুটি পরিবার সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। পাট ব্যবসায়ী সিরাজ ভাই, প্রবাস থেকে ফেরা হক সাহেবের খরচে আমরা চলছি। ১১ এপ্রিল হক সাহেব হাঁস-মুরগিগুলোকে খাবার দেবেন, খালিশপুরের বাড়িটিও দেখে আসবেন—এই বলে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু ঘণ্টা তিনেক পর খবর এলো, রাজাকার-আর্মির সহযোগিতায় সেখানকার বিহারিরা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তাঁর মৃত্যুর পরপরই একে তো অচেনা, তার ওপর স্বামী নেই, অন্য লোকের সঙ্গে এসেছে—এসব কারণে আশ্রয়কেন্দ্রের অন্যদের সঙ্গে আমার একাত্মতা কমতে লাগল। সিরাজ ভাইয়ের স্ত্রী রঞ্জু ভাবিও আমাকে আর মানতে পারছেন না। সিরাজ ভাইও আগের মতো খাওয়ার সময় ডাকেন না। বুঝলাম এখানে আর এক দিনও থাকা যাবে না। বিয়ার ভাই গ্রামের দিকে চলে গেলেন। কিন্তু রাজাকারের ভয়ে আমাকে নিতে পারলেন না। বাধ্য হয়ে আবার পথে বেরোতে হলো।

কিভাবে বন্দি হলেন?

গোয়ালখালীর লেভেলক্রসিংয়ের কাছে গিয়ে নিজের পুরনো ভাড়া বাড়িটি দেখে খুব যাওয়ার কথা মনে হলো। কিন্তু প্রবীণ এক কৃষক, পরে জেনেছি তাঁর নাম ইমাম আলী, তিনি জানালেন যে সেই বাড়িতে এখন মানুষ মারা হচ্ছে। তাঁর কথায় পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি, শিয়াল মানুষের মাংস খাচ্ছে। ফলে তাঁর পরামর্শে আবার আশ্রয়কেন্দ্রে ফিরে আসতে হলো। সিরাজ ভাই কয়েক দিনের নিভৃত গৃহকষ্ট ও চাপা বিবাদের পর থাকতে না পেরে বললেন, ‘আপা, আপনি চলে যান। যখন মনে হবে অসুবিধায় পড়েছেন, চলে আসবেন।’ খুব গোপনে তিনি আমাকে কিছু টাকা, একটা শাড়ি দিলেন। আবার পথে নামলাম। কিন্তু বেরিয়ে দেখি, গ্রামে একেবারেই অচেনা লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে, পথঘাটও চেনে না। বুঝলাম, এরাই রাজাকার, লাখ লাখ মানুষের হত্যাকারী। এর মধ্যে অফিসের অ্যাকাউন্টস বিভাগের জাহাঙ্গীর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। তিনিও তাদের সঙ্গে ঘুরছেন। কিন্তু আমাকে বললেন, ‘এমনি এখানে ঘুরতে এসেছি। তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ বললাম, ‘আট-নয় দিন এক কাপড়ে আছি, অফিসটা খুললেও তো হতো।’ উত্তর দিলেন, ‘অফিস তো খোলাই, জয়েন করবে?’ ‘নিশ্চয়ই।’ ‘তৈরি হয়ে এসো।’ ‘আমার প্রস্তুত হওয়ার কিছু নেই। এভাবেই পালাতে পারব।’ তখন আমার খালি পায়ের দিকে চেয়ে বললেন, ‘অন্তত চপ্পল পরে আসো।’ বাধ্য হয়ে বলতে হলো, ‘পালাতে পালাতে পায়ের চপ্পলও হারিয়ে গেছে।’ বললেন, ‘বাইকে ওঠো।’ বললাম, ‘বাইকে উঠতে পারি না, পিছলে পড়ে যাই।’ তিনি হেসে দিলেন, ‘তাহলে তো তোমাকে দোলনায় করে নিয়ে যেতে হবে।’ আমাকে রিকশা ঠিক করে দিয়ে তিনি সেটির পেছন পেছন আসতে লাগলেন। পথে বহু বিহারি ঢিল, পাটকেল, থুতু ছুড়ল। তাদের সঙ্গে কিছু কথা বলে তিনি চলে এলেন। কিন্তু জীবন বাঁচানোর তাগিদে আমি একসঙ্গে চাকরি করা এই মানুষটিকে বিশ্বাস করে বসে আছি। তিনি আমাকে নতুন একটি বাড়ির সামনে এনে ভেতরে যেতে বললেন। সেই বিলাসবহুল বাড়িটি আমার কল্পনায় ভাসত। বিত্তবৈভবে একেবারেই অভ্যস্ত না হলেও বিত্তবানদের দেখে আমার খুব ভালো লাগে। সব সময়ই মনে হয়, তাঁদের পরিপূর্ণ বিলাস-বৈভবের সত্যিকার শূন্যতা থেকে কিছু না কিছু শেখার থাকে, বেঁচে থাকার শুদ্ধ সংস্কৃতি খুঁজে পাওয়া যায়। আমাকে প্রায়ই আকর্ষণ করা সেই বাড়িটির নাম ‘মাসকট হাউজ’।

রাজাকারটি কি খারাপ ব্যবহার করেছিল?

আমি তো তাঁর কথামতো সেই বাড়িতে ঢুকলাম। তিনি একটি শোবার ঘরে আমাকে নিয়ে গেলেন। এরপর তাঁর ভয়ংকর আক্রমণ শুরু হলো। কয়েক মুহূর্ত আগেও তো এমন দুর্ঘটনার কথা আমার মাথায় আসেনি! নিজেকে বাঁচাতে তাঁর হাতে কামড় দিতে লাগলাম। না পেরে তিনি আমাকে শাসাতে শাসাতে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় বললেন, ‘সন্ধ্যায় সব টের পাবে।’ তিনি কোথাও বেরোতে বারণ করে দিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু ১৮-১৯ বছরের এক ছেলে ড্রয়িংরুমের দরজা খুলে দিয়ে আমাকে বললো, ‘আপনি সদর রাস্তায় নেমে রিকশা নিয়ে এখনই চলে যান। না হলে দারোয়ানরা আপনাকে নির্যাতন করবে। সন্ধ্যায় এখানে অনেক আর্মি অফিসার এসে অনেক মহিলাকে নির্যাতন করে লাশ গুম করে ফেলে।’ আমাকে নামতে দেখে দারোয়ান এগিয়ে এসে বলল, ‘আপনাকে তো স্যার থাকতে বলেছেন।’ উত্তরে জানালাম, ‘জামাকাপড় আনতে যাচ্ছি, এখনই ফিরে আসব।’ বেরিয়েই দ্রুত রিকশা নিলাম।

কোথায় গেলেন?

রিকশায় বসে যা থাকে কপালে, বেঁচে থাকতে হবে; তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, আগের কর্মস্থল ক্রিসেন্ট জুটমিলেই যাব। মিলের সামনে এসে রিকশাভাড়া দিয়ে অফিস গেটে ঢুকেই দেখি, আমার আগের কর্মস্থল পিপলস জুটমিলের প্রধান হিসাবরক্ষক ফিদাই সাহেব, ক্রিসেন্টের কর্মকর্তা ছোটি মোহাম্মদ ভাই এবং এক পাঞ্জাবি ভদ্রলোক মিলে আলাপ করছেন। ফিদাই সাহেবকে নম্রভাবে বললাম, ‘স্যার, পালাতে পালাতে শেষ পর্যন্ত উপায় না পেয়ে আপনার কাছে এসেছি, আমাকে জয়েন করতে দেওয়া যাবে?’ পিপলসে চাকরি করার সময় এই প্রবীণ ভদ্রলোক আমাকে খুব স্নেহ করতেন, যখন যে সাহায্যের জন্য যেতাম, না করতেন না, করে দিতেন। তাঁর কথার পর ছোটি সাহেব বললেন, ‘আজ থেকে জয়েন করতে পারবে? আমার কাজ বাদেও তোমাকে ফ্রন্ট ডেস্কে কাজ করতে হবে।’ এরপর থাকার জায়গা খুঁজতে বেরোলাম। রিকশা নিয়ে দৌলতপুরের পুরো পাবলা গ্রাম ঘুরলাম। যেখানেই যাই, বিহারিতে ভর্তি।

কোথায় থাকার জায়গা হলো?

আমাদের খালিশপুরের বাড়িতে এসে প্রায়ই গান শোনাত সিদ্দিক ও ফরিদ। ওদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। খুলনা বেতারের শিল্পী সিদ্দিক তাদের বাসায় থাকতে বলল। গেলাম। তাদের বাড়িটি বিরাট, পরিবারের সদস্যরাও খুব ভালো। বিয়ার ভাই মাঝেমধ্যে এসে দেখা করে যান। অনেক দিন বাদে যোগাযোগের পর তাঁর ওপর আবার নির্ভরশীল হয়ে গেলাম। ভালোই আছি। একদিন তিনি বললেন, স্থানীয় রাজাকার মতিউল্লাহ আর্মিদের কাছে তালিকা জমা দিয়েছে। সেখানে প্রথমেই তাঁর নামটি আছে। ফলে কোনোভাবেই তাঁর পক্ষে মিলে থাকা সম্ভব নয়। আরেক দিন বললেন, সরকারি মিল কর্তৃপক্ষ তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। তিনি জেজেআইতে (যশোর জুটমিল ইন্ডাস্ট্রিজ) যোগ দেবেন। আমাকে তাঁর জন্য কিছু কাপড়চোপড় ঠিক করে রাখতে বললেন। যেদিন যাবেন, সেদিন তিনি তাঁর কুকুর ম্যাগির গলায় বেল্ট পরিয়ে গাড়ির জন্য অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন। মনে মনে আমি বলছি, বিয়ার ভাই, তোমার কুকুরের সঙ্গে আমার গলায়ও বেল্ট পরিয়ে নিয়ে চলো।’ মুখে বললাম, ‘গাড়ি আসতে যতক্ষণ দেরি হবে, ততক্ষণ না হয় আমার পাশে বসো।’ কিন্তু তিনি তাঁর ব্যাটম্যান (বাবুর্চি) আসছে না, কুকুরের কী হবে—এই চিন্তায় অস্থির। এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীর শক্ত হয়ে গেল। এই ভয়ংকর সময়ে, আমাকে বারবার ধর্ষণ, নির্যাতন করছে—এসব তোমাকে এতটুকু বিচলিত করল না? আমার তিন সন্তানের এখনো কোনো খবর এলো না। আমার মনের অবস্থা এতটুকুও ভাবলে না? কিন্তু তাঁকে কোনো কিছুই বুঝতে দিলাম না। গাড়ি এলো, তিনি যাওয়ার সময় শুধু বললেন, ‘তুমি কোথায় থাকবে?’ বললাম, ‘থাকব কোথাও, আমার জন্য ভেবো না।’ বললেন, ‘যদি মিল অঞ্চলে থাকো, তাহলে তো দেখা হবে।’

অফিসে এই ঘটনা কেন ঘটল?

প্রথম দিন গিয়েই তো কয়েকজনের ধর্ষণের শিকার হলাম। আমি একা পড়ে আছি পাবলা গ্রামে। একদিন সেই বাড়িতে ফেরার পর জরুরি টেলিফোন এলো। টেলিফোনে কথা বলতে পাশের বাড়ির শিল্পপতি আফিল উদ্দিন সাহেবের বাসায় যাওয়ার পথে গ্রামের মোড়ে এক মোটরসাইকেল আরোহীকে কয়েকজন লোক বেয়নেট চার্জ করে মেরে ফেলল। পরে জানলাম, তিনিই ভূঁইয়া চাচা, দৌলতপুর কলেজের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক। বিয়ে করে নববধূকে নিয়ে প্রথম দিন আমাদের বাড়িতেই উঠেছিলেন। এতটাই ভালো সম্পর্ক ছিল আমাদের সঙ্গে! এই ঘটনা দেখে ভয় পেয়ে গেলাম।

আর্মির কাছে কেন গেলেন?

কর্তৃপক্ষ থেকে একদিন কড়া নির্দেশ এলো। ফলে পাবলা গ্রাম ছেড়ে ভৈরব নদের তীরে মিলের বরাদ্দ করা কোয়ার্টারের তিনতলার খুব ভালো ফ্ল্যাটে উঠে যেতে হলো। মিলের জেনারেল ম্যানেজার ফিদাই সাহেব আরেক দিন ডেকে বললেন, নৌবাহিনীর কমান্ডার গুলজারিন আমাকে ডেকেছেন। তিনি গাড়ি পাঠাবেন। আমি যেন গিয়ে দেখা করি। তিনি আরো বললেন, আমার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আছে। যা বলার আমি যেন তাঁকে গিয়ে বলি। কমান্ডার গুলজারিন নৌবাহিনীর পোশাক পরা ড্রাইভার, বিরাট গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে গেলেন। নৌবাহিনীর এক বাংলোর সামনে আমাকে নামিয়ে দেওয়া হলো। খুব সুদর্শন, পিতৃতুল্য এই গুলজারিন। কিন্তু আলাপের পর বললেন, এই রুজভেল্ট জেটিতে বেশির ভাগ সময় নারীদেরই ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তাদের অনেকেই অপরাধী প্রমাণিত হয়। এই অপরাধী নারীরা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পরিপন্থী। ফলে ভৈবর নদেই তাদের পরিণতি হয়। তবে আমার ভয়ের কিছু নেই। তিনি তো আমাকে অতিথি হিসেবে দাওয়াত করে এনেছেন। আমার পরিণতি ভৈরব নদে না-ও হতে পারে। আমাকে কিছু প্রশ্ন করবেন, উত্তর সন্তোষজনক হলে এক মাস পর ছেড়ে দিতে পারেন। মিল কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁরা আমাকে হত্যার আসামি হিসেবে সন্দেহ করে অভিযোগ করেছেন। এক মাস ধরে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেবেন বলে জানালেন।

তাঁর অভিযোগ?

তিনি আমাকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ভূঁইয়াকে হত্যায় যুক্ত থাকার অভিযোগ করলেন। তিনি আরো বললেন, না হলে সন্ধ্যা ৭টার পর কেন গ্রামে কোনো মহিলা দাঁড়িয়ে থাকবে? সে জন্যই তিনি আমাকে সন্দেহ করেছেন। এসব বলে হঠাৎ তিনি আমাকে বেডরুমে নিয়ে গিয়ে বিছানায় ফেলে দিলেন। আজও সেই লেলিহান জিহ্বার গনগনে আগুন, সেই সাপের বিষ আমার সারা মুখে লেগে আছে। যখনই চোখ বন্ধ করি, একাত্তর ভেসে ওঠে বলে সেসব কথা, স্মৃতিগুলোও ঠিক তেমনই দুঃসহ। সেদিন আত্মরক্ষার চেষ্টা করিনি। কারণ জানি সম্ভব ছিল না। যুদ্ধের করাল গ্রাসে আমি ছিন্নভিন্ন হয়েছি। যত্রতত্র, যখন-তখন, আমার মান, মর্যাদা, সম্ভ্রম লুট হয়েছে। আমি একা, ভীষণ একা। কখনো মৃত্যুচিন্তা এসে ভর করেছে। কিন্তু মুহূর্তেই বেঁচে থাকার নির্লজ্জ বাসনা জেগেছে। শক্তি, সাহস—কিছুই আমার তখন নেই। সরাসরি যেন দানবের মুখোমুখি হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে কথা বলছি। জীবনের এই দর-কষাকষি কতক্ষণ? তিনি আমাকে বললেন, ‘ইউ হ্যাভ আ কাইন্ড ফেস, কাইন্ড লুক। যে কারণে তোমাকে আজকে ছেড়ে দিচ্ছি, কিন্তু মুচলেকা লেখো—কমান্ডার গুলজারিন ডাকলে প্রয়োজনে বহুবার আসতে হবে। আমরা তোমাকে ওয়াচে রাখব এবং এও জানি, তোমার সঙ্গে মোটা গ্যাঙ ধরা পড়বে। তোমার জন্য ডিনার তৈরি হয়েছে, আমার সঙ্গে খেতে হবে। আমাদের পশ্চিমি তরিকায় কানুন আছে—মেহমান কখনো না খেয়ে যেতে পারবে না। মেহমান অভুক্ত হয়ে ফিরে গেলে গৃহকর্তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষণ হবে।’ ফেরার পথে তিনি বললেন, রাতে ফিদাইয়ের বাড়িতে তাঁর ডিনার আছে। এর পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই আমি ধর্ষণের শিকার হই। রাতে ঘুমের ঘোরে উঠে বসে থাকি। বিছানায় গেলে ঘুম হয় না। অথচ আমার শোবার ঘরের জানালা দিয়েই ভৈরব দেখা যায়। প্রায় প্রতি রাতেই শুনতে পাই, নদীর পার থেকে কেমন যেন করুণ সুর ভেসে আছে। ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, ‘বাঁচাও, বাঁচাও’।

তারা কারা?

আমারও মনে হয়, এ কার করুণ আকুতি? একদিন জেগে বসে আছি। হঠাৎ শুনি, ‘বাঁচাও. বাঁচাও।’ নদীর পারে দু-একটি বড় নৌকা আছে। সেগুলোর বাতি টিমটিম করে জ্বলছে। দুটো বিশাল লরি দাঁড়ানো। কয়েকজন মানুষের মুখে কালো কাপড় বাঁধা। তারা ট্রাক থেকে মুখ বাঁধা লোকগুলোকে নামিয়ে পাট কাটার মেশিনে তাদের মাথা ঢুকিয়ে দ্বিখণ্ডিত করছে। আর মাথা ও মৃতদেহগুলো নদীতে ফেলে দিচ্ছে। এমন দু-একটি হত্যাকাণ্ড দেখে এত ভয় পেয়ে গেলাম যে মনে হলো, আমাকেও বোধ হয় ওরা দেখছে। প্রাণহীন, সুখহীন এসব রাত-দিন কেটে যায়। মাঝে মাঝে যশোরে মায়ের খবর পাই। অফিসেরই ‘সুন্দর’ নামের একটি ছেলে সপ্তাহ শেষে যশোর যায়, তার কাছে যতটুকু পারি মাকে টাকা পাঠাই। আমার ছোট ভাই-বোনরা তো তাঁর সঙ্গে আছে।

সার্কিট হাউসের গুহায় কেন পাঠানো হলো?

হঠাৎ একদিন সার্কিট হাউস থেকে ফোন এলো। গল্লামারি রেডিও সেন্টারের গেটে সেই যে আমাকে সসম্মানে, দুর্দিনে, আদরে আশ্রয় দিয়েছিল ফরিদ আর সিদ্দিক; সেই ফরিদ গানের অডিশন দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছে। তাকে তল্লাশি করে আপত্তিকর কাগজ পাওয়া গেছে। সে তখন নাকি আমার নাম বলেছে। তাই মেজর বানুরি আমাকে তলব করেছেন। ফিদাই সাহেব তখনই গাড়ির ব্যবস্থা করে আমাকে সেখানে পাঠিয়ে দিলেন। পুরো একাত্তরে তাঁরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেছেন। আমারও মনে হলো, আর কোনো ভয় নেই। ধর্ষণ, নির্যাতন—ভাগ্যে যা-ই ঘটে, গা-সওয়া হয়ে গেছে। সার্কিট হাউসে যাওয়ার পর বানুরি বললেন, ‘আমরা তো তাকে যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাঠিয়ে দিয়েছি, সেখানে খোঁজ নেবেন। আর আপনার রিপোর্টও তো ভালো নয়।’ ফিরে এলাম। কিন্তু ফরিদকে তো বাঁচাতে হবে। ফলে খুব কাছের আত্মীয় অসুস্থ বলতে হলো। এরপর আমাকে নজরদারিতে ফিদাই সাহেব গাড়ির ব্যবস্থা করলেন। পরে সেই গাড়ির ড্রাইভার রশিদও আমার সঙ্গে বীভৎস আচরণ করেছে। পরে বুঝেছি, সেটিও অফিসের ষড়যন্ত্র ছিল। আর ফরিদের বাড়িতে গিয়ে ওর গ্রেপ্তারের কথা বলার পর তার ভাই ও বোন আমার হাত ধরে বললেন, ‘ভাবি, যেভাবেই হোক, আপনি ফরিদকে বাঁচান।’ ফলে এক দিনের ছুটিতে লুকিয়ে যশোর যেতে হলো। কেন এসেছি মাকেও বললাম না। খুব গোপনে সার্কিট হাউসে মেজর ইকরামের সঙ্গে যোগাযোগের পর তিনি সময় দিলেন। তাঁর ব্যবহারে অন্য পাকিস্তানি অফিসারদের মতো অমানুষের ছাপটি কম। পরের সপ্তাহে তিনি আসতে বললেন।

খুলনায়ও কি নির্যাতন চলছিল?

প্রতিদিন দুপুরে মেজর গুলজারিন গাড়ি পাঠান। আমাকে যেতে হয়। অনেক অসহায় বাঙালি প্রতিনিয়ত আমাকে পাকিস্তানি বাহিনীর অফিসারদের গাড়ি থেকে ওঠানামা করতে দেখে, কিন্তু কী কারণে, কোন পরিস্থিতিতে আমার এই দুঃসহ জীবন তা কেউ জানতে পারে না। মনে মনে তারা আমার ওপর রাগ করতে থাকে। তবে নির্যাতন, কষ্টভোগের এই জীবনে খুব গোপনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে এম আর আখতার মুকুলের ‘চরমপত্র’ শুনি, স্বাধীন বাংলা বেতারের গান শুনি। সেগুলোই আমার সামান্য শান্তি। সেপ্টেম্বরের শেষে গর্ভে শত্রুর বিষাক্ত ভ্রূণ বাসা বাঁধল। একা একা হাউমাউ করে কেঁদে বেড়াই, মনে মনে বলি, আমার আত্মহননের সময় বোধ হয় এসে পড়েছে। বহু কষ্টে পরে অনেক ঘুরে খুলনার ফেরিঘাট রোডের নামকরা গাইনি ডাক্তার কাদের সাহেবের কাছে অনেক টাকা দিয়ে শাপমুক্ত ও পাপমুক্ত হলাম। আমাকে তিনি মায়ের মমত্ব দিয়ে ‘এমআর’ করালেন।

ফরিদকে কিভাবে মুক্ত করলেন?

এই বন্দিজীবনে নানাভাবে ম্যানেজ করে, অফিস থেকে ছুটি নিয়ে মার্শাল লর হেডকোয়ার্টার্স যশোর ক্যান্টনমেন্টে গেলাম। মহা ব্যস্ত মেজর একরামের সঙ্গে দেখা করে বললাম, ‘আগামীকাল তো মিল থেকে বেরোনোর অনুমতি পাব না। আসামি ফরিদ কি বেঁচে আছে? এটুুকুই জানতে এসেছি। এই নিরপরাধ ছেলেটির মুক্তি হবে কি না জানতে চাই। আপনি কি আমাকে সাহায্য করতে পারবেন?’ হাসিমুখে তিনি বললেন, ‘আল্লাহই সব সমস্যার সমাধান করে দেন। তোমাকে একটি ম্যাজিক দেখাব’—এই বলে তিনি বিধ্বস্ত চেহারার ফরিদকে ফিরিয়ে দিলেন। তাকে ওপরে পা ঝুলিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল আরেক আর্মি অফিসার। আমার অনুরোধের কথা মনে পড়ায় তিনি তাকে বাঁচিয়েছেন।

তখন আপনার পরিবারের কী অবস্থা?

মেজো ভাই শিবলী যশোরে মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছে। মাঝে মাঝে দেখা হয়। খুব গোপনে জিজ্ঞেস করে, ‘আপা, আমাদের শেলিংয়ের আওয়াজ শোনা যায়?’ কোনো দিন হয়তো বলে, ‘আমাদের অপারেশন আছে, পরশু গোলাগুলি হলে বুঝবি।’ যশোর টেলিফোন এক্সচেঞ্জের সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারটির যারা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের দলে আাামার ভাইও ছিল। তবে মিল এলাকার নিরাপত্তা, আর্মির কড়া নজরদারির কারণে আমাকে তারা মুক্ত করতে পারছিল না।

ফিদাই কি আর সমস্যা করেছেন?

একদিন গাড়িতে আমাকে নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন। এক বিরাট বাড়িতে আমরা পৌঁছলাম। সেখানে ক্যাপ্টেন ইমতেয়াক, ক্যাপ্টেন সাবের, পাকিস্তান অবজারভারের সিনিয়র এডিটর ওয়রিসিসহ (ওয়ার্সি) তাঁদের আরো এক বন্ধু ছিলেন। এটি রাজা হোসেনের বাড়ি। তাঁরা আমার ওপর পাশবিক নির্যাতন করলেন। আমার কান্না দেখে ওয়ার্সি কিছু বলেননি। শুধু আরেক দিন আসতে বলে ছেড়ে দিলেন। তবে অক্টোবরে এই অত্যাচারের মাত্রা কমে এলো। একদিন স্টেশন ওয়াগন, সবুজ জিপ, দুধসাদা টয়োটা করোলায় পাকিস্তানি অফিসারে ভর্তি গাড়ি এলো। তারা বলল, আমাকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে। প্রায় সবাই মদ্যপ। জানাল, তাদের হাতে ফিদাইয়ের চিঠি আছে। ওরা আমাকে চুল ধরে টেনে তিনতলা থেকে নামাল। একজনকে চিনতে পেরেছিলাম, বেঙ্গল ট্রেডার্সের মালিক, খুলনারই ইউসুফ। আমাকে তারা যশোর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেল। অফিসার্স ক্লাবের ছোট্ট এক রুমে বসাল। সারা রাত নির্যাতন করল। ফেরার পথে পাটের গুদামের পাশে গাড়ি রেখে একের পর এক এসে নির্যাতন করল। তখন হয়তো আমার জ্ঞান ছিল না। এরপর বন্দিশিবিরে পাঠিয়ে দিল। জোয়ানরাও পাশবিক নির্যাতন করেছে। এক দয়ালু মেজরের জন্য ২৮ ঘণ্টা পর ছাড়া পেলাম। ফিরে এলাম ক্রিসেন্টে। অফিসের ভেতরে তাদের একটি গোপন কন্ট্রোল রুম ছিল। সেখান  থেকে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা মানুষ মারার সাংকেতিক পরিকল্পনাগুলো করত। সাংকেতিক অর্থগুলো ফোন রিসিভ করার সময় অনেক সময় আমিও বুঝতে পারতাম না।

খুলনা শিপইয়ার্ডে কেন পাঠানো হলো?

মেজর বেলায়েত শাহ (কিলার বেলায়েত শাহ) মিলে এলেন। অফিসের কর্তা খাজা মোহাম্মদ আলীর নির্দেশে তাঁর সঙ্গে যেতে হলো। আমাকে তিনি খুলনা শিপইয়ার্ডে নিয়ে গেলেন। নানা বিষয়ে রাজনৈতিক আলাপ করলেন। শারীরিক সম্পর্ক করতে চাইলেও খুব অন্যমনস্ক ছিলেন। বারবার টেলিফোনের কাছে ছুটে যাচ্ছিলেন। সেদিন ছিল ২ ডিসেম্বর। রাতে জুটমিলে ফিরে আসতে পারলাম।

দুঃসহ জীবন থেকে বাঁচলেন কিভাবে?

৬ ডিসেম্বর বিয়ার ভাই সংবাদ পাঠালেন, যেন তাঁর মিলে যাই। কিছুক্ষণের মধ্যে একজন উর্দুভাষী টেলিফোন করে বললেন, ‘তোমাকে হত্যার জন্য একটি দল ছুটে আসছে, এখনই বেরিয়ে পড়ো।’ পাঁচ মিনিট ব্যবধানে যশোরের বাসে উঠতে পারায় বেঁচে গেলাম। বিয়ার ভাইয়ের কোয়ার্টারে যাওয়ার পর তিনি জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তুমি আর কোথাও যাবে না। আমরা বিয়ে করব। আমার অনেক ভুল হয়েছে। আমি অনুতপ্ত।’ আমার চোখে জল, অভিমানের সংলাপ কিছুই নেই। শুধু বললাম, ‘এসব কথা থাক।’ মিলের জেনারেল ম্যানেজার ইদ্রিস আলী সাহেব ফোন করে বিয়ার ভাইকে বললেন, “আহসান, আমাকে যশোর থেকে ব্রিগেডিয়ার হায়াৎ টেলিফোন করে বলেছেন, ‘যত বাঙালি অফিসার আছে, সবাইকে রেখে অবাঙালিদের নিয়ে তুমি মিল খালি করে দাও’।” এরপর আমরা সবাই বেরিয়ে গেলাম। কয়েকটি পরিবার খুলনা শহরের করিমাবাদ কলোনির স্কুলের ঘরে রাত কাটাতে হলো। পরদিন জেজেআই কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত দিল, খুলনার সবচেয়ে বড়, ঐতিহ্যবাহী হোটেল ‘সেলিম’-এ মুক্তিযুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের অফিসাররা থাকবেন।

নতুন করে কিভাবে জীবন সাজালেন?

১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে আমরা বিয়ে করলাম। তিন ছেলেসহ নতুন করে আমার জীবন শুরু হলো। আমাকে বিয়ে করায় বিয়ারের সঙ্গে তাঁর পরিবার কখনো ভালো ব্যবহার করেনি। কিন্তু আমার সেই দুঃসহ জীবনের স্মৃতি ভোলাতে তাঁর চেষ্টার কমতি ছিল না। তিনি সর্বক্ষণই বাড়ি মুখর রাখতেন, রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে শুনতে বহুদূর পর্যন্ত আমরা গাড়িতে ঘুরতাম। প্রায় প্রতি বৃহস্পতিবার তাঁর বিশেষ অনুরোধে সাতক্ষীরার শ্যামনগর হয়ে সুন্দরবনের গহিনে ঢুকে পড়তাম। আস্তে আস্তে মানসিক যন্ত্রণা ভুলে যেতে লাগলাম।

শিল্পকর্মের প্রতি ঝোঁক কিভাবে হলো?

১৯৭৪ সালে তিনি বদলি হতে হতে যশোর এলেন। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি ফুলতলা গ্রামে। সেই গ্রামের কাছে দক্ষিণডিহি নামে আরেকটি গ্রাম আছে। মহাকাল রেলগেটে চেঙ্গুটিয়া গ্রামে ছোট্ট এক টেক্সটাইল মিলে তিনি চাকরি করেন। সেখানে থাকতে গ্রাম ও আশপাশের প্রকৃতি আমাকে খুব উজ্জীবিত করল। তখন থেকেই নিসর্গ সৃজনে ঝুঁকে পড়লাম। খাবার টেবিল, বসার চেয়ার, আলমারি, রান্নাঘরের আসবাব—সবই আমার নিজের নকশায়, সহজ পদ্ধতিতে তৈরি করা শুরু করলাম। আমার এই প্রয়োজনীয় আসবাব দেখে বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘এ যেন শকুন্তলার তপোবন।’

আর একাত্তরের এই ইতিহাস কিভাবে লেখা হলো?

সাত মাসের ক্রিসেন্ট জুটমিলের চাকরিজীবন এবং আমার সেই অন্ধকার ধূসর অতীত প্রায় প্রতিদিনই ছোট্ট একটি ডায়েরিতে লিখে রেখেছি। সেই স্মৃতিকথা নিয়ে আমার একটি বই আছে—‘নিন্দিত নন্দন’। প্রকাশ করেছে শব্দশৈলী, দাম ৪৫০ টাকা। প্রচ্ছদ এঁকেছে আমার ছেলে ‘তূর্য’।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আপনার ভূমিকা?

সাক্ষ্য না দিলেও বীরাঙ্গনা নারীদের তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপনে আমি উৎসাহ দিয়েছিলাম। ১৯৯৩ সাল থেকে আমি একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটিতে সরাসরি যুক্ত আছি।

এ ক্ষেত্রে শাহরিয়ার কবিরের ভূমিকা?

তিনি সম্পর্কে আমার মামা। তিনি একদিন প্রয়াত তারেক মাসুদকে বললেন, তাঁর বইয়ের জন্য একাত্তরের একজন বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকার প্রয়োজন। আমি যে তাঁদের একজন, তিনি তখনো জানতেন না। তারেক মাসুদ বললেন, ‘প্রিয়ভাষিণীর সঙ্গে কথা বলুন।’ প্রথমে তিনি দুজন তরুণকে পাঠালেন। পরে আমি তাঁকে বললাম, এরা এত ছোট যে এদের কাছে বিষয়টি বলতে চাই না, আপনি এলে ভালো হতো। ১৯৯৯ সালের ১০ নভেম্বর লেখক-সাংবাদিক, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শাহরিয়ার কবির এলেন। অকপটে তাঁর কাছে একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতি ব্যক্ত করলাম। সেদিন অনেকটা ভারভুক্ত হয়েছি। তাঁর কাছে আমি অনেক ঋণী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আমাকে মানসিক সহায়তা ও সাহস দিয়ে চলেছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হামিদা হোসেন, সুলতানা কামাল, লেখক শাহীন আকতারের কাছেও আমি বিশেষভাবে ঋণী। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের উদ্যোগে ২০০০ সালে প্রথম জাপানে ‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন’ শীর্ষক সেমিনারে যোগদান করেছিলাম। সেখানে সারা পৃথিবী থেকে অনেক খ্যাতনামা নারী এসেছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনেছি এবং আমার অভিজ্ঞতা বলতে পেরেছি। আমার কথা জানার পর সবার যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পেয়েছি, তা-ই আমার জীবনের পাথেয়। আমি বীরাঙ্গনা বলে গর্বিত।

[২৮ নভেম্বর ২০১৫, পিংক সিটি, খিলক্ষেত, ঢাকা]



মন্তব্য