kalerkantho


গায়িকা হতে চেয়েছিলাম

রাবেয়া খাতুনের ফেলে আসা জীবনের দিকে তাকালে চমকে যেতে হয়। সেই আমলে নানা সামাজিক বাধা পেরিয়ে তিনি লেখক হয়ে উঠেছেন। সত্যি সেই কাহিনিই তাঁর লেখায় এসেছে। সেসবই জানলেন ওমর শাহেদ। ছবি তুললেন কাকলী প্রধান

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



গায়িকা হতে চেয়েছিলাম

আপনার জীবনের গল্প কোথা থেকে শুরু করলেন?

আমার গড়ে ওঠার পেছনে আছেন এক ভদ্রলোক, আমার দাদা। দ্বিতীয় শ্রেণিতে যখন পড়ি, তিনি মারা যান। তাঁর স্মৃতি খুব মনে নেই। বড় হয়ে তাঁর সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহ করেছি, তাঁকে নিয়ে আমার উপন্যাস আছে—‘মোহর আলী’। বাবা (মৌলভি মুল্লুক চাঁদ) সরকারি চাকরি করতেন, বছরে একবার ছুটি হতো। পূজার ছুটির সেই একটি মাস আমরা গ্রামের বাড়ি বিক্রমপুরের ষোল ঘর গ্রামে গিয়ে থাকতাম। গ্রামটিতে হিন্দু বেশি। তখন দাদাকে দেখেছি, লম্বা, দাড়িওয়ালা, শ্যামলা বর্ণ। হিন্দু ছেলেদের সঙ্গে খেলে তিনি বড় হয়েছেন। ‘পুণ্ডুলির মা’ নামের এক হিন্দু বিধবা নিজের ঘরে ছেলেদের পড়াতেন। মেয়েদের পড়া বারণ ছিল। দাদা, তাঁর বাবা, তাঁরা তো পড়ালেখাই জানতেন না, তাঁদের তিনি বলতেন, ‘আমি সেই স্কুলে যাব।’ তাঁরা কিন্তু উৎসাহ দেননি। বলেছেন, ‘বাংলা তো হিন্দুরা পড়ে, মুসলমানরা আরবি, ফারসি পড়ে।’ কেন যেন তাঁর বাংলার প্রতি রোখ ছিল। প্রথম দিকে তিনি হিন্দু বন্ধুদের কাছে বাংলা শিখেছেন। বন্ধুরাই তাঁর শিক্ষক। যখন বেশ পড়তে পারতেন, নিজেই বই পড়তেন। আমাদের পূর্বপুরুষরা কিন্তু ধনী ছিলেন না,  মধ্যবিত্ত ছিলেন। তবে তাঁদের প্রচুর জমিজমা ছিল। দাদার বাবা আলসে মানুষ, সারা বছর জমি বন্ধক দিয়ে সেই টাকায় খেতেন। দাদা যখন বাংলা শিখে বড় হলেন, তখন কিন্তু ইংরেজি স্কুল শুরু হয়ে গেছে। তাঁদের মাস্টার ছিলেন খাস ব্রিটিশ! এ আমার খুব অবাক লাগে যে ডোবা, কাদার মধ্যে তিনি থাকছেন, কী করে সম্ভব? ব্রিটিশরা খারাপ অনেক কিছু করেছে, তাদের ভালো দিকও আছে। নয়তো লন্ডনের লোক গণ্ডগ্রামে থাকবে কেন? সেই স্কুলে যাওয়ার নাম তো আমার দাদা করতেই পারতেন না, স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না। তিনি সেই স্কুলে যেতে পারেননি। কিন্তু দাদার মনে বোধ হয় প্রশ্ন এসেছিল, বসে বসে খাব? বাপ-চাচার তো কোনো রোজগার নেই, ক্ষেত বন্ধক দিয়ে সেই আয় খেতেন। বাপ-বেটার এই নিয়ে মিলত না। দাদা বলতেন, বসে বসে খাব কেন? যা পারি রোজগার করব। আমাদের ওদিকে তখন কবিরাজি পেশাটির খুব নাম ছিল। দাদা বন্ধুদের কাছ থেকে বই নিয়ে কবিরাজি পড়তেন। তখন চিকিৎসা পেশার অবস্থা এমন ছিল যে ছেলে অসুস্থ হলো—ডাকো কবিরাজ। কবিরাজরাও ‘ধন্বন্তরী’ ছিলেন। ছেলে বেঁচে যেত। কিন্তু একটি মেয়ে যদি অসুস্থ হতো, তার কোনো চিকিৎসা নেই। অসুখ হলো, মরে গেল—এই হলো মেয়েদের জীবন! আমরা বড় হওয়ার পরে তো দাদাকে আর দেখা হয়নি, কাকাদের কাছে শুনে শুনে আমার মনে হয়েছে, বোধ হয় তাঁর কোনো নিকটজন ওই অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন। ফলে তিনি বললেন, ‘আমি চিকিৎসা করব।’ যেহেতু মুসলমান কবিরাজ, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন মহিলা রোগী হলে তাঁকে দেখতে দিতেন। তাঁরা খাটে শোয়া থাকতেন, দাদা ওপার থেকে দেখতেন। তিনিই আমাদের ওখানে প্রথম চিকিৎসাব্যবস্থা চালু করেন। তাঁর নাম ‘মকিম কবিরাজ’। পুরো নাম মকিম মোহাম্মদ বা এমন কিছু হবে। তাঁর পেশা ছিল কবিরাজি। এভাবে দাদার কবিরাজি-জীবন শুরু হলো।

 

এই দাদা আপনার ওপর প্রভাব ফেলেছেন কেন?

এগুলো শুনতাম, শুনে খুব অবাক লাগত, এই লোক এ রকম হয় কী করে? আমার স্মৃতি যা বলে—লোকে তখন খালি পায়ে ঘুরত, দাদা তখন স্যান্ডেল পরতেন। দাদা তখন বিদ্যাসাগর চটি পরতেন, ধুতি পরতেন। তখন বাঙালিদের বাইরের পোশাক ছিল ধুতি, মুসলমানরাও পরতেন। বাবাও ধুতি পরে অফিসে যেতেন। বাবা-জ্যাঠাদের তিনি ছোটবেলায়ই বললেন, ‘তোরা বাংলা শিখবি, আমি তোদের স্কুলে ভর্তি করব।’ বাবা-জ্যাঠা কেউ খুশি নন, যা হয় বাচ্চাদের। তাও দাদা দুই ছেলেকে নিয়ে হেড মাস্টারের সঙ্গে দেখা করে তাদের সেই ব্রিটিশের হাই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়ে এলেন। স্কুলটি এখনো আছে। তারা স্কুলে যেত, গ্রামের লোক সব ছি ছি করত। বলত, ওরা শুয়োরখেকোদের স্কুলে যায়। দাদা কারো কথা শোনেননি। পরে তাঁকে একঘরে করে দেওয়ার ভয়ও দেখানো হয়েছে। তিনি তাদের বলতেন, ‘তোমাদের যা খুশি করো, আমি তো পড়তে পারিনি, ছেলেদের আমি পড়াব।’ এই দুই ছেলে যখন ম্যাট্রিক পাস করল, পুরো তল্লাটের লেখাপড়া জানা মানুষরা তাঁদের দেখতে এলেন। বাবা সরকারি অফিসার ছিলেন, জ্যাঠা পুলিশ ইন্সপেক্টর। আমার কাকা সেই সময় ডাক্তারি পড়তেন! দাদা শুধু নিজের পরিবারই নয়, পুরো অঞ্চলটিকেই বদলে দিয়েছিলেন। এসব শুনে আমাকে ভেতর থেকে ধাক্কা দিল—এ তো খুব ভালো একটি চরিত্র। তাঁকে নিয়ে কেন লিখব না? তখন চাচাদের কাছে, বড় ভাইদের কাছে জিজ্ঞেস করে নোট নেওয়া শুরু করলাম। 

 

আপনার জীবন কোথায় শুরু হয়েছে?

আমার জীবন পুরান ঢাকায় শুরু হয়েছে। রায় সাহেব বাজারে থাকতাম। ৮-১০ টাকা হলে দুই রুমের বাসা ভাড়া পাওয়া যেত। ১২ টাকায় ভালো ঘরের পুরো বাড়ি। বাবা মৌলভি মোহাম্মদ মুল্লুক চাঁদ সরকারি চাকরি করতেন। পুরো বাড়ি ভাড়া নিয়েই থাকতেন। ছোটবেলায় এমন বাড়িতেই বেড়ে উঠেছি। তখন ঢাকায় সবে কল এসেছে। গলির মোড়ের কলে পুরুষরা গোসল করেন, একেবারের ভেতরের কলে মহিলারা। সকাল-বিকাল দুই বেলা পানি আসে। ১২ টাকার ভাড়া বাড়িতে নিজস্ব কল থাকে। বহু মহিলা আমাদের কলে গোসল করতেন। টানা ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত পুরান ঢাকায় থেকেছি। পুরান শহর আমার মুখস্থ। আমার প্রথম দিকের বইগুলোর পাঠকরা ঢাকার সেই অবস্থা, পারিপার্শ্বিক সবই পেয়েছেন। সব বই যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, আমার লেখায় ঢাকা ধীরে বাড়ছে, মানুষগুলোও সভ্য হচ্ছে—সবই ধরা আছে। পুরান ঢাকার কথা বলতে পারেন দুজন—শামসুর রাহমান আর আমি। তিনিও পুরান শহরের মানুষ। দেশভাগের আগে ঢাকার সীমা ছিল বুড়িগঙ্গা থেকে ব্যাকল্যান্ড বাঁধ হয়ে ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন।

 

স্কুল?

খেলছি, হঠাৎ এক ভাই ধরে নিয়ে মালিটোলা স্কুলে দিয়ে এলেন। স্কুল কোনো দিনও আমার ভালো লাগেনি। কোনো দিন অবশ্য ফেল করিনি, সব সময় কানায় কানায় পাস করে গিয়েছি। অঙ্কে একেবারে কাঁচা ছিলাম, এখনো এটি আমার দুই চোখের বিষ। হিসাব-নিকাশ অবশ্য ঠিক পারি। মা (হামিদা খাতুন) পড়তে পারতেন, চিঠিও লিখতেন। লেখাপড়ার প্রতি তাঁর খুব অনুরাগ ছিল। তিনি চাইতেন, যা-ই করি, স্কুলে যেতেই হবে। অল্প জ্বর হলেও মাকে বলে স্কুল কামাই দিতে পারতাম না। ক্লাসের পড়া একেবারেই ভালো না লাগলেও ছোটবেলা থেকেই গল্প ভালো লাগত। তবে বই নয়, গল্প শুনে বেড়ে উঠেছি। দাদা, বাবার কাছে রূপকথা শুনেছি। বড় বোন নূরজাহান খাতুন আমার ১২ বছরের বড়। তাঁর বিয়ে হলো ১২ বছর বয়সে। সে বছর আমার জন্ম (হাসি)। তিনি বাংলা ভালো জানতেন, গল্পের বই পড়তে পারতেন, হাতের লেখাও খুব সুন্দর ছিল। তাঁর গল্প বলার স্টাইলও দারুণ ছিল। চোখ, হাত-পা নেড়ে, অভিনয় করে গল্প বলতেন। সে জন্য তিনি আমাদের সবার খুব প্রিয় ছিলেন। তখন আমাদের ভাই ছিল না। তিন বোন আমরা। জ্যাঠাতো ভাই ‘মজিদ ভাই’ শুধু ভালো নন, ‘কৃতী’ ছাত্র ছিলেন। তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলে থেকে তিনি এমএ পড়ছেন। খুব গল্পের বই পড়তেন, লিখতেনও। প্রতি শনিবার বাসায় এসে রবিবার দিনটি থেকে সোমবার সকালে হলে ফিরতেন। তিনিই আমার নতুন গল্পের উৎস। তখনকার দিনে রাত ৮টার মধ্যে মধ্যবিত্ত গেরস্তের খাওয়া হয়ে যেত। মা-খালা-ফুফু-চাচি-জেঠিরা খেয়েই আমাদের বলতেন, তোমরা সব বিছানায় যাও, এই ঘরে আসবে না। মজিদ ভাই চেয়ারে বসতেন, মহিলার দল (হাসি) তাঁর কাছে গল্প শুনতে বসত। বাচ্চাদের সেখানে ‘যাওয়া নিষেধ’। থ্রি-ফোরের আমি অবাঞ্ছিত অতিথির মতো ঘরের চৌকাঠে গল্প শুনতে বসে থাকতাম। তাঁরা তাড়িয়ে দিতেন, আবার আসতাম। এ জন্য কম কথা শুনতে হয়নি। ‘নৌকাডুবি’, রবিঠাকুরের ‘ছোটগল্প’, ‘দস্যু মোহন’, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, যা কিছু পড়তেন, তাঁদের বলতেন। মা-খালারাও খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। বড় হয়ে ‘নৌকাডুবি’ খানিকটা পড়ে বুঝলাম, এ তো আমার জানা! আরেকটু বড় হয়ে শেকসপিয়ারের কিছু গল্প পড়তে শুরু করে মনে হলো, আমি তো জানি। মজিদ ভাই আমার জ্ঞানের পরিধি অনেক সমৃদ্ধ করে দিয়েছেন।

 

তখনকার সমাজ?

ফাইভে উঠলাম, একদিন দেখি পেছনে কয়েকজন লোক আসছেন। আমাদের বাসার কাছে এসে তাঁরা চলে গেলেন। চিনি না, জানি না, এরা কারা? তখনকার দিনে পাড়ায় ভালো-মন্দ সব কিছুর বিচার মসজিদে হতো। আমাদের পাড়ায় খুব সুন্দর মসজিদ ছিল। বাবার ডাক পড়ল, এক সন্ধ্যায় তিনি সেই মসজিদে গেলেন। মহল্লার প্রধান ঢাকাইয়া সর্দার, তিনি এলেন। বাবার নামে বিচার এসেছে (হাসি)। বাবা তো অবাক, আমার নামে আবার কী বিচার? ওই পক্ষ থেকে বলল, আপনার একটি মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে, সে শ্বশুরবাড়ি না গিয়ে স্কুলে যায়। এই পাড়ায় থাকতে হলে স্কুলে যেতে পারবে না। তখন তো ঢাকাইয়ারাই ঢাকার শাসক। বাসায় এসে তিনি মাকে বললেন, রাবেয়া যেন কাল থেকে স্কুলে না যায়। শিশুদের যা হয়, শুনে আমি এত খুশি হলাম (হাসি), এখনো মনে আছে—সারাটা দিন আনন্দে কেটেছে। কিন্তু মার মুখ কালো হয়ে গেল। তাঁর স্বপ্ন ছিল, মেয়ে অনেক লেখাপড়া শিখে বড় হবে। বাসা বাবার অফিসের কাছে, সুতরাং বাড়ি ছাড়া সম্ভব নয়, আমাকেই স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনা হলো।

 

আপনার বাকি বোনরা লেখাপড়া করতে পেরেছেন?

নূরজাহান আপা স্কুলে পড়তে পারেননি। সুফিয়া (খাতুন) আমার চার বছরের ছোট। আমি যখন ফাইভে পড়ি, ও থ্রিতে। তাকেও সেভাবেই আটকে দেওয়া হয়েছে। সে-ও বাড়িতে পড়েছে। কিন্তু পড়ার সুযোগ আমার বন্ধ হলো না। ছোট মামা (কবীর) তখন আমাদের বাসায় থেকে ম্যাট্রিকের জন্য তৈরি হচ্ছেন। তিনি আমাদের গৃহশিক্ষক। তাঁর রোগ ছিল, আশপাশের যত লাইব্রেরি আছে, সেগুলোর সদস্য হয়ে বই আনতেন। সেগুলোর মাধ্যমে আমার বই পড়ার দরজা খুলে গেল। সারা দিন পড়তাম। তখন তো ঢাকায় পত্রিকা ছিল না। সপ্তাহে এক দিন বিকেলে আমরা সদরঘাট বেড়াতে যেতাম। বাবা ‘যুগান্তর’ কিনতেন। সেটি পড়ে বাবা-কাকার যে আলোচনা হতো, সেগুলো শুনতাম। কিছুদিন পর দেশভাগ হলো।

 

সে সময়ের দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখেছেন?

ঢাকায় প্রায়ই রায়ট হতো। রায়ট প্রথমে বম্বে শহরে শুরু হতো, তারপর আহমেদাবাদ আসত, এরপর সেটিতে আমরা আক্রান্ত হতাম। নিয়মই ছিল, সেভাবেই রায়ট আসবে। ওদিকে যদি রায়ট লাগত, প্রত্যেকে অ্যালার্ট হয়ে যেতেন। এসব রায়ট কোনো বড় কারণে লাগত না। মায়ের কাছে শুনেছি, বাজারে একবার কাঁচা মরিচের দাম নিয়েও রায়ট লেগে গিয়েছিল। রায়ট কিন্তু দুই-তিন মাস থাকত। আমার লেখায় আছে। ওই সময়, আমি স্কুলে যাই। রায়ট নিয়ে আমার ছোটগল্প আছে, ‘নবাব গুণ্ডার বৌ’।

 

নতুন ঢাকায় এলেন কিভাবে?

তখন যাঁদের কিছু টাকা-কড়ি আছে, তাঁরা জমি, বাড়ি কেনা শুরু করলেন। শুনলাম, আমরা ভাড়া বাড়িতে আর থাকব না, এবার নিজেদের বাড়ি হবে। ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন পার হওয়া মানে তখন গ্রাম। আমরা সেদিকে বাড়ি দেখতে যেতাম। এখনকার শান্তিনগরে ১৬ কাঠা জমি বোধ হয় ১০ হাজার টাকায় কেনা হলো। শান্তিনগর তখন খুব সুন্দর জায়গা ছিল। এত সুন্দর—লোকজন খুব কম, এখানে চাষের জমি, ওখানে একটু জলা, তারপরে কারো বাসা। যখন আমরা সে এলাকায় থাকা শুরু করলাম, তখন হিন্দুরা প্রায় চলে গেছে।

 

তখন তো অনেক বিখ্যাত লোক সেখানে থাকতেন?

প্রতিবেশী পেলাম—কবি গোলাম মোস্তফা, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কবি ও গীতিকার আবু হেনা মোস্তফা কামালদের। কাইয়ুম চৌধুরীও আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন। এখানে এসে জীবন একেবারে পাল্টে গেল। দেখলাম, হেনার বোন টিকাটুলির কামরুন্নেসায় পড়ে, আরো মেয়েরাও পড়ে। রাস্তাঘাট তখন খুব কম ছিল। বাবা খুব কষ্ট করে অফিসে যেতেন। শান্তিনগর থেকে নয়াপল্টন, ওখান থেকে বাসে অফিসে যেতেন। বাস সার্ভিস তখন সবে চালু হয়েছে। তার আগে আমরা ঘোড়ার গাড়িতে চড়তাম। দেশভাগের পর রিকশা এলো। কলকাতা থেকে আইসক্রিম এলো। আমরা আগে দেখিনি, এমন অনেক কিছু দেশভাগের পর দেখলাম। এখানে আমার জীবন খুব ভালো কেটেছে। হেনার তো অনেক গুণ। হেনা তখনই কবিতা, গান লেখে। হেনার বোন ছিল সাবেরা মোস্তফা, সে-ও লেখে। আরেক বোন ছিল জাহানারা, পাড়ার আরেকটি মেয়ে ছিল—নিলুফার। গানের ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন। তাঁর মেয়ে বকুলও গল্প লিখত। মোস্তফা সাহেবের দুই শালী ছিল। তারা এত সুন্দর ছিল যে আমরাই তাদের তাকিয়ে দেখতাম। তাদের সবাইকে নিয়ে আমরা দলে ভারী হয়ে গেলাম। দুপুরে খাওয়ার পর আমরা বের হয়ে যেতাম। মা-বাবা দেখতেন, সব ভদ্রঘরের, ভদ্র মেয়েদের সঙ্গে ঘুরছি, ফলে আর কিছু বলতেন না। প্রায়ই আমরা শাহজাহানপুর, মতিঝিল স্কুলের দিকে আসতাম। সেখানে ছেলে-মেয়ে সবাই পড়ত। গুলিস্তান তখন ছিলই না। এসব জায়গা তখন বনজঙ্গল ও জলায় ভরা আর আমাদের বেড়ানোর জায়গা। ওখানে কোনো দিন কবিতা পাঠ, কোনো দিন গল্প পড়া হতো। আর গান তো সব সময়ই হতো। আমি খুব ভালো গাইতাম।

 

গান শিখেছেন কিভাবে?

বাবা তাঁর সময়ে খুব ভালো গায়ক ছিলেন। অফিস ও বন্ধুদের বাড়িতে গান করতেন। আমাদের বাড়িটিও সংস্কৃতিময় ছিল। মাসে একবার সবাই মিলে সিনেমা দেখা হতো, সার্কাস দেখতে যেতাম। তখনকার যুগে আরেকটি বড় বিনোদন ছিল, ‘ঢাকার মিছিল’। ঢাকার মিছিল খুব নামকরা ছিল। নবাবপুর থেকে হিন্দুরা ভালো মিছিল বের করতেন, বিদেশিরাও দেখতে আসতেন। হিন্দুদের ‘নবাবপুর’ ভার্সেস মুসলমানদের ‘ইসলামপুর’-এর মিছিল হতো। বাবা বাসায় গান করতেন। কিন্তু নিজের বাসায়ও গান করতে দেওয়া হতো না, মহল্লা থেকে মানা করত। বলত, মুসলমানের আবার গান কী? সেই সময় মুসলমানরা পর্দা করতেন। যেদিন খুব বৃষ্টি পড়ত, বাইরে শব্দ যেত না, বাবা গান করতেন। কোনো দিন অনেক রাতে গাইতেন। বাবা হারমোনিয়াম নিয়ে মাঝখানে বসতেন, আমি আর সুফিয়া দুইদিকে বসে তাঁর সঙ্গে গাইতাম। সেই সময় রবীন্দ্রনাথের গানকে বলা হতো ‘রবিবাবুর গান’। তাঁর গান ছাড়াও রামপ্রসাদী গাইতেন। রজনীকান্ত, তখনকার নামকরা সুরকার-গীতিকারদের গান করতেন। আমাদের বাসায় রেডিও নয়, কলের গান ছিল। সেই সময়েই এটির দাম ছিল অনেক, ৮০ টাকা। তারপরে বের হলো রেকর্ড। বাবার কাছে যেগুলো শুনতাম, কলের গান শুনেও অনেক গান মুখস্থ করে ফেললাম। আমি গায়িকা হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার তো সেটি হওয়ার জো নেই।

 

কেন?

গায়িকা হতে গেলে ওস্তাদ লাগে। ওস্তাদরা তো পুরুষ। বাবাকে ওস্তাদের কথা বললাম। বাবা, চাচা বেশ রেগে গেলেন। বললেন, ‘অন্য পুরুষের কাছে গান করলে কেউ কিছু মনে করলে?’ ওস্তাদ মোহাম্মদ খসরু আমার প্রতিবেশী। কিন্তু তার পরও গান শেখা হলো না। লেখার জন্য মাস্টার লাগে না বলে লেখক হয়ে গেলাম।  

 

প্রথম লেখা কোথায় প্রকাশিত হলো?

খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের ‘যুগের দাবী’ পত্রিকায় গল্প লিখেছিলাম। বিষয়, নারী নির্যাতন। পুরনা ঢাকায় এমন কত জীবন দেখেছি! দ্বিতীয় গল্প লিখলাম ‘বেগম’-এ। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সাহেব তখন বেঁচে আছেন, কলকাতায় থাকেন। ডাকে লেখা পাঠিয়েছিলাম। এক গল্পই ‘যুগের দাবী’ ও ‘বেগম’-এ পাঠিয়েছিলাম। তখন পত্রিকায় লেখা থাকত, নতুন লেখকদের কোনো গল্প পাঠানোর তিন মাসের মধ্যে যদি ছাপা না হয়, তাহলে সেটি অমনোনীত হয়েছে। প্রথমে ‘বেগম’-এ পাঠালাম। তারা তিন মাসে ছাপল না দেখে যুগের দাবীতে পাঠালাম। ‘বেগম’ ছেপে দিল। পরের সপ্তাহে তো ‘যুগের দাবী’ ছাপালো। ‘যুগের দাবী’র সম্পাদক ইলিয়াস সাহেবের ছোট ভাই, পুরো নামটি এখন ভুলে গেছি, মোস্তফা সাহেব কাগজটি দেখতেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর সময় রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন। তাঁর এত বড় চিঠি এলো। এখনো সেটি আমার কাছে আছে। তিনি লিখলেন, ‘আপনার এক গল্প দুই কাগজে গেছে।’ তাঁর লেখা লাইনটি এখনো আমার মনে আছে—‘সাহিত্যের ক্ষেত্রে এহেন চৌর্যবৃত্তি মহা অপরাধ। সুতরাং আপনি আমাদের কাগজে আর লিখবেন না।’ তিনি আবার হেনার দুলাভাই ছিলেন। তখন বাবা বললেন, ‘কী রে, কী লিখলি যে এই ভাষায় চিঠি আসে?’ আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। ভাবলাম, লেখার জীবন শেষ। বললাম, ‘আমি তো ইচ্ছা করে করিনি, আমার করার কিছু নেই।’ এমনিতে বাবা লেখা নিয়ে কিছু বলতেন না; কিন্তু মা ভীষণ বকতেন। বলতেন, ‘লিখে কী হয়? আমিও জানি না, সে-ও জানে না।’ কিন্তু ভালো লাগে বলেই তো আমি লিখি। শুধু লিখেই আনন্দ, যতক্ষণ লিখি, ততক্ষণ ভালো লাগে।

পরে কী ‘যুগের দাবীতে আর লিখেছেন?

মায়ের ফুপাতো ভাই, নাম মহিউদ্দিন, তিনি মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় আসতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে রেঙ্গুন ফ্রন্টে যুদ্ধ করেছেন, পরে হাবিলদার হয়েছিলেন। খুব ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন। তখনকার দিনেই আইএ পাস ছিলেন। তিনি ভীষণ মিশুক লোক ছিলেন। বহু মহলে তাঁর যাতায়াত ছিল। তিনি বললেন, ‘চিন্তা করবে না, আমি একটি ব্যবস্থা করে ফেলব।’ তিনি ইলিয়াস সাহেবের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে পুরো ব্যাপারটি বোঝালেন। খোন্দকার ইলিয়াস নাকি সব শুনে হেসে বলেছিলেন, ‘আপনার ভাগ্নিকে বলবেন, সে যেন আরো লেখে।’ ফাঁড়া কাটল। ‘যুগের দাবী’ আবার গল্প ছাপল। তৃতীয় গল্পটি সরকারি মাসিক পত্রিকা ‘মাহে নও’তে ছাপা হলো।

 

আর কোনো বাধা পেয়েছিলেন?

এর পরই আপার শ্বশুরবাড়ি থেকে দ্বিতীয় ধাক্কা এলো। বাবার কাছে একদিন একটি পোস্টকার্ড এলো। তাঁরা লিখেছেন, ‘এই বাড়ির এক মেয়ের হাতের লেখা পরপুরুষ দেখিতেছে। ইহা অত্যন্ত লজ্জাকর ব্যাপার। সুতরাং ব্যবস্থা লইবেন।’ ভয়ে একেবারে শেষ হয়ে গেলাম। খুবই ভেঙে পড়লাম। আমার সব কিছুতে একমাত্র সুফিয়ার উৎসাহ ছিল। এই বোনটি আমার অত্যন্ত প্রিয় ছিল। সে আমার বোন ছিল, কিন্তু বন্ধু ছিল তারও অনেক বেশি। আমার হাতের লেখা খুব খারাপ বলে সে আমার সব লেখা কপি করে দিত। সে না থাকলে আজকের অবস্থায় আসতে পারতাম না। তখন ভাবলাম, এবার আমি শেষ। সুফিয়া কিন্তু সব কিছুর মধ্যে আশা দেখত, আমার পক্ষে বলত। তখনো বলেছে। এর মধ্যেই একদিন উঠানে পিয়ন এসে জিজ্ঞেস করছেন, ‘এখানে রাবেয়া খাতুন নামে কে আছেন? তাঁর নামে টাকা এসেছে।’ বাড়ির সবাই অবাক, আমার নামে টাকা? কোত্থেকে এলো? কিভাবে এলো? পরে শুনি, ‘মাহে নও’র সদর দপ্তর করাচি থেকে ১০ টাকার নোট এসেছে। বাড়িতে খুব হৈচৈ হলো, লিখে আবার টাকা পাওয়া যায়? এটা তো অসম্ভব। আমিও জানতাম না, লিখে টাকা পাওয়া যায়! এটি ১৯৫০-৫১ সালের ঘটনা হবে। এর মধ্যে কিন্তু আমি আরমানিটোলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করলাম। এরপর লেখাপড়া করার মতো অত সাহস পাইনি। তবে এখনো এবং সারা জীবনই পড়েছি। তার পরের রোজগার রেডিও থেকে। রেডিওতে গল্প পড়ে ২০ টাকা পেলাম।

 

গল্পগুলো পাঠাতেন কিভাবে?

হয় হেনা, নয় আমার তো একটি ভাই আছে, সে পরে হয়েছে, আজিজ, ও এখন রিটায়ার করেছে—এই দুজন আমার গল্পবাহক ছিল। পুরানা পল্টনের ‘মাহে নও’ পত্রিকায় হেনা আমার গল্প পৌঁছে দিত। 

 

স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন, শুনেছি।

আমরা শান্তিনগর যখন যাই, সে পাড়ায় একটি স্কুল ছিল। নাম সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুল। হিন্দুরা চলে যাওয়ায় স্কুলটি প্রায় উঠে যাচ্ছিল। পাড়ায়ই কিছু নেতৃস্থানীয় মানুষ উদ্যোগ নিয়ে নিজেরা ছাত্র জোগাড় করে, নিজেরা পড়িয়ে স্কুলটি ধরে রাখলেন। তাঁরা বাড়ি বাড়ি ছাত্রী খোঁজার জন্য আসতেন। কিন্তু স্কুলের মাইনে ৩০ টাকা, আসা-যাওয়ার রিকশা ভাড়া আছে। সে মাইনেতে রিকশায় আসা-যাওয়া করা যায় না। ফলে কোনো মেয়ে স্কুলে আসতে চায় না। ফলে স্কুলের কাছাকাছি যাদের বাড়ি, তাদেরই তাঁরা ছাত্রী হিসেবে নেওয়ার চেষ্টা করতেন। তাঁরা সেখানে শিক্ষকতার জন্য আমাদের বাড়িতে এলেন। আমাদের তো যৌথ পরিবার ছিল। তাঁরা বাবা-চাচাকে ধরলেন। কিন্তু তাঁরা কেউ রাজি নন। তাঁদের রাজি করাতে কষ্ট হয়েছে। এই স্কুলে আট মাস চাকরি করেছি। 

 

তখনই তো আপনার বিয়ে হলো?

শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে আমি আপা বলি, তিনি আমার আত্মীয়ও বটে। সিদ্ধেশ্বরী স্কুলে তিনি প্রধান শিক্ষিকা হয়ে এলেন। আমি সেখানে শিক্ষক। তিনি পত্রিকা করবেন। আমার লেখাও পছন্দ করতেন। একদিন বললেন, ‘আমি মেয়েদের একটি কাগজ বের করব। তুমি কাজ করবে?’ স্বর্গ কেমন জানি না, কিন্তু তখন আমার মনে হলো, স্বর্গ পেলাম। আমার তখনকার জীবনে একটি বড় স্বপ্ন ছিল—একটি পত্রিকায় কাজ করব। বললাম, বাবা-চাচা তো রাজি হবেন না। তিনি বললেন, ‘সামনের রোববার আমি তোমাদের বাসায় কথা বলতে যাব।’ তিনি সত্যিই এলেন। তখন তিনি আজিমপুর কলোনিতে থাকতেন। রুমী তখন বছর দুয়েক বয়সের। তাঁর যুক্তি ছিল অসাধারণ, কথাও খুব সুন্দর করে বলতেন। তিনি এমন যুক্তি দিলেন যে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তাঁরা পটে গেলেন। কিন্তু বাবার একটি শর্ত ছিল, ‘আমার মেয়েকে নিয়ে যাবেন আপনি এবং দিয়েও যাবেন আপনি।’ জাহানারা আপা রাজি হলেন। তাঁরাও আমাকে পত্রিকায় কাজ করতে দিলেন। মেয়েদের ১১টায় স্কুল শেষ হওয়ার পর আমি আর জাহানারা আপা বুলবুল ললিতকলা একাডেমির প্রথম অফিস সেই ওয়াইজঘাটে আমাদের পত্রিকার অফিসে যেতাম। ২টার সময় ফিরে আসতাম। আমাদের কাগজের নাম ছিল ‘খাওয়াতিন’। ‘খাতুন’ থেকে ‘খাওয়াতিন’, অর্থ ‘মহিলাগণ’। সেই পত্রিকায় যখন কাজ করি, আমি আর জাহানারা আপা বিভিন্ন দোকান, মার্কেট, পত্রিকা অফিসে যেতাম। সাগরের আব্বা (এ টি এম ফজলুল হক) পত্রিকার লোক তো, তিনিও তখন আমাকে দেখেছেন। রাস্তাঘাট, সিনেমা হলেও দেখা হতো। তাঁর ‘সিনেমা’ পত্রিকায় দেখা হওয়ার আগেই আমি লিখেছি। আমার দেবরের নাম ডাক্তার ‘করিম’। সে আর তার কয়েকজন বন্ধুবান্ধব আমার বাবার কাছে এলো। তারা অনেকক্ষণ কথাবার্তা বলল। বাবা প্রথমে মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি হননি। কারণ আমরা এদিকের লোক, তারা বগুড়ার। শেষে রাজি হলেন। তারা ছয়-সাতজন গিয়েছিল বলে বাবাকে রাজি হতে হয়েছে। ওই পক্ষও রাজি ছিল না, কারণ তারা তো আমাদের চেনে না। কিন্তু ছেলে তাঁদের রাজি করালেন। সাংবাদিককে বিয়ে করা যে রিস্ক, তখন রিস্ক মানেই তো বুঝি না।

 

আপনার প্রথম উপন্যাস ‘মধুমতির পেছনের ঘটনা?

গল্প লিখে যখন একটু নাম হয়েছে, তখন এটি লিখলাম। এ-ও অনেক আগের ঘটনা। এখানেও আমার সেই কবিরাজ দাদাই আসেন। পেশার জন্য অনেক বাড়িতে তাঁর ডাক পড়ত। আমাদের ষোল ঘর গ্রামটি খুব ছোট। এখানে হিন্দুর, ওখানে মুসলমানের, এখানে সৈয়দের, ওখানে তাঁতির বাড়ি। দাদা রোগী দেখতে যেতেন। ছোটবেলায় তখন স্কুলে যাই, নাকি যাওয়া শুরু করেছি, আমিও তাঁর পেছনে পেছনে যেতাম। দাদা আমাকে সঙ্গে নিয়ে রোগী দেখতে যেতেন। তাঁতিদের বাড়িতে অনেক রং, কাপড় দেখতাম। দাদা যতক্ষণ রোগী দেখেছেন, আমি সেই কাপড় বোনা, তাঁত নাড়াচাড়া, রং মাখানো—এসব দেখতাম। ছোটবেলা এগুলোই দেখেছি। বড় হওয়ার পর পাকিস্তান আমলে তাঁতিদের প্রত্যেক দিন রং, সুতা নিয়ে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে খুব কথা-কাটাকাটি হচ্ছে। প্রায় রোজই কাগজে সেই খবর থাকত। খবরগুলো কেটে কেটে রাখতাম। পরে একসময় মনে হলো, আচ্ছা,  এই গোষ্ঠীটিকে নিয়ে তো আমি লিখতে পারি। সে জন্য তাদের নিয়ে পড়ালেখার দরকার হলো। কিন্তু বই আমাকে এনে দেবে কে? কোত্থেকে কোত্থেকে বই জোগাড় হলো। মধুমতিতে যারা আছে, তারা হলো সেই যে মসলিন তৈরি করতেন যাঁরা, তাঁদেরই বংশধর। সেভাবেই উপন্যাসটির জন্ম। প্রকাশের পর খুব হৈচৈ পড়েছিল।

 

‘বাগানের নাম মালনীছড়া?

এই উপন্যাসের নায়ক আমাদের প্রতিবেশী ছিল। সাগরের আব্বা তাকে ‘ভাই, ভাই’ করতেন। ভাড়াটে বাসায় থাকলে যা হয়, প্রতিবেশী আসে, তারপর চলে যায়। এটি সেই ছেলেটির সত্যিকার ঘটনা নিয়ে লেখা। ওর ছোটভাই আবার সাগরের বন্ধু। স্বাধীন হওয়ার পর শুনলাম, ছেলেটি মুক্তিযুদ্ধে মারা গেছে এবং তাকে খুব কষ্ট দিয়ে মারা হয়েছে। তখন বললাম, ‘সাগর (ফরিদুর রেজা সাগর) আমি সেই কবরটি দেখব, চলো।’ আমরা সবাই সিলেটে বেড়াতে গেলাম। কিন্তু কবর কোথায়? ওকে মেরে ফেলে রেখে গিয়েছিল। স্থানীয় লোকেরা তার লাশ নিয়ে রাস্তার ধারে কবর দিয়েছিলেন। আমরা কবরের কাছে গেলাম। কবরের কাছে খানিকক্ষণ বসে থাকলাম। বাড়িতে এসে লেখা শুরু হলো। আমার অনেক গল্প, উপন্যাসই আছে প্রায় সত্যি।

 

‘পাবনা মানসিক হাসপাতাল’ নামের এই হাসপাতাল নিয়ে আপনার একটি লেখার কথা বেশ বলা হয়।

আমি আর আবেদ খান গিয়েছিলাম। একদিন না দুদিন ছিলাম। তখন যা দেখেছি, সেটিই লিখেছি।

 

‘একাত্তরের নয় মাস?

স্মৃতিকথা—একেবারে ৯টি মাসের। যখন ফিরে এলাম, কাগজে নানা ঘটনা দেখলাম এবং বুঝতে পারলাম যে কী অবস্থায় ছিলাম, কী না হতে পারত। গলা কাটতে কতক্ষণ লাগত! ফলে স্মৃতি ধরে ধরে লিখতে শুরু করলাম।

 

কোনো বাসনা বা হতাশা আছে?

মনে হয় না। যখন যেটি নিয়ে লিখতে মনে হয়েছে, লিখেছি। দায় থেকে নয়, লিখেছি মনের আনন্দে।  

 

এখন লেখেন?

খুব কম।

(১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বনানী, ঢাকা) 



মন্তব্য