kalerkantho


ভালো অভিনয়ের সুযোগ খুঁজে বেড়াই

পঞ্চাশের দশকে একটি মেয়ে কিভাবে অভিনয়ে এলো? প্রখ্যাত অভিনেত্রী শর্মিলী আহমেদ তাঁর পুরনো দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে অনেক গল্প করলেন। সেগুলো শুনে লিখলেন ওমর শাহেদ। ছবি তুললেন কাকলী প্রধান

১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ভালো অভিনয়ের সুযোগ খুঁজে বেড়াই

কী করে অভিনয়ে এলেন?

তখন তো নিয়মিত অভিনয়ের সুযোগ ছিল না। তার পরও আব্বা বছরে দু-তিনটি নাটক নামাতেন। তাঁর নাম মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন মল্লিক। তিনি উত্তরবঙ্গের নামকরা নাট্যাভিনেতা, নাট্যশিক্ষক, নাট্য পরিচালক ছিলেন। সেই সময়ই তাঁদের নাটকের দল ছিল—‘ঘোড়ামারা ড্রামাটিক ক্লাব।’ রাজশাহীর অলকা সিনেমা হলে দু-তিন দিন সিনেমা চালানো বন্ধ রেখে সে মঞ্চে খুব জাঁকজমক করে নাটক করতেন। আমাদের বৈঠকখানায় সেই নাটকের রিহার্সাল হতো। বিকেল থেকে তাঁরা মহড়া শুরু করতেন। বাইরে খেলে এসে রিহার্সালের আওয়াজ পেলেই ঢুকে এককোণে চুপচাপ বসে মহড়া দেখতাম, খুব ভালো লাগত।

কত বছর বয়সে মঞ্চে উঠলেন?

চার বছর। তখনো রাজশাহীতে কোনো মেয়ে অভিনয় শুরু করেনি। ছেলেরাই মেয়ে সাজত। মেয়ে শিশুশিল্পী কোথায় পাবে?  বন্ধুরা বললেন—‘কেন, ওই তো লিলি, ও করুক।’ আব্বা বললেন, ‘ও কি পারবে? এত ছোট?’ মঞ্চাভিনয় কী, কিভাবে করতে হয়, কোনো কিছু না বুঝে খুশির চোটে বলে দিলাম—‘পারব’। এরপর দৃশ্যটি আব্বা বোঝালেন, ‘তিন ভাই-বোনের তুমি সবার ছোট। মা-বাবার এত অভাব যে ঠিকমতো খেতে দিতে পারে না। খেতে চাইলে মা খুব রাগ করে, ‘একবেলা খেয়ে থাকতে হবে।’ ক্ষুধায় চিত্কার করছ। ‘এত খাওয়া, খাওয়া করলে কোত্থেকে খাওয়া দেব’ বলে সে তোমাকে থাপ্পড় দেবে। আর তুমি ভ্যাঁ করে কেঁদে দেবে। সঙ্গে সঙ্গে কোল থেকে নামিয়ে দেবে। ভয় নেই, ডায়ালগ বলতে হবে না।’ এই হলো অভিনয় (হাসি)। তবে মঞ্চে থাপ্পড় খেয়ে, এত মানুষের চিত্কার দেখে সত্যি সত্যি কেঁদে দিয়েছিলাম। দর্শকরা খুব হাততালি দিচ্ছিল। মঞ্চে অভিনয় করলে মানুষ হাততালি দেয়! তখন থেকেই নেশা হয়ে গেল, অভিনয় করব।

মঞ্চে নিয়মিত ছিলেন?

আব্বার পরিচালনায় অনেক নাটক করেছি। স্কুল (পিএম গার্লস হাই স্কুল) ও কলেজে (রাজশাহী সরকারি কলেজ) নাটক করেছি। স্কুলে নাটক হলেই আমার ডাক পড়ত। আব্বাই পরিচালনা করতেন। শরত্চন্দ্রের ‘বিন্দুর ছেলে’তে শুকনো, পাতলা, ছোটখাটো ছিলাম বলে ‘অমূল্য’ করতে হয়েছে। মেয়েদের স্কুলে মেয়েরাই ছেলে, মেয়ের চরিত্র করেছি। কলেজেও পড়ার সময় অনেক নাটক করেছি। আব্বার গ্রুপে মঞ্চে অভিনয় করেছি।

বেতারে শুরু কিভাবে?

রাজশাহী বেতার চালু হলে ঘোষিকা হিসেবে ডাক পড়ল। ডাকার পর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল, কলেজের প্রথম বর্ষে পড়ি। পড়ালেখার চাপে কিভাবে কাজ করব? আরডি (আঞ্চলিক পরিচালক) কাহ্হার সাহেব কবি বেগম সুফিয়া কামালের বড় মেয়ের স্বামী—তিনি আব্বার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। খুব আদর করতেন। বললেন, ‘মা, কলেজ থেকে এসে খাওয়াদাওয়া করে বিশ্রাম নিয়ে প্রস্তুত হয়ে থেকো। রেডিওর গাড়ি গিয়ে ৬টায় নিয়ে আসবে। সাড়ে ১০টা পর্যন্ত উপস্থাপনার পর গাড়ি তোমায় বাসায় পৌঁছে দেবে। একটু কষ্ট করে রাতে পড়া সেরে ফেলো। তোমরা যদি কাজ না করো তাহলে অন্য মেয়েরা এগিয়ে আসতে পারবে না। আমরাও ঘোষিকা পাব না।’ বললাম, ‘চাচা, পরীক্ষার সময়?’ ‘ছুটি দেব।’ এত সুন্দরভাবে তিনি বললেন যে আব্বাও বললেন, ‘কর।’ তখন শর্ত দিলাম, ‘অভিনয়ের সুযোগ দিতে হবে।’ তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমার জন্য মাসে দুটি নাটক বরাদ্দ করা হলো।’ সারা দিন ঢাকা রেডিওর অনুষ্ঠান রিলে করে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ‘লাইভ অনুষ্ঠান’ চলত। আমি বাদে আর একজন মাত্র অনুষ্ঠান ঘোষিকা ছিলেন। তাহেরা বেগম, আবু হেনা মোস্তফা কামাল সাহেবের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী। আর এক কি দুজন পুরুষ ঘোষক ছিলেন। সে আমলে উপস্থাপনা করে মাসে ২১০ টাকা পেতাম। দুটি নাটকে ২৫ করে ৫০ টাকা। আমার মাসিক আয় ছিল প্রচুর—২৬০!

রাজশাহী বেতারে কদিন ছিলেন?

দুই বছর, ১৯৬২ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠান ঘোষণা করেছি। রাজশাহী বেতারের প্রথম নাটক ‘তৈমুর লঙ’ আব্বা পরিচালনা করেছেন। সেখানে আমি, আব্বা ও ফুফু (রবিউন নেসা বেগম) অভিনয় করেছি। বেতারে প্রচুর নাটক করেছি। এত বছরের কথা (হাসি), নামগুলো আর মনে নেই। রাজশাহী বেতারের বেশির ভাগ নাটকই আব্বার পরিচালিত, অন্য প্রযোজকদের নাটকও করেছি। আব্বার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়েও মঞ্চনাটক করতাম। আমি রাজশাহী বিশ্বদ্যালয়ের বাংলায় এমএ।

ঢাকা বেতারে কিভাবে শুরু?

আতিকুল হক চৌধুরী সুযোগ করে দিয়েছেন। তাঁর নাটকেই প্রথম অভিনয় করেছি ‘মেকআপ’। তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে ‘মাজেদা মল্লিক’ নামে অভিনয় করতাম। পাঁচ-সাত দিন রিহার্সাল করে মাইক্রোফোনের সামনে যেতাম। শরত্চন্দ্রের অনেক নাটক করেছি। ‘চন্দ্রনাথ’, ‘চরিত্রহীন’, ‘মেজদিদি’, ‘মহেশ’, ‘নীলাম্বরী’, ‘শুভদা’, ‘শ্রীকান্ত’; এ ছাড়া ‘বিলাস’, ‘নির্জন সৈকতে’, ‘শীতের পাখি’ ‘নষ্ট নীড়’, ‘মন ও মানুষ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য নাটক করেছি। ঢাকা বেতারে আমি এত জনপ্রিয় শিল্পী ছিলাম যে মাজেদা মল্লিক অভিনয় করছেন জানলে শ্রোতারা রেডিও শুনতেনই। অনেক ভালো ভালো নাটকে অভিনয় করেছি। নায়িকাসহ ভালো চরিত্রে অভিনয় করেছি। আশকার ইবনে শাইখসহ নামকরা লেখকদের নাটকে অভিনয় করে সুনাম অর্জন করেছি। রেডিওতে একটানা অনেক বছর জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলাম।

টিভিতে কিভাবে এলেন?

তখন মডি কোহেন নামের এক ইহুদি ছেলে অনুষ্ঠান ঘোষণা করতেন। সঙ্গে এক মহিলাও ঘোষণা করতেন। তাঁর এখন অনেক বয়স, ভয়েস অব আমেরিকায় সংবাদ পড়েন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার পর মডির সঙ্গে অনুষ্ঠান ঘোষণার জন্য ডেকেছিল। প্রতিদিনই অনুষ্ঠান ঘোষণা করতে হবে, কাজটি করতে হলে তো ঢাকায় স্থায়ী হতে হবে, রাজশাহী থেকে এসে করা সম্ভব নয়। ফলে করতে পারিনি। আতিকুল হক চৌধুরী টিভিতে চলে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে দিয়ে অভিনয় শুরু করালেন। তখন সিনেমার নামটি নিলাম—‘শর্মিলী আহমেদ’। তাঁর নাটক দিয়ে টিভি অভিনয় শুরু করলাম। মাসে, দুই মাসে নাটক করলেও যত্ন করে অভিনয় করতাম। টিভিতে নায়িকা চরিত্রও করেছি।

টিভিতে তো অনেক নাটক করেছেন?

ছয় শর বেশি নাটক করেছি। কতগুলোর আর নাম বলব? আতিকুল হক চৌধুরীর পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথের ‘মালঞ্চ’তে আমি ও আলী যাকের মূল চরিত্র ছিলাম। বুলবুল আহমেদ ও কবরীও তাতে ছিলেন। আমার অভিনয়ের এত সুনাম হয়েছিল যে বিটিভির ঠিকানায় আতিক সাহেবের কাছে অসংখ্য চিঠি এসেছিল। দর্শকরা লিখেছেন, আমরা কলকাতায় ‘মালঞ্চ’ সিনেমা দেখেছি, কিন্তু এই মালঞ্চ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। এটি পৌনে দুই ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের এ মাসের নাটক ছিল। আমার চরিত্রের নাম ‘নীরজা’। খবরের কাগজেও খুব প্রশংসা হয়েছে। আমার প্রশংসা করে আতিক সাহেবের কাছে ফোন যেত। আব্বা তো খুব নামকরা মানুষ ছিলেন, তাঁর সঙ্গে সবার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ভারতীয় হাইকমিশনার তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি ডেকে বলেছেন, ‘তোফাজ্জল সাহেব, কলকাতায় ছবিটি দেখেছি, আপনার মেয়ের অভিনয়ও দেখলাম। মেয়ে যে কত বড় মাপের অভিনেত্রী, বুঝেছেন? আমি কিন্তু বুঝেছি। অসাধারণ, অপূর্ব অভিনয় করেছে। যে জীবনে একবার দেখেছে, ভুলতে পারবে না।’ এভাবে আমার আব্বার কাছে তিনি আমার প্রশংসা করেছেন (হাসি)। যাকের ভাই একদিন বললেন, ‘শর্মিলী আপা, এটি মনে রাখার মতো নাটক, সিডিটি দিন।’ কপি করে দিলাম। আরো অনেকে কপি করে নিয়েছেন। পত্রিকায়ও আমার অভিনয়  প্রশংসিত হয়েছে। বিটিভিতে শরত্চন্দ্রের ‘বড়দিদি’ নাটকে ‘বড়দিদি’ হয়েছি। আবুল হায়াত আমার বাবা হয়েছেন। এটিও খুব ভালো নাটক ছিল। বিটিভিতে ইমদাদুল হক মিলনের লেখা বেশির ভাগ নাটকে অভিনয় করেছি। অনেক বড় শিল্পীর সঙ্গে অভিনয় করেছি। গোলাম মোস্তাফা কত বড় মাপের শিল্পী, তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেছি। হুমায়ুন ফরীদির সঙ্গে অভিনয় করেছি। কাজী খালেকের সঙ্গে সিনেমায় ও রেডিওতে অভিনয় করেছি। এখন মায়ের বিশিষ্ট চরিত্রগুলো করছি। সুন্দর সুন্দর দাদির চরিত্র করছি।

সিনেমায় কিভাবে শুরু করলেন?

আবদুল জব্বার খান ও কামাল আহমেদ আব্বার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। আলী মনসুর, মহিউদ্দিনসহ আরো অনেক পরিচালক তাঁর বন্ধু ছিলেন। জব্বার চাচা একদিন বললেন, ‘তোমার মেয়ে তো বেশ নাম করছে, রেডিও এবং মঞ্চে ভালো অভিনয় করছে, সিনেমায় দাও না কেন?’ এরপর তাঁর প্রডাকশনে কামাল চাচার পরিচালনায় প্রথম ছবি করতে এলাম, নামটি মনে নেই। দ্বিতীয় নায়িকার চরিত্র। সুলতানা জামান মূল নায়িকা। তখন আব্বার অন্য পরিচালক বন্ধুরা বললেন, ‘দ্বিতীয় নায়িকা হলে সেটিই করতে হবে। আর মূল নায়িকা হতে পারবে না, দিয়ো না।’ ছবি না করে আমরা রাজশাহী চলে গেলাম। চাচার বন্ধু বজলুর রহমান খুব ভালো উর্দু ছবি ‘ঠিকানা’য় অফার করলেন। চরিত্রটিও সাংঘাতিক। সেটিতে অভিনয় করলাম। আমার বিপরীতে নায়ক ছিলেন অবাঙালি ‘হায়দার শফি’। এখনো রিলিজ হয়নি। এরপর আমার অভিনয় দেখে অন্যরা ডাকা শুরু করলেন। সিনেমায় আমি নায়িকা হয়েই এসেছিলাম। তখন হঠাত্ উর্দু ছবি বানানো শুরু হলো। ফলে জুগনু, পাঞ্চি বাউরাসহ চারটি উর্দু ছবি করলাম। এরপর আবার বাংলা ছবির দিকে দর্শক ঝুঁকে পড়ল। সুভাষ দত্তের ‘আবির্ভাব’ করলাম। পড়ালেখার অসুবিধা হবে বলে বছরে একটি ছবি করতাম।

শর্মিলী আহমেদ নামটি কিভাবে হলো?

রেডিওতে মাজেদা মল্লিক নামেই অভিনয় করতাম। এটিই আমার আসল নাম। তখন সিনেমাতে সব নায়িকার নাম ‘এস’ দিয়ে হতো। যেমন—শাবানা, শবনম ইত্যাদি। ফলে আমার নামও তেমনটি রাখার কথা ভাবলেন ‘ঠিকানা’র পরিচালক বজলুর রহমান। আমি ডাকনাম মিলিয়ে লিলি মল্লিক রাখার কথা বললাম। তবে ছবিটির প্রধান সহকারী পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার আমজাদ হোসেন অনেকগুলো নাম লিখে বললেন, ‘কোন নামটি আপনার পছন্দ?’ আমি শর্মিলী বেছে নিলাম। বিয়ের পর থেকে আমার নামের সঙ্গে স্বামীর নাম মিলিয়ে ‘শর্মিলী আহমেদ’ নামে অভিনয় করছি।

সুভাষ দত্তের কত সিনেমা-নাটকে অভিনয় করেছেন?

তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম ছবি ‘আবির্ভাব’। তিনি আমার কথা জানতেন। ফলে বাসার ঠিকানা দিয়ে ডেকে পাঠালেন। এত বড় মাপের পরিচালক ডেকেছেন, গেলাম। তিনি বললেন, ‘আমি আজিম ও তোমাকে একটি জুটি আর রাজ্জাক-কবরীকে আরেকটি জুটি নিয়ে একটি ছবি করতে চাই। গল্প হলো, তোমাদের সন্তান হয় না। তবে রাজ্জাক-কবরী তাদের সন্তানকে হারিয়ে ফেলে। তাকে পেয়ে তোমরা লালন-পালন করো।’ সেটিই হলো উর্দু ছবির জোয়ারের পর প্রথম বাংলা ছবি ‘আবির্ভাব’। এর পর দাদার সঙ্গে ‘আলিঙ্গন’ ও ‘আবিষ্কার’ নামে আরো দুটি বাংলা ছবি এবং তিনটি টিভি নাটক করার সৌভাগ্য হয়েছে। তাঁর পরিবারের সঙ্গেও আমাদের এত খাতির হয়ে গিয়েছিল যে বউদি ভালো কিছু রান্না করলেই আমাদের দাওয়াত দিতেন। আমরাও তাঁদের আমাদের বাসায় নিমন্ত্রণ করতাম। ‘আলিঙ্গন’ ছবিতে আমি মূল চরিত্র ‘রাবেয়া ভাবি’ করেছি। সেটিও নায়িকা চরিত্র ছিল না। সেখানে যুবতী থেকে বৃদ্ধার চরিত্র করেছি। আর ‘আবিষ্কার’-এ আমি ছিলাম এক সংগ্রামী মা। আমার বিপরীতে ছিলেন প্রবীরদা (প্রবীর মিত্র)। পুতুল তৈরি করে সেগুলো বিক্রি করে আমি সংসার চালাই।

ব্রেক থ্রু কিভাবে হলো?

তখন আমরা ডিআইটিতে টিভি ভবনে অভিনয় করি। আতিক ভাই টিভিতে তাঁর প্রথম ধারাবাহিকেই আমাকে নিলেন। সেখানে আমার বিপরীতে ছিলেন সৈয়দ আহসান আলী সিডনি। আমরা ‘দম্পতি’ নাটকের দম্পতি হয়েছিলাম। তিন মাসের এই সিরিয়াল অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রতি বৃহস্পতিবার নাটক প্রচারিত হতো। এক শুক্রবার হলে ‘আবির্ভাব’ মুক্তি পেল। ফলে বৃহস্পতি ও শুক্রবার আমাকে দর্শকরা টিভির সামনে ও হলে হুমড়ি খেয়ে দেখতে শুরু করল। এর পর থেকে শর্মিলী আহমেদ নামটি মানুষের মুখে মুখে।

তখন কি রাজশাহীতে থাকতেন?

হ্যাঁ। চাচা সরকারের খাদ্য বিভাগের অফিসার, অফিসপাড়ায় মঞ্চনাটক করতেন, শুটিংয়ের সময় তাঁর বাসায় উঠতাম। শুটিং শেষে ফিরে যেতাম। বলা ছিল, আমার পড়ালেখা আছে, ছাড়া ছাড়া শুটিং রাখবেন না। যখন পরীক্ষা থাকবে না, টানা সাত দিন, ১০ দিন শুটিং রাখবেন। এভাবে কাজ করতাম। বিয়ের পর তো ঢাকায় স্থায়ী হয়ে গেলাম। উর্দু-বাংলা মিলিয়ে নায়িকা চরিত্রে ৯-১০টি ছবি করার পর তো ‘আগুন’ করলাম।

সেটির মাধ্যমেই মায়ের চরিত্রে এলেন?

আমি তখন নায়িকা। ‘আগুন’-এর পরিচালক মোহসীন সাহেব বাসায় এসে গল্পটি শুনিয়ে বললেন, ‘শর্মিলী ভাবি, ছবিতে দুই নায়িকা আছে। একজন কেন্দ্রীয় চরিত্র, যুবতী থেকে বৃদ্ধা; অন্যজন রোমান্টিক। কোনটি করবেন?’ বললাম, ‘রোমান্টিক নায়িকা মানে তো প্রেম, গান, গাছের ডাল ধরে অভিনয় করা। সারা জীবন নায়িকা হয়ে থাকব—এ প্রত্যাশা আমার নাই। ভালো অভিনেত্রী হতে চাই, এই চরিত্রই পছন্দ।’ ছবিতে রাজ্জাক সাহেব প্রথমে আমার স্বামী, আমাদের একটি সন্তান আছে। সে বড় হয়ে আবার রাজ্জাক। স্বামী-ছেলের দুই চরিত্র তিনি করলেন। এই ছবিটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। তিনি মারা যাওয়ার পর সেদিনও মধুমিতায় দেখিয়েছে ছবিটি। এতে অভিনয়ের পর প্রতিটি পত্রিকার হেডলাইন হয়েছিল—‘মা চরিত্রে শর্মিলী আহমেদ সার্থক, অসাধারণ অভিনয় করেছেন।’

সেই বয়সে এমন ঝুঁকি কেন নিলেন?

নায়িকা ছাড়া অন্য চরিত্র করব না—তেমন কিছু আমার ছিল না। তাহলে তো নায়িকার চরিত্রই করতাম। মোহসীন সাহেব আমাকে বলেছিলেনও, ‘আপনি যেটি করবেন, করুন, বাকিটিতে অন্য শিল্পী দেখব।’ নায়িকা থাকা অবস্থায়ই তো আমি কেন্দ্রীয় চরিত্র বেছে নিয়েছি। পরে শাবানা রোমান্টিক চরিত্রটি করেছে। সে বলেছিল, ‘শর্মিলী আপা, সেই চরিত্রটির ওপর আমার কী যে লোভ ছিল! কিন্তু করিনি কেন জানেন? এক বয়সে গিয়ে চুল পাকাতে হবে, এর পর থেকে নায়িকা হিসেবে মানুষ আমাকে আর নেবে না। আমাদের দেশটি এমনই।’ তাকে বলেছি, ‘চুল পাকালে পাকাব। কিন্তু আমি ভালো অভিনয়ের সুযোগ খুঁজে বেড়াই।’ নায়িকা হিসেবে ভালো অভিনয়ের সুযোগ থাকলে সেটি করব, না নিলে মা-ই করব। এর পর থেকে দেখি, রোমান্টিক নায়িকা নয়, মা চরিত্রের অফার আসতে লাগল। শাবানার কথাই সত্য হলো। তবে রোমান্টিক নায়িকা বা মা, যেকোনো চরিত্রে আমি দেখেছি সেটি কেন্দ্রীয় চরিত্র কি না, গল্পে আমার চরিত্র কত গুরুত্বপূর্ণ। যুবতী থেকে বৃদ্ধা, মা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ, অভিনয়ের প্রচুর সুযোগ আছে—এমন চরিত্রগুলোয় অভিনয় করতাম।

অনেক ছবি করেছেন।

‘আগুন’-এর পর বুলবুল আহমেদ বললেন—‘ভাবি, এটিও মায়ের চরিত্র। কিন্তু একেবারে নেগেটিভ, করবেন?’ বললাম, ‘খুব সুন্দর চরিত্র। অভিনয়ের প্রচণ্ড সুযোগ, কেন করব না?’ তাঁর পরিচালনায় ‘আকর্ষণ’ করলাম। আমি জাফর ইকবালের মা। বিরাট বড়লোক, হুইলচেয়ারে গিয়ে বিরাট অফিস চালাই, ছেলেকে নিয়ন্ত্রণ করি। অফিসের কর্মচারী চম্পা গরিবের মেয়ে। তাদের প্রেম হয়, কিন্তু আমি মেনে নিই না। ছেলের সঙ্গে সংঘাত করে তাকে বিদেশ পাঠিয়ে চম্পাকে ছাঁটাই করা থেকে শুরু করে অনেক বাজে কাজ করি। এই ছবিটিও খুব প্রশংসিত হয়েছে। নায়িকা থাকা অবস্থায়ই সুভাষ দত্তের ‘আলিঙ্গন’-এ কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘মা’ করেছি। ‘আরাধনা’য় বুলবুল আহমেদ একই চেহারায় দ্বৈত নায়ক ছিলেন। আমি ও কবরী নায়িকা। কবরীর সঙ্গে গ্রামের বুলবুলের প্রেম হয়। তবে শহরের বুলবুল আহমেদের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। আলমগীর কবিরের ‘রূপালী সৈকত’-এ নায়িকা চরিত্রে অভিনয়ের সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমি ও জয়শ্রী কবির নায়িকা ছিলাম, বুলবুল আহমেদ নায়ক। এও আমার স্মরণীয় ছবি। ‘দুই নয়ন’ ও ‘দহন’-এ অভিনয় করেছি। মোহাম্মদ হান্নানের ‘রায় বিনোদিনী’-তে কৃষ্ণের মা ‘যশোদা’ চরিত্রটি এত জনপ্রিয়, এত বাস্তবধর্মী ছিল যে রাজশাহীর হলে ছবিটি দেখতে হিন্দু মহিলারা ধূপ নিয়ে যেতেন, আমাকে প্রণাম করতেন। ‘স্বর্গ নরক’-এ আমার বিপরীতে ছিলেন রহমান। আমার দেবর ছিল ইলিয়াস কাঞ্চন। আমরা সেই পরিবারের বড় ভাই-ভাবি ছিলাম। হান্নানের আরেক ছবি ‘জিজ্ঞাসা’য় অতিথি শিল্পী হিসেবে একটি মাত্র দৃশ্যে অভিনয় করেছি। ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। গোলমালে গুলি খেয়ে সে মারা যায়। শহর থেকে গ্রামে লাশ এলো। তার জন্য মন টানছে, রেললাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছি। এই একটি দৃশ্যের, এক পাতার সংলাপ ও অভিনয়ের পর ইউনিটের সবাই কেঁদে ফেলেছেন। দৃশ্যটির জন্য আমি প্রশংসিত হয়েছি। বাদল রহমানের ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’তে রাকিবুদ্দিন আহমেদ আমার স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। বাস্তবেও তিনি আমার স্বামী ছিলেন। আমি ছিলাম এমিলের খালা। এটিও সুন্দর গল্প ছিল। বাদল রহমান, আলমগীর কবির তো আমাদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। সিনেমায় ভালো পরিচালক, চরিত্র, ইউনিট দেখে বেছে কাজ করেছি। তাই আমার ছবি দেড় শ হয়েছে, না হলে তো চার-পাঁচ শ হতো।

আলমগীর কবিরের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল?

আলমগীর কবিরের পরিবারের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক, অন্তরঙ্গতা ছিল। নিয়মিত তাঁরা আমাদের বাসায় দাওয়াত খেতে আসতেন। আমরাও যেতাম। তিনিই আমাকে বললেন, ‘ভাবি, একটি ছবি করব। দুই নায়িকা, এক নায়ক। বুলবুল আহমেদ মূল চরিত্রে। করবেন?’ বললাম, ‘আপনার ছবি, করব না?’ তিনি ‘রূপালী সৈকত’-এর শুটিং শুরু করলেন। এ ছবিতে আমার নায়ক ছিলেন উজ্জল। তাঁর স্ত্রী জয়শ্রী কবিরের নায়ক ছিলেন বুলবুল ভাই। তিনি সব কিছু গুছিয়ে খুব সুন্দর করে শট নিতেন। তিনি শিল্পীদের অত্যন্ত সম্মান করতেন। তিনি বলেই দিয়েছিলেন, ‘আমার শিল্পীরা যখন যা চাইবে, তাদের দেবে। তাদের কোনো অসম্মান যেন না হয়।’ কোনো ভালো দৃশ্য বা তাঁর মনের মতো কিছু হলে তিনি খুশিতে বলতেন, ‘বাঘের বাচ্চা সব শিল্পীরা।’ বুলবুল ভাই তো খুব মজা করতেন। তিনি বলতেন, ‘কবির ভাই, আপনি আমাদের অপমান করছেন। আমরা বাঘের বাচ্চা নই, মানুষের বাচ্চা।’ অত্যন্ত গম্ভীর এই মানুষটির আড়ালে কিন্তু একজন হাসিখুশি মানুষ ছিল।

এখনো অভিনয় করেন?

খুব কম করি। সর্বশেষ এস এ অলিকের ‘এক পৃথিবী প্রেম’, তার আগে সামিয়া জামানের ‘ছেলেটি’ করেছি। রাজ্জাক সাহেব ও আমি স্বামী-স্ত্রী ছিলাম। অলিকের আরেক ছবি ‘আকাশছোঁয়া ভালোবাসা’য় রাজ্জাক সাহেবের মা হয়েছি। এখনো চরিত্র, পরিচালক ও গল্প পছন্দ হলে সিনেমায় অভিনয় করি। কিন্তু সারা জীবনই বছরে এক বা দুটি ছবি করেছি।

বুলবুল আহমেদের সঙ্গে জুটি গড়ে উঠেছিল।

দর্শকরা পছন্দ করেছেন বলে পরিচালকরা আমাদের জুটি হিসেবে নিয়েছেন। রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে অনেক ছবি করেছি। তাঁরা দুজনই খুব সহযোগিতাপরায়ণ শিল্পী। ফলে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে অভিনয় করেছি। যেকোনো দৃশ্যে ভালো অভিনয়ের জন্য তাঁরা পরামর্শ দিতেন। আমাদের খুব আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিল। বুলবুল আহমেদের সঙ্গে প্রচুর নাটক করেছি। তিনি যেহেতু পরিচালনাও করতেন, ফলে বন্ধুবত্সল ছিলেন। মানুষ হিসেবেও খুব ভালো ছিলেন। এখন আমি ও আবুল হায়াত নাটকে জুটি হিসেবে কাজ করছি। সহশিল্পী হিসেবে তিনি খুবই সহযোগিতাপরায়ণ। কোনো কিছু ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে ধরিয়ে দেন। এটি অনেকেই মেনে নিতে পারেন না। তবে আমার কোনো অসুবিধা হয় না। তাঁর পরিচালনায়ও আমি অভিনয় করেছি। তাঁর মেয়েদের স্বামীরাও (তৌকীর, শাহেদ) আমার সঙ্গে অভিনয় করেছে। হায়াত ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গেও আমার খুব ভালো সম্পর্ক।

আপনার স্বামীও তো সিনেমায় জড়িয়েছেন?

রাকিবউদ্দিন আহমেদ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ থাকার পর কাপ্তাইয়ের সুইডেন-বাংলাদেশ টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ছিলেন। তাঁর নিজের ক্যামেরা ছিল। ঢাকায় থাকতে প্রচুর ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানিয়েছেন। সরকারি ২৫-৩০টি প্রামাণ্যচিত্র বানিয়েছেন। বিধায়ক ভট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি লিখলেন, “রকিব, ‘আকাশ আর মাটি’ বানাও।” তিনি ছবিটির চিত্রনাট্য করা শেষে সব সম্পন্ন করলেন। তবে পরিচালনা করতে পারেননি। এটি আমাদের বিয়ের আগের ঘটনা। এরপর ফিচার ফিল্ম ‘পাঞ্চি বাউরা’তে হাত দিলেন। তখন আমাদের পরিচয়। আজ পর্যন্ত তাঁর মতো এত মেধাবী, বিনয়ী, শিক্ষিত, ভদ্রলোক আমার চোখে পড়েনি। আস্তে আস্তে ভালো লাগা, শেষ পর্যন্ত বিয়ে। আমাদের নিজস্ব ক্যামেরা ছিল, নিজে ক্যামেরা চালিয়ে প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করতেন। বাসায় ফিল্মের অনেক বই ছিল। ক্যামেরা, সিনেমা পরিচালনা নিয়ে পড়ালেখা করতেন। ‘আকাশ আর মাটি’র পর ইন্দু সাহার উপন্যাস অবলম্বনে বাংলা ছবি ‘পলাতক’ করলেন। রাজ্জাক সাহেব ও আমি নায়ক-নায়িকা ছিলাম। বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান রফিকুল বারী চৌধুরী ঢাকা পলিটেকনিকে চাকরি করার সময় আমার স্বামীর কাছে ক্যামেরায় তাঁর হাতেখড়ি হয়। তাঁকে তিনিই তৈরি করেছেন। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পুরনো লোকেরা সবাই এ ঘটনা জানেন। তাঁর বন্ধু আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘সূর্যস্নান’-এর চিত্রনাট্য লিখে তাঁকে ক্যামেরাম্যান হিসেবে নিয়ে পরিচালক হিসেবে শুটিং শুরু করলেন। ২০ ভাগ কাজ করার পর প্রযোজকের সঙ্গে ঝামেলা হলো। তাঁরা বলেছিলেন, পাকিস্তান থেকে নায়িনাকে নিয়ে এসে বাইজি নাচ নাচাতে হবে। তিনি বললেন, গল্পে বাইজি ঢোকানোর কোনো সুযোগই নেই। আমি বাইজি নাচ রাখব না। এ নিয়ে তর্ক হতে হতে তিনি রাগ করে পরিচালনা ছেড়ে দিলেন। তাঁর খুব নীতিবোধ ছিল। এরপর সালাউদ্দিন সাহেব ছবিটি পরিচালনা করেছেন। আনোয়ার হোসেনসহ সিনেমার পুরনো লোকেরা সবাই এটি জানতেন। আলমগীর কবির ‘রুপালী সৈকত’ ছবিতে তাঁকে দিয়ে একটি দৃশ্যে অভিনয়ও করিয়েছেন। তাঁকে বলেছিলেন, ‘রাকিব, এই দৃশ্যে হয় তোমাকে না হয় আমাকে অভিনয় করতে হবে।’ তাঁর অনুরোধ ফেলতে না পেরে তিনি পত্রিকার সম্পাদকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি ১৯৯৬ সালে ইন্তেকাল করেন।

ব্রিকলেনখ্যাত মনিকা আলী পরিবারের সঙ্গে নাকি আপনাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল?

তার বাবা হাতেম আলী আমার স্বামীর সঙ্গে চাকরি করতেন। তিনি বিদেশে থাকার সময় এক ব্রিটিশ নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তবে তাঁর মা-বাবা সেই বিদেশি বধূকে গ্রহণ করেননি। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহে। তখন তাঁরা আমাদের বাসায় থেকেছেন। আমার স্বামী তাঁদের মুসলমান রীতিতে বিয়েও দিয়েছেন। এরপর তো মনিকার জন্ম হলো। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ব্রিটিশ দূতাবাস মনিকা আলী, তার ভাই রবিন আলী ও তাদের মাকে ব্রিটেনে নিয়ে গেল। তখন হাতেম ভাই অন্য এক স্থানে থাকলেও আমাদের বাসায় খেতেন। বহু বছর পর আমি লন্ডনে গেলে হাতেম ভাই তাঁদের বাড়িতে দাওয়াত করে ১১ দিন রেখেছেন। তিনি তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। আমার রিসেপশন পার্টি রবিনের বাসায় হলেও মনিকা ফোনে বলেছিল, ‘আব্বু, আমার বাসায় পার্টি দাও। আমার বাসা বড় আছে।’ তার বাসাও আমি ঘুরে দেখেছি। তখন সে অন্য এক স্থানে ছিল। এরপর সে ওই পার্টিতে থাকতে না পেরে দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং ছোটবেলায় মা-বাবার মুখে যে আমার কথা শুনেছে সেসব বলে চিঠি লিখেছে।

আপনার পরের প্রজন্মের কেউ অভিনয় করেন?

আমি আনিনি, স্কুলে পড়ার সময় থেকে আমার মেয়ে তনিমা আহমেদ অভিনয় করে। স্কুলে রবীন্দ্রনাথের নাটক করেছিল। ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে ইঞ্জিনিয়ারদের ছেলে-মেয়েদের নাটকে অভিনয় করেছে। বিটিভিতে ক্লাস নাইন থেকে অভিনয় করছে। প্রথম নাটকটি মমতাজউদদীন আহমদ পরিচালনা করেছেন, আসাদুজ্জামান নূর তার নায়ক ছিল। সে বিটিভির প্রচুর এক পর্ব, ধারাবাহিক ও অনেক প্যাকেজ নাটকে অভিনয় করেছে। অনেক সিরিয়াল করেছে। এসটিভি ইউএস-এ চাকরি করত। সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ছিল। তাতে অভিনয়ে ছয়-সাত বছরের বিরতি পড়ল। এর পর থেকে সে একটু কম অভিনয় করছে। কিন্তু কণ্ঠস্বর খুব ভালো। নাইন থেকে শুরু করে এখনো ফিল্মে ডাবিং করে, নায়িকার ভয়েস দেয়। ঋতুপর্ণা থেকে রিয়া সেন—যত ভারতীয় নায়িকা এসেছে, সবার ভয়েস দিয়েছে। অপু বিশ্বাস, বর্ষার ভয়েসও দিয়েছে। এখনো অনেকের ভয়েস দেয়।

অবসর যাপনের বয়সেও অভিনয়ে জড়িয়ে আছেন?

যদিও নাটক এখন আমার পেশা, কিন্তু নাটক আমার নেশা, আমার ভালোবাসা। নাটক ছাড়া আমি আমার অস্তিত্বই কল্পনা করতে পারি না। বয়স হয়ে গেছে, মাঝেমধ্যেই শরীর অসুস্থ থাকে। চার-পাঁচ দিন বাসায় থাকতে হয়। তখন অস্থির লাগে—সহশিল্পীদের দেখছি না, কথা বলতে পারছি না, অভিনয় করতে পারছি না। আবার সেই পরিবেশে গেলে সুস্থ বোধ করি। জানি না ভালো অভিনেত্রী কি না, দর্শক ভালো জানেন; কিন্তু ভালোবেসে, অন্তর দিয়ে আমি অভিনয়ের চেষ্টা করি। যখন নায়িকা ছিলাম, তখন বোরকা পরিনি, সবার সঙ্গে মিশতাম। এখনো শপিং করি, বাইরে যাই, অচেনা মানুষ রাস্তা পার হচ্ছেন, বলেন, আসসালামু আলাইকুম, ভালো আছেন? শরীরটা ভালো? জ্যামে গাড়ি থামলে ড্রাইভার বলে—‘আন্টি, ভালো আছেন? মোটরসাইকেল আরোহী ভদ্রলোকও সালাম দেন। আমি জীবনে অনেক সামাজিক, বিভিন্ন সংগঠন, বাচসাস পুরস্কার পেয়েছি; কিন্তু জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাইনি। অনেকে বলেন, কেন একুশে পদক পাওনি? তোমার পাওয়া উচিত ছিল। আমি মনে করি না, উচিত ছিল। হয়তো আমি একুশে পদক পাওয়ার যোগ্য নই, সে কারণে পাইনি। এ নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপই নেই। মানুষের ভালোবাসাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। এত মানুষের ভালোবাসাই আমার অনুপ্রেরণা, আনন্দ ও উত্সাহ। সে জন্য এখনো অভিনয় করে চলেছি। যত দিন সুস্থ থাকব, অভিনয় করে যাব।

(২৫ নভেম্বর, ২০১৭, উত্তরা, ঢাকা)



মন্তব্য