kalerkantho


দুজনে মিলে তো ডিরেকশন দেওয়া যায় না

নানা কারণেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক মাইল ফলক ছবি ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’। ছবির মতোই নাটকীয় এর তৈরির নেপথ্য গল্প। সেটিই শোনালেন মশিহউদ্দিন শাকের। শুনলেন ওমর শাহেদ। ছবি তুললেন কাকলী প্রধান

১৭ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দুজনে মিলে তো ডিরেকশন দেওয়া যায় না

শেখ নিয়ামত আলীর সঙ্গে জুটি কিভাবে গড়ে উঠল?

তিনিও আমাদের বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের একজন ভালো সদস্য ছিলেন। অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন, চাকরি করতেন।

সংসদে আসা-যাওয়া, ছবি দেখার সময় আলাপ হতো। আমার চেয়ে অনেক সিনিয়র, সাত-আট বছরের বড়। লেখালেখিও করতেন। সংসারী মানুষ। তখনো আমি বিয়ে করিনি। চলচ্চিত্র নিয়ে আমার লেখাগুলো পড়ে তাঁর ধারণা হলো, চিত্রনাট্য সম্পর্কে আমার জ্ঞান একটু গ্রাহ্যের মধ্যে আনা যায়। ফলে প্রায়ই ছবি বানানোর ইচ্ছার কথা বলতেন। একবার একটি চিত্রনাট্য লিখে দেখালেন। কলকাতার লেখকের গল্পটিও পড়লাম। চিত্রনাট্য পড়ে যা মনে হলো অকপটেই বললাম, আরো ভালো করা যাবে। আরেকবার আরেক কাহিনির ওপর চিত্রনাট্য লিখে দেখালেন। সেইবারও পরামর্শ দিলাম। যদিও নিজে তখনো চিত্রনাট্য লিখিনি। তার পরও উপলব্ধি হয়েছিল, এই এই জায়গায় উন্নতি করা যায়। ফলে তাঁর আস্থা জন্মাল। আমারও শ্রদ্ধা এলো—তিনি ভালো চলচ্চিত্র তৈরির চেষ্টা করছেন।

 

‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র কাজ কিভাবে শুরু করলেন?

১৯৭৬ সালে হঠাৎ উপন্যাসটি হাতে এলো। ক্লাস এইটে থাকতে প্রথম পড়েছিলাম, আর পড়া হয়নি। আবার পড়ে মনে হলো, আরে, এখন তো ছবি বানানোর চেষ্টা করতে পারি। তত দিনে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের কর্মী হিসেবে অনেক ছবি দেখেছি, কর্মশালাও করেছি। নিয়ামত ভাইকে পড়তে দিলাম। তিনিও বললেন, এ তো খুব ভালো ছবি হবে। চলুন, দুজনে মিলে চিত্রনাট্য লিখে ফেলি। তবে তাঁর একটু অসুবিধা ছিল যে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের মানুষ, এখানে এসে বিয়ে করেছেন। ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র পাত্র-পাত্রীরা ঢাকার গ্রামাঞ্চল, বিশেষত ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জের টানে কথা বলে, এ ভাষাটি আয়ত্ত করতে পারেননি। ফলে সংলাপ লেখার কাজ পুরোটা আমাকেই করতে হয়েছে। লেখক আবু ইসহাকের সংলাপই অনুসরণ করেছি। কিন্তু অভিনেতা-অভিনেত্রীরা উচ্চারণের সময় পরিচালক হিসেবে আমারও তো কান থাকতে হবে। তারা ভুল উচ্চারণ করলে তো টেক করতে পারব না। ফলে গ্রামের এই মানুষগুলোর কথাবার্তার সঙ্গে খুব পরিচিত ইউনিটের এক বন্ধুকে নিয়ে জায়গাগুলোতে গিয়েছি। তাদের কথা শুনে আঁচ করার চেষ্টা করেছি। এভাবে চিত্রনাট্য লেখা হলো। কোন দৃশ্যের পর কোন দৃশ্যটি হবে দুজন মিলে করেছি। নিয়ামত ভাইয়ের বাসায় বসতাম।

 

 

ছবিটিতে অসাধারণ কিছু ডায়ালগ আছে।

সংলাপগুলো বাস্তবতারই প্রতিফলন। আমি মনে করি, চলচ্চিত্রকারের সবার আগে করণীয় হলো, বাস্তবতাকে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বুঝতে পারা। সমাজে কী ঘটছে, চিত্রনাট্যকারকে বুঝতে হয়। ব্রিটিশ, পাকিস্তান এমনকি বাংলাদেশ আমলেও সমাজে বিবদমান দুটি শ্রেণি আছে। একটি শোষণ করতে চায়, অন্যটি শোষিত। শোষিতরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই চিরন্তন গল্পটি যদি বুঝতে পারি, তাহলে সংলাপ কেন, প্রতিটি ছবিতেই তাদের আচার-আচরণ, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সবকিছু সেভাবেই সাজাতে পারব। সংলাপ লিখতে আমার মাস কয়েক লেগেছে। মূল উপন্যাসের কিছুটা সাহায্য নিয়েছি। দৃশ্যগুলো কল্পনা করতে গিয়ে কোথাও যোগ করা দরকার, কোথাও বাদ দেওয়া দরকার—এসব তো করতেই হয়েছে। আসল কথা কী—ছবিটি আগেই মনের মধ্যে দেখে ফেলতে হয়। চলচ্চিত্রকার যদি আগে দেখে না ফেলেন, শুটিংয়ের মাধ্যমে কী ফুটিয়ে তুলবেন?

 

লেখকের অনুমতি কিভাবে নিলেন?

তত দিনে চিত্রনাট্য বেশ খানিকটা লেখা হয়ে গেছে, তথ্য মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে, পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য অনুদান দেওয়া হবে। বাজেট আড়াই লাখ। নগদ এক লাখ, বাকিটা এফডিসি থেকে ফিল্মসহ বিভিন্ন প্রাযুক্তিক সহায়তা হিসেবে দেওয়া হবে। যদিও এই টাকা ছবি করার জন্য যথেষ্ট নয়, অনুদান হিসেবে মন্দও নয়। আবু ইসহাক সাহেব তখন কলকাতার বাংলাদেশ দূতাবাসে সরকারি চাকরি করেন। তাঁর অনুমতি ছাড়া তো অনুদান পাব না। ফলে আমাদের পরিচয় দিয়ে তাঁকে চিঠি লিখলাম, কখনো ছবি বানাইনি। কিন্তু বানাতে চাই। আপনি অনুমতি দিলে চিত্রনাট্য লিখে জমা দিতে পারি। তিনি লিখে পাঠালেন, ‘আমার পক্ষে সম্ভব নয়।   সত্যজিৎ রায়ও আমার এই উপন্যাসটি পড়েছিলেন। একবার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন—ছবি বানাবেন। কিন্তু যখন দেখলেন, ঢাকা শহরের আশপাশের এই সংলাপগুলো এতটাই গ্রাম্য, যে ঠিকমতো হ্যান্ডেল করতে পারবেন না, পরে আগ্রহ দেখাননি। এটি আমার সেই উপন্যাস, খুব যত্নে লেখা বই। আপনারা তো ছবিই করেননি। আরেকটি অফার পেয়েছি। বাংলাদেশেরই এক যুবক, পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ালেখা করেছেন। আমার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রেখেছেন। তাঁর নাম বাদল রহমান।

 

বাদল রহমানের কাছে গেলেন?

তাঁর সঙ্গে আমার ভালোই পরিচয় ছিল। নাটকে, টেলিভিশনে কাজ করতেন। প্রতিভাবান মানুষ। তবে তিনি পুনেতে পরিচালনা নয়, এডিটিংয়ের ওপর পড়েছেন। তাঁর বাসায় যাতায়াত ছিল। কিভাবে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র চিত্রনাট্য লিখছেন জানার জন্য তাঁর বাসায় গেলাম। বললাম, ‘বাদল, অনুদান ঘোষণা করা হয়েছে। চিত্রনাট্য জমা দিচ্ছেন?’ ‘দিচ্ছি। ’ ‘কোন কাহিনি?’ আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, “বিদেশি গল্পের অনুবাদ—‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’। ” ভেতরে ভেতরে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি। তখনই মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল, যেহেতু জমা দিচ্ছেন না, আমরা দিয়ে ফেলি। যদি কোনোভাবে অনুদান পেয়ে যাই, হাতে-পায়ে ধরে লেখককে রাজি করব। তিনি যদি অনুমতি না-ই দেন, ছবি করা হবে না। নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর চিত্রনাট্য জমা দিলাম। পেয়েও গেলাম। চারটি ছবির মধ্যে এটিই প্রথম হলো। বাদল জানলেন, কিছু বলেননি। আমরাও এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলিনি। সাহস করে এরপর সেটির পেপার কাটিংসহ লেখককে চিঠি লিখে ফেললাম—‘খোঁজ নিয়েছি—বাদল অনুমতি নিলেও তাঁর প্রথম চিত্রনাট্য হিসেবে এ গল্প জমা দেননি। তিনি শিশুতোষ ছবি বানাবেন। গল্পটি অনেক ভালো লেগেছিল বলে আমরা জমা দিয়েছি। আপনাকে না জানিয়ে বেয়াদপি হয়েছে। যেহেতু নির্বাচিত হয়ে গেছে, যদি দয়াপরবশ হয়ে অনুমতি দেন, তাহলে এটি তৈরি হতে পারে। ’ তিনি উত্তরে লিখলেন, ‘কিছুদিন পর আমি ঢাকায় আসব, তখন কথাবার্তা বলব। ’ ১৯৭৭ সালের গোড়ার দিকে ঢাকায় এলেন, আলাপ হলো। তিনি আমাদের একটু যাচাই করে দেখলেন—তাঁর এত জনপ্রিয় উপন্যাস কতটা আন্তরিকতা, দক্ষতা দিয়ে আমরা বানাতে পারব। কথা বলে একটু ভরসা পেলেন, আমরা পারতে পারি। চুক্তি হলো। কয়েক হাজার টাকা দিলাম। কিছু বাকি রাখতে হয়েছে। টাকার জন্য পীড়াপীড়ি করেননি। ছবি করতে নেমে গেলাম।

 

দুজনে একসঙ্গে কাজ করতেন?    

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্থপতির চাকরি ছেড়ে দিলাম। দুজনেই যদি পাঁচ দিন চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকি, কাজ করবে কে? তাঁকে বলেছিলাম, পরিবার চালাতে গিয়ে তো চাকরি ছাড়তে পারবেন না। যেহেতু বিয়েই করিনি, আমিই ছাড়ি। মা আর ছোট ভাই সঙ্গে থাকতেন। চাকরি ছেড়ে তাঁদের গ্রামে পাঠিয়ে দিলাম। ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া করে থাকতাম। পরে এক বন্ধু তার চিলেকোঠায় থাকার ব্যবস্থা করে দিল। নিজের খরচটুকুও কমিয়ে ছবির কাজ শুরু করলাম। অনেক ধারদেনা করতে হয়েছে। সেসব নিয়ে অনেক গল্প আছে।

 

লোকেশন কিভাবে পেলেন?

লোকেশন খুঁজতে অনেক সময় লাগলো। যেহেতু ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’, বাড়ির লোকেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ; বর্ষাকালে চারদিকে পানি থইথই করবে, দ্বীপের মতো বাড়িটি জেগে থাকবে। গরমকালে পানি থাকবে না, জায়গাগুলো হেঁটে পার হওয়া যাবে—এমন এক লোকেশন আমাদের দরকার। এক জায়গায় পেলামও। আশপাশের লোকেরা বললেন, এটি গোরস্তান, শুটিং করতে দেব না। আরেক জায়গায় পেলাম—বিদ্যুতের মোটা তার এত কাছ দিয়ে গেছে যে ক্যামেরা ধরলেই চলে আসবে। আমাদের গল্প তো চল্লিশের দশকের, তখন তো গ্রামে এত ভোল্টের বিদ্যুৎ কল্পনাও করা যেত না। এ-ও বাদ। এভাবে গোটা তিনেক লোকেশন বাদ দিতে হলো। সাভারের পরে মানিকগঞ্জ যাওয়ার পথে নয়ারহাট পার হয়ে কিছুদূর গিয়ে হাতের বাঁ দিকে এই লোকেশনটি পেয়েছিলাম। পানিতে ভাসা জায়গা, বর্ষাকালে একটি উঁচু স্থান দ্বীপের মতো জেগে থাকে। মালিক সেখানে সবজি চাষ করেন। তাঁকে বললাম, যত দিন শুটিং করব, ফসল থেকে যে পয়সাটুকু পেতেন, দেব। হিন্দু ভদ্রলোকটির বোধহয় শিল্প-সাহিত্যের সামান্য ধারণা ছিল। রাজি হলেন। সেট বানিয়ে কাজ শুরু করলাম।

 

জয়গুনকে কিভাবে পেলেন?

এই চরিত্রে শর্মিলী আহমেদকে প্রথমে কাস্ট করেছিলাম। তিনি খুব ভালো অভিনেত্রী, এখনো নাটকে অভিনয় করেন। অন্যান্য চরিত্রে কারা অভিনয় করবেন, সেগুলোও ঠিক করে ফেলেছি। লোকেশনে যেসব কুঁড়েঘর তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে প্রথম দিন শুটিং শুরু করলাম। কেন্দ্রীয় চরিত্রের অন্যতম রিকয়ারমেন্ট ছিল, যেহেতু সে খুব দরিদ্র ঘরের মেয়ে, বাড়িতে থাকার সময় অভাবের কারণে ব্লাউজ গায়ে দেয় না। গেরস্থালির কাজে ব্লাউজ পরার তখন খুব একটা চল ছিল না। চল্লিশের দশকে মেয়েদের ব্লাউজ পরার চলও ছিল না, আত্মীয় বাড়ি বা বাইরে যাওয়ার সময় তাঁরা তোলা ব্লাউজ গায়ে দিতেন। ছোটবেলায় আমরাও দেখেছি। শর্মিলীর সঙ্গে আলাপ করলাম, ভাবি, এই হলো ব্যাপার। বললেন, কোনো অসুবিধা হবে না। তাঁর বাসা ছিল মগবাজারে। সকালে ঢাকা থেকে তাঁকে পিকআপ করা হতো। সন্ধ্যায় ফিরিয়ে আনা হতো। পুরো ইউনিট নয়ারহাটে সরকারি ডাকবাংলোতে থাকতাম। প্রথম দিন শুটিং করলাম। ভালোই হলো। পরদিন তাঁর সঙ্গে স্বামী গেলেন। সকালের শুটিং হলো। লাঞ্চের পর ক্যামেরা ওপেন করেছি—তাঁর দৃশ্যটি ছিল, কুঁড়েঘরের দাওয়ায় বসে ভাত রান্না করছেন। হঠাৎ একটি ডাক শুনলেন। ছেলে হাসু আগের স্বামীর ঘরের ছেলে কাশুকে নাম ধরে ডাকছে—কাশু, কাশু। তাঁর কান খাড়া হলো—কাশু কোত্থেকে এলো? তিনি দেখার জন্য বাড়ির কিনারে গেলেন। আকালের সময় যিনি তাঁকে তালাক দিয়েছিলেন, সেই আগের স্বামী (কেরামত মাওলা) নৌকায় তাঁর ছোট ছেলে কাশুকে নিয়ে টেঁটা দিয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছেন। হাসু কাশুকে ডাকছে। এই ছিল জয়গুনের অভিনয়। দেখলাম, এমনভাবে তিনি জড়সড় হয়ে আঁচল টেনে ভাত রান্না করছেন, যে বোঝার উপায় নেই, তাঁর গায়ে ব্লাউজ আছে কী নেই? ঠিক মনঃপূত হলো না। ঘরের কাজ করতে তো মেয়েরা এভাবে জড়সড় হয়ে বসে না। বললাম, ভাবি, আঁচলটা একটু আলগা করে বসুন, দৃশ্যটি সুন্দরভাবে আসবে। কিন্তু দেখলাম, তিনি আমাকে পাত্তা দিচ্ছেন না। আগের দিনও তো এমন কিছু দেখিনি। আমি তো পরিচালক, আমার পরামর্শ তো তাঁকে মানতে হবে। তিনি উল্টো বললেন, ‘না ভাই, এটিই ঠিক আছে। ’ ‘না, এটি ঠিক নেই। কল্পনায় এমন কিছু আমি দেখিনি। দয়া করে ওভাবে বসেন। ’ তিনি বললেন, ‘সম্ভব না। ’ বুঝলাম, নিশ্চয়ই কোনো অসুবিধা হচ্ছে। হয়তো স্বামীর উপস্থিতি বা নিষেধাজ্ঞায় এমন করছেন। বললাম, ‘এমন হলে তো ছবি বানানো যাবে না। সামনের দিনগুলো তো পড়েই আছে। কী করব?’ আবারও বললেন, ‘না ভাই, যেভাবে বসেছি, শুট করেন। ’ নিয়ামত ভাইকে ডেকে আলাপ করলাম, ‘ভাই, কাজ করতে পারব না। ব্যাপারটি খুব ছোট হলেও বাস্তবতার নিরিখে ভুল। তিনি যদি রাজি না-ই হন, তাহলে আজ শুটিং বন্ধ করে দিই। সন্ধ্যায় তাঁর বাসায় গিয়ে বুঝিয়ে বলব। ’ নিয়ামত ভাইও রাজি। ইনফ্যাক্ট, ডিরেকশনটা আমিই দিচ্ছিলাম। দুজন মিলে তো ডিরেকশন দেওয়া যায় না। যদিও ছবিতে দুজনের নাম রেখেছি। যেহেতু তিনি সিনিয়র, চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশও করতে চাইছেন, আমিও চলচ্চিত্রকার, হয়তো বা তাঁর নিজস্ব ছবি করার ব্যাপারে সুবিধা হতেও পারে। ওভাবেই নাম দিয়েছি। তিনি ইনসিস্ট করেননি। নিজে থেকেই কাজটি করেছি।

 

সমঝোতা কিভাবে হলো?

ওটা হয়েই গিয়েছে। নিয়ামত ভাই-ই বলেছেন, আপনি ডিরেকশন দেখেন, আমি প্রডাকশনে দেখতে পারব। ফলে আমার ঝামেলা কমেছে। কাজের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো অসুবিধা হয়নি।

 

শর্মিলী আহমেদকে কী বললেন?

বললাম, ‘আজ আর শুটিং করতে পারব না, দৃশ্যটি ঠিক হ্যান্ডেল করতে পারছি না। ’ সবাই বুঝে ফেলেছে, কিন্তু শুটিং বন্ধ করে দেব, এতটা আনকম্প্রোমাইজিং হবো, ইউনিটের কেউ-ই ভাবেনি। আমার মনে হচ্ছিল, ইজিভাবে তিনি অভিনয় করতে রাজি না হলে তো ছবিটিই হবে না। এত উদ্যোগ, এত পয়সা খরচ—এগুলোর কোনো মানেই থাকবে না। লোকেও হাসবে, বিশেষ করে মূলধারার যাঁরা ছবি বানান, তাঁরা হো হো করে হাসবেন—ওই যে চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী এসেছিলেন দুজন, দেখেন না, কী বানাইছে? একটা নায়িকাও হ্যান্ডেল করতে পারে না। নিজের কানে শুনতে পারছিলাম, সবাই হো হো করে হাসছে। ভাবলাম, পরিচালক হিসেবে কম্প্রোমাইজে যাওয়া যাবে না। সেদিন সন্ধ্যায় ঢাকায় এসে তাঁর বাসায় গেলাম। তাঁর স্বামী বাসায় ছিলেন না। বললাম, ‘ভাবি, কী ভাবলেন?’ ‘না ভাই, আপনি যেভাবে চাইছেন, আমার পক্ষে তো ওভাবে কিছু করা সম্ভব নয়। ’ ‘এ রকম তো কথা ছিল না। প্রথম দিন তো ভালোই ছিলেন। আজ এত জড়সড় ভাব, এ কি ঠিক হলো?’ ‘বুঝতে পারছি, কিন্তু ভাই, আমি পারব না। ‘দয়া করে বলবেন, কেন?’ ‘বুঝতেই পারছেন, পরিবার নিয়ে চলতে হয়, সংসার করতে হয়। ’ নির্দিষ্ট করে তিনি তাঁর স্বামীর কথা বললেন না, পরিবারের কথাটি বললেন। ঘটনা কী হয়েছে বুঝে নিলাম; কিন্তু তাঁদের পারিবারিক বিঘ্ন তো ঘটাতে পারি না। ‘আপনাকে নিয়ে কাজ করতে পারলাম না, খারাপ লাগছে’—এই বলে বিদায় নিয়ে চলে আসব—এমন সময় শর্মিলী আহমেদ বললেন, ‘একটু দাঁড়ান। ’ তাঁকে সাইনিং মানি হিসেবে কিছু টাকা দেওয়া হয়েছিল, সেই খামটি হাতে তুলে দিলেন। হাজার পাঁচেক দিয়েছিলাম। বললেন, ‘যেহেতু কাজ করছি না, টাকা নেওয়ার অধিকার আমার নেই। রেখে দিন। আপনারও তো ক্ষতি তো হয়ে গেল। ’ তিনি সব বুঝতে পারছিলেন। চলে এলাম। শুরু হলো আমাদের আরেক অধ্যায়। কিভাবে নায়িকা পাওয়া যায়, এ ধরনের চরিত্রে যার অসুবিধা হবে না?

 

কী করলেন?

ভাবছিলাম, আমরা কী এখন বসে যাব, নাকি কাউকে নেব? দুই-একজন বললেন, এফডিসিতে এই বয়সের প্রতিষ্ঠিত নায়িকা নন, নাটক করেছেন—এ রকম কাউকে খুঁজে দেখুন। ব্যক্তিগতভাবে খুঁজলাম। একজনকে পেলাম, নাম বোধহয় সেলিনা। তিনি বেতারে কাজ করতেন। তাঁর আগে ফেরদৌসী মজুমদারের কাছে গেলাম। শর্মিলী আহমেদের আগেই তাঁর কাছে গিয়েছিলাম। তিনিই প্রথম পছন্দ ছিলেন। তাঁদের পরিবার তো খুব সম্ভ্রান্ত, সংস্কৃতিবান। তিনি তো ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র গল্পটি জানেনই। তিনি বলেছিলেন, এই চরিত্রটি খুব ভালো, লোভনীয়ও। কিন্তু চলচ্চিত্রে অভিনয় করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই, করব না। পরে শর্মিলী আহমেদকে নিয়ে কাজ শুরু করলাম। সেলিনাকে আমাদের এক বন্ধুর মাধ্যমে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি রাজিও হলেন। কিন্তু কদিন পরেই জানালেন, বিয়ে ঠিক হয়েছে। পাত্র আর্মিতে চাকরি করেন।

 

এরপর?

এক ভদ্রমহিলা, নাম রোকসানা, নাটকে অভিনয় করেছিলেন। রাজশাহী থাকতেন। তাঁর স্বামী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বিচিত্রায় একবার প্রচ্ছদ ছবিতে এসেছিলেন। রাজশাহীতে কিছু নাটকে খুব সুন্দর, বাস্তবধর্মী অভিনয় করেছিলেন। ভাবলাম, ঢাকায় যেহেতু কাউকে দিয়ে কাজ করাতে পারছি না, রাজশাহীতে খুঁজে দেখি না! তাঁর সঙ্গে দেখা করলাম। স্বামী আমাদের সাদরে গ্রহণ করলেন। বললাম, আমরা এমন একজনকে চাইছি, যাকে সব দিক থেকে ‘জয়গুন’ চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। ছবি দেখেছি, আমাদের মনে হয়েছে, আপনি পারবেন। তাঁর স্বামীরও আপত্তি নেই। রোকসানা বললেন, ঢাকায় এক ভাই আছেন, ওখানে থাকব। ভাইকে চিনতেও পারেন, তিনিও আপনার মতো স্থপতি। তিনি বুয়েটে আমার দুই ব্যাচ সিনিয়র। সংস্কৃতিমনা, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ভালো তবলা বাজাতেন। বললাম, তাহলে তো কোনো চিন্তাই নেই। তিনি বললেন, তার পরও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ক্ষেত্রে একটু আপত্তি থাকে। চলচ্চিত্রের ব্যাপারে নানা আজেবাজে কথাবার্তা শুনি। তাঁর বাসায় থাকতে হলে তাঁর সঙ্গে একটু কথা বলতে হবে। বললাম, আমাকে সামাল দিতে দিন, আমি কথা বলি। ঢাকায় ফিরে ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা হলো। বললেন, দুই-এক দিন পর যোগাযোগ করো। পরে বললেন, একটু অসুবিধা হয়ে গেল। আমার বাসায় থাকলে তো স্ত্রীর সঙ্গে সমঝোতা করে থাকতে হবে। কিন্তু স্ত্রী ব্যাপারটি পছন্দ করছে না। রোকসানাকেও নেওয়া হলো না। আরেকজনকে দেখলাম, তিনিও রাজি হলেন না। এভাবে ধাক্কা খেতে খেতে পরে ভাবলাম যে সবাই যদি এ কথা বলেন তাহলে কিভাবে হবে? আরেকবার ফেরদৌসী মজুমদারের কাছে গেলাম, ‘আপা, কেউ তো রাজি হচ্ছে না। পরিবার থেকে বাধা দিচ্ছে, আপনি মতটি পাল্টান না। ’ তিনি বললেন, ‘আপনারা ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিমের মেয়ে ডলি ইব্রাহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। বিটিভিতে কিছু নাটকে ভালো অভিনয় করেছেন। ’ বিটিভিতে গিয়ে খুঁজে বের করে কথা বললাম। পছন্দও হলো। রাজি হলেন। তাঁর স্বামীও রাজি।

 

আবার কাজ শুরু হলো।

নায়িকা খুঁজতে আমাদের প্রায় এক বছর লেগে গেল। যে সেট বানানো হয়েছিল, কুঁড়েঘরগুলো কে যেন পুড়িয়ে দিয়েছে। যে ভদ্রলোকের জায়গা ব্যবহার করছি, উনি তো টাকা পাবেন। তাঁর প্রতি বিদ্বেষবশত কেউ বোধ হয় আয়ের পথ বন্ধ করতে আগুন দিয়েছে। গাছটি পুড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ডাল-পালা, পাতা কমে গেল। সেটিই ব্যবহার করেছি। যদিও সমালোচকরা অন্য অর্থ করেছেন—যে পাকিস্তানের কোনো আশা নেই, মরা গাছের মরা ডালে সেটির পতাকা ঝুলিয়ে তাকে তাজা করার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছে। আবার শুটিং শুরু হলো। অভিনয়শিল্পী হিসেবে আরো অনেককে নিলাম, যাঁরা নিয়মিত না হলেও অভিনয়ে যুক্ত ছিলেন। গায়ের মোড়ল গদু প্রধান, ঘরে তিন স্ত্রী থাকাসত্ত্বেও জয়গুনের প্রতি যার আগ্রহ ছিল, তিনি ‘রংবাজ’ ছবির পরিচালক জহিরুল হক। আরিফুল হক নাটকের লোক। মোতালেবও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। হাতের কাছে পেলেই চরিত্রের সঙ্গে মানানসই মনে হলে নিয়ে নিতাম। পয়সাকড়ি না থাকাসত্ত্বেও সিরিয়াসলি ছবিটি করার চেষ্টা করছি বলে এফডিসির লোকদেরও আমাদের প্রতি সহানুভূতি তৈরি হলো।

 

ডলি ইব্রাহিম (আনোয়ার) কেমন করেছেন?

অভিনয়শিল্পী হিসেবে সে খুব ভালো ছিল। খুব আবেগপ্রবণও ছিল। কী একটা কথায় প্রধান সহকারী পরিচালক কাজল আরেফিনের সঙ্গে বাজি ধরেছিল। ঘটনাটা পরে জেনেছি। তখন আমি ট্রাকে বসে চিত্রনাট্য ঘষামাজা করছি। দুপুরের পরে ঢাকা-চট্টগ্রাম লাইন দিয়ে ট্রেন আসছে, শব্দ পাচ্ছি। সেই লাইনের ওপর ডলি গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই হৈহৈ করছে—‘ম্যাডাম, লাইন থেকে নামেন। ’ ট্রেন এত কাছে এসেছে যে হুইসিল দিচ্ছে। আমি তো অবাক। দেখলাম, কাজল দৌড়ে গিয়ে তাকে একঝটকায় নামিয়ে নিল। বলল, ‘ভাবি, মাফ চাই। ’ কাজলকে ডাকলাম। ঘটনা হলো—তার ও ডলির আলাপের পর সে বলেছে, আত্মহত্যা করা বিরাট কোনো কাজ নয়। যে কেউ যেকোনো সময়ই করতে পারে। বাজি ধরা হলো ১০ হাজার টাকা। এতটা ইমোশনাল, যে ডলি দাঁড়িয়ে গেল ট্রেনের সামনে। সে মারা গেলে এই টাকা তার ছেলে পাবে। ছেলেটির বয়স মাত্র সাত-আট। এ ছবিতেই আলোক চিত্রকর আনোয়ার হোসেন ও তার প্রেম হয়। তবে তাদের প্রেমের পুরোটা জানতে পারিনি। ছবি রিলিজের পর শুনি, তারা বিয়ে করেছে। সে নিয়ামত ভাইয়ের ‘দহন’ করেছে। তার আরো সিনেমা করার দরকার ছিল। খুব মেধাবী ছিল।

 

পরিচালনা কিভাবে করতেন?

প্রধান সহকারী পরিচালক কাজল আরেফিন আমজাদ হোসেনসহ আরো অনেকের সহকারী হিসেবে কাজ করেছে। পরে ‘সুরুজ মিয়া’ করেছে। যদিও এটি আমার প্রথম ছবি, এফডিসিতে কয়েক ঘণ্টা একনাগাড়ে শুটিং দেখার অভিজ্ঞতাও ছিল না। কিভাবে শুটিং করে কালেভদ্রে চোখে পড়েছে; কিন্তু ডিটেইল জানতাম না। সেটি কাজলের কাছ থেকে শিখেছি। সে খুব সহযোগিতা করেছে। ইউনিটের সবার প্রতি আমি খুব কৃতজ্ঞ—তাঁরা দেখেছেন, ভালো ছবি করার চেষ্টা করছি, ফলে সবাই মন-প্রাণ ঢেলে কাজ করেছেন। ছবিতে আব্বাসউদ্দীনের রেকর্ডের গান ব্যবহার করেছি। জয়নুল আবেদিনের বড় ছেলে সাইফুল আবেদিন আমার সঙ্গে পড়ত। বাসায় গিয়ে তার মা বেগম জয়নুল আবেদিনের কাছ থেকে কিছু স্কেচ ব্যবহারের অনুমতি নিয়েছিলাম। বিশ্বযুদ্ধের ছবি আর্কাইভ থেকে নেওয়া।   

 

এই ছবিতেই তো বিখ্যাত অনেকের শুরু হয়েছে?

ক্যামেরায় কাজ করেছে আনোয়ার হোসেন। সে পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়ালেখা করেছে। বুয়েটে সে আমার স্থাপত্য বিভাগেই দুই ক্লাস নিচে পড়ত। সে আন্তর্জাতিক মানের আলোকচিত্রী। ছবির প্রতি তার আগ্রহ জাগানোতে আমারও ভূমিকা আছে। আনোয়ারকে ছবি দেখতে বলতাম। যখন দেখলাম, ফিল্মে আগ্রহ জন্মেছে, পুনেতে পড়তে বললাম। ফিরে আসার পর এটিই াঁর প্রথম ছবি। সাইদুল আনাম টুটুলও পুনে থেকে এডিটিং পড়ে এসেছেন। তাঁরও এটি প্রথম ছবি।

 

কত দিন লাগল?

ছবি শেষ করতে তিনটি বছর লেগে গেল। টাকা-পয়সা নেই, মাঝেমাঝে ফুরিয়ে যায়। ধারদেনা করে আবার ছবি করি। সাড়ে ৯ লাখ টাকার ওপরে, প্রায় ১০ লাখ লেগেছে। আড়াই লাখে তো ছবি হয় না। অনুদান আংশিক অনুপ্রেরণা। এখনো সেটিই দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালের মাঝামাঝি ছবি শেষ হলো। এর মাঝে ১৯৭৮ সালের শেষ দিকে বিয়ে করলাম। কিছুদিনের মধ্যে স্ত্রীর বাবা মারা গেলেন। তাঁর প্রভিডেন্ট ফান্ডের কিছু টাকা ছিল। সেগুলো দিল। নিজে বাংলাদেশ বিমানে কাজ করত। তার আয়ের এক অংশ আমাকে দিত। কোথায় সংসার করব, ছবির পেছনে ছুটছি। চাকরিও করতে পারছি না। সব দায়িত্ব স্ত্রী নিয়েছিল। টাকা জোগাড় নয়, বাচ্চারা বড় হয়ে যাচ্ছে দেখে সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগত। এক বছরেই তো ওরা অনেকটুকু বাড়ে। হাসুর (লেনিন) ক্ষেত্রে তা বেশি ঘটেছে। ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে আমরা ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ মুক্তির ব্যবস্থা করলাম। আশা ছিল—ছবি হিসেবে একে ধর্তব্যের মধ্যে আনা হলে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাবে।

 

কবে মুক্তি পেল?

১৯৭৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর রিলিজ হলো। এফডিসিওলারা সব দখল করে রেখেছে, ঢাকায় কোনো হল পাচ্ছিলাম না বলে নাটোর শহরের এক হলে মুক্তি দেওয়া হলো। শুক্র, শনিবার ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ দেখানো হলো।

 

শ্রুতলিখন : রবিউল হোসাইন

(১৮ সেপ্টেম্বর, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, মিরপুর, ঢাকা) 


মন্তব্য