kalerkantho


খান আতাকেই কোনো পুরস্কার দেওয়া হয়নি

সেখানে খুরশীদ আলম কে?

চার শতাধিক ছবিতে গান করেছেন। এর মধ্যে শুধু জনপ্রিয় গানের তালিকা করতে গেলে হয়ে যাবে এক লম্বা ফিরিস্তি। দেশের প্রধান সুরকারদের সবাই যেমন তাঁকে দিয়ে গান করিয়েছেন, তেমনি আবার তাঁর গানে ঠোঁট মিলিয়েছেন তাঁর কালের প্রধান সব অভিনেতাই। এখনো লোকের মুখে মুখে ফেরা বহু গানের স্রষ্টা মো. খুরশীদ আলমের মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৮ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



সেখানে খুরশীদ আলম কে?

আপনার জন্ম? পারিবারিক জীবন?
আমার জন্ম ১৯৪৬ সালে। গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাট জেলার কালাই থানার হারুনজাও গ্রাম।

বাবা এ এফ তসলিম উদ্দিন আহমেদ, মা মেহেরুন্নেসা খানম। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে আমি বড়। জন্মের পর আমরা পুরান ঢাকার কাজি আলাউদ্দিন রোডের নাজিরাবাজারে যৌথ পরিবারে চলে আসি। চাচা ডা. আবু হায়দার সাইদুর রহমান ঢাকা ডেন্টাল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস পড়ার সময় ঢাকা মেডিক্যালভিত্তিক ‘ঢাকা শিল্পীসংঘ’-এ গান করতেন, রবীন্দ্রসংগীত শেখাতেন। তাঁর কাছেই হাতেখড়ি। নবাবপুর সরকারি হাই স্কুলে পড়ার সময় গানের শিক্ষক শেখ আবুল ফজলের কাছে তালিম নিয়েছি। স্কুলের নানা অনুষ্ঠানে গেয়েছি। ১৯৬২ ও ৬৩ সালে ইস্ট পাকিস্তান এডুকেশন উইকে পর পর দুইবার রবীন্দ্রসংগীত ও আধুনিকে পুরো পূর্ব-পাকিস্তানে প্রথম হয়েছিলাম। সেই থেকে বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা উত্সাহিত করতে লাগল। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত নাজিমউদ্দিন রোডের রেডিও অফিসে রবীন্দ্রসংগীত গাইতাম। তবে ১৯৬৫ সালে আইয়ুব খান রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করে দিলেন। ফলে ১৯৬৬ সালে খোন্দকার ফারুক আহমেদের কাছে দুই দিনে সাতটি আধুনিক গান শিখে বেতারে অডিশন দিলাম। বিচারক ছিলেন আবদুল আহাদ, ফেরদৌসী রহমান ও সমর দাস। গান গাওয়ার পরে সমরদা বললেন, ‘তোমার গলা আমাদের পছন্দ হয়েছে; কিন্তু তুমি একজনকে কপি করো। ’ বললাম জি। তিনি বললেন, ‘কপি করলে তুমি কোনো দিনও ভালো শিল্পী হতে পারবে না। সবাই বলবে খুরশীদ আলম সেই শিল্পীর মতো গান গায়। তুমি থাকো কোথায়?’ ঠিকানা বললাম। তিনি বললেন, ‘আমি লক্ষ্মীবাজার থাকি। সকাল ৭টার মধ্যে চলে আসবে। আমি তোমার অনুকরণের ছাপ মুছে দেওয়ার চেষ্টা করব। ’ সকাল ৭টায় চলে যেতাম, ৮টায় ফিরতাম। তিনি এক ‘সা’ প্রথমে পাঁচ, পরে ১০, ১৫, ২০ সেকেন্ড এভাবে এক-দেড় মিনিট ধরে গাওয়াতেন। আমাদের বাসার পাশেই ছিল মসজিদ। আশপাশের বাড়িগুলোতে হাজি সাহেবরা থাকতেন। তাই আমাদের হিন্দু বাড়িটির প্রদীপ দেওয়ার চওড়া গর্তে গলা ঢুকিয়ে রেওয়াজ করতাম, যাতে তাঁদের কোনো সমস্যা না হয়।

লেখাপড়া?
দাদা জসিম উদ্দিন আহমেদের প্রতিষ্ঠিত আজিমপুরের ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে এক বছর পড়েছি। এরপর কাপ্তানবাজারের নবাবপুর হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক। আমার চাচার সঙ্গে সুরকার, গীতিকার ও উচ্চাঙ্গসংগীতের ওস্তাদ আজাদ রহমানের খাতির ছিল। তিনি তখন কলেজ অব মিউজিকের অধ্যক্ষ। এখান থেকে প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছি। রবীন্দ্রসংগীতে ভালো নম্বর পেয়েছিলাম। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানে গ্র্যাজুয়েশন করতে পারলাম না বলে জগন্নাথ কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করলাম।

বেতারে শুরু?
১৯৬৭ সালে শাহবাগ বেতারে প্রথম গান করে ২০ টাকা সম্মানী পেয়েছিলাম। প্রথম গেয়েছি—‘‘চঞ্চল দুনয়নে বল না কী খুঁজছ?/চম্পা না করবী না পলাশের গুচ্ছ?’’ গীতিকার জেবুন্নেসা জামাল, সুরকার আজাদ রহমান। সেদিন গীতিকার কবি সিরাজুল ইসলামের লেখা ও আজাদ রহমানের সুরে আরেকটি গান গেয়েছিলাম—‘তোমার দু-হাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম/থাকব তোমারই আমি কথা দিলাম। ’ বেতারে আমার অনেক আধুনিক গান গাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। সমর দাস, আবদুল আহাদ, আবদুল লতিফ, ধীর আলী, মনসুর আলী, কাদের জামেরী, রাজা হোসেন খান, খুরশিদ খান, আজাদ রহমান, আলম খান, খোন্দকার নুরুল আলম, দেবু ভট্টাচার্যের মতো নামকরা সুরকারের সুরে গান গাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। তখন নানা ধরনের স্কেচ প্রগ্রাম হতো। বর্ষাকালে দুই-তিনজন ভালো শিল্পীর বর্ষার গান হতো। এখন এগুলো হয় না। ফেরদৌসী আপা, হাসিনা মমতাজ বা আনজুমান আরা বেগম, লায়লা আরজুমান্দ বানু আপার সলো গান থাকত। আমরা কোরাস গাইতাম। একুশে ফেব্রুয়ারি, ঈদে বিশেষ অনুষ্ঠানেও গাইতাম। বেতারে আমার ‘যে সাগর দেখে তৃপ্ত দুচোখ মুগ্ধ তোমার মন’, ‘ঝলক দিয়া কাকন পরে’, ‘সূর্যটা আগুনের পিণ্ড’, ‘খোঁপার বাগান খালি করে ওই গোলাপটা আমায় দাও’সহ আরো বহু জনপ্রিয় গান আছে।

অনেকের সঙ্গে গাওয়ার স্মৃতিও তো আছে।
অবশ্যই। ফিরোজা বেগম, ফেরদৌসী রহমান, রওশন আরা মাসুদ, রওশন আরা মুস্তাফিজ, ইসমত আরা, জিনাত রেহানা, বেদারউদ্দিন আহমেদ, এম এ হামিদ, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, খোন্দকার ফারুক আহমেদ, মাহমুদুন্নবী, মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, মোহাম্মদ রফিকুল আলম, আনজুমান আরা বেগম, ফরিদা পারভীন, নার্গিস পারভীন, মালা ও রূপা খান, নাজমুল হুদা বাচ্চু, সোহরাব হোসেনসহ অনেকের সঙ্গে গান গেয়েছি। ফেরদৌসী আপা তো এখনো আমাদের আইডল। আমাদের ভুল হলেও তিনি বুঝতে দিতেন না। শুধু বলতেন, ‘এভাবে গানটি গাও, তাহলে ভালো হবে ভাই। ’ তখন গান খুব বাণীপ্রধান ছিল। অশ্লীল শব্দ গানে ছিল না। এই ডিজিটাল যুগের গানে এসব চলে এসেছে। কারণ লোকে এগুলো গ্রহণ করেছে। আনজুমান আপার সঙ্গে চলচ্চিত্রেও  গেয়েছি। তাঁরা আমাদের মঙ্গল চাইতেন। কাদের জামেরী খুব ভদ্র, গুণী ও মেধাবী সুরকার ছিলেন। তিনি সব সময় বলতেন, ‘তোমার মতো আমারও বয়স ছিল। আল্লাহর ওয়াস্তে এসব জিনিস বাইরে খেও না। কেউ দিলেও খাবে না। ’ তিনি যেগুলো খেতে বারণ করেছিলেন, সেগুলো এখনো বাইরে আমি খাই না। বেতারের কর্মকর্তারাও আমাদের অভিভাবকের মতো ছিলেন। সিনেমায় প্রথম রেকর্ডিংয়ের দিন বেতারের সংগীত বিভাগের প্রত্যেক অফিসার আমাকে উত্সাহ দেওয়ার জন্য ফার্মগেটের ইস্ট পাকিস্তান গ্রামোফোন কম্পানিতে গিয়েছিলেন। তখন আমাদের মধ্যে সহযোগিতা ছিল। গীতিকার কোন কোন জায়গায় উচ্চারণ ভুল করে বা উচ্চারণ করতে কষ্ট হয়, সেসব বাদ দিয়ে শিল্পীর জন্য গান লিখতেন। যখন বাণিজ্যিক কার্যক্রমে গাইতাম, যন্ত্রীরা বলতেন, ‘এই জায়গাগুলো ফাস্ট হয়ে যাচ্ছে, একটু স্লো করো। ’ এখন অনেক ভালো শিল্পী আছেন। কিন্তু তাঁদের মাথার ওপর তখনকার মতো ছায়া নেই। সমরদা, খান আতাউর রহমান, আবদুল আহাদের মতো ভুল ধরিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। বেতার আমাকে অনেক দিয়েছে। বেতার, বেতারের শ্রোতারা আমাকে খুরশীদ আলম বানিয়েছেন। বেতারে ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, কে জি মোস্তফা, আজিজুর রহমান, খান আতার মতো সুরকার, গীতিকবির সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্য হয়েছে। আমি তাঁদের সবার কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

কিভাবে গাইতেন? রি-অ্যাকশন?
সলো কিংবা কোরাস—সবই আমাদের লাইভ করতে হতো। একটি মাইক্রোফোনেই গাইতাম। বেতারে আধুনিক, দেশের গান, ভাষার গান—সবই গেয়েছি। তখন একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষার গান প্রচারিত হতো। এখন তো কোনটি আধুনিক, কোনটি ভাষার গান বোঝা যায় না। বেতারে প্রচারিত আমার উল্লেখযোগ্য দেশের গান ‘পদ্মা, মেঘনা, সুরমা, যমুনা’র গীতিকার মনিরুজ্জামান মনির, সুরকার আলাউদ্দিন আলী; ‘পাখির নাম দোয়েল, ফুলের নাম শাপলা, দেশের নাম বাংলাদেশ, সুজলা সুফলা’র গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুরকার সত্য সাহা। খোন্দকার নুরুল আলম, রফিকুজ্জামান, ডা. আবু হায়দার সাইদুর রহমানেরও অনেক দেশাত্মবোধক গান গেয়েছি। তখন কবি শামসুর রাহমান, আবুবকর সিদ্দিক বেতারে গান লিখতেন। সেগুলো গেয়েছি। সমরদার সুরে ১০ থেকে ১৫টি ভাষার গান গেয়েছি। ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় থেকেই তো বেতারে গাইছি। এখনো গাই। এখন গানপ্রতি দুই হাজার টাকা সম্মানী পাই। ইফতেখার আলম সাহেবের স্ত্রীই তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘বেতারে ‘তোমার দু-হাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম’ এ গানটি যিনি গেয়েছেন, সেই ভদ্রলোককে দিয়ে তোমার সিনেমায় গান করাও। ” সেভাবেই সিনেমায় আমার গানের শুরু। পূর্ব পাকিস্তানে তখন এইচএমভির অফিস ছিল না। ক্যাসেট বা ডিস্কও করা যেত না। করাচিতে এইচএমভির প্রধান দপ্তর ছিল। তবে ঢাকায় সেটির লিয়াজোঁ অফিসের প্রধান ছিলেন কলিম শরাফী ভাই। তাঁর সঙ্গে রোজি লতিফ ছিলেন। তাঁরা দয়া করে আমার ‘তোমার দু-হাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম’ গানটি পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে ডিস্ক করে আনলেন। ডিস্ক বিক্রিতে সেটি পুরো পাকিস্তানে সপ্তম স্থানে ছিল।

পরে আর রবীন্দ্রসংগীত গাইলেন না কেন?
আইয়ুব খান রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া বন্ধ করে দেওয়ার পর আর গাইতে যাইনি। স্বাধীনতার পর আবার রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া শুরু হলে রিস্ক নিইনি। কারণ তখন আধুনিক গানে মোটামুটি সবাই আমাকে চেনে। কোনো কারণে রবীন্দ্রসংগীত ভালো গাইতে না পারলে রবীন্দ্রসংগীতে তো বটেই, আধুনিক গানেও আমার অবস্থান হারিয়ে যাবে। এটি আমার ব্যক্তিগত ধারণা। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি, এ দেশের মানুষ খুব আবেগপ্রবণ। তারা কখনো কাউকে তালি দিয়ে ওপরে ওঠায়, কখনো নিচে নামিয়ে দেয়।

সিনেমায় শুরু?
১৯৬৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর ‘আগন্তুক’ ছবির মাধ্যমে সিনেমায় এলাম। চাচার লেখা ‘তোমার দু-হাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম’ গানটি সুরকার আজাদ রহমান তিন-চার দিন তাঁর বাসায় শেখালেন। ছবিটির পরিচালক ছিলেন বাবুল চৌধুরী। এটি নায়করাজ রাজ্জাকের লিপে ছিল। প্রথম দিন রেকর্ডিং না হওয়ার পর বেতারের কর্মকর্তারা বললেন, ‘মন খারাপ করো না বাবা, একদিন না একদিন রেকর্ডিং হবেই। ’ ভাবলাম, বেতারে তো গাই-ই; ফলে সিনেমায় গাইতে না পারলেও অসুবিধার কিছু নেই। সে বছরের ডিসেম্বরে রাজ্জাক আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে গেলেন। স্ত্রী, বাবুর্চি, ড্রাইভারের সঙ্গে কিভাবে আলাদা ভাষায় কথা বলেন, রেগে যান দেখালেন। পরে বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি তার ভয়েসে লিপসিং করব। ’ এর সাত-আট দিন পর গানটির রেকর্ডিং হলো। সেই গানটি হিট না করলে হয়তো আমার সিনেমায় আর গাওয়া হতো না। কারণ আমাকে বলা হয়েছিল গানটি হিট করলে ১০০ টাকা সম্মানী পাব, হিট না করলে পয়সা পাব না। ছবিটিতে আমি একটি গান গেয়েছি, অন্যটি সোহরাব হোসেন। তাঁর গানে আমরা কোরাস গেয়েছি। চলচ্চিত্রে আমি নায়করাজ রাজ্জাকের লিপে সবচেয়ে বেশি গান গেয়েছি। তাঁর সঙ্গে আমার ঘরোয়া সম্পর্ক আছে। তাঁর জন্মদিনে সব সময় ডাকেন। আমি যাই। বড় ভাইয়ের মতো তাঁকে শ্রদ্ধা করি। তিনি আমাকে অনেক পরামর্শ, সহযোগিতা করেছেন। তিনি তাঁর ‘চাপাডাঙ্গার বৌ’ ছবির শুটিংয়ের সময় বড় ছেলে বাপ্পারাজকে বলেছিলেন, ‘চাচাকে সালাম করো। ’ তিনি এমন এক জায়গায় অবস্থান করেন, এই কাজটি না করালেও পারতেন। তবে তিনি কোনো দিন অতীতকে অস্বীকার করেননি। এই ঘটনা আমি জীবনেও ভুলব না।

এর পরের ছবি?
‘সাধারণ মেয়ে’তে খুব দ্রুতলয়ের একটি গান ছিল—‘ডিম মারো ডিম মারো/যত পারো জোরে মারো মারো/আমি ভেজে ভেজে খাবো/খেয়ে খেয়ে তাগড়া হব/তাগড়া হয়ে আগ্রা যাব। ’ লিখেছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুরকার সত্য সাহা, জাফর ইকবালের লিপে ছিল। আমার তৃতীয় ছবি—‘পিচ ঢালা পথ’। তখন ৭০ কাজি আলাউদ্দিন রোডে থাকি। ছবির সুরকার রবীন ঘোষ ও গীতিকার আহমদ জামান চৌধুরী পর পর দুদিন আমার বাসায় গেলেন। কিন্তু আমাকে পেলেন না। পরে চিরকুট রেখে এলেন—‘আমি সুরকার রবীন ঘোষ। ইস্কাটনে থাকি। আপনি আসবেন। একটি গান গাইতে হবে। ’ এই আচরণ এখন আর পাওয়া যাবে না। আমি তাঁর বাসায় গেলাম। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গান তুলে ভাত খেলাম। রেস্ট নিয়ে চা খাওয়ার সময় তিনি বললেন, ‘গানটি মনে আছে?’ জি আছে। ‘কালকে আবার আসতে হবে। ’ পরদিন গিয়ে আবার শিখলাম। এরপর রেকর্ডিং হলো। এই ছবিতে আমার গানটিতে লিপসিং করেছেন চৌকস অভিনেতা, কমেডিয়ান খান জয়নুল। আস্তে আস্তে আরো ছবিতে গাওয়ার সুযোগ হলো। সত্যদার ছবিতে গাইলাম। ‘শাপমুক্তি’, ‘সমাধি’, ‘গড়মিল’, ‘মানুষের মন’, আজাদ রহমানের সুরে ‘মতিমহল’, ‘রাতের পরে দিন’, ‘অনন্ত প্রেম’ ছবিতে গাইলাম। আলম খানের সুরে ছবিতে অনেক গান গেয়েছি। ‘মিন্টু আমার নাম’ ছবিতে ‘আজকে না হয় ভালোবাসো আর কোনো দিন নয়’, ‘দোস্ত-দুশমন’ ছবিতে ‘চুমকি চলেছে একা পথে’ তাঁর সুরে আমার বিখ্যাত গান। সুরকার আজাদ রহমান, আলী হোসেনের কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। কারণ তাঁরা ব্রেক না দিলে আমি খুরশীদ আলম হতাম না। আলী হোসেন সাহেব আমার জন্য অনেক করেছেন। ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘সোহাগ’সহ অনেক ছবিতে গাইয়েছেন। তাঁর সুরে ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’ ছবিতে ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জমানের লেখা ‘ও দুটি নয়নে স্বপনে চয়নে নিজেরে যে ভুলে যায়’, ‘ওয়াদা’ ছবিতে ‘যদি বউ সাজো গো আরো সুন্দর লাগবে গো’—এই বিখ্যাত গানের গীতিকার মাসুদ করিম, সুরকার সুবল দাস। আনোয়ার পারভেজ, খোন্দকার নুরুল আলম, মনসুর আহমদের মতো বিখ্যাত সুরকাররা আমার জন্য অনেক করেছেন।

অনেক বিখ্যাত শিল্পীর সঙ্গেও তো গেয়েছেন।
মাইকে কিভাবে গাইতে হয়, থ্রোয়িং, ডেলিভারি, এক্সপ্রেশন—এসব আলাদা আলাদা ছবিতে সুরকার, গীতিকাররা যেমন শিখিয়েছেন তেমনি রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, শাহনাজ রহমতউল্লাহসহ অন্য গায়ক-গায়িকাদের কাছ থেকেও শিখেছি। সৈয়দ আবদুল হাদী, অ্যান্ড্রু কিশোর, রুলিয়া রহমান, নিগার সুলতানার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ডুয়েট গেয়েছি। শাকিলা জাফর, শাম্মী আখতারের সঙ্গেও গেয়েছি। রুনা পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পর তাঁর সঙ্গে ‘জিঘাংসা’ ছবিতে আমি প্রথম গান গেয়েছি। ‘পাখির বাসার মতো দুটি চোখ তোমার ঠিক যেন নাটোরের বনলতা সেন’—এর গীতিকার দেওয়ান নজরুল, সুরকার মনসুর আহমদ। তাঁর সঙ্গে অনেক গান গেয়েছি। তিনি সহশিল্পী হিসেবে খুব ভালো। কোনো লাইন ভুলে গেলে বিরতির সময় বলতেন, খুরশীদ সাহেব এ জায়গাটি এমন হবে। সত্যিই স্বীকার করি—গলায় গান তুলতে আমার একটু দেরি হয়। আমি সুর ভুলে যাই। সাবিনা ইয়াসমিনও লাইভ রেকর্ডিংয়ের সময় সহযোগিতা করতেন। বলতেন, ‘এই জায়গাটি এভাবে ধরো। ’ শাহনাজের সঙ্গে আলী হোসেনের সুরে আমার দুটি গান করার সৌভাগ্য হয়েছে। একটি হলো ‘আপনজন’ ছবিতে—‘স্লামালাইকুম, কেন এত দেরি হলো? ওয়ালাইকুম সালাম এখন কোথায় যাবে চলো। ’ গানটির গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুরকার আলী হোসেন। ফেরদৌসী আপার সঙ্গে আমার সিনেমায় একটি গান করার কথা ছিল। তবে অশ্লীল শব্দ ছিল বলে দুবার চেষ্টা করেও গানটি গাইতে পারিনি। সেই ছবির সুরকার ছিলেন রাজা-শ্যাম (রাজা হোসেন ও সুজেয় শ্যাম) জুটি। পরে তিনি বললেন, ‘আমার সামনে এই লিরিকস সে গাইতে পারবে না। সাবিনা ইয়াসমিনকে নিয়ে আসো। সে সঙ্গে সঙ্গে গাইতে পারবে। ’ পরে সাবিনা তাঁর সঙ্গে গেয়েছেন।

আপনার বেশির ভাগ গানই দ্রুত লয়ের কেন?
‘চঞ্চল দুনয়নে বল না কী খুঁজছ’ খুব দ্রুত লয়ের গান ছিল বলে তখন থেকে শ্রোতাদের মনে হতে লাগল মো. খুরশীদ আলম মানেই দ্রুত লয়ের গান। জীবনে হয়তো সাত-আটটি ধীর লয়ের গান গাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। বাকি সবই দ্রুত লয়ের, রিদমিক গান। আলম ভাইয়ের সুরে ‘তবলার ধেরে কেটে তাক/আজকাল হয়ে গেছে সব বরবাদ’ গানটিও খুব দ্রুত লয়ে গেয়েছি। ‘মিন্টু আমার নাম’, ‘আজকে না হয় ভালোবাসো’ লিখেছেন দেওয়ান নজরুল, সুর করেছেন আলম খান। ‘চুমকি চলেছে একা পথে’ও দেওয়ান নজরুলের লেখা। ‘চুপি চুপি বলো কেউ জেনে যাবে’র সুরকার মনসুর আহমেদ। এই গুণী যন্ত্রশিল্পী এ প্রজন্মের কি-বোর্ড বাদক মানাম আহমেদের বাবা। খুব পড়ালেখা জানা সুরকার ছিলেন।

‘চুমকি চলেছে একা পথে’র পেছনের গল্প?
আলম ভাইয়ের কাছে ‘দোস্তি’ নামের একটি ছবি এলো। এতে ভারতের ‘শোলে’ ছবির কিছুটা ছায়া আছে। সেখানে অমিতাভ বচ্চন ও ধর্মেন্দ্রর লিপে একটি গান আছে—‘এ দোস্তি হাম নেহি তোরেঙ্গে। ’ মান্না দে ও কিশোর কুমার গেয়েছিলেন। বাংলা গানটি আমি ও রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ফাহিম হোসেন মিলে গেয়েছিলাম—‘দোস্ত আমরা দুজন/হবো না দুশমন/ছিঁড়বে না এ বাঁধন/রবে চিরদিন। ’ পরে সলো গাইলাম ‘চুমকি চলেছে একা পথে’। এটির গীতিকার দেওয়ান নজরুল চলচ্চিত্র পরিচালকও ছিলেন। এই ছবির নায়িকা ছিলেন ববিতা, রাজ্জাক নায়ক। গানটির লিরিকসে একটু ঠাট্টা-মসকরা আছে বলে হয়তো এটি একটু বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ভালো লাগে, ২০১৭ সালেও আমার এই গানগুলোর চাহিদা আছে। ‘আজকে না হয় ভালোবাসো’ গানটির সুরকার আলম খান। তিনি আমাকে দিয়ে সব সময় দ্রুত লয়ের গান গাইয়েছেন। খুব হালকা কথার এই গানগুলো হিট করেছিল, ছবিগুলোও। তিনি একবারই আমাকে দিয়ে ‘আসামী হাজির’ ছবিতে ‘ও রে হাসু রে হাসু/আমায় ফাঁকি দিলো’ নামের একটি সিরিয়াস গান গাইয়েছেন। শুধু আমাকেই নয়, তিনি অ্যান্ড্রু কিশোর, শাম্মী আখতারসহ অনেক বিখ্যাত শিল্পীকে সিনেমার গানে নিয়ে এসেছেন। তাঁর ভাণ্ডার থেকে যতটুকু সম্ভব আমাদের দিয়েছেন। ১৯৭২ সালে তাঁর প্রথম ছবি ‘স্লোগান’-এও আমি গেয়েছি। ছবিটির পরিচালক ছিলেন কবীর আনোয়ার। তখন দেশের অবস্থা খুব খারাপ। সবাই বড় বড় চিপ রাখে, বেলবটম প্যান্ট পরে। গানের লিরিকসও তেমন—‘তবলার ধেরে কেটে/ধেরে কেটে তাক/আজকাল হয়ে গেছে সব বরবাদ/ড্রামটা বাজাও তালে তালে। ’ গানটি নায়করাজ রাজ্জাকের লিপে গিয়েছিল। তখন সুরকারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল না। তাঁরা সবাই চাইতেন সবার ছবি হিট করুক। সবার মধ্যে আন্তরিকতা ছিল।

আরো অনেক বিখ্যাত সুরকারের গান করেছেন।
সমরদা ওয়েস্টার্ন নোটেশনও জানতেন। খুব ভালো হাওয়াইন গিটার ও পিয়ানো বাজাতেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে আমাদের জাতীয় সংগীত রেকর্ডিংয়ের জন্য লন্ডনে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর খুব শখ ছিল বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁর কবর হবে। তবে শেষ পর্যন্ত নারিন্দার খ্রিস্টান সিমেট্রিতে তাঁর কবর হয়েছে। যখন কোরাস গাইতাম, তিনি সবার আগে ডেকে বলতেন, ‘এই গানটি তোল। ’ সত্য সাহা আমাকে ‘সমাধি’তে গাইয়েছেন—‘মা গো মা আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা। ’ এটির গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার। ছবিটির পরিচালক দিলীপ বিশ্বাস। মাকে নিয়ে আমি প্রায় ৫০টি গান গেয়েছি। ‘মতিমহল’-এ আহমদ জামান চৌধুরীর লেখা ও আজাদ রহমানের সুরে ‘মাগো তোর চরণতলে বেহেশত আমার’ গেয়েছি। সুবলদার সুর ও মাসুদ করিমের লেখা আরেকটি বিখ্যাত গান হলো—‘মা তুই বেহেশতেরই খোদার হাসি। ’ তবে কোনোটিই ‘মাগো মা’র মতো জনপ্রিয়তা পায়নি। আলী হোসেন, আলম খান ও আজাদ রহমানের সুরে আমার সবচেয়ে বেশি হিট গান আছে। যতক্ষণ সন্তুষ্ট করতে পারতাম না, ততক্ষণ আলী হোসেন ছাড়তেন না। তাঁর সঙ্গে আমার হিট গানের মধ্যে আছে—‘এ আকাশকে সাক্ষী রেখে’, ‘হায়রে কী সৃষ্টি/দেখে এ দৃষ্টি/ফেরাতে পারি না তো আর/তুলনা মেলে না তাঁর। ’ ১৯৭২ কি ’৭৩ সালে আলাউদ্দিন আলীর সুরে মনিরুজ্জামান মনিরের লেখা ‘পদ্মা, মেঘনা, সুরমা, যমুনা’ গানটি এখনো আমার হিট গান। আমাকে খুরশীদ আলম বানাতে ১০টি লোকের অবদান থাকলে প্রথমেই আজাদ রহমান আছেন। তিনি আমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন। নতুন শিল্পী বলে পরিবর্তনের কথা উঠলে তিনি বলেছিলেন, ‘না, আমি তাকে কথা দিয়েছি। দেখা যাক কী হয়। ’ তিনি আমাকে নিয়ে এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন যে ঋণ শোধ করতে পারব না। সুবলদা আমাকে যেমন ঢাল-তলোয়ারওয়ালা ছবিতে গাইয়েছেন, তেমনি কাহিনিভিত্তিক ছবিতেও গাইয়েছেন। ‘লালু ভুলু’ করার সময় আমাকে ডেকে বললেন, ‘এই ছবিতে তোমাকে গাইতে হবে। ’ এটি নীহাররঞ্জন গুপ্তর উপন্যাস অবলম্বনে হয়েছিল। সেখানে ছবির প্রযোজকরাও উপস্থিত ছিলেন। বললাম, সুবলদা রাগ করবেন না, এই কাহিনি নিয়ে তো ভারত, পাকিস্তানে ছবি হয়েছে। আমি এত স্কেলে গাইতে পারব না। প্রযোজকরা বললেন, ‘লস হলে আমাদের হবে। আপনি গেয়ে পয়সা নেবেন। ’ বললাম, আমার বিবেকে বাধবে। অন্য কাউকে দিন। সুবলদা রাজি হলেন না। এই ছবির সাতটি গান প্রতিদিন ১০০ বার শুনে শিখেছিলাম। ছবির সব গান তিনি আমাকে দিয়ে গাইয়েছেন। খুব দিলদরিয়া মানুষ ছিলেন। সত্যদা যে গান জানে না, সেও যেন গুনগুনিয়ে গাইতে পারে; সেভাবে সুর করতেন। এটিই তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল। তাঁর সঙ্গে ‘অমর অ্যান্থনি আকবর’ ছবিতে আমি ও সুবীর নন্দী গেয়েছি—‘মামা ভাগনা যেখানে আপদ নাই সেখানে/মামা ভাগনা। ’ আমার গানগুলো একেবারে সোজা সুরের গান, কিন্তু এগুলো গাওয়া খুব কঠিন ছিল। সোজা কথার গানকে হিট করা খুব কঠিন। সুরকার ঠিকভাবে সুর না দিলে, যন্ত্রীরা ঠিকমতো না বাজালে, গীতিকারের লেখা ভালো না হলে গানগুলো হিট হতো না। তবে এই কঠিন গানগুলো গাইতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম (হাসি)। আমার বেশির ভাগ গানই মানুষ গ্রহণ করেছে।

আপনার ক্যারিসমা কোথায়?
এই ৭২ বছর বয়সেও প্রচুর গান শুনি। বিশ্বাস করি, নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে এখনো আমার অনেক কিছু শেখার আছে। কোনো সুরকার ১০টার মধ্যে আসতে বললে পৌনে ১০টায় পৌঁছে যেতাম। এই একটি ব্যাপারেই খুব গর্ব করি যে কোনো সুরকার, গীতিকার, পরিচালক, প্রযোজক কেউ বলতে পারবেন না, আমি তাঁকে কষ্ট দিয়েছি। আমাদের সময়টিও অন্য রকম ছিল। ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান কোনো শব্দ নিয়ে আপত্তি উঠলে ১০টি বিকল্প শব্দ লিখে দিতেন। এখন তো যা আছে সেটিই ঠিক করে নিতে হচ্ছে। জগন্নাথ কলেজে আমার রবীন্দ্রসংগীত শুনে অজিত গুহ স্যার বললেন, ‘বাবা, তুমি কোথায় থাকো?’ বললাম। তিনি বললেন, ‘আমি এই কলেজের বাংলার অধ্যাপক, শাঁখারীবাজারে থাকি। আমার বাসায় এসো, উচ্চারণ শেখাব। ’ এখন তো পয়সার ওপর নির্ভর করে গান শেখানো হয়।

আর কোন কোন নায়কের গলায় গান উঠেছে?
রাজ্জাকের পরে ওয়াসিম, আলমগীর, বুলবুল আহমেদ, জাফর ইকবাল, উজ্জল, জাভেদসহ প্রায় সব নায়কই আমার গানে লিপসিং করেছেন, শুধু ফারুক ভাই বাদে। তিনি বেশির ভাগ গ্রামের চরিত্র করেছেন। আমি তেমন গান গাইতে পারিনি। জাফর ইকবাল হাসিখুশি, চকোলেট হিরো ছিল। তার স্টাইলই অন্য রকম ছিল। ফলে সবাই তাকে অনুকরণ করত। সে ভালো গিটার বাজাত। আমার স্কুলের ছোট ভাই ছিল। পরিচালক আজিজুর রহমান বুলির ছোট ভাই মাহমুদ কলি আমার অনেক গানে ঠোঁট মিলিয়েছেন। টিভিতেও অনেক গান করেছি।

সিনেমায় সর্বশেষ কবে গেয়েছেন?
২০১৬ সালে। আমি ৪২৫টি ছবিতে গেয়েছি। আমাকে দিয়ে অনেক এক্সপেরিমেন্টাল গান গাওয়ানো হয়েছে। যৌথ প্রযোজনার ছবিসহ অনেক ছবিই তো আমাদের গানের জন্য হিট করেছে। বক্সার মোহাম্মদ আলী এই দেশে এলে আমি ও সৈয়দ আবদুল হাদী ভাই তাঁর সম্মানে গান গেয়েছি। তবে কোনো পুরস্কারই পাইনি। কেন পাইনি সেটি এই শিল্পে জড়িতরা বলতে পারবেন। তবে এ দেশের মানুষ আমাকে যে সম্মান দেন, সেটি কোটি টাকা দিয়েও কিনতে পারব না। তাঁরা আমার গান শোনেন—এ জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ। আনোয়ার পারভেজের দুঃখ ছিল—তিনি আওয়ামী লীগের ‘জয় বাংলার জয়’ লিখেছিলেন, বিএনপির ‘প্রথম বাংলাদেশ’ও লিখেছিলেন। তবে কোনো পুরস্কার পাননি। তাঁকে বলেছিলাম, পুতলার জন্য পাগল হবেন না। যে দেশে খান আতাকে জীবদ্দশায় কোনো পুরস্কার দেওয়া হয়নি, সেখানে খুরশীদ আলম কে?

অবসর কিভাবে কাটে?
গান শুনে। অনেক প্রিয় গান আছে। খান আতার লেখা ও সুর করা সুবীর নন্দীর ‘দিন যায় কথা থাকে’ গানটি খুব ভালো লাগে। অ্যান্ড্রুর ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’ ৫০০ বার শুনলেও তৃপ্তি মেটে না। হাদী ভাইয়ের ‘যেও না সাথী’ খুব ভালো লাগে। শ্যামল মিত্রের ‘চেনা চেনা লাগে তবু অচেনা’ গানটির শুধু ‘এলোমেলা পথচলা/মনে মনে কথা বলা’ এই লাইনটির জন্য ‘সীমানা পেরিয়ে’ ৪০০ বার দেখেছি। সাবিনার ‘ইশারায় শিস দিয়ে আমাকে ডেকো না’, ‘রেইন’ ছবিতে রুনার ‘আয় রে মেঘ আয় রে’—গানের মতো কোনো গানই আমাকে আন্দোলিত করে না।

চাকরিজীবন?
গ্রিন রোডের পাশে পারফরমিং আর্টস একাডেমি নামের সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির শুরু। মুস্তাফা মনোয়ার বস ছিলেন। এটি ভেঙে গেলে শিল্পকলায় যোগ দিলাম। তবে গাইতে সময় দেবে না বলে মনে হলো, এখানে থাকলে তো মারা যাব। ফলে ১৯৮৪ সালে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে বিসিআইসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান কোহিনূর কেমিক্যালে যোগ দিলাম। ২০০২ সালে সেখান থেকে ম্যানেজার হিসেবে অবসর নিয়েছি।

অ্যালবাম?
দুটি অ্যালবাম আছে—‘এই আকাশকে সাক্ষী রেখে’ ও ‘চুরি করেছো আমার মনটা’। দুটিই একসঙ্গে ২০০১ সালে সঙ্গীতা  ও সাউন্ডটেক প্রকাশ করেছে।

ব্যক্তিগত জীবন?
১৯৭৪ সালে রীনা আলমের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। সে গৃহিণী। আমার দুই মেয়ে। বড় মেয়ে মেহরীন আলম এমবিএ করেছে। ছোট মেয়ে মিনহাজ আলম ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে মাস্টার্স। দুজনেই চাকরি করে।

শ্রুতলিখন : সাইদ হাসান রাজ
(৯ জুন ২০১৭, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা)


মন্তব্য