kalerkantho


ছবি আমার প্রতিবাদের ভাষা

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ছবি আমার প্রতিবাদের ভাষা

রসায়নবিদ্যায় পিএইচডি করেও ছবি তোলার জন্য দেশে ফিরেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন দৃক, পাঠশালা।

ক্রসফায়ার, কল্পনা চাকমা, ব্রহ্মপুত্র সিরিজসহ অনেকগুলো সিরিজ ছবি তুলেছেন। নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনের শেষ ফরমায়েশি পোর্ট্রেটও তাঁর তোলা। প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ।   ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

রসায়নে পিএইচডি করেও ফটোগ্রাফার হলেন কেন?

রসায়নবিদ্যায় পিএইচডি করাকে খুব বড় কিছু মনে করি না। পিএইচডির সুবাদেই হয়তো বলতে পারি যে আমি রসায়নবিদ। তবে আলোকচিত্রে আমার যে জ্ঞান আছে, তার বিন্দুমাত্রও রসায়নে নেই। ছবি তোলার দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ হলো, খুব ছোটবেলা থেকেই আমার তীব্র একটি রাজনৈতিক বোধ আছে। উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যাওয়ার পর প্রথমে সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে যুক্ত হলাম। তখন বর্ণ-শ্রেণি-লিঙ্গবৈষম্য—এ ধরনের অনেক আন্দোলনে জড়িত হয়েছি।

তবে দেশে ফিরে আসার ব্যাপারে কোনোকালেই নিজের মধ্যে কোনো সন্দেহ ছিল না। ফিরে এসে কী করব, সেটি পরিষ্কার ছিল না। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবেশে থাকায়, ছবিকে আবিষ্কার করায় নিজের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল—যদি হাতিয়ারই খুঁজি, তাহলে এটিই তো সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। ফটোগ্রাফিতে আসার পেছনের গল্পটি হলো, পিএইচডি শেষ করার পর একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখলাম, একটি স্টুডিও ফটোগ্রাফার খুঁজছে। আবেদন করলাম, কাজও পেয়ে গেলাম। আহামরি যে ভালো  কাজ ছিল, আলোকচিত্রী হিসেবে অসাধারণ কাজ করেছি তা  নয়। তবে সবাই আমার কাজ পছন্দ করতেন। ১৯৮৩ সালে সপ্তাহে ৩৫০ পাউন্ড আয় হতো। মাসে দেড় লাখ টাকা আয় এখনো অনেক টাকা, তখন তো বিশাল অঙ্ক। মোটামুটি ভালোই পাচ্ছি, সুনাম হচ্ছে, খুব আরামে আছি, সেটিই আমার কাছে দুশ্চিন্তার বিষয় ছিল। মনে হয়েছিল, এমন আরামের জায়গা ছেড়ে দেওয়া কঠিন হয়। যদি বেশিক্ষণ থাকি তাহলে হয়তো শিকড় গজাবে। এসব ভেবেই ১৯৮৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি দেশে চলে আসি।

 

লন্ডনে কী পড়তেন?

বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড জেনেটিক্সে গ্রাজুয়েশন করেছি। বাবা সরকারি চাকুরে, মা স্কুল মাস্টার। তাঁরা আমাকে বিদেশে পড়ানোর সামর্থ্য রাখতেন না। কামলাগিরি, রাজমিস্ত্রির জোগালি, মেথরগিরিসহ যখন যে কাজ পেরেছি সে কাজ করেছি, সেই টাকায় গ্রাজুয়েশন করেছি। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ অ্যাসিসটেন্টের চাকরি নিলাম। মাস্টারি থেকে যে আয় হতে সে তাতে পিএইচডির বেতন দিতাম।

 

দেশে ফিরে তো বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটিতে যোগ দিলেন?

তখন মঞ্জুর আলম বেগও এখানে ছিলেন। প্রথমে আমাকে সেক্রেটারি জেনারেল করা হলো। পরে সভাপতি হয়েছি। এর মধ্যে ঢাকার ৫২ এলিফ্যান্ট রোডের ফুজির পরিচালক খান মোহাম্মদ আমিরের (বিল্টু ভাই) সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমার কাজে ভীষণ আগ্রহী হলেন। তাঁর টাকা-জায়গা, আমার দক্ষতায় ১৯৮৪ সালের জুনে চালু হলো ‘ফটো ওয়ার্ল্ড’। তাতে ফ্যাশন, পত্রিকার কভার ফটোগ্রাফি, বিজ্ঞাপন ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ছবি তুলেছি। একটি অত্যাধুনিক স্টুডিও দাঁড় করিয়েছি। তবে একসময় নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, যে কারণে আলোকচিত্রী হয়েছি, দেশে ফিরেছি এবং এখানে এসে সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সেটি তো করা হচ্ছে না। ফলে ছয় মাস পরিচালক থেকে প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে ১৯৮৪ সালের ১ ডিসেম্বর আবার ফ্রিল্যান্স কাজ করা শুরু করলাম। তখন এরশাদবিরোধী আন্দোলন মাত্র জেগে উঠছে, আমার বন্ধুরা নানাভাবে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের দলে আলোকচিত্রী হিসেবে যুক্ত হলাম। তখন ফটোগ্রাফারদের মধ্যে নিজের তাড়নায় লম্বা মেয়াদে কাজ করার চল ছিল না, এখন তো অনেকেই করেন। সাধারণ মানুষের জীবনে রাজনীতি কিভাবে প্রভাব ফেলে তা নিয়ে কাজ শুরু করলাম। তার মধ্যে একটি—রমজানের পরিবার। একজন রিকশাওয়ালা তাঁর পরিবার নিয়ে কিভাবে থাকছেন, সেই ছবি তুলেছি, পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের অবস্থা, সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে কাজ করেছি। এখনকার খুব আলোচিত ইস্যু জঙ্গিবাদের আবির্ভাব নিয়ে তখনই কাজ করেছি। এ কাজগুলোর সঙ্গে গণতান্ত্রিক আন্দোলন কিভাবে যুক্ত তা দেখিয়েছি। বন্যার ওপর কাজ করেছি, বন্যায় সাধারণ মানুষের অবস্থা তুলে ধরেছি। এই প্রসঙ্গে বলি, ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় আবাহনী মাঠে এক ক্ষমতাবান মন্ত্রীর মেয়ের বিয়ে হচ্ছিল। একই সঙ্গে বন্যা ও সেই বিলাসবহুল বিয়ের ছবি দেখাতে চেষ্টা করেছি। ভদ্রলোক এখনো মন্ত্রী। সরকার বদলেছে, তাঁর মন্ত্রিত্ব বদলায়নি। এটিই আমাদের দেশের বাস্তবতা। ছবিটি আমার ‘মাই জার্নি অ্যাজ অ্যা উইটনেস’ বইতে আছে।

 

তখন তো ছবির প্রদর্শনীও করেছেন!

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর নূর হোসেন মারা গেলেন। তাঁর মৃত্যুর পর দুই বছরে তোলা ছবিগুলো নিয়ে তাঁকে স্মরণ করে ১৯৮৯ সালের ১০ নভেম্বর প্রদর্শনী করলাম। প্রদর্শনীটি বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। প্রথমে প্রদর্শনীর স্পনসর ছিল অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ। ঠিক হলো যে সব খরচ তারা দেবে, তাদের গ্যালারিতে প্রদর্শনী হবে। তবে কাজ দেখে তারা ঠিক করল, দেখাবে না। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৮৯ সালে কিন্তু ফরাসি বিপ্লবের ২০০তম বার্ষিকী ছিল। চারুকলার জয়নুল গ্যালারি কর্তৃপক্ষ বললেন, আলোকচিত্র তো শিল্প নয়। তাই তাঁরা রাজি হলেন না। যত গ্যালারিতে গেছি প্রত্যেকেই না করেছে। তারপর আমার একটু বুদ্ধি বাড়ল। আলোকচিত্রী হিসেবেও কিছুটা পরিচিতি হয়েছে। কাজ না দেখিয়ে প্রেসক্লাবে গিয়ে, ধারকর্জ করে প্রদর্শনীর জন্য হল বুক করলাম। সস্তায় ছবি প্রিন্ট করলাম, নিজে টাঙানো থেকে শুরু করে সবই করলাম। ১৯৮৯ সালের ১০ নভেম্বর প্রদর্শনীটি শুরু হলো। পরে দেখি, বিয়ের সেই ছবি দুটি গায়েব! ছবিগুলো উদ্ধার করে ফের টাঙালাম। নিজেরা পাহারা দিয়ে প্রদর্শনী চলাকালে সব ছবি যাতে দেখানো হয় সে ব্যবস্থা করলাম। আমরা ঠিক করলাম, কাজগুলো প্রেসক্লাবের সামনের গেটের গ্রিলে ভোরে ঝুলিয়ে রাখব। জানি, সকালে পুলিশ নামিয়ে ফেলবে। কিন্তু তার আগে ভোরে অন্তত কিছু মানুষ দেখতে পাবে, ছবি যে আমার প্রতিবাদের ভাষা, তা অন্তত দেখবে। তাই করেছি। এটি আমার ‘স্ট্রাগল ফর ডেমোক্র্যাসি’র প্রথম দুই বছরের কাজ ছিল।

 

ছবিমেলার শুরু কিভাবে হলো?

১৯৯৪ সালে ফান্সের আর্লে যাওয়ার সময় আমি দুই নবীন আলোকচিত্রী শেহজাদ নূরানী ও ফটো এজেন্সি ম্যাপের মাহমুদকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলাম। আমার বন্ধু আব্বাস তখন বিখ্যাত ফটো এজেন্সি ম্যাগনামের সভাপতি। তাকে বললাম, তোমার এজেন্সি এদের ঘুরিয়ে দেখাও। অবাক হয়ে ঘুরে ঘুরে তারা কার্তিয়ার ব্রেসও, কুদেলকার কাজ দেখল। ফেস্টিভ্যালে গেল, কর্মশালা করল। দেখলাম, এই একটি উৎসব এই দুই নবীন আলোকচিত্রীকে খুব প্রভাবিত করেছে। এরপর থেকে তারা ভিন্ন স্পৃহায় কাজ শুরু করল। তখনই মনে হলো, এসব জায়গায় আমার দেশের শয়ে শয়ে ছেলেমেয়েকে তো নিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত নিলাম, তাদের কাছেই আমি উৎসবকে নিয়ে আসব। ১৯৯৬ সালের শুরুতে আমরা এক সপ্তাহের ছোট আকারের উৎসবের আয়োজন শেষ করে ফেললাম। তখনো ‘ছবিমেলা’ নাম দিইনি। তবে যে সপ্তাহে উৎসবটি হওয়ার কথা ছিল, তখনই দেশে প্রথমবারের এক সপ্তাহের লাগাতার হরতাল হলো। ফলে আয়োজনের কোনো সুযোগই হলো না। টিকিটের টাকা ফেরত দিতে হলো। অনেক দেনার দায়ে পড়ে গেলাম। উঠে দাঁড়াতে অনেক সময় লেগেছে। যাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম, তাদের আবার রাজি করাতে অনেক সময় লাগল। এভাবে চেষ্টা করতে করতে ২০০০ সালে ‘ছবিমেলা’ নাম দিয়ে উৎসবটি করলাম।

 

প্রথম আয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের ছবি কিভাবে জোগাড় করেছেন?

১৯৯৬ সালে দৃকের ক্যালেন্ডারটি স্বাধীনতাযুদ্ধের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে করা হয়েছিল। তাতে বাংলাদেশী যত আলোকচিত্রী মুক্তিযুদ্ধের ছবি তুলেছিলেন, তাঁদের কাজ জোগাড় করেছি। তখন তো দৃকের এত পরিচিতি ছিল না, কোথায় কী আছে, ভালোভাবে জানতামও না। তার পরও কোনো দিন প্রকাশিত হয়নি এমন অনেক কাজও ছবিমেলায় পেয়েছি। একটির গল্প বলি, ১৯৯৪ সালে আর্লে যাওয়ার আগে প্যারিসে বিখ্যাত ফটো এজেন্সি ‘সিপা’র প্রতিষ্ঠাতা গোকসিন সিপায়িয়াগ্লু’র সঙ্গে দেখা করতে তাঁর অফিসে গেলাম। আমাকে দেখে তিনি খুব খুশি হয়ে বললেন, ‘খানিকক্ষণ বসো, আসছি’। অনেকক্ষণ পর অনেকগুলো রঙিন স্লাইড নিয়ে ফিরলেন। অবাক হয়ে গেলাম, সবগুলো একাত্তরের স্লাইড। এগুলো আব্বাসের তোলা, সিপা তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের ছবি তুলতে পাঠিয়েছিলেন। এর পরই মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে গবেষণার শুরু হলো। সেই ছবি ও আলোকচিত্রীদের খোঁজা শুরু করলাম। তখনো আব্বাসের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। ফিলিপাইনে এক অ্যাসাইনমেন্টে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। একেবারে গ্রামে, সাগরের তীরে, সন্ধ্যার আলোয় ছবি তুলছি, পাশে তাকিয়ে দেখি আরেক দাড়িওলাও ছবি তুলছেন। পরিচয় হলো—তার নাম আব্বাস। সেখানেই তাকে প্রদর্শনীর ধারণাটি দিলাম। সে ছবি দিতে রাজি হলো। কোডাকের পার্টিতে ডন ম্যাক্কালিনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তিনি ব্রিটেনের সবচেয়ে বিখ্যাত যুদ্ধের আলোকচিত্রী। তাঁকে বললাম, প্রদর্শনীতে আপনার ছবি প্রয়োজন। তিনি ছবি দিলেন। বৃষ্টি হচ্ছে, বর্ষার মধ্যে শরণার্থীরা তাঁবু গেড়ে যশোরে আশ্রয় নিয়েছেন—একাত্তরের সেই বিখ্যাত ছবিটিও তাঁর তোলা। এভাবে খুঁজতে খুঁজতে দেখলাম, তখনকার কিংবদন্তি সব আলোকচিত্রীই বাংলাদেশে কাজ করতে এসেছিলেন। বিভিন্নভাবে ছবিগুলো জোগাড় করলাম। কন্ট্রাক প্রেস ইমেজেসের সভাপতি রবার্ট প্লেজেরও সাহায্য নিয়েছি। বাঘা বাঘা সব আলোকচিত্রী নির্দ্বিধায় বলেছেন, তোমাদের উৎসবে আমরাকাজ দেব। কেউ কোনো শর্ত দেননি, এক পয়সাও চাননি। শুধু ছবি পাঠানো ও প্রিন্ট খরচ দিতে হয়েছে। শুধু ম্যাগনাম নেগেটিভগুলো ব্যবহারের জন্য এক হাজার ডলার ফি নিয়েছে। একটি ছবি এখনো পাইনি, পাওয়ার চেষ্টায় আছি। মালয়েশিয়ায় এক কর্মশালায় আমার এক বয়স্ক ছাত্র বলেছিলেন, তিনি ভারতের বিখ্যাত আলোকচিত্রী রঘুবীর সিংয়ের সঙ্গে ১৯৭১ সালে এ দেশে এসে কাজ করেছেন। রঘু রায় ও রঘুবীর সিং ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত আলোকচিত্রী। রঘু রায়ের মুক্তিযুদ্ধের কাজ দেখেছি, তবে রঘুবীরের কাজ দেখিনি। তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। এখনো ছবিগুলো পাইনি। ভারতের বিখ্যাত আলোকচিত্রী কিশোর পারেখ মারা গেছেন। তিনি ‘বাংলাদেশ অ্যা ব্রুটাল বার্থ’ নামের খুব বিখ্যাত আলোকচিত্রের বইটির লেখক। আমি ওয়ার্ল্ড প্রেসের বিচারক থাকার সময় তাঁর ছেলে স্বপন পারেখ পুরস্কার পেয়েছিল। তখনই পরিচয় হয়েছিল। তাঁকে বলেছিলাম, তোমার বাবার মুক্তিযুদ্ধের ছবিগুলো আমাদের প্রয়োজন। সে বলল, বাবাও নেই, ছবির প্রিন্টার নীতিনদাও অবসর নিয়েছেন। ছবিগুলো প্রিন্ট করার মতোও তো কেউ নেই। কিভাবে দেব? তার পরও আমার অনুরোধে সে নিজে সব ছবি প্রিন্ট করে পাঠিয়েছে। রঘু রায় ছবি পাঠিয়েছেন, ডন ম্যাক্কালিন নিজে তাঁর অরিজিনাল ছবিগুলো প্রিন্ট করে পাঠিয়েছেন। ছবিগুলো খুব মূল্যবান হলেও তাঁরা দিয়েছেন।

 

কেন জাদুঘর থেকে প্রদর্শনী দৃকে সরিয়ে নিতে হয়েছিল?

সব যুদ্ধেই ভালো-খারাপ কাজ হয়। যুদ্ধে আমাদের যেমন অসাধারণ সংগ্রাম-জয় ছিল, তেমনি বিহারিদের হত্যাও করা হয়েছে। আমি কোনো কিছু বাদ দিয়ে প্রদর্শনী করতে রাজি হইনি। ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর পল্টন ময়দানে মুক্তিযোদ্ধারা বিহারিদের মারছেন, সেই ছবিও প্রদর্শনীতে ছিল। তবে সরকার প্রদর্শনীটি করতে দেবে না। কিন্তু আমি বললাম, সেন্সরশিপ আমরা গ্রহণ করব না। জাদুঘরে সব সেটআপ তৈরি করে ফেলেছি, প্রদর্শনীর আগের দিন রাতে তথ্যমন্ত্রী ফোন করে বললেন, এই ছবি আপনি দেখাতে পারবেন না। বললাম, তাহলে আমি প্রদর্শনী করব না। সেদিন রাত ১০টায় জাদুঘর থেকে আমরা সব কিছু রাস্তায় নামিয়ে আনলাম। ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার পলি হোপকে ফোনে বললাম, কিছু মনে করবেন না, আপনার প্রদর্শনীটি নামিয়ে ফেলতে হচ্ছে। তিনিও রাজি হলেন। দৃকে আমাদের গ্যালারিতে কাজ শুরু করলাম। ভোর ৫টায় লে আউটের কাজ শেষ হলো। বিকেল ৩টায় আগের সময়সূচিতেই শামসুর রাহমান ও ওয়াহিদুল হক প্রদর্শনীর উদ্বোধন করলেন। অসংখ্য দর্শনার্থী এলেন। সবার ভীষণ আগ্রহ, অনেক প্রশ্ন। আমি বললাম, সরকারকে জিজ্ঞাসা করুন।   

 

প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে অনেক দিন ধরে কাজ করছেন।

এসব শ্রমিকদের নিয়ে যখন কোনো আলোচনা বা সংবাদ অথবা ছবি আমাদের সামনে আসে, তখন তাঁরা কতটা কষ্টে আছেন, সংগ্রাম করছেন, সেটিই দেখানো হয়। তবে তার বাইরেও জগৎ আছে। সে জন্য মালয়েশিয়ার উত্তর-দক্ষিণ পুরো এলাকা ঘুরেছি, কুয়ালালামপুরও গিয়েছি। শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের করুণ দশা দেখেছি। দালালদের সঙ্গে কথা বলেছি। মাহাথির মোহাম্মদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। নারী, পুরুষ—দুই ধরনের শ্রমিকদেরই বোঝার চেষ্টা করেছি। প্যারিসে এক স্টেশনে গিয়ে দেখেছি, এক বাঙালি দোকানদারের দোকানের ওপরতলায় সারি সারি বিছানা পাতা। দিন-রাত ভাগ করে একতলা, দোতলা, তিনতলার মতো এই বিছানাগুলোতে বাঙালি শ্রমিকরা থাকেন। আসলে আমি আসলে প্রবাসী শ্রমিক খুঁজি না, মানুষ খুঁজি। সারা জীবনই তাঁদের শ্রমিক হিসেবে দেখা হয়—এই বোধ থেকে সরে আসা খুব জরুরি। এগুলো সাদা-কালোয় তোলা ছবি।   

 

অনেক দিন ধরে কল্পনা চাকমাকে নিয়ে কাজ করছেন।

আমরা সংগ্রাম করে যে দেশ পেয়েছি, সেখানে অন্যদের সংগ্রামকে শ্রদ্ধা করতে শিখিনি, এটি আমাকে খুব আহত করে। কল্পনাকে অপহরণের ২০ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে এখনো কোনো তদন্ত হয়নি। গবেষণা করতে গিয়ে আমি সাইদিয়া গুলরুখ নামের এক নৃবিজ্ঞানীর সাহায্য নিলাম। প্রথমে আমরা কল্পনার ভাই কালিন্দিদা, পরিবারের অন্যদের সঙ্গে কথা বললাম। পরিষ্কার হয়ে গেল, তদন্তে পাহাড়িদের মতামত নয়, আর্মি ও বাঙালিদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে সিদ্ধান্ত নিলাম, ফটো সিরিজটি অন্যভাবে দাঁড় করাব। সেখানকার নীরব সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলব, তাঁদের প্রশ্ন করব। ফলে যে পথে তিনি শেষযাত্রা করেছিলেন, সেই পথের পাথর কুড়িয়ে, যে কুয়ার পাশে তিনি হেলান দিয়ে বসেছিলেন, সেটি থেকে একটি পাথর দিয়ে, যে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন, সেটির একটি বাকল নিয়ে—এভাবে তাঁর স্মৃতিবাহী নানা জিনিষ কুড়িয়ে ফরেনসিক টেকনিকে ফটোগ্রাফি করেছি। আমার ভাবনাটি ছিল—সত্যিকার তদন্ত হলে তো ফরেনসিক স্টাডি হতো, সেভাবেই আমি কাজ করব। এ্যাপোলো হাসপাতালের মাইক্রোসকোপে কাজ করতে চেষ্টা করলাম। তাদের সে যন্ত্র নেই। পরে ব্রিটেনের ফ্যালমআথ ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে তাদের অপটিক্যাল মাইক্রোসকোপে কাজ করতে গেলাম। তবে যে ধরনের মাইক্রোসকোপে কাজ করতে চেয়েছি, সেটি সেখানে ছিল না। জার্মানির ওল্ডেনবার্গ ইউনিভার্সিটিতেও না পেয়ে এসব উপকরণ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিজবেনের ব্রেইন ইনস্টিটিউটে গেলাম। সেখানে কাজের পর ২০১৩ সালের ১২ জুন প্রথম প্রদর্শনীটি হলো। এর চিন্তাটি ছিল নীরব সাক্ষীদের আমি প্রশ্ন করব। তাঁরা কি বলে? সে জবাব নিয়েই প্রদর্শনী হলো। দুই বছর পর তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহার্য—পরনের কাপড়, লাইব্রেরির বই, বাড়িঘর ইত্যাদির ছবি নিয়ে যে মানুষটি নেই, সে শূন্যতার মধ্যে তাঁকে উপস্থাপন করলাম। এর পরের অধ্যায়ে যাঁরা তাঁর সংগ্রামকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, অধ্যাপক আনু মুহম্মদ, সারা হোসেন প্রমুখের সাক্ষাৎকার নিলাম। তাঁদের কাছে শুনলাম কল্পনাদের বাড়িতে গিয়ে তাঁরা একটি মাদুর ছাড়া আর কিছু দেখেননি। মনে হলো, এমন একজন মানুষের মানসিক গঠন কতটা শক্তিশালী হলে তাঁর সংগ্রাম জেগে থাকে। সেই মাদুর পুড়িয়ে, পোড়ানো গ্রামের বাড়ি ইত্যাদির ছবি নিয়ে একটি অসাধারণ প্রদর্শনী করলাম। যারা কল্পনার জন্য সংগ্রাম করেছেন, তাঁরা গ্যালারিতে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রবেশ করলেন। এটি খুব সার্থক হয়েছিল। চীনের ডালি ফেস্টিভ্যালে ৮০০ প্রদর্শনীর মধ্যে সেরা হয়েছে, মাল্টায় প্রদর্শনীটি দেখতে সে দেশের প্রেসিডেন্টও এসেছেন। দিল্লি ও লন্ডনে এটি প্রদর্শিত হয়েছে।

 

ক্রসফায়ার সিরিজ কিভাবে করেছেন?

ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে কাজের ধরন বদলাতে হয়েছে। কারণ এ সম্পর্কে আমরা সবাই জানি, ফলে এখানে তথ্য দেওয়ার কিছু নেই। আমাকে মানুষকে নাড়া দিতে হয়েছে বলে এই সিরিজের ছবিগুলোতে কনসেপ্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছবিগুলো তোলার সময় আমি নিজেকে শেখানোর চেষ্টা করেছি। মৃত্যুগুলো দেখানোর চেয়ে সেগুলোর প্রভাব দেখানোই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছি। সে জন্য গবেষক দল নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। কেসস্টাডিগুলোতে দেখেছি, সব হত্যাকাণ্ডই মধ্যরাতে হয়েছে। ফলে মধ্যরাতেই ছবি তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। পরিবারগুলোর কাছে জানতে চেয়েছি তখন কী হয়েছিল? তাঁরা যেভাবে বলেছেন, ছবিগুলোতে তাই আনার চেষ্টা করেছি। মারা যাওয়ার আগে সেই মানুষটি যে দৃশ্য শেষবারের মতো দেখেছেলে, সেটি নান্দনিক ও রাজনৈতিকভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছি। এই প্রদর্শনীটি ভীষণ শক্তিশালী ছিল। সরকার এটি বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, আমরা তার বিপক্ষে মামলাও করেছি। প্রদর্শনীতে তেমন কোনো তথ্যও দেইনি। চেয়েছি, দর্শক ভাবুক। ফলে তাঁরা ধানক্ষেতের ছবি দেখে সেটি কোথাকার তা গুগল আর্থে খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছেন। প্রদর্শনীর উদ্বোধনী দিনে দৃকে ডিবি এসেছে, পুলিশ এসে বন্ধ করে দিয়েছে। মহাশ্বেতা দেবী, নুরুল কবির ও আমি রাস্তায় নেমে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেছি। অনেক দেশের রাষ্ট্রদূতও প্রদর্শনীটি দেখেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসে এটির তিনটি রিভিউ ছাপা হয়েছে। আমাদের প্রদর্শনী বা অন্য কারণেই হোক কিছুদিনের জন্য ক্রসফায়ার কমে গিয়েছিল।

             

ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির জন্য প্রথম এশীয় হিসেবে মাদার জোন্স পুরস্কার পেয়েছেন। ৬২ বছরের মধ্যে প্রথম অশ্বেতাঙ্গ হিসেবে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোর জুরি বোর্ডের সভাপতি ছিলেন।  

এখনো ওয়ার্ল্ড প্রেসের ইতিহাসে আমি ছাড়া আর কোনো অশ্বেতাঙ্গ সভাপতি নেই। আর ‘মাদার জোন্স’ ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র নিয়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের দেওয়া হয়। এটিও খুব বিখ্যাত পুরস্কার। ভারত, বাংলাদেশ থেকে অনেকেই চেষ্টা করলেও পাননি। প্রথম এশীয় হিসেবে আমিই পেয়েছি। সমাজ পরিবর্তন করতে পারে, এমন কাজকে তাঁরা গুরুত্ব দেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের রূপ নিয়ে লম্বা মেয়াদের কাজ ছিল সেটি। পুরস্কারের আর্থিক মূল্য সাত হাজার ডলার দিয়ে দৃক গ্যালারি বানিয়েছি। ওয়ার্ল্ড প্রেসের সভাপতি হওয়ার পেছনেও ঘটনা আছে—আমি তাঁদের চিঠি দিয়ে বলেছিলাম, তোমরা নিজেদের ওয়ার্ল্ড প্রেস বলো, এই নাম বদলে ইউরোপিয়ান প্রেস রাখো। কারণ ইউরোপের ফটোগ্রাফারদের ছবি দেখাও, তাঁদেরই পুরস্কার দাও। তারা আমাকে চিঠি দিল যে তোমার চিঠির আগে আমরা চিঠি লিখেছি। তাতে তোমাকে বিচারক হিসেবে আমন্ত্রণ করেছি। চিঠিতে বলেছিলাম, প্রদর্শনীটি গুরুত্বপূর্ণ। সুযোগ থাকলে আমি এটি বাংলাদেশে দেখাতে আগ্রহী। তখন তারা জানাল, একটি প্রদর্শনী বাতিল করা হয়েছে। সেটি এখানে হতে পারে। স্থপতি রফিক আজমকে ফোন করে ১৭ দিনে গ্যালারি বানানো হলো।

  

নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনের শেষ ফরমায়েশি পোর্ট্রেটের পেছনের গল্পটি কী?

ড. মুহম্মদ ইউনূস ম্যান্ডেলার ওপর জোহানেসবার্গে বক্তৃতা করবেন। আগে থেকেই ম্যান্ডেলার প্রতি আমার দুর্বলতা ছিল। তাঁকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি। ভাবলাম, দুজনের একসঙ্গে ছবি তুলি। নেলসন ম্যান্ডেলা ফাউন্ডেশন আমাকে তাঁর পোর্ট্রেট তুলে দিতে বিশেষভাবে অনুরোধ করল। আমি তখন মেক্সিকোতে। সেখান থেকে জোহানেসবার্গ যেতে অনেকগুলো ফ্লাইট বদলাতে হয়। ছবিটি তোলার তারিখ ছিল ২০০৯ সালের ৮ জুলাই। সেদিন দুবাই পর্যন্ত যেতে পেরেছি। তবে ইউনূস ভাই ফোন করে বললেন, ম্যান্ডেলা তারিখ পিছিয়ে ১০ জুলাই সময় দিতে রাজি হয়েছেন। ফলে সেখানে যাওয়ার সৌভাগ্য হলো। যে ঘরে ছবিটি তুলেছি, সেখানে ইউনূস ভাই, ম্যান্ডেলাসহ আরো দুয়েকজন ছিলেন। আগে থেকেই সব ঠিক করে রেখেছিলাম। ছবি তুলব, কিন্তু ইউনূস ভাই সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে তো আর সরতে বলতে পারি না। চুপ করে ক্যামেরা ফোকাস করে বসে আছি। একটু পরে তিনি সরে গেলেন। ম্যান্ডেলাও খুব চালাক। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে দিলেন। কয়েক মুহূর্তে দুই কি তিনটি ছবি তুলতে পেরেছি। তার মধ্যেও একজন উপজাতি, মানবতাবাদী ও অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ববান মানুষের চেহারা ফুটে উঠেছে বলে ছবিটি দেখার পর লোকে বলেছেন।   

শ্রুতলিখন : রাজু আহমেদ ও সাইদ হাসান রাজ

(৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, দৃক গ্যালারি, ঢাকা) 


মন্তব্য