kalerkantho


গলাচিপায় এমপির পক্ষে সাফাই মানববন্ধন

শিক্ষকদের ঘাম ঝরল রোদে

পটুয়াখালী প্রতিনিধি   

৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় ১৯০টি প্রাথমিক, ৪৬টি মাধ্যমিক, ৪২টি মাদরাসা ও ৯টি কলেজ রয়েছে। এই ২৮৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষককে গতকাল সোমবার সকালে উপজেলা সদরে রাস্তায় রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। তাঁদের এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। এক শিক্ষক দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চেতনা হারিয়ে ফেলেন।

শিক্ষকরা মানববন্ধনে অংশ নেওয়ায় কোনো প্রতিষ্ঠানে পাঠদান হয়নি। সকালে শিক্ষার্থীরা গিয়েছিল; কিন্তু শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন না।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কালের কণ্ঠ ‘এমপি জাহাঙ্গীর মুখ-হাত একসঙ্গে চালান’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। এর প্রতিবাদে গতকাল শিক্ষকদের মানববন্ধনে উপস্থিত হতে বাধ্য করা হয়। মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গত রবিবার মৌখিক নোটিশ দেওয়া হয়। এই নোটিশ জারি করে পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা-গলাচিপা) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইনের অনুসারীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক কালের কণ্ঠকে জানান, মানববন্ধনে উপস্থিত না হলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি এবং আধাসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্তসহ নানা ধরনের হয়রানির হুমকি দেয় এমপির লোকজন। এ কারণে তাঁরা বাধ্য হয়ে গতকাল পৌর শহরে সকাল ১০টায় গলাচিপা হাই স্কুল রোড এলাকায় যান। তাঁদের দীর্ঘক্ষণ রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এ কারণে কাজী কান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রাজিয়া সুলতানা চেতনা হারিয়ে ফেলেন। এরপর তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

স্থানীয় লোকজন জানায়, মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের চার নেতা। শিক্ষকদের মানববন্ধনে উপস্থিত হওয়ার জন্য মৌখিক নোটিশ করেন গলাচিপা বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হালিম। তিনি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাজনীতি করেন এমপি, আমরা তো রাজনীতি করি না। বরং ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাই। কিন্তু এখন এমপির অনিয়ম-দুর্নীতির দায়দায়িত্ব আমাদের বহন করতে হচ্ছে। তা না হলে আমাদের দিয়ে কেন এ মানববন্ধন করানো হবে? আজ মানববন্ধন করেছে সব শিক্ষক, এটা আশ্চর্যের! সবই করা হয়েছে এমপির নির্দেশে। পত্রিকার সংবাদ দেখেছি, যা ছাপা হয়েছে তা তো মিথ্যা না। সরকারি কোনো বন্ধ নেই। অথচ আমাদের ক্লাস বাদ দিয়ে আজ বাধ্য করে মানববন্ধন করাতে, এটাও তো বড় ধরনের একটা অনিয়ম। এ খবর পত্রিকায় ছাপা হলেও কি সেই খবরের বিপরীতে আমাদের মানববন্ধন করতে হবে? এরও বিচার হওয়া উচিত।’ তিনি জানান, জেএসসি, জেডিসি, এসএসসি, এইচএসসি, বিএসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় বছরের অনেক দিন শিক্ষার্থীরা ক্লাস পায় না। আর খোলা তারিখে ক্লাস বন্ধ করে রোদে দাঁড়িয়ে এমপির নির্দেশে তাঁর দুর্নীতি ঢাকতে সাফাই মানববন্ধন নৈতিকতাবিরোধী।

গলাচিপা বালিকা বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী (নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না) বলে, ‘স্যারেরা এমপির জন্য মানববন্ধন করতে গেছে। এ কারণে আজ আমাদের ক্লাস হয়নি।’

মানববন্ধনের অন্যতম আয়োজক, এমপি জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল হালিম বলেন, ‘আমি মনে করি, এমপির বিরুদ্ধে যেসব কথা ছাপা হয়েছে, তা মিথ্যা। এ জন্য আমরা সমাজের সচেতন মানুষ হিসেবে একটা প্রতিবাদ করেছি। কাউকে বাধ্য করা হয়নি। সবাই স্বেচ্ছায় এসেছে এবং যাদের ক্লাস ছিল না তারাই অংশ নিয়েছে।’

জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি কাশিনাথ দত্ত বলেন, ‘এমপি জাহাঙ্গীর অনিয়ম-দুর্নীতির জাল বিস্তার করেছেন। এ কারণে তাঁর ওই সব কথা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেই। দলীয় নেতাকর্মীরা এর প্রতিবাদ করেনি। তিনি শিক্ষকদের ভয় দেখিয়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করিয়েছেন।’

গলাচিপা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, গলাচিপা কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস) শাহীন শাহ বলেন, ‘উনি ৫ জানুয়ারি (২০১৪ সাল) এমপি হওয়ায় এলাকায় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। নেতাকর্মীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়নি। বরং লুটপাট আর অনিয়ম-দুর্নীতি করতে গিয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। পত্রিকায় তো সব সত্যি লিখছে। এখন প্রতিবাদ করতে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী পাচ্ছেন না। তাই শিক্ষকদের বাধ্য করে মানববন্ধন করিয়েছেন। এটি গলাচিপা আওয়ামী লীগের জন্য লজ্জার।’

এমপি আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইনের মোবাইল ফোনে গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠ অফিস থেকে কল করলে তিনি রিসিভ করেননি। এ কারণে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।



মন্তব্য