kalerkantho


কীর্ত্তিপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

জ্ঞানসুধার শিশুস্বর্গ

কে এম সবুজ, ঝালকাঠি   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শ্রেণিকক্ষের ভেতরের দেয়ালে আঁকা আছে সৌন্দর্যময় ও শিক্ষামূলক নানা ধরনের ছবি। বাইরে মনোমুগ্ধকর আলপনা। রয়েছে ‘শিশুস্বর্গ’ নামে একটি কক্ষ। এখানে শিশুরা খেলার ছলে পড়ছে। কেউ আবার গানের তালে সুর মেলাচ্ছে। কেউবা সুরের ছন্দে কবিতা মুখস্থ করছে। তারা মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। শিক্ষকরাও পরম মমতায় পড়াচ্ছেন। আনন্দঘন এমন পরিবেশে পাঠদান চলছে ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্ত্তিপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টি আনন্দের এক রঙিন ফুল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে জেলাজুড়ে।

জানা যায়, ১৯০৩ সালে ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্ত্তিপাশা ইউনিয়নে জমিদারবাড়ির পাশেই প্রতিষ্ঠা করা হয় কীর্ত্তিপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই বিদ্যালয়ের চত্বরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং কক্ষের ভেতরে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রত্যন্ত গ্রামের এই বিদ্যালয়টি জেলার সুনাম বয়ে এনেছে বেশ কয়েকবার। ফুটবলসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় জেলার শীর্ষে রয়েছে বিদ্যালয়টি। খেলাধুলার পাশাপাশি লেখাপড়ায়ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রশংসা অর্জন করেছে। রয়েছে সুসজ্জিত প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষ, মহানুভবতার দেয়াল, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ স্মৃতি জাদুঘর, সততা স্টোর, পাঠাগার, খুদে চিকিৎসক দল ও ফুলের বাগান। বিদ্যালয়টি শিক্ষা ছাড়াও ক্রীড়া, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ বহুমুখী শিক্ষা কার্যক্রমেও সফলতা পেয়েছে। শ্রেণিকক্ষগুলোর নামকরণ করা হয়েছে কবি-সাহিত্যিকদের নামে। সেখানে তাঁদের ছবির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত লেখা আছে। বিদ্যালয়ের ৩০০ শিক্ষর্থী আনন্দে পড়ালেখা করছে। শিক্ষকরাও সন্তান স্নেহে পড়াচ্ছেন শিক্ষার্থীদের, তাই প্রতিদিনের উপস্থিতিও শতভাগ। আটজন শিক্ষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে এগিয়ে যাওয়া এই বিদ্যালয়টি জেলার একটি মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। জেলার সব বিদ্যালয়ে যদি এভাবে সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে ক্লাস নেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষার মান আরো বাড়বে বলে মনে করেন অভিভাবকরা।

তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী মুরছালিম সুলতানা বলে, ‘এটি জেলার প্রাচীন একটি বিদ্যালয়। এখানের শিক্ষকরা ভীষণ দক্ষ। আমাদের সন্তান স্নেহে তাঁরা পড়ান। বিদ্যালয়ে এলে আর বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে না। এ বিদ্যালয়ে পড়তে পেরে আমি গর্বিত।’

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাভিলা জাহান বলে, ‘সকালে বিদ্যালয়ে আসার পরে আনন্দে পড়ালেখা করে সময় কেটে যায়। শিক্ষকরা আমাদের খুব ভালোবাসেন। আমাদের বিদ্যালয়ের সব শ্রেণিকক্ষ সাজানো-গোছানো। আমরা গানের মাধ্যমে কবিতা শিখছি, খেলার ছলে পড়া শিখছি। পড়ালেখার পাশাপাশি আমরা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গিয়ে সময় কাটাই। আমাদের খেলার জন্যও একটি কক্ষ সাজানো রয়েছে।’

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী জয়িতা জুঁই বলে, ‘আমাদের বিদ্যালয় আনন্দের এক রঙিন ফুল। এখানে পড়তে আমাদের ভালো লাগে। এখানে সততা স্টোর রয়েছে, আমাদের খিদে পেলে সেখান থেকে কিছু কিনে খেতে পারি। যা খাই একটি বাক্সে তার দাম (টাকা) রেখে দিই।’

অভিভাবক কীর্ত্তিপাশা গ্রামের বীণা রানী দাস বলেন, ‘আমার মেয়ে বিদ্যালয়ে এলে আর বাড়ি যেতে চায় না। এখানেই ওর ভালো লাগে। মনোরম পরিবেশ ও শিক্ষকদের আন্তরিকতার কারণে এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেশি। প্রতিদিন সব শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত থাকছে। আমার মেয়ে এখানে পড়ে ভালো ফল করছে।’

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে সহশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করাতে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই মধ্যে আমাদের বিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষক আইসিটির ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে ডিজিটাল যুগের বিভিন্ন বিষয় শিক্ষার্থীদের শেখাচ্ছেন। আমরা প্রতিদিন একটি ক্লাস মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে নিয়ে থাকি, ফলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রবণতা একেবারেই নেই।’

শিক্ষক সুবর্ণা শারমিন বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের পড়ালেখার মান ভালো থাকায় অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানকে আগ্রহ নিয়ে ভর্তি করছেন। পাশের গ্রামের শিক্ষার্থীরা এখানে পড়ছে। আমাদের প্রধান শিক্ষকের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে বিদ্যালয়টি সুন্দর ও মনোরম পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিমুল সুলতানা হ্যাপি বলেন, ‘আমরা স্বপ্ন দেখেছি এমন একটি বিদ্যালয়ের, যেখানে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে শিখবে। বিদ্যালয়টি হবে সজ্জিত, ঠিক যেন স্বর্গের মতো। আমাদের সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়েছে। দক্ষ শিক্ষক, অভিভাবক ও কমিটির সহযোগিতায় আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের বিদ্যালয়ের শিশুস্বর্গটি, সত্যিকারের স্বর্গের মতোই সাজানো হয়েছে। এখানে পড়তে এসে ওরা বিন্দুমাত্রও আতঙ্কের মধ্যে থাকে না। আনন্দে সঙ্গে ওদের পাঠদান করা হয়।’

ঝালকাঠি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাইয়াদুজ্জামান বলেন, ‘কীর্ত্তিপাশার শিশুরা বিদ্যালয়ে আনন্দে পড়বে, আলোকিত মানুষ হয়ে আলো ছড়াবে সবখানে। কারণ ওদের লেখাপড়ার মান যেমন ভালো, তেমনি বিদ্যালয়ের পরিবেশও মানসম্মত। প্রধান শিক্ষক একজন গুণী মানুষ। তাঁর প্রচেষ্টায় একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তাই শিক্ষার্থীরাও আনন্দে লেখাপড়া করছে। কীর্ত্তিপাশা স্কুলটি জেলার একটি দৃষ্টান্ত।’



মন্তব্য