kalerkantho


ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ক্রিকেটে আশার আলো

জাতীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় জোগাড়ের পাইপলাইনই হচ্ছে ছোট-   

৩১ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০



ক্রিকেটে আশার আলো

বাংলাদেশের যে এলাকাগুলো সংগীত, শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে স্বমহিমায় উজ্জ্বল ব্রাহ্মণবাড়িয়া তার অন্যতম। সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, ব্যারিস্টার এ রসুল, নবাব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদা, কথাসাহিত্যিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ, কবি আবদুল কাদির, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ বহু জ্ঞানী-গুণীর জন্মধন্য জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তিতাস বিধৌত ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে এ জন্য সাংস্কৃতিক রাজধানীও বলেন অনেকে। একটা সময় ক্রীড়াঙ্গনেও যথেষ্ট সুনাম ছিল এই জেলার। বিভিন্ন খেলার লিগ মাঠে গড়াত নিয়মিত। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব, দ্বন্দ্ব, স্পনসরের অভাবে একটা সময় নেমে আসে স্থবিরতা। ভলিবল লিগই যেমন হয়নি ১০ বছর। সর্বশেষ বাস্কেটবল লিগ ২০০৭ সালে। আশির দশকের পর হকি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে স্কুলে। তবে সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল বারী চৌধুরী মন্টুর নেতৃত্বে জেলা ক্রীড়া সংস্থার নতুন কমিটি দায়িত্বে আসার পর গতি ফিরছে ক্রীড়াঙ্গনে। অন্তত হচ্ছে ক্রিকেট লিগটা।

এরই ধারাবাহিকতায় ব্রাক্ষণবাড়িয়ার বয়সভিত্তিক দলগুলো সাফল্য পেয়েছে এ বছর। ২০১৪-১৫ মৌসুমে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রিকেটের শিরোপা জিতেছে অনূর্ধ্ব-১৬ ও ১৮ দল। চ্যাম্পিয়ন না হলেও ফাইনালে পৌঁছেছিল অনূর্ধ্ব-১৪ দল। এ নিয়ে জেলা ক্রিকেট দলের কোচ রুহুল কুদ্দুস শামীম জানালেন, 'নানা কারণেই স্থবির ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ক্রীড়াঙ্গন। এখন গতি ফিরছে ধীরে ধীরে। তার পরও প্রতিবছর একই সঙ্গে প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগ করা হয়ে উঠছে না। এই সমস্যা কেটে গেলে বিভাগীয় পর্যায়ে আমাদের দল ভালো করবে আরো। তা ছাড়া ক্রিকেটে ভালো করতে নেওয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। তাই এই খেলাটায় আশার আলো দেখছি আমরা।'

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গত পাঁচ বছরে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগ হয়েছে দুবার। ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন হাজী সিরাজুল ইসলাম স্মৃতি সংসদ কাজীপাড়া। আর ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ প্রথম বিভাগ লিগের শিরোপা ক্রিকেট একাডেমির। এই ক্রিকেট একাডেমিই ২০১৩ সালে জিতেছিল দ্বিতীয় বিভাগ। ২০১৫-১৬ মৌসুম থেকে ১০ দল নিয়ে প্রিমিয়ার লিগ করার পরিকল্পনা নিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থা। পাশাপাশি তারা চেষ্টা করবে অন্য সব লিগই করার। এ জন্য দরকার শুধু পৃষ্ঠপোষকতা। এ বছরের দ্বিতীয় বিভাগের কথাই ধরুন। টুর্নামেন্টের জন্য গ্যাসফিল্ড দিয়েছিল আড়াই লাখ টাকা। কিন্তু এটা শেষ করতে খরচ প্রায় চার লাখ টাকা। বাকি দেড় লাখ টাকার ঘাটতিটা পূরণ হবে কোথা থেকে?

ফুটবলে একটা সময় বিখ্যাত ছিল হাজী এ খালেক গোল্ড কাপ, বাসন্তী শিল্ড আর তোফায়েল আজম শিল্ড। সত্তরের দশক শেষে হারিয়ে গেছে টুর্নামেন্টগুলো। তাই বলে ফুটবল থমকে যায়নি একেবারে। জেলা ক্রীড়া সংস্থা (ডিএসএ) আর জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (ডিএফএ) যৌথ উদ্যোগে জেলা প্রশাসক কাপ ফুটবল একপ্রকার নিয়মিত এখানে। ডিএসএ থেকে আলাদা হওয়ার পর পাঁচ বছর অবশ্য ফুটবল লিগ করতে পারেনি ডিএফএ। এই পাঁচ বছর সভাপতি থাকা অ্যাডভোকেট ইউসুফ কবীর ফারুক দায়িত্বে আছেন এখনো। তবে গত দুই মৌসুমের মতো এবারও মাঠে গড়াতে যাচ্ছে ফুটবল লিগ। ফুটবল হঠাৎ করে এমন গতি পেল কিভাবে? বছরতিনেক আগে ডিএফএর সাধারণ সম্পাদক হয়ে আসা মহিম চৌধুরী জানালেন, 'আগের কমিটির বেশির ভাগ সদস্য খেলোয়াড় ছিলেন না। এবারের কমিটিতে সেই সমস্যা নেই। আমি নিজেই ফুটবল খেলেছি ৩০ বছর। কিভাবে টুর্নামেন্ট করতে হয় জানা আছে ভালোভাবেই।'

লিগ বা টুর্নামেন্ট আয়োজনে উদ্যোগী হওয়ার পাশাপাশি দরকার টাকারও। একটা লিগ করতে যেখানে খরচ হয় তিন লাখ টাকা সেখানে বাফুফে থেকে দুই বছরে দেওয়া হয়েছে এক লাখ টাকা করে। ৫০ হাজার টাকা করে দিয়েছে মেডিক্যাল কলেজ। আর বাকি টাকাটা এসেছে কমিটির সদস্যদের আন্তরিকতায়। তাই আগামী মৌসুম থেকে প্রথম বিভাগের পাশাপাশি দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবলেরও পরিকল্পনা আছে ডিএফএর। এই সংস্থাটির বাইরে স্থানীয়দের উদ্যোগে অবশ্য নানা ফুটবল টুর্নামেন্ট হয় সুলতানপুর, সুহিলপুর, কুট্টাপাড়া, চান্দুরার মতো জায়গায়।

এই জেলার ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণকেন্দ্র নিয়াজ মোহাম্মদ স্টেডিয়াম। ১৯৩৪ সালে সেই সময়ের এসডিও নিয়াজ মোহাম্মদ খান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এটা, যা দেশের অন্যতম প্রাচীনতম স্টেডিয়াম হিসেবে পরিচিত। প্রাচীন আর ঢাকার এত কাছাকাছি থাকার পরও এই স্টেডিয়াম অবশ্য পায়নি আন্তর্জাতিক রূপ। তবে শিগগিরই সেই হতাশা কাটার আশাবাদ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল বারী চৌধুরীর কণ্ঠে, 'নানা সময়ে উন্নয়নের কথা বলে উল্টো ক্ষতিই করা হয়েছে স্টেডিয়ামের। স্টেডিয়ামের আন্তর্জাতিক রূপ দিতে আমাদের পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীও চেষ্টা করছেন। তিনি চিঠি দিয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে। আমরাও যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি।'

নিয়াজ মোহাম্মদ স্টেডিয়াম ছাড়া এখানে খেলার মাঠ বলতে কাউতলী, নিয়াজ মোহাম্মদ স্কুল মাঠ, কলেজপাড়া মাঠ, অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ আর হালদারপাড়া মাঠ। সবখানে পর্যাপ্ত অবকাঠোমো না থাকলেও এই মাঠগুলোতেই এখন সীমাবদ্ধ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ক্রীড়াঙ্গন।

ঈসা খাঁর প্রথম ও অস্থায়ী রাজধানী ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে সরাইলে। সেন বংশের রাজত্বকালে এই এলাকায় অভিজাত ব্রাহ্মণকুলের অভাবে পূজা-অর্চনায় বিঘ্ন হতো। এ জন্য রাজা লক্ষণ সেন আদিসুর কন্যাকুঞ্জ থেকে কয়েকটি ব্রাহ্মণ পরিবারকে নিয়ে আসেন। তারা শহরের মৌলভীপাড়ায় বাড়ী তৈরি করে। সেই ব্রাহ্মণদের বাড়ির অবস্থানের কারণে এ জেলার নামকরণ ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাস ফিল্ড, সালদা গ্যাস ফিল্ড, মেঘনা গ্যাস ফিল্ড দেশের এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস সরবরাহ করে। আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র। আশুগঞ্জ সার কারখানা দেশের ইউরিয়া সারের অন্যতম বৃহত্তম শিল্প কারখানা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একসময় বিখ্যাত ছিল 'আসিল মোরগ লড়াই'। 'আসিল' শব্দের অর্থ 'আসল'। আর 'আসিল মোরগ লড়াই' মানে 'আসল মোরগ লড়াই'। ভারত থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের দেওয়ান বংশ এই আসিল মোরগ নিয়ে আসেন। জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজন হতো এই মোরগ লড়াই। জমিদার আমল শেষেও দেশজুড়ে থাকা সৌখিন মালিকরা প্রতিবছর মোরগ নিয়ে আসতেন এখানে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা গ্রামীণ খেলাটা ফুটবল, ক্রিকেটের ডামাডোলে বিলুপ্ত প্রায়।

মনসাপূজা উপলক্ষে ভাদ্র মাসের প্রথম তারিখে তিতাস নদীতে হােত নৌকা বাইচ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাবেক মহকুমা প্রশাসক মিস্টারের বর্ণনায় জানা যায়, নৌকা বাইচের সময় লঞ্চ, নৌকা, কোষা, কলাগাছের ভেলা এমন কি, মাটির গামলাকে পর্যন্ত রং-বেরঙের কাগজের ফুল ইত্যাদি দিয়ে বিচিত্র সাজে সাজানো হতো। বিজয়ী নৌকাকে দেওয়া হতো মেডেল, কাপ, শিল্ড, পেতলের কলস, পাঁঠা বা ট্রফি। মাহবুবুল বারী চৌধুরী মন্টুর নেতৃত্বে জেলা ক্রীড়া সংস্থার নতুন কমিটি গত তিন বছর তিতাস নদীতে আয়োজন করেছে জমজমাট নৌকাবাইচ। নৌকাবাইচের মতো টিকে আছে গ্রামীণ খেলা গরুর দৌড়ও।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থানার সবচেয়ে বড় গ্রাম রূপসদীর ঐতিহ্যবাহী গরুর দৌড় পুরুষানুক্রমে লালন করে চলেছে। পহেলা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ঈদ, নবান্ন ছাড়াও সপ্তাহের বিশেষ একটি নির্দিষ্ট দিনে গ্রামের বৃন্দাবন হাইস্কুলের মাঠে গরুদৌড়ের অনুষ্ঠান করে থাকে তারা। কিছু দিনের মধ্যে কাবাডি লিগ চালু করার অঙ্গীকারও করলেন মাহবুবুল বারী চৌধুরী মন্টু, 'কাবাডি লিগের জন্য কমিটি করে ফেলেছি। কিছু দিনের মধ্যে চালু হবে এই লিগ। মহিলা ক্রীড়া সংস্থা কয়েক বছর হ্যান্ডবল করলেও এবার পারেনি নানা কারণে। আমরা চেষ্টা করছি হ্যান্ডবলের পাশাপাশি ভলিবল লিগ করারও।'

নিয়মিত খেলা মাঠে রাখতে প্রয়োজন টাকার। সেই টাকার অবশ্য খুব বেশি কমতি নেই জেলা ক্রীড়া সংস্থার। গর্বভরেই মাহবুবুল বারী চৌধুরী মন্টু জানালেন, 'বিন্দু বিন্দু জলে সিন্ধুর মতো আমরা জেলা ক্রীড়া সংস্থার নামে ব্যাংকে রাখতে পেরেছি ২৫ লাখ টাকার মতো। স্টেডিয়ামের দোকান ভাড়াই আয়ের প্রধান উৎস আমাদের। স্থানীয় সংসদ সদস্য আর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এখন ক্রীড়াঙ্গনে গতি ফেরাতে চাই আমরা। এ জন্য জাতীয় কোচদের অধীনে নিয়মিত আয়োজন করছি নানা খেলা প্রশিক্ষণেরও। '

এ ছাড়া সুনাম আছে স্পেশাল অলিম্পিকের অ্যাথলেটদের জন্য। দেশের হয়ে অনেক পদক এনে দিয়েছেন এখানকার খেলোয়াড়রা। এর অনেকটাই কৃতিত্বের দাবিদার প্রতিবন্ধী আন্দোলনের পথিকৃৎ সাবেক পৌর চেয়ারম্যান আল মামুন সরকার।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক কাজী জাবিদ আল রহমান জনি জানালেন, 'বাঞ্ছারামপুরের বিভিন্ন উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে বসুন্ধরা গ্রুপের অবদান আছে। ক্রীড়া ক্ষেত্রেও বসুন্ধরা গ্রুপকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।'

 



মন্তব্য